শূন্য এল ইউরোপে

যদি কোনদিন ছন্দিত পায়ে আগন্তুকরা আসে,

তারকাখচিত তৃণের আসনে, এই বাগিচার পাশে

ফুল্ল হৃদয়ে তুমিও সেখানে চরণচিহ্ন এঁকো,

একটি শূন্য সুধার পেয়ালা নিভৃতে উপুর করে রেখো।

–ওমর খৈয়াম, রুবাইয়াৎ

পাশ্চাত্য সম্রাজ্যবাদের সূচনা থেকে সমসাময়িক কাল পর্যন্ত পরিচিত ধারাটি হল, এশিয়া, আফ্রিকা আর ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে মেধাবী ছেলেমেয়েরা নিজ দেশের ‘সর্বচ্চ ডিগ্রী’ অর্জন করার পর ‘উচ্চতর’ শিক্ষার জন্য চলে যায় পশ্চিমে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও মধ্যযুগের প্রাক্কালে  কিন্তু স্রোতটা ছিল ঠিক বিপরীত। বরং পশ্চিম থেকে উচ্চাকংখী প্রতিভাধর ছেলেদের (সেকালে মেয়েদের স্কুলে যাওয়াটাই ছিল অশ্রুতপূর্ব) স্বপ্ন ছিল প্রাচ্যের বড় বড় শিক্ষানেকতন গুলোর কোথাও গিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করা। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সে শিক্ষাগারের পিঠস্থান ছিল আরব। তখনকার দিনে উন্নততর জ্ঞানকেন্দ্র ছিল মিসর, ইরাক, সিরিয়া, ইরান এইসব মুসলিমপ্রধান দেশ।

এমনি এক উচ্চাভিলাষী শিক্ষার্থী ছিলেন লিওনার্দো ফিবোনাচি (১১৭০-১২৫০)। ইতালির পিসা শহরে তাঁর জন্ম। ব্যবসায়ী পিতার আর্থিক সহায়তায় তিনি উত্তর আফ্রিকায় গিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। সেখানে তিনি অঙ্ক শেখেন মুসলিম গণিতজ্ঞদের কাছে। কালক্রমে তিনি নিজেই একজন বিশিষ্ট গাণিতিক হয়ে ওঠেন। আফ্রিকার গণিত চর্চা শেষ করে তিনি ফিরে আসেন মাতৃভূমিতে। ইউরোপে তখন প্রাচ্যের গণিত, বিশেষ করে আরব-সূচিত সংখ্যা-লিখনপ্রনালী সবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। ‘শূন্য’ তখনো ঠিক তাদের সচেতন মনে ঠাই করে উঠতে পারে নি। গণিতের ঐতিহাসিকদের কারো কারো ধারনা, ফিবোনাচিই ছিলেন প্রথম ইউরোপিয়ান যার হাতে করে আরবি গণিত এবং আরবি ‘শূন্য’ সগৌরবে পদার্পণ করে ইউরোপের মাটিতে, এবং স্থায়ীভাবে আসন করে নেয় ইউরোপের মনমানসে।

১২০২ সালে Liber Abachi (গণনাগ্রন্থ) নামক একটি পুস্তক প্রকাশ করেন ফিবোনাচি। তাতে অত্যন্ত হালকা মেজাজে একটা আপাতত- তুচ্ছ সমস্যা দাঁড় করলেন তিনি। সমস্যাটি এরকমঃ

ধরুন এক কৃষক একজোড়া বাচ্চা খরগোশ কিনে এনেছে বাজার থেকে। ধরা যাক, খরগোশ প্রজাতির প্রজনন-প্রকৃতির ধারাটাই এরকম যে বাচ্চা অবস্থা থেকে পুরো দুমাস সময় লাগে তাদের প্রসব যোগ্য বয়স হতে। এই দুমাস কেটে যাবার পর প্রতি মাসের প্রথম দিনটিতে তাদের একজোড়া সন্তান জন্মায়। এই সন্তান জোড়াও দুমাস অপেক্ষা করার পর ঠিক একই নিয়মে প্রতি মাসে একজোড়া সন্তানের জন্ম দেয়। সমস্যাটি হল এইঃ একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক মাস, ধরুন, n অতিক্রম করার পর, n+1 – তম মাসের প্রথমে তাহলে সর্বমোট কত জোড়া খরগোশের মালিক হলেন সেই কৃষক?

একটা ছেলেমানুষি মডেল, মানছি, কিন্তু এর একটা বিস্ময়কর সমাপ্তি আছে।

গোনার কাজটি কিন্তু খুবই সহজ। প্রথম মাসে সংখ্যা ১। দ্বিতীয় মাসেও ১, কারন উৎপাদন তো শুরু হয় দ্বিতীয় মাস শেষ হবার পর। তৃতীয় মাসের ১ তারিখে সংখ্যা দাঁড়ায় ২। তার পরের মাসে সন্তানেরা স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি বলে শুধু তাদেরই একজোড়া বাচ্চা হয়, সুতরাং মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৩। তার পরের মাসে কিন্তু বাবা-মা এবং তাদের প্রথম সন্তানদ্বয়, দুইয়েরই একজোড়া করে সন্তান জন্ম নেয়। তাহলে এবার সংখ্যা দাঁড়াল ৫। এভাবে হিসেব করে যে সংখ্যামালাটি অনায়াসেই উদ্ধার করে ফেলি আমরা সেটা হলঃ

১,১,২,৩,৪,৫,১৩,২১,৩৪,৫৫……

এই ধারাবাহিক সংখ্যাগুলোর দিকে একটি মনোযোগ দিয়ে তাকালে একটা সুশৃঙ্খল প্যাটার্ন ধরা দেবে যেকোনে আনাড়ি চোখেও। তৃতীয় সংখ্যা থেকে শুরু করে ডান দিকের প্রতিটি সংখ্যা তার পূর্ববর্তী সংখ্যা দুটির যোগফল। এই অবলোকনটি থেকে একটা গাণিতিক সূত্র লিখে ফেলা যায়, কি বলেন? Xn যদি হয় n-তম মাসের খ্রগোশ-জোড়ার সংখ্যা, তাহলে সেই সূত্রটি নিশ্চয়ই এরকমঃ

Xn+1 = xn + xn-1.

এখানে n-কে শুরু করতে হবে ১ থেকে, এবং ধরে নিতে হবে যে, x0 = 0, x1 = 1, সুতরাং x2 =1, x3 =2, x4 =3, x5 =5,……, এই যে sequence টি, বা অনুবর্তী রাশিমালা, এটি গণিত-জগতে বিশেষ ভাবে পরিচিত ফিবোনাচি সিকুয়েন্স নামে। আট শ বছর পর এখনো গণিত বিশারদদের অনেকে এর উপর কাজ করছেন, পেপার লিখছেন। এ এক আশ্চর্য রহস্যময় সংখ্যামালা। এত সহজ, এত সাদাসিধে, অথচ এতো গভীর তার তাৎপর্য। এই তাৎপর্যের পরিসর অবিশ্বাস্য রকম বিস্তৃত। তার মাঝে একটি বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যাবে যদি একটু মনোযোগ দিয়ে তাকাই আনুবর্তিক সংখ্যা গুলোর দিকে। বাঁ থেকে ডান দিকে এগিয়ে চলুন। প্রতিটি সংখ্যাকে তার পূর্ববর্তী সংখ্যা দিয়ে ভাগ করুন। যেমন, ৩/২=১.৫, ৮/৫=১.৬, ১৩/৮=১.৬২৫, ২১/১৩=১.৬১৫৩৮……, ৩৪/২১= ১.৬১৯০……..। পরিচিত মনে হচ্ছে কি? এই অনুপাতটি যতই এগোবে ডান দিকে, একেবারে অন্তহীন মাত্রায়, ততই এটি একটি বিশেষ সংখ্যার নিকটে চলে যাবে। সেই সংখ্যাটি হল পূর্ববর্ণিত ওই জাদুকরী সংখ্যাটিঃ ১.৬১৮…..; পিথাগোরাসের সেই সুবর্ণ সংখ্যা যাকে ফাঁস করে দেওয়ার জন্য হতভাগ্য হিপসাসকে প্রান দিতে হয়েছিল!

আশ্চর্য, তাই না? শুধু তাই-ই নয়, পণ্ডিতরা খুঁজে বের করেছেন যে অনেক প্রানী আর উদ্ভিদের জীবনেও এই ফিবোনাচি রাশির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এ যেন এক দৈব ডিজাইন। (এ বিষয়ে বেশ কিছু সুপাঠ্য বই লেখা হয়েছে। কৌতূহলী পাঠক ইয়ান স্টুয়ারটের Mathematics of Life গ্রন্থখানা পড়ে দেখতে পারেন) যারা দৈবতায় বিশ্বাস করে না (যাঁদের মধ্যে এই বইয়ের দুই লেখকই আছে), তাদের কাছেও এ এক বিস্ময়কর রহস্য প্রকৃতির- যেন প্রজন্ম বৃদ্ধির এই সহজ নিয়মটির সারল্যের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি তার নিজেরই সারল্য-প্রীতি প্রকাশ করেছে।

প্রকৃতির আইন কানুনের সাথে যারা মোটামুটি পরিচিত (অর্থাৎ সফল গবেষনাকর্মে লিপ্ত) তাঁরা অবশ্য অনেক আপাত রহস্যেরই ব্যাখ্যা খুঁজে পেয়েছেন, এবং অহরহ খুঁজে চলেছেন (এই অন্তহীন কৌতূহলই বিজ্ঞানীদের চালিকা শক্তির উৎস)। যেমন আইজ্যাক নিউটনের (১৬৪২—১৭২৭) অভিকর্ষ বা মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব। অভিকর্ষের ফর্মুলাটি 1/d2 এর ২ হল কেন, ৩ হল না কেন, বা ২.১৭ বা অন্য কোন সংখ্যা, সেটা ভাববার বিষয় বৈকি (উক্ত ফর্মুলাটিতে d হল দুটি বস্তুর দূরত্ব, যেমন সূর্য এবং পৃথিবী।) মজার ব্যাপার যে এই একই ফর্মুলা প্রকৃতির আরো কয়েক জায়গায় কাজ করে, যেমন তাড়িতচৌম্বক ক্ষেত্রে, ফর্মুলার ২ সংখ্যাটি অন্য কোন সংখ্যা হলে তার কি পরিণতি হতে পারত সেটা নিয়েও অনেক গবেষনা হয়েছে – গাণিতিক, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, সব প্রকারেরই। তাতে দেখা গেছে যে ২-এর অন্যথায় আমাদের বিশ্ব প্রকৃতির চেহারা একবারে ভিন্ন রকম হতো, সম্ভবত এর স্থায়িত্ব নিয়েই নানা রকম সমস্যা দেখা দিত। তার অর্থ, এই যে সহজ সরল নীতিমালা অনুসরণ করে চলেছে প্রকৃতি তার একটুখানি উনিশ-বিশ হলে আমাদের অস্তিত্ব আর স্থিতি দুটিই বিপন্ন হয়ে পড়ত।

ফবোনাচির উপরোক্ত সূত্র বা সমীকরণটির সমাধান বের করা কিন্তু এমন কোন শক্ত কাজ নয়। ধরুন, সমাধানটি এরকমঃ

Xn = tn, t

কোনো সংখ্যা, মূলদ-অমূলদ কিছু আসে যায় না। এই ধারনাকৃত সমাধানটি আসলেই উক্ত সমীকরণের শর্ত পালন করে কিনা তা যাচাই করতে হলে দেখতে হবে ওটাতে স্থাপন করার পর t ভিত্তিক কি সমীকরণটি বের হয়ে আসে। এটা অতি সহজেই প্রমান করা যায় যে সমীকরণটি হচ্ছেঃ

t2 –t -1 = 0,

এর সমাধান কি করে বের করতে হয় সেটা তো আমাদের আগেই শেখা হয়ে গেছে আল-খোয়ারিজমি সাহেবের আবিষ্কার থেকে। এই সমাধান থেকেই চলে আসবে সেই বিপুল রহস্যে ভরা সংখ্যাটিঃ

(51/2 + 1)/2 = 1.618……,

বিচিত্র এই বিশ্ব, তাই না?

এই অনুচ্ছেদের মূল প্রসঙ্গটি হল ‘শূন্য’ ও তার ঘনিষ্ট সহচর ‘অসীম’। ফিবোনাচি সূত্রে শূন্য হয়তো আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না, যদিও প্রচ্ছন্নভাবে সেটা আছেও, কিন্তু অসীম তো একেবারে নাকের ডগায়। এই যে বলা হল সংখ্যা গুলো (অর্থাৎ কৃষকের খরগোশের সংখ্যা) বেড়ে বেড়ে চলে যাচ্ছে অসীমের দিকে, সেখানেই তো ছিল গ্রিক চিন্তাবিদদের জুজুর ভয়। ফিবোনাচির রাশিতে অসীম (এবং পরোক্ষে শূন্য) দেখা দিতে পেরেছে বলেই পিথাগোরাসের সযত্নে লুক্কায়িত জুজু, সুবর্ণ অনুপাত, আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে।

Liber Abaci ফিবোনাচির একমাত্র গ্রন্থ নয়। তার আরেকটি গ্রন্থে ত্রিঘাতী সমীকরণ, যা কিনা ছিল ওমর খৈয়ামের প্রিয় বিষয়, তার উপর অনেক মূল্যবান গবেষনা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। যেমনঃ

X3 + 2x2 +10x = 20

এটির কোনো মূলদ সমাধান থাকা যে সম্ভব নয়, এবং a+b1/2 জাতীয় কোন সংখ্যা, এ ধরনের আধুনিক গোছের মন্তব্যও তিনি রেখে গেছেন (উল্লেখ্য যে এখানে a এবং b উভয়কেই মূলদ সংখ্যা হতে হবে।)

 

মোনালিসার ছবিতে অঙ্ক?

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইউরোপের অন্ধকার ভালো করে কেটে ওঠেনি। উন্নততর আরব এবং ভারতবর্ষ সহ দুরপ্রাচ্যের নানা দেশ থেকে নতুন নতুন আইডিয়ার বাতাস ভেসে এলেও প্রাচীন অ্যারিস্টটলিয়ান চিন্তাধারা তাদের বিজ্ঞান আর গণিতের অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। ফিবোনাচির যুগান্তকারী আবিষ্কার আর আরব সংখ্যামালার প্রভাব তখনো প্রবেশ করেনি ইউরোপের গণমানসে, এমনকি বুদ্ধিজীবি মহলেও।

কিন্তু রক্ষনশীল সমাজের নানা রকম বিধিনিষেধ সত্ত্বেও সত্যিকার কোন আকর্ষণীয় আইডিয়া যখন অংকুরিত হয় কোন দেশে তখন সেটা ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বেই কোনো না কোনভাবে, চুম্বকের মত আকৃষ্ট করতে থাকবে চিন্তাশীল মানুষদের। সব বড় আইডিয়ারই ধর্ম সেটা। ‘শূন্য’ তেমনি এক বড় আইডিয়া। একে আর বেশিদিন চেপে রাখা সম্ভব হয় নি ইউরোপে। ধর্মযুদ্ধের ধবংস স্তুপ থেকে আস্তে আস্তে উঠে আসবার পর ‘শূন্যের’ আইডিয়াটি সে- সম্প্রদায়কে সবার আগে টেনে আনতে সক্ষম হয় সেটা ছিল যারা ছবি আঁকতেন – পেশাজীবি না হলেও শখের শিল্পী, যাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন চার্চের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট (সেকালে শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বলতে সাধারণত তাই বোঝাত,  ল্যাটিন ভাষা জ্ঞানসম্পন্ন পাদ্রী বা সাধু বা ভিক্ষু বা ঐজাতীয় কোন উপাধীযুক্ত পুরুষ)। ফিলিপো ব্রুনেলিসি (১৩৭৭-১৪৪৬) ছিলেন তেমনি এক মননশীল ইতালিয়ান বুদ্ধিজীবী যিনি পেশাতে ছিলেন স্থপতি, নেশাতে শিল্পী, চিন্তায় গাণিতিক। এক বিরল ব্যতিক্রম সেকালের, যার সঙ্গে চার্চের কোন সরাসরি সম্পর্ক ছিল না, তবে চার্চের জন্য ছবি আঁকতেন। ১৪২৫ সালে তার আঁকা ছবি, যা পরবর্তীকালে মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে, সেটা ফ্লোরেন্সের সবচেয়ে নামকরা চার্চের দেয়ালে সগৌরবে বোদ্ধা দর্শকদের চিত্তরঞ্জন করে চলেছে। ছবিটির বৈশিষ্ট্য হল অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে শূন্যের বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষতার পর্দায় তুলে নিয়ে আসা। তার আগে অংকন শিল্পের কোন জীবন ছিল না- নিষ্প্রান সমতল ভূমিতে শবদেহের মতো ছিল তাঁদের ছবি। ব্রুনেলিসি শূন্যের সাহায্যে তাতে একটা তৃতীয় মাত্রা যোগ করে দিলেন। শিল্প জীবন্ত হয়ে উঠল। জন্ম নিল ‘পার্সপেক্টিভ’ নামক এক নতুন আইডিয়া। দ্বিমাত্রিক পটে তিনি প্রবেশ করালেন ত্রিমাত্রিক বাস্তবতাকে। শূন্য আর অসীম তাতে হাত মিলিয়ে দর্শকের চোখ ধাধিয়ে দিল, মনকে তুলে নল লোক থেকে লোকান্তরে।

সে ছবি ইউরোপের রেনেসাঁ যুগের প্রত্যুষকালের এক যুগান্তকারী সৃষ্টি। ব্রুনেলিসির উত্তরসূরী ছিলেন আরেক বিশিষ্ট ইতালিয়ান, রেনেসাঁর অন্যতম প্রধান কর্ণধার, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫০৯)। ভিঞ্চি ব্রুনেলিসির কাজ দ্বারা খুব অনুপ্রানিত হয়েছিলেন কৈশোর আর যৌবনে। রীতিমত একটা বই লিখে ফেলেছিলেন ‘পার্সপেক্টিভ’ বিষয়টির উপর। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির নাম শোনেনি এমন কোন শিক্ষিত লোক পৃথিবীর কোথাও আছে কি না জানি না। জ্ঞান বিজ্ঞানের সাধনাতে অনুপ্রেরনার প্রয়োজন হলে আর কোথাও যেতে হবে না, ভিঞ্চির দুএকটা কাজের কথা শুনলেই যথেষ্ট। তাঁর মত শতমুখী প্রতিভার মানুষ ইতিহাসে কখনো জন্মেছে কিনা সন্দেহ। তাঁকে বলা হয় ‘সব জিনিয়াসের সেরা জিনিয়াস’। কিংবদন্তীয় শুধু নয়, অবিশ্বাস্য, অপার্থিব, অসামান্য প্রতিভা। সাধারন লোক তাঁর নাম শুনেছে ‘মোনালিসা’র শিল্পী হিসেবে।

কিন্তু তাঁর কর্মক্ষেত্র যে শিল্পের বাহিরে কত অসংখ্য পথে বিস্তৃত ছিল – গণিত, পদার্থবিদ্যা, প্রকৌশল, বিমান নির্মাণ, শারীরবিজ্ঞান, বিশেষ করে মানব দেহের অভ্যন্তরীণ জগতের যাবতীয় রহস্য, যা বর্তমান যুগের মেডিক্যাল ছাত্রছাত্রীরা হিউম্যান অ্যানাটমি বলে জানে (সে খবর হয়তো সবার জানা নয়)। আমাদের বিশেষ অনুরোধ বাংগালী পাঠকদের কাছে তারা যেন আগ্রহ করে এই লোকটার জীবনী পড়ার চেষ্টা করেন।

যা-ই হোক, আজকের প্রসঙ্গে যা বলতে চাচ্ছি তা হল ভিঞ্চি কি ধারনা পোষন করতেন অঙ্ক আর শিল্পের সম্পর্ক নিয়ে। তিনি লিখেছিলেন এক জায়গায়ঃ ‘আমার যদি ভালো করে বুঝতে চায় কেউ তাহলে সে যেন অঙ্কের জ্ঞান ছাড়া বুঝতে চেষ্টা না করে’। ইউরোপের মধ্যযুগে গণিত আর অংকন-শিল্প ছিল একই জিনিসের এপিঠ-ওপিঠ। অনেকটা প্রাচীন গ্রিকদের মতো, যারা বিশ্বাস করতেন যে গণিত আর দর্শন প্রায় সমার্থক শব্দ।

যেহেতু ব্রুনেলিসির ছবিতে শূন্যের উপস্থিতি ছিল প্রায় আক্ষরিকভাবেই, এবং সেই শূন্যই প্রকারান্তরে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিল অনন্ত অসীমতার, প্রধানত সেই কারনেই, এবং আনুষঙ্গিক আরো কিছু কারনে চার্চের মন আস্তে আস্তে নরম হতে লাগল এ দু’টি অ্যারিস্টটল বিরোধী আইডিয়ার প্রতি। ফলে চার্চ সংশ্লিষ্ট আরো কিছু গুনীজন সাহস করে এগিয়ে এলেন তাঁদের নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে। ব্রুনেলিসির সমসাময়িক এক চার্চ নেতা, কুসা শহরের জনৈক নিকোলাস, আকাশের নক্ষত্রমালার গতিপ্রকৃতি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করবার পর দৃঢ় সিদ্ধান্তে পৌঁছুলেন যে ‘পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু নয়’। এবং সে মর্মে প্রকাশ্যে ঘোষনাও দিয়ে ফেললেন। সে সময়কার মেজাজ মর্জি অনুযায়ী অত্যন্ত সাহসী, বৈপ্লবিক ও বিপজ্জনক ঘোষনা। কিন্তু এত বড় দুঃসাহসিক ঘোষনা প্রচার হবার পরও চার্চের কোন তাৎক্ষনিক বিরুপ প্রতিক্রিয়া হয় নি। ব্রুনেলিসির ছবি হয়তো চার্চকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল কিছুদিন। এরপর টেম্পিয়ার নামক আরেক ব্যক্তি বলে বসলেনঃ ‘ঈশ্বর তো সর্বশক্তিমান, যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। সুতরাং তিনি যদি চান তাহলে শূন্যতা থেকেই সবকিছু সৃষ্টি করতে পারেন (এটিই ইহুদি-খ্রিষ্টান-ইসলাম এই তিন আব্রাহামিক ধর্মের মূল বিশ্বাসের ভিত্তি), চাইলে অ্যারিস্টটলকেও ভুল প্রমানিত করতে পারেন’। ভীষন উদ্ধত উক্তি সন্দেহ নেই, কিছুদিন আগে বা কিছুদিন পরে হলেও অমার্জনীয় অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। চার্চ সেটা অগ্রাহ্য করে গেলেন। বিভোর ঘুম, নিঃসন্দেহে।

কুসার নিকোলাস কেবল ভূকেন্দ্রিক মতবাদের বিরোধীতা করেই ক্ষান্ত হলেন না, তিনি এ-ও বললেন যে, মহাবিশ্বে কেবল একটি নক্ষত্র মণ্ডল থাকবে কেন, কোটি কোটি, এমনকি অসংখ্য মণ্ডল থাকতেই বা বাধা কোথায় (পদার্থবিজ্ঞানের অত্যাধুনিক চিন্তা ধারার সঙ্গে আশ্চর্য রকম খাপ খেয়ে যায় এ ধারনা)। আমরা যেমন পৃথিবীতে বসে আকাশের তারাদের উজ্জলতা দেখে মুগ্ধ হচ্ছি, তেমনি অন্যান্য নক্ষত্রের অধিবাসীরাও হয়তো পৃথিবীর উজ্জলতা দেখে একই ভাবে মুগ্ধ হচ্ছে। তাহলে পৃথিবী কেন সবার থেকে আলাদা আসন পাবে সৃষ্টির মাঝে? পৃথিবী কেন হবে মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু?

অসম্ভব বিপ্লবী কথাবার্তা। পঞ্চাশ বছর পর জন্মগ্রহণ করলে লোকটাকে নির্ঘাত শূলে চড়ানো হতো। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম তাঁর গতানুগতিক ক্ষমতার মোহাবিষ্টতায় এমনই বিভোর যে ক্ষুদ্র মানুষেরা তাঁদের ক্ষুদ্র চিন্তা নিয়ে কোথায় কি আবোলতাবোল বকে যাচ্ছে, সেসব নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন বোধ করে নি কেউ।

কুসার নিকোলাসের বলিষ্ঠ ঘোষনা বিস্মৃতির গহ্বরে মিলিয়ে যেতে না যেতেই আরেক নিকোলাস উদয় হলেন ইউরোপের সদ্যজাগ্রত বিজ্ঞান জগতে – নিকোলাস কোপার্নিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩) নামক এক পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গাণিতিক। তখনকার ইউরোপে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় আসন ছিল পোল্যান্ডের। গণিত ও বিজ্ঞানের স্নায়ুকেন্দ্র ছিল পোল্যান্ডের বিখ্যাত ক্র্যাকো বিশ্ববিদ্যালয়। কোপার্নিকাস তাঁর গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান-বিষয়ক যাবতীয় জ্ঞানলাভ করেন প্রধানত সেখানেই। তাঁর পান্ডিত্য কেবল গণিত আর জ্যোতির্বিজ্ঞানেই ছিল তা নয়, আইন, চিকিৎসাশাস্ত্র – এসব বিষয়েও ছিল তাঁর বিশেষ বুৎপত্তি। তিনি কুসার নিকোলাস প্রবর্তিত ভূকেন্দ্রিক তত্ত্বকে আরো একধাপ এগিয়ে দিলেন তাঁর নিজস্ব তত্ত্ব দ্বারা – আমাদের সৌরমণ্ডলে সূর্যই একমাত্র নক্ষত্র যা তার নিজের অবস্থানে স্থির দাঁড়িয়ে আছে, এবং পৃথিবী সহ অন্যান্য গ্রহ তার চারপাশে নিজ নিজ বৃত্তপথে প্রদক্ষিন করছে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলার সঙ্গে। তাঁর এই দুঃসাহসী তত্ত্বটি এক কথায় সম্পূর্ণ উৎখাত করে দেয় টলেমি, পিথাগোরাস আর অ্যারিস্টটলের বহুদিনের সযত্নে লালিত ভূকেন্দ্রিক তত্ত্বকে। যে বছর তাঁর যুগান্তকারী তত্ত্ব-সংবলিত গ্রন্থ (১৫৪৩) প্রকাশ লাভ করে ঠিক সে বছরই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। ভাগ্যবান লোক। নইলে কপালে অনেক দুঃখ ছিল।

প্রায় একই সময় আরো দু’চারটে অলুক্ষনে ঘটনা ঘটে ইউরোপে যাতে রোমের ধর্মীয় সিংহাসন একটু কেঁপে উঠতে শুরু করে। প্রথম বড় ধাক্কাটা আসে তাদের নিজেদেরই এক পাদ্রির কাছ থেকে – মারটিন লুথার (১৪৮৩-১৫৮৬) নামক এক ‘কুলাঙ্গার’। জার্মানির আইলবোনে তাঁর জন্ম, ১৫০৭ সালে অগাস্টানিয়ান মনাস্টারি তাঁর সন্ন্যাসত্ব প্রাপ্তি, এবং তাঁর বছর পাঁচেক পর উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বচ্চ ডিগ্রি লাভের ফলে বাইবেল-বিষয়ক শাস্ত্রাদিতে অধ্যাপনার পদে নিযুক্তি।

অধ্যাপনা জীবনের প্রথম চার বছর তাঁর কেটেছিল বহু অন্তদ্বন্দ্ব আর প্রশ্ন জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়ে, চরম মানসিক বিবর্তন আর মৌলিক সংশয় চিন্তায়। তাঁর মন বুঝতে চেষ্টা করে বিশ্বজগতে ঈশ্বরের যথার্থ প্রকৃতি কি, কিই বা চার্চের ভূমিকা, কেন মানুষের জীবন এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা চার্চের সীমাহীন বিধিনিষধের বেড়াজালে, সেসব প্রশ্নও। ঈশ্বর সম্পর্কে তাঁর নিজের চিন্তা ভাবনা আর ক্যাথলিক চার্চের গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গির যোজন যোজন দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছিল ক্রমেই। সাথে সাথে আরো একটি যন্ত্রনার মধ্যে আজীবন বন্দি ছিলেন তিনি – কোষ্ঠকাঠিন্য। হাঁসি পাবে জানি, কিন্তু সমস্যাটি এতই গুরুতর ছিল তাঁর বেলায় যে মারটিন লুথারকে নিয়ে যত বই-পুস্তক লেখা হয়েছে এযাবৎ তার প্রায় প্রতিটিতেই এই সমস্যাটির উল্লেখ আছে। এমনও দাবী করেন কোন কোন লেখক যে লুথারের বড় বড় আইডিয়াগুলো শৌচাগারের নির্জনতায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার সময়ই মাথায় উদয় হয়। যা-ই হোক, তিনি তার সংশয়ী মনের নানা প্রশ্নকে কিছুতেই নিজের মধ্যে চেপে রাখতে পারেন নি। ১৫১৭ সালে উইটেনবার্গের চার্চে একদিন প্রকাশ্যে রোমের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ একে একে লিপিবদ্ধ করে প্রচার করে দিলেন।

অর্থাৎ চার্চের কৃষ্ণ-বিড়াল তখন থলের অন্ধকার থেকে মুক্তি লাভ করে বহিরাংগনে আবির্ভূত। সে ধাক্কার জের সামলাতে না সামলাতেই ইংল্যান্ডে লেগে গেল আরেক ফ্যাঁকড়া – বিয়ে পাগলা রাজা অষ্টম হেনরি ১৫৩০ সালে পোপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করে নিজেই একটি আলাদা ধর্ম সৃষ্টি করে ফেললেন, এবং সে ধর্মের প্রধান নিযুক্ত করলেন নিজেকেই। এর নাম হল চার্চ অব ইংল্যান্ড। পরপর দুটি বড় বড় ‘ধর্মবিরোধী’ ঘটনা ঘটে যাওয়াতে চার্চকে এবার নড়েচড়ে বসতে হল। আর চুপ থাকা যায় না।

বলতে গেলে চার্চের শক্তহস্ত দমননীতি শুরু হয়ে গেল ১৫৪৩ এর অব্যবহিত পরই। কোপার্নিকাস মরে গিয়ে বেঁচে গেলেন। বাঁচেন নি বেচারা জিয়োরদিনো ব্রুনো।

 

চার্চের রোষবহ্নি

ব্রুনো ছিলেন ডমিনিকান মতবাদী (১২১৫ সালে সেন্ট ডমিনিক প্রতিষ্ঠিত একটি ক্যাথলিক ধর্মগোষ্ঠি) ধর্মযাজক। পেশা ও বিশ্বাসে ধর্মগতপ্রান হলেও বুদ্ধি ও চিন্তার জগতে তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা, জ্ঞানপিপাসু মানুষ, যার নৈতিক আনুগত্য গির্জার প্রতি থাকলেও বৌদ্ধিক আনুগত্য ছিল যুক্তি ও বিজ্ঞানের প্রতি। ষোড়শ শতাব্দীর আশির দশকে তিনি on the Infinite Universe and Worlds নাম দিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। নাম থেকেই বোঝা যায়, সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে লোকটার চিন্তাভাবনা কতখানি প্রগতিশীল ছিল, এবং কত দুঃসাহসী। একে তো তিনি বিশ্বজগতকে infinite, অর্থাৎ সীমাহীন বলছেন, যা প্রচলিত অ্যারিস্টটলিয়ান মতবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তার উপর বলছেন Worlds – একটা দুটো নয়, অসংখ্য পৃথিবী। তার অর্থ আমাদের এই অতি পরিচিত বিশ্বস্ত পৃথিবীটি বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডের কেন্দ্রবিন্দু তো নয়ই, আমাদেরটির মত আরো বহু বিশ্ব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সারা মহাকাশব্যাপী, হয়তোবা অগনিত সংখ্যায়।

আরো একটি মারাত্মক জিনিস ছিল গ্রন্থটিতে – কোপার্নিকাসের সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বের সঙ্গে একমত পোষন করা। এটা ছোটখাটো বেয়াদবি নয়, রীতিমতো বিদ্রোহ ঘোষনার শামিল।

ব্রুনো ভালো করেই জানতেন, ১৫৪৩ এর পর কতটা কড়াকড়ি হতে শুরু করেছেন ইংকুইজিশনের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ইতালিতে, যেখানে চার্চের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। কোপার্নিকাসের মৃত্যুর পরপরই তাঁর বই বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়, এবং সে বই থেকে সংগৃহীত কোনো তথ্য বা তত্ত্ব ব্যবহার ক্রাকে দন্ডনীয় অপরাধ বলে ঘোষনা করা হয়। ভালো করেই জানতেন তিনি ইংকুইজিশনের ভয়ঙ্কর জল্লাদ বাহিনী কতখানি তৎপর হয়ে উঠেছে তাঁর মতো “আইন ভঙ্গকারী”দের নিয়ে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করতে। কিন্তু লোকটার বুকে ছিল ভয়ানক সাহস, ছিল প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস। যা তিনি সত্য বলে জানতেন, প্রানের ভয়ে তাকে চেপে রাখার কোন যুক্তি তিনি মানতে রাজি ছিলেন না। চার্চের তরফ থেকে এক বিচারের প্রহসনে ব্রুনোকে অগ্নিদগ্ধ করে মারার রায় দেওয়া হয়। আগুনে পোড়ানোর আগ পর্যন্ত চার্চ থেকে প্রচন্ড চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল যেন তিনি কোপার্নিকাসের ভুল মতবাদ পরিত্যাগ করে বাইবেলের বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ‘পৃথিবী-কেন্দ্রিক’ মতবাদকে সত্য বলে মেনে নেন। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সত্যের প্রতি অবিচল ব্রুনো ঘৃণাভরে সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন। বরং বিচারকের দিকে তাকিয়ে নিরুত্তাপ গলায় ব্রুনো বলেছিলেন, ‘বিচারপতি, মনে হচ্ছে আমার চেয়ে আপনিই অধিকতর ভীত হয়ে এই বিচারের রায় উচ্চারন করছেন’। ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে এই অসম সাহসী বীর বিদ্রোহীকে সত্য ও যুক্তির সপক্ষে নিরাপস অবস্থান রাখার অপরাধে জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করা হয়।

‘Perhaps you, my judges, pronounce this sentence upon me with greater fear than i receive it .’ – Giordano Bruno (1548 – February 17 1600)

ব্রুনোর এই ভয়াবহ পরিণতির খবর পেয়ে তৎকালীন ইউরোপের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী গালিলিও গ্যালিলি এমন ঘাবড়ে গেলেন যে কোপার্নিকাস তত্ত্বের নির্ভুলতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া সত্ত্বেও প্রকাশ্যে সেটা প্রচার করায় বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে তাঁর কি মতামত সেটা কারোরই অজানা ছিল না। চার্চের রোষবহ্নি থেকে ছাড়া পাওয়া তাঁর সম্ভব হয়নি শেষ পর্যন্ত। একদিন কার্ডিনাল বেলারমিন নিজে তাকে ডেকে হুঁশিয়ার করে দিলেন যাতে এসব বাজে মতামত প্রকাশ করা বন্ধ করেন। মনে মনে যা-ই ভাবুন বাইরে যেন কাকপক্ষী টের না পায় গ্যালিলিও কি ভাবছেন। তাহলে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না-ও হতে পারে।

কার্ডিনাল ম্যাটিও বারবেলিনি ছিলেন একজন অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল পাদ্রী। এবং গ্যালিলির দারুন ভক্ত ও ব্যক্তিগত বন্ধু। শৌভাগ্যবশত কার্ডিনাল বারবেলিনি অষ্টম আরবান নাম ধারন করে পোপ হয়ে এলেন রোমে। বন্ধুর পোপ নিযুক্ত হওয়া দেখে গ্যলিলিও একটু ভরসা পেলেন বুকে – হয়তো বিপদ কেটে গেল এবার। সেই ভরসাতে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁর অপ্রকাশিত গ্রন্থ প্রকাশ করে ফেলবেন – এ সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। বই প্রকাশ করতে চার্চের অনুমতি নিতে হতো। ভাবলেন, বন্ধু যেখানে সর্বেসর্বা সেখানে অনুমতি আটকাবে কে। কিন্তু দেখা গেল, চার্চের স্বার্থ যেখানে সেখানে বন্ধুত্বের খুব মূল্য নেই। অনুমতি পেলেন না। তাতে দমে গেলেন খানিক, কিন্তু একেবারে নিরুৎসাহ হলেন না। ঠিক আছে, রোমে হল না, অন্যত্র হবে। শেষ পর্যন্ত ফ্লোরেন্সের চার্চ থেকে প্রকাশের অনুমতি পাওয়া গেল, ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে। বই বেরোল দীর্ঘ শিরোনামে – ‘টলেমীয় এবং কোপারনিয়ান – দুটি প্রধান বিশ্ব জগত- সম্পর্কিত কথোপকথন’। সাথে সাথে বেজে উঠল বিপদের শিঙ্গা।

ফ্লোরেন্সের সাধারন চার্চ তাকে প্রকাশের অনুমতি দিলেও ইংকুইজিশনের পাদ্রিদের চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়াল তাঁর গ্রন্থটি। তারা বললেন, ঠিক বেড়িয়ে গেছে, কিছু করা যাবে না, কিন্তু খবরদার, বইটা যেন প্রচার না হয় কোনোভাবে, যেন কোন ক্রেতার হাতে না পরে, কোন বাইরের লোকের চোখ না পরে তাতে। ব্যাপারটা সেখানেই চুকে গেল না কিন্তু। এবার এল স্বয়ং রোমের ইংকুইজিশন। তারা সমন পাঠালেন গ্যালিলিকে চার্চের আদালতে হাজিরা দেওয়ার জন্য। ১৬৩৩ খ্রিষ্টব্দের ২২ জুন তিনি আসামীর কাঠগড়াতে দাঁড়িয়ে কঠিন জেরার সম্মুখীন হলেন। চার্চের বিচারে সাব্যস্ত হল যে তাঁর গুরুতর অপরাধের সুযোগ্য শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, তবে সেটা মকুব করে গৃহবন্দিত্বের সাজায় নামানো যেতে পারে যদি তিনি নতজানু হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন চার্চের বিচারকবৃন্দের কাছে, এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে এসব বেয়াইনী কথাবার্তা জীবনে আর কখনো উচ্চারন করবেন না। প্রানের দায়ে ঠিক তাই করলেন গ্যালিলিও। সেই যে বন্দি হয়ে থাকলেন ১৬৩৩ সাল থেকে, সেই বন্দিদশাতেই ভগ্নহৃদয়ে মৃত্যুবরণ করেন এই মহাপুরুষ নয় বছর পর।

জিয়োরদিনো আর গ্যালিলিও গ্যালিলির করুন কাহিনী সেকালের খ্রিষ্টধর্মের করুণা ও ক্ষমার আদর্শের চেয়ে বরং মধ্যযুগের পৈশাচিক রূপটাই বেশি করে ফুটিয়ে তুলেছিল। দুঃখের বিষয় যে কোন কোন ধর্মের সেই পৈশাচিক রুপ আজকের অত্যাধুনিক যান্ত্রিক যুগেও নির্মূল হয়ে যায়নি।

সৌভাগ্যবশত যা সত্য ও শাশ্বত, যা স্বচ্ছ, সুন্দর ও পবিত্র তাকে অগ্নি, অস্ত্র আর বাহুবল, কোন কিছু দিয়েই দমিয়ে রাখা যায় না বেশি দিন। শত আবর্জনার স্তুপ থেকেও বুনোফুল এক সময় বের হয়ে আসে সূর্যের পিপাসায়। আলোর পুণ্যধারাতে অবগাহনই প্রানের প্রকৃতি। ইংকুইজিশনের শত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও কোপার্নিকাসের সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্ব ইউরোপের বুদ্ধি জগতে সাড়া সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হয়নি, শতদলে প্রস্ফুটিত হয়ে নানা বর্ণে নানা পত্রপুষ্পে বিস্তৃত হতে শুরু করে।

মধ্যযুগের ইতালীতে ধর্মের কৃপাণ যখন বিজ্ঞান আর গণিতের মুণ্ডচ্ছেদের যজ্ঞানুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত, ইউরোপের অন্যত্র তখন রেনেসাঁর অগ্নিশিখা অনির্বাণ উজ্জলতায় উদ্ভাবিত হয়ে চলেছে। পোল্যান্ডের কোপার্নিকাস যে আলোর বর্তিকা নিয়ে এলেন ইউরোপে, সেই আলোর পুণ্যধারাতে সিক্ত হয়ে জার্মানির ইওহান কেপলার (১৫৭১-১৬৩০) বেরিয়ে এলেন তার চেয়েও গূঢ়তর বাণী নিয়ে। কোপার্নিকাস শুধু বলেছিলেন, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে বৃত্তাকার পথে, কেপলার তাঁর দূরবীন দিয়ে খুব ভালো করে পরীক্ষা করে বললেনঃ না, ঠিক বৃত্ত নয়, উপবৃত্ত (ellipse)। তিনি আরো বললেন যে, সূর্য থেকে পৃথিবী বা অন্য যে কোন গ্রহ পর্যন্ত যদি একটি সরলরেখা কল্পনা করা যায় তাহলে সেই রেখাটি একই বেগে পরিভ্রমণ করবে একই সমতল ক্ষেত্র। অর্থাৎ এই প্রদক্ষিনের আঞ্চলিক গতিবেগের কোনো পরিবর্তন নেই। কেপলারের তৃতীয় একটি সূত্র আছে যা বছরের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে এই আঞ্চলিক গতির একটা সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে। এই তিনটি সূত্রই আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায় প্রকৃত পর্যবেক্ষণের সাথে।

মজার ব্যাপার যে, সে সময় আইজ্যাক নিউটনের যুগান্তকারী অভিকর্ষ তত্ত্ব কারো জানা না থাকলেও কেপলারের তত্ত্ব থেকেই উদ্ধার করা সম্ভব যে পৃথিবী ও সূর্যের ভেতরে একটা আকর্ষণের ব্যাপার আছে এবং সেটা বিপরীত দূরত্ববর্গের সূত্র পালন করে। কিন্তু এই আকর্ষণ যে একটি সর্বজনীন প্রাকৃতিক নিয়ম, এবং তা শুধু সৌরমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডজুরেই তার বিস্তার, সেই বিপুল অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন পদক্ষেপটি নিয়েছিলেন স্যার আইজ্যাক নিউটন। এবং সেই অসামান্য দূরদর্শী পদক্ষেপটি তিনি নিয়েছিলেন কোন দুরবিন বা অন্য কোনো যন্ত্রের সাহায্যে নয়, গণিতের সাহায্যে। এবং সে গণিত ছিল তাঁর নিজেরই উদ্ভাবিত গণিত। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী বাগানে আপেল পতনের দৃশ্য থেকেই সেই দিব্যজ্ঞান উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তাঁর মনে যে আপেলটি উপরে না গিয়ে নিচে নেমেছে, তার কারন বিশ্বপৃষ্ঠ তাকে টেনে নিয়েছে বিপরীত দূরত্ববর্গের নিয়ম অনুসারে। সব গল্প সব সময় সত্য হয় না, এ গল্পও হয়তো কেবলই গল্পই। তবে এটা সত্য যে পৃথিবীর বড় বড় আবিষ্কারগুলোর বেশির ভাগেরই প্রায় একই ইতিহাস – হঠাত, দৈববাণীর মতো উদয় হয় সাধকের মনে- হয়তো বাগানে, গোসল করতে গিয়ে, কিংবা খেলার মাঠে। এমনকি টয়লেটে বসেও মহান দিব্যদৃষ্টি লাভ করেছেন অনেকে, যেমন মারটিন লুথার। আইজ্যাক নিউটন এই একটি কাজ ছাড়া আর কোন বড় কাজ যদি না-ও করতেন তাহলেও তিনি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতেন। কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব ছিল তাঁর অসংখ্য যুগান্তকারী সৃষ্টির অন্যতম মাত্র। গণিত জগতে তিনি বিশেষভাবে খ্যাত ক্যাল্কুলাসের আবিষ্কারক হিসেবে, যদিও ওটা নিয়ে খানিক বিতর্ক আছে। সত্যি সত্যি নিউটনের প্রথম আবিষ্কারক, না জার্মানির গডফ্রিড উইলেম লিবনিজ (১৬৪৬-১৭১৬), সে নিয়ে এক বিরাট ঝগড়া ব্রিটেন আর বাদবাকি ইউরোপের মধ্যে। ব্রিটেন বলে নিউটন, ইউরোপ বলে লিবনিজ। এই বিতর্ক বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত দুই দলকে বিভক্ত করে রেখেছে, যার পরিণতি ইউরোপের চাইতে ব্রিটেনের জন্যই হয়েছে বেশি ক্ষতিকর। সৌভাগ্যবশত উভয় পক্ষেরই এখন মাথা ঠান্ডা হয়েছে খানিক, ফলে দুই দেশেই গণিত-সাধনায় এসেছে নবজীবনের প্রানোচ্ছাস।

 

গ্যালিলিওর বিচার

১৬৩৩ সাল। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে – বাইবেল বিরোধী এই সত্য কথা বলার অপরাধে চার্চ খ্যাতনামা বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে অভিযুক্ত করল ‘ধর্মদ্রোহিতার’ অভিযোগে। গ্যালিলিও তখন প্রায় অন্ধ, বয়সের ভারে ন্যুব্জ। অসুস্থ ও বৃদ্ধ বিজ্ঞানীকে জোর করে ফ্লোরেন্স থেকে রোমে নিয়ে যাওয়া হল, হাঁটু ভেঙ্গে সবার সামনে জোড় হাতে ক্ষমাপ্রার্থনা করিয়ে বলতে বাধ্য করা হয় এতোদিন গ্যালিলিও যা প্রচার করেছিলেন তা ধর্মবিরোধী, ভুল ও মিথ্যা। বাইবেলে যা বলা হয়েছে সেটিই আসল, সঠিক – পৃথিবী স্থীর অনড় – সৌরজগতের কেন্দ্রে। গ্যালিলিও প্রান বাঁচাতে তা-ই করলেন। পোপ ও ধর্ম সংস্থার সম্মুখে গ্যালিলিও যে সবীকারোক্তি ও প্রতিজ্ঞাপত্র স্বাক্ষর করেন, তা বিজ্ঞান সাধনার ইতিহাসে ধর্মীয় মৌলবাদীদের নির্মমতার এবং জ্ঞানসাধকদের কাছে বেদনার এক ঐতিহাসিক দলিলঃ
আমি ফ্লোরেন্সবাসী স্বর্গীয় ভিন্সেঞ্জিও গ্যালিলিওর পুত্র, সত্তর বছর বয়স্ক গ্যালিলিও গ্যালিলি সশরীরে বিচারার্থ আনীত হয়ে এবং অতি প্রখ্যাত ও সম্মানীয় ধর্মযাজকদের (কার্ডিনাল) ও নিখিল খ্রিস্টীয় সাধারনতন্ত্রে ধর্মবিরুদ্ধ আচরণজনিত অপরাধের সাধারন বিচারপতিগণের সম্মুখে নতজানু হয়ে স্বহস্তে ধ্রমগ্রন্থ স্পর্শপূর্বক শপথ করছি যে, রোমের পবিত্র ক্যাথলিক খৃষ্টধর্ম সংস্থার দ্বারা যা কিছু শিক্ষাদান ও প্রচার করা হয়েছে ও যা কিছুতেই বিশ্বাস স্থাপন করা হয়েছে, আমি তা সব সময় বিশ্বাস করে এসেছি, এখনো করি এবং ঈশ্বরের সহায়তা পেলে ভবিষ্যতেঅ করব। সূর্য কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ও নিশ্চল এরুপ মিথ্যা অভিমত যে কিরুপ শাস্ত্রবিরোধী সেসব বিষয়ে আমাকে অবহিত করা হয়েছিল; এ মিথ্যা মতবাদ সম্পূর্ণরুপে পরিহার করে এর সমর্থন ও শিক্ষাদান থেকে সর্বপ্রকারে নিবৃত্ত থাকতে আমি এই পবিত্র ধর্মসংস্থা কর্তৃক আদিষ্ট হয়েছিলাম। কিন্তু তৎসত্ত্বেও সে একই নিন্দিত ও পরিত্যক্ত মতবাদ আলোচনা করে ও কোনো সমাধানের চেষ্টার পরিবর্তে সেই মতবাদের সমর্থনে জোড়ালো যুক্তি তর্কের অবতারনা করে আমি একটি গ্রন্থ রচনা করেছি; এজন্য গভীর সন্দেহ এই যে আমি খ্রিষ্টধর্মবিরুদ্ধ মত প্রকাশ করে থাকি। ……… অতএব সঙ্গত কারনে আমার প্রতি আরোপিত অতিঘোর সন্দেহ ধর্মাবতারদের ও ক্যাথলিক সম্প্রদায়ভুক্ত প্রত্যেকের মন হতে দূর করবার উদ্দেশ্যে সরল অন্তঃকরণে ও অকপট বিশ্বাসে শপথ করে বলছি যে পূর্বোক্ত ভ্রান্ত ও ধর্মবিরুদ্ধ মত আমি ঘৃণাভরে পরিত্যাগ করি। আমি শপথ করে বলছি যে, আমার উপর এজাতীয় সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে, এরুপ কোন বিষয় সম্বন্ধে ভবিষ্যতে আর কখনো কিছু বলবো না বা লিখব না। এরুপ অবিশ্বাসীর কথা জানতে পারলে অথবা কারো উপর ধর্মবিরুদ্ধ মতবাদ পোষনের সন্দেহ উপস্থিত হলে পবিত্র ধর্মসংস্থার নিকট অথবা যেখানে অবস্থান করব সেখানাকার বিচারকের নিকট আমি তা জ্ঞাপন করব। শপথ নিয়ে আমি আরো প্রতিজ্ঞা করছি যে, এই পবিত্র ধর্মসংস্থা আমার উপর যেসব প্রায়শ্চিত্তের নির্দেশ প্রদান করবে আমি তা হুবহু পালন করব। এসব প্রতিজ্ঞা ও শপথের যেকোন একটি যদি ভঙ্গ করি তাহলে শপথ ভঙ্গকারীর জন্য ধর্মাধিকরনের পবিত্র অনুশাসনে এবং সাধারন অথবা বিশেষ আইনে যেসব নির্যাতন ও শাস্তির ব্যবস্থা আছে তা আমি মাথা পেতে গ্রহণ করব। অতএব, ঈশ্বর ও যেসব পবিত্র গ্রন্থ আমি স্পর্শ করে আছি, এঁরা আমার সহায় হোন। আমি ওপরে কথিত গ্যালিলিও গালিলি শপথ গ্রহণ ও প্রতিজ্ঞা করলাম এবং নিজেকে উপযুক্তভাবে বন্ধনে আবদ্ধ রাখতে প্রতিশ্রুত হলাম। এর সাক্ষ্য হিসেবে স্বহস্ত লিখিত শপথনামা যার প্রতিটি অক্ষর এইমাত্র আপনাদের পাঠ করে শুনিয়েছি তা আপনাদের নিকট সমর্পণ করছি। (২২ জুন, ১৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দ, রোমের মিনারভা কনভেন্ট)।

শোনা যায়, এর মধ্যেও একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ গণিতজ্ঞ-জ্যোতির্বিদ স্বগতোক্তি করেছিলেন- ‘তার পরেও কিন্তু পৃথিবী ঠিক ঘুরছে’। ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ নিয়েই গ্যালিলিওর মৃত্যু হয় ১৬৪২ সালে, নিজ গৃহে, অন্তরীন অবস্থায়। শুধু গ্যালিলিওকে অন্তরীন করে নির্যাতন তো নয়, ব্রুনোকে তো পুড়িয়েই মারল ঈশ্বরের সুপুত্ররা। তারপরও কি সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘোরা ঠেকানো গেল?

পবিত্র বাইবেলে আছে,
‘আর জগতও অটল- তা বিচলিত হবে না’ (ক্রুনিকলস ১৬/৩০)
‘জগতও সুস্থীর, তা নড়াচড়া করবে না।‘ (সাম ৯৩/১)
‘তিনি পৃথিবীকে এর ভিত্তিমূলের উপর স্থাপন করেছেন, তা কখনো বিচলিত হবে না’ (সাম ১০৪/৫) ইত্যাদি।

 

কথিত আছে যে নিউটনের পর্বতপ্রমান কর্মকাণ্ড – গণিত, পদার্থ বিজ্ঞানের একাধিক শাখা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, তার অধিকাংশ কাজই তিনি করেছিলেন ১৬৬৫ আর ১৬৬৭, এই দুটি বছরের মধ্যে, যখন ব্রিটেন ব্যাপী এক ভয়াবহ মহামারীর কারনে কেমব্রিজ বিশ্ববিদালয় দু’বছর বন্ধ থাকাকালে তিনি তাঁর গ্রামের বাড়িতে নিরিবিলি কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স তেইশ থেকে পচিশ! এই দুই বছরের ভেতর তিনি ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেছিলেন, অভিকর্ষ তত্ত্ব, শক্তিশালী দুরবীন ও আলোকরশ্মি বিষয়ক আরো অনেক মৌলিক তথ্য, বলবিদ্যার মৌলিক সূত্রাবলি (বস্তুর ভর ও ত্বরণের গুণফল যে গতির চালিকা শক্তির সঙ্গে আনুপাতিকভাবে সম্পর্কিত, এ তথ্যটি তাঁর গণিত তত্ত্বের তিন সূত্রের দ্বিতীয় সূত্র নামে খ্যাত), সবই সেই দুটি অবিশ্বাস্য বছরের ফসল। নিউটন সম্বন্ধে আইনস্টাইনসহ অনেক বড় বড় মনীষী এমন মন্তব্য করেছেন যে তিনি প্রকৃতির আজ্ঞাবহ ছিলেন না, বরং উল্টোটাই সত্য ছিল তাঁর বেলায়। প্রকৃতি যেন নিউটনের কাছে এসে তার সব রহস্য উজাড় করে দিয়েছিল। প্রকৃতি ছিল তার পোষা জীব। এজন্যই ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি মানুষই নিউটনের অনন্যসাধারন প্রতিভায় ছিলেন বিস্মিত, অবিশ্বাসের ঘোরে আচ্ছন্ন। নিউটন সাধারন রক্তমাংশে গড়া মানুষ ছিলেন না।

 

দর্শন কি অঙ্ক বোঝে?

নিউটনের জন্ম যে বছর, সে বছর ইউরোপের আরেক যুগস্রষ্টা পুরুষ, ফ্রান্সের রেনে ডেকারট ৪৬ বছর বয়সে পা দিলেন। তার দর্শন ও গণিতের ভক্ত তখন সারা ইউরোপ জুড়ে। আধুনিক দর্শন শাস্ত্রের জনক বলে ভাবা হয় তাকে। দর্শনের ব্যাকরণ ও রচনা প্রনালী তাঁরই হাতে গড়া। কিন্তু তাঁর অমরত্ব যদি দর্শনশাস্ত্রে পূর্ণপ্রতিষ্ঠিত না-ও হয়ে থাকে তাঁর গণিতের কাজ তাকে চিরঞ্জীব করে রাখবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।  গণিতের প্রাচীন দুটি শাখা – জ্যামিতি ও বীজগণিত এ দুটিকে একসাথে যুক্ত করে একটি নতুন শাখা সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। এর নাম Coordinate Geometry; বাংলা অভিধান অনুযায়ী বৈশ্লেষিক জ্যামিতি। জ্যামিতির সঙ্গে মানুষের পরিচয় আদিযুগ থেকে, সেই মিসরীয় সভ্যতার সময়ই জ্যামিতির জন্ম। কিন্তু বিজগণিতের প্রথম অঙ্কুর সম্ভবত গজায় ভারতবর্ষে, তারপর তা পূর্ণতা পায় আরেবের আল খোয়ারিজমির হাতে। সেটা ঘটে মধ্যযুগের প্রাক্কালে। তখন কারো পরিষ্কার ধারনা ছিল না যে দুটি আপাত বিচ্ছিন্ন শাখার মধ্যে কোন সরাসরি সম্পর্ক থাকতে পারে। জ্যামিতির প্রধান বাহক হল ছবি, রেখাচিত্র (figures), আর বীজগণিতের ভাষা হল সংখ্যা- ১, ২, ৩, …, a, b, c …. ইত্যাদি। একটা ত্রিভুজের সঙ্গে এগুলোর কি সম্পর্ক থাকতে পারে? ডেকারট দেখিয়ে দিলেন যে গণিতের সংখ্যা দিয়েই ত্রিভূজ করা যায়, আঁকবার দরকার হয় না। দুটিকে এভাবে জোড়া লাগিয়ে নতুন একটি শাখা তৈরি করাতে মৌলিক যে জিনিসটা ব্যবহার করতে হয়েছিল তাঁকে সেটা হল ‘শূন্য’। ধরুন একটা দ্বিমাত্রিক সমতল। সেখানে একটা বিন্দু স্থাপম করা দরকার যেখান থেকে দূরত্ব গণনা করা হবে সরাসরি ডানে, বামে বা সরাসরি ঊর্ধ্বে, নিচে, অর্থাৎ আনুভূমিক (horizontal), অথবা উল্লম্ব (Vertical) রেখা। সেই বিন্দুটিকে বলা হয় মূল (origin), এবং তা প্রকাশ করা হয় এভাবেঃ (0, 0)। ত্রিমাত্রিক ঘনক্ষেত্রে তা হবে (0, 0, 0)। যতই মাত্রা বাড়বে ততই বাড়বে শূন্যের সংখ্যা। এভাবে শূন্য তাঁর নতুন গণিতে অপরিহার্যভাবেই প্রবেশাধিকার অর্জন করে নিল। উদাহরণস্বরূপ (২, ৪) এমন একটি বিন্দু যার দূরত্ব মূল থেকে দুই একাঙ্ক (unit) ডান দিকে, আর চার একাঙ্ক লম্বাতে, সে একাঙ্ক একেক ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে (ইঞ্চি বা সেন্টিমিটার, মিলিমিটার ইত্যাদি)। ডেকারটের নতুন তত্ত্ব অনুযায়ী একটা সরল রেখাকে বর্ণনা করা যায় এভাবেঃ

Ax + by =c,

যেখানে, a, b, c হল পূর্বনির্ধারিত তিনটি সংখ্যা যার কোন পরিবর্তন হয় না রেখাটির এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে। এগুলোকে বলা হয় প্যারামিটার, বা নির্দিষ্ট সংখ্যা। কিন্তু x ও y দুটোই চলমান সংখ্যা, একেক বিন্দুতে তাদের একেক মান। এমন করে শুধু সরল রেখা কেন পুরো একটা ত্রিভূজ, একটা চতুর্ভুজ, পঞ্চভুজ, ইত্যাদি সব রকম জ্যামিতিক আকারকেই বীজগণিতের সাহায্যে প্রকাশ করা যায়। শুধু তা-ই নয়, ইউক্লিডের সমস্ত উপপাদ্য, সম্পাদ্য ইত্যাদিও প্রমান করা সম্ভব কেবল বীজগণিতের ব্যবহার দ্বারা। ডেকারটের এই অভিনব আবিষ্কার বিজ্ঞান জগতে এক নতুন যুগের সূচনা করে। বর্তমান যুগের সেরা গবেষকদের অন্যতম বড় আকর্ষণীয় বিষয়, Algebraic Geometry, তাঁর পূর্বসূরি হিসেবে ডেকারট সাহেবকে চিহ্নিত করা হয়তো অন্যায় হবে না।

অথচ মানুষের বুদ্ধির জগত আর বিশ্বাসের জগতে যে কতটা সংঘাত ঘটতে পারে ডেকারটের জীবনই তার উজ্জল উদাহরণ। ‘শূন্য’ সংখ্যাটি এক হিসেবে তার নবসৃষ্ট গণিতের মূল স্তম্ভ, কিন্তু তা সত্ত্বেও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘শূন্যের’ আইডিয়াকে পুরোপুরি গ্রহণ করাটাও ছিল তাঁর পক্ষে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি জন্মসূত্রে ছিলেন গোঁড়া জেসুটপন্থী ক্যাথলিক। জেসুট স্কুল থেকেই তাঁর ছোটবেলার শিক্ষাদীক্ষা। সমগ্র ইউরোপ মহাদেশ ব্যাপী যখন প্রটেস্ট্যান্ট আন্দোলনের ঝড় উঠেছে, ঠিক তখনই তিনি ঘোর ক্যাথলিক বিশ্বাসী ধার্মিক পুরুষ। তিনি ছিলেন অ্যারিস্টটলের ভক্ত, ছিলেন শূন্য-বিরোধী, ছিলেন সরল-গতি বিরোধী। অথচ তা গণিতই শূন্য নির্ভর। এ এক মহা যন্ত্রনা। একদিকে তাঁর বুদ্ধির পূর্ণ সমর্থন কোপার্নিকাস তত্ত্বের প্রতি, আরেকদিকে অ্যারিস্টটলের ভূকেন্দ্রিক বিশ্বকেও তিনি বর্জন করতে পারছিলেন না। বিজ্ঞান আর ধর্ম পরস্পর বিরোধী নয়, এই মতবাদ যারা আঁকরে থাকতে চান, তারা সম্ভবত ডেকারটের জীবন কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত নন।

‘শূন’ তার বিপরীত ‘অসীম’কে নিয়ে ডেকারটের নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বের সমাধান তিনি নিজেই করেছিলেন। প্রাচীন দার্শনিকদের মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন যে যার অস্তিত্ব নেই তার ভেতর থেকে হঠাত করে কিছু বের হয়ে আসতে পারে না (nothing can come out of nothing), যা আসলে রোমান কবি ও দার্শনিক লুক্রেসিয়াস (৯৯-৫৫ খ্রি.পূ.) বলে গিয়েছিলেন অনেক আগেই (আমাদের এ গ্রন্থের শেষের দিকে দেখব যে এ দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে সমসাময়িক পদার্থ বিজ্ঞানে)। এমনকি জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য বলে ভাবতেন ডেকারট, অর্থাৎ নতুন জ্ঞান বলতে কিছু নেই, বা নতুন চিন্তা, নতুন ধারনা। বাহ্যত নতুন মনে হলেও এসব কোন কিছুই নতুন নয়। সেগুলো কোন সর্বজ্ঞ স্রষ্টার কাছ থেকে একপ্রকার সূক্ষ্ম দৈবসূত্রে প্রাপ্ত প্রতিভাস মাত্র। সেই সর্ব জ্ঞানের জ্ঞানী সত্ত্বা, সেই সর্বজ্ঞ অধীশ্বরের অস্তিত্ব যিনি ধারন করেন তিনিই ঈশ্বর, সৃষ্টিকর্তা। তিনি অসীম, একমাত্র অসীম। বাদবাকি সব সীমার মধ্যে আবদ্ধ –  মানুষ, প্রকৃতি, বিশ্বগজত, জ্ঞান, সাধনা, প্রেম-ভালোবাসা। গোটা সৃষ্টি দুটি বিপরীত মেরুর মধ্যে সীমাবদ্ধ – একদিকে অসীম অর্থাৎ ভগবান। আরেক প্রান্তে শূন্য, অর্থাৎ যা অস্তিত্বহীনতার পর্যায়ে গণিতের বিমূর্ত জগতে বিরাজমান। তার অর্থ, অ্যারিস্টটল যেখানে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমান করেছিলেন শূন্য আর অসীমকে অস্বীকার করে, ডেকারট সেই একই ঈশ্বরকে প্রমান করার প্রয়াস পেলেন দুটিকে স্বীকার করেই।

⇐পূর্বের অধ্যায়⇐⇐⇒⇒ পরের অধ্যায়⇒