মুসলমানীর গল্প

খসড়া

তখন অরাজকতার চরগুলো কণ্টকিত করে রেখেছিল রাষ্ট্রশাসন, অপ্রত্যাশিত অত্যাচারের অভিঘাতে দোলায়িত হত দিন রাত্রি। দুঃস্বপ্নের জাল জড়িয়েছিল জীবনযাত্রার সমস্ত ক্রিয়াকর্মে, গৃহস্থ কেবলই দেবতার মুখ তাকিয়ে থাকত, অপদেবতার কাল্পনিক আশঙ্কায় মানুষের মন থাকত আতঙ্কিত। মানুষ হোক আর দেবতাই হোক কাউকে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল, কেবলই চোখের জলের দোহাই পাড়তে হত। শুভ কর্ম এবং অশুভ কর্মের পরিণামের সীমারেখা ছিল ক্ষীণ। চলতে চলতে পদে পদে মানুষ হোঁচট খেয়ে খেয়ে পড়ত দুর্গতির মধ্যে।

এমন অবস্থায় বাড়িতে রূপসী কন্যার অভ্যাগম ছিল যেন ভাগ্যবিধাতার অভিসম্পাত। এমন মেয়ে ঘরে এলে পরিজনরা সবাই বলত ‘পোড়ারমুখী বিদায় হলেই বাঁচি’। সেই রকমেরই একটা আপদ এসে জুটেছিল তিন-মহলার তালুকদার বংশীবদনের ঘরে।

কমলা ছিল সুন্দরী, তার বাপ মা গিয়েছিল মারা, সেই সঙ্গে সেও বিদায় নিলেই পরিবার নিশ্চিন্ত হত। কিন্তু তা হল না, তার কাকা বংশী অভ্যস্ত স্নেহে অত্যন্ত সতর্কভাবে এতকাল তাকে পালন করে এসেছে।

তার কাকি কিন্তু প্রতিবেশিনীদের কাছে প্রায়ই বলত, ‘দেখ্‌ তো ভাই, মা বাপ ওকে রেখে গেল কেবল আমাদের মাথায় সর্বনাশ চাপিয়ে। কোন্‌ সময় কী হয় বলা যায় না। আমার এই ছেলেপিলের ঘর, তারই মাঝখানে ও যেন সর্বনাশের মশাল জ্বালিয়ে রেখেছে, চারি দিক থেকে কেবল দুষ্টলোকের দৃষ্টি এসে পড়ে। ঐ একলা ওকে নিয়ে আমার ভরাডুবি হবে কোন্‌দিন, সেই ভয়ে আমার ঘুম হয় না।’

এতদিন চলে যাচ্ছিল এক রকম করে, এখন আবার বিয়ের সম্বন্ধ এল। সেই ধূমধামের মধ্যে আর তো ওকে লুকিয়ে রাখা চলবে না। ওর কাকা বলত, ‘সেই জন্যই আমি এমন ঘরে পাত্র সন্ধান করছি যারা মেয়েকে রক্ষা করতে পারবে।’

ছেলেটি মোচাখালির পরমানন্দ শেঠের মেজো ছেলে। অনেক টাকার তবিল চেপে বসে আছে, বাপ ম’লেই তার চিহ্ন পাওয়া যাবে না। ছেলেটি ছিল বেজায় শৌখিন–বাজপাখি উড়িয়ে, জুয়ো খেলে, বুলবুলের লড়াই দিয়ে খুব বুক ঠুকেই টাকা ওড়াবার পথ খোলসা করেছিল। নিজের সম্পদের গর্ব ছিল তার খুব, অনেক ছিল মাল। মোটামোটা ভোজপুরী পালোয়ান ছিল, সব বিখ্যাত লাঠিয়াল। সে বলে বেড়াত, সমস্ত তল্লাটে কোন্‌ ভগ্নীপতির পুত্র আছে যে ওর গায়ে হাত দিতে পারে। মেয়েদের সম্বন্ধে সে ছেলেটি বেশ একটু শৌখিন ছিল–তার এক স্ত্রী আছে, আর একটি নবীন বয়সের সন্ধানে সে ফিরছে। কমলার রূপের কথা তার কানে উঠল। শেঠবংশ খুব ধনী, খুব প্রবল। ওকে ঘরে নেবে এই হল তাদের পণ।

কমলা কেঁদে বলে, ‘কাকামণি, কোথায় আমাকে ভাসিয়ে দিচ্ছ।’

‘তোমাকে রক্ষা করবার শক্তি থাকলে চিরদিন তোমাকে বুকে করে রাখতুম জানো তো মা!’

বিবাহের সম্বন্ধ যখন হল তখন ছেলেটি খুব বুক ফুলিয়ে এল আসরে, বাজনাবাদ্দি সমারোহের অন্ত ছিল না। কাকা হাত জোড় করে বললে, ‘বাবাজি, এত ধুমধাম করা ভালো হচ্ছে না, সময় খুব খারাপ।’

শুনে সে আবার ভগ্নীপতির পুত্রদের আস্পর্ধা করে বললে, ‘দেখা যাবে কেমন সে কাছে ঘেঁষে।’

https://googleads.g.doubleclick.net/pagead/ads?client=ca-pub-1346472207097106&output=html&h=280&adk=234305443&adf=170846785&pi=t.aa~a.2566247160~i.21~rp.4&w=1200&fwrn=4&fwrnh=100&lmt=1663308063&num_ads=1&rafmt=1&armr=3&sem=mc&pwprc=4889733164&psa=1&ad_type=text_image&format=1200×280&url=https%3A%2F%2Fwww.tagoreweb.in%2FStories%2Fgalpoguchchho-84%2Fmusalmanir-golpo-2341&fwr=0&pra=3&rh=200&rw=1280&rpe=1&resp_fmts=3&wgl=1&fa=27&dt=1663308063834&bpp=1&bdt=1577&idt=-M&shv=r20220912&mjsv=m202209080101&ptt=9&saldr=aa&abxe=1&cookie=ID%3D461ced42134dbfaa-22a6e20f66d600e1%3AT%3D1662867198%3ART%3D1662867198%3AS%3DALNI_MYTv_XYuJMSKb4SDjB3rkdmGZhw3A&gpic=UID%3D000009b0adf756ed%3AT%3D1662867198%3ART%3D1663307054%3AS%3DALNI_MYG4ZAlokH5dfmvfd9av1mGcf28Lw&prev_fmts=0x0%2C1200x280%2C1200x280%2C1200x280%2C1200x280&nras=6&correlator=5486519247556&frm=20&pv=1&ga_vid=1136287520.1662867195&ga_sid=1663308063&ga_hid=79730178&ga_fc=1&u_tz=-420&u_his=5&u_h=858&u_w=1429&u_ah=813&u_aw=1429&u_cd=24&u_sd=0.896&adx=105&ady=2658&biw=1410&bih=718&scr_x=0&scr_y=58&eid=44759876%2C44759927%2C44759837%2C44770881%2C31067826&oid=2&psts=APxP-9DWrx15TyUy0_yQqwNHgLEdFfznLC06rGS8FtGf9m051H1OU1Cnz9Kr8Zt6t8xOtU_StkbkmguzLGWE4pc&pvsid=2645364661276208&tmod=1266376245&nvt=1&ref=https%3A%2F%2Fwww.tagoreweb.in%2FStories%2Fgalpoguchchho-84&eae=0&fc=1408&brdim=-9%2C-9%2C-9%2C-9%2C1429%2C0%2C1440%2C827%2C1429%2C718&vis=1&rsz=%7C%7Cs%7C&abl=NS&alvm=r20220914&fu=128&bc=31&ifi=6&uci=a!6&btvi=4&fsb=1&xpc=TepHYzWskN&p=https%3A//www.tagoreweb.in&dtd=118

কাকা বললে, ‘বিবাহ-অনুষ্ঠান পর্যন্ত মেয়ের দায় আমাদের, তার পর মেয়ে এখন তোমার–তুমি ওকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছবার দায় নাও। আমরা এ দায় নেবার যোগ্য নই, আমরা দুর্বল।’

ও বুক ফুলিয়ে বললে, ‘কোনো ভয় নেই।’

ভোজপুরী দারোয়ানরা গোঁফ চাড়া দিয়ে দাঁড়ালে সব লাঠি হাতে।

কন্যা নিয়ে চললেন বর সেই বিখ্যাত মাঠের মধ্যে, তালতড়ির মাঠ। মধুমোল্লার ছিল ডাকাতের সর্দার। সে তার দলবল নিয়ে রাত্রি যখন দুই প্রহর হবে, মশাল জ্বালিয়ে হাঁক দিয়ে এসে পড়ল। তখন ভোজপুরীদের বড়ো কেউ বাকি রইল না। মধুমোল্লার ছিল বিখ্যাত ডাকাত, তার হাতে পড়লে পরিত্রাণ নেই।

https://googleads.g.doubleclick.net/pagead/ads?client=ca-pub-1346472207097106&output=html&h=280&adk=234305443&adf=79287300&pi=t.aa~a.2566247160~i.29~rp.4&w=1200&fwrn=4&fwrnh=100&lmt=1663308064&num_ads=1&rafmt=1&armr=3&sem=mc&pwprc=4889733164&psa=1&ad_type=text_image&format=1200×280&url=https%3A%2F%2Fwww.tagoreweb.in%2FStories%2Fgalpoguchchho-84%2Fmusalmanir-golpo-2341&fwr=0&pra=3&rh=200&rw=1280&rpe=1&resp_fmts=3&wgl=1&fa=27&dt=1663308063807&bpp=1&bdt=1550&idt=2&shv=r20220912&mjsv=m202209080101&ptt=9&saldr=aa&abxe=1&cookie=ID%3D461ced42134dbfaa-22a6e20f66d600e1%3AT%3D1662867198%3ART%3D1662867198%3AS%3DALNI_MYTv_XYuJMSKb4SDjB3rkdmGZhw3A&gpic=UID%3D000009b0adf756ed%3AT%3D1662867198%3ART%3D1663307054%3AS%3DALNI_MYG4ZAlokH5dfmvfd9av1mGcf28Lw&prev_fmts=0x0%2C1200x280%2C1200x280%2C1200x280%2C1200x280%2C1200x280%2C1005x124&nras=8&correlator=5486519247556&frm=20&pv=1&ga_vid=1136287520.1662867195&ga_sid=1663308063&ga_hid=79730178&ga_fc=1&u_tz=-420&u_his=5&u_h=858&u_w=1429&u_ah=813&u_aw=1429&u_cd=24&u_sd=0.896&adx=105&ady=3306&biw=1410&bih=718&scr_x=0&scr_y=726&eid=44759876%2C44759927%2C44759837%2C44770881%2C31067826&oid=2&psts=APxP-9DWrx15TyUy0_yQqwNHgLEdFfznLC06rGS8FtGf9m051H1OU1Cnz9Kr8Zt6t8xOtU_StkbkmguzLGWE4pc&pvsid=2645364661276208&tmod=1266376245&nvt=1&ref=https%3A%2F%2Fwww.tagoreweb.in%2FStories%2Fgalpoguchchho-84&eae=0&fc=1408&brdim=-9%2C-9%2C-9%2C-9%2C1429%2C0%2C1440%2C827%2C1429%2C718&vis=1&rsz=%7C%7Cs%7C&abl=NS&alvm=r20220914&fu=128&bc=31&ifi=7&uci=a!7&btvi=6&fsb=1&xpc=b1rNnlK8UK&p=https%3A//www.tagoreweb.in&dtd=599

কমলা ভয়ে চতুর্দোলা ছেড়ে ঝোপের মধ্যে লুকোতে যাচ্ছিল এমন সময় পিছনে এসে দাঁড়ালো বৃদ্ধ হবির খাঁ, তাকে সবাই পয়গম্বরের মতোই ভক্তি করত। হবির সোজা দাঁড়িয়ে বললে, ‘বাবাসকল তফাত যাও, আমি হবির খাঁ।’

ডাকাতরা বললে, ‘খাঁ সাহেব, আপনাকে তো কিছু বলতে পারব না কিন্তু আমাদের ব্যবসা মাটি করলেন কেন।’

যাই হোক তাদের ভঙ্গ দিতেই হল।

হবির এসে কমলাকে বললে, ‘তুমি আমার কন্যা। তোমার কোনো ভয় নেই, এখন এই বিপদের জায়গা থেকে চলো আমার ঘরে।’

কমলা অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে উঠল। হবির বললে, ‘বুঝেছি, তুমি হিন্দু ব্রাহ্মণের মেয়ে, মুসলমানের ঘরে যেতে সংকোচ হচ্ছে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো–যারা যথার্থ মুসলমান, তারা ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণকে সম্মান করে, আমার ঘরে তুমি হিন্দুবাড়ির মেয়ের মতোই থাকবে। আমার নাম হবির খাঁ। আমার বাড়ি খুব নিকটে, তুমি চলো, তোমাকে আমি খুব নিরাপদে রেখে দেব।’

কমলা ব্রাহ্মণের মেয়ে, সংকোচ কিছুতে যেতে চায় না। সেই দেখে হবির বলল, ‘দেখো, আমি বেঁচে থাকতে এই তল্লাটে কেউ নেই যে তোমার ধর্মে হাত দিতে পারে। তুমি এসো আমার সঙ্গে, ভয় কোনো না।’

হবির খাঁ কমলাকে নিয়ে গেল তার বাড়িতে। আশ্চর্য এই, মুসলমান বাড়ির আট-মহলা বাড়ির এক মহলে আছে শিবের মন্দির আর হিন্দুয়ানির সমস্ত ব্যবস্থা।

একটি বৃদ্ধ হিন্দু ব্রাহ্মণ এল। সে বললে, ‘মা, হিন্দুর ঘরের মতো এ জায়গা তুমি জেনো, এখানে তোমার জাত রক্ষা হবে।’

কমলা কেঁদে বললে, ‘দয়া করে কাকাকে খবর দাও তিনি নিয়ে যাবেন।’

হবির বললে, ‘বাছা, ভুল করছ, আজ তোমার বাড়িতে কেউ তোমাকে ফিরে নেবে না, তোমাকে পথের মধ্যে ফেলে দিয়ে যাবে। না হয় একবার পরীক্ষা করে দেখো।’

হবির খাঁ কমলাকে তার কাকার খিড়কির দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বললে, ‘আমি এখানেই অপেক্ষা করে রইলুম।’

বাড়ির ভিতর গিয়ে কাকার গলা জড়িয়ে ধরে কমলা বললে, ‘কাকামণি, আমাকে তুমি ত্যাগ কোরো না।’

কাকার দুই চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।

কাকি এসে দেখে বলে উঠল, ‘দূর করে দাও, দূর করে দাও অলক্ষ্মীকে। সর্বনাশিনী, বেজাতের ঘর থেকে ফিরে এসেছিস, আবার তোর লজ্জা নেই!’

কাকা বললে, ‘উপায় নেই মা! আমাদের যে হিন্দুর ঘর, এখানে তোমাকে কেউ ফিরে নেবে না, মাঝের থেকে আমাদেরও জাত যাবে।’

মাথা হেঁট করে রইল কমলা কিছুক্ষণ, তারপর ধীর পদক্ষেপে খিড়কির দরজা পার হয়ে হবিরের সঙ্গে চলে গেল। চিরদিনের মতো বন্ধ হল তার কাকার ঘরে ফেরার কপাট।

হবির খাঁর বাড়িতে তার আচার ধর্ম পালন করবার ব্যবস্থা রইল। হবির খাঁ বললে, ‘তোমার মহলে আমর ছেলেরা কেউ আসবে না, এই বুড়ো ব্রাহ্মণকে নিয়ে তোমার পূজা-আর্চা, হিন্দুঘরের আচার-বিচার, মেনে চলতে পারবে।’

এই বাড়ি সম্বন্ধে পূর্বকালের একটু ইতিহাস ছিল। এই মহলকে লোকে বলত রাজপুতানীর মহল। পূর্বকালের নবাব এনেছিলেন রাজপুতের মেয়েকে কিন্তু তাকে তার জাত বাঁচিয়ে আলাদা করে রেখেছিলেন। সে শিবপূজা করত, মাঝে মাঝে তীর্থভ্রমণেও যেত। তখনকার অভিজাত বংশীয় মুসলমানের ধর্মনিষ্ঠ হিন্দুকে শ্রদ্ধা করত। সেই রাজপুতানী এই মহলে থেকে যত হিন্দু বেগমদের আশ্রয় দিত, তাদের আচার-বিচার থাকত অক্ষুণ্ন। শোনা যায় এই হবির খাঁ সেই রাজপুতানীর পুত্র। যদিও সে মায়ের ধর্ম নেয় নি, কিন্তু  সে মাকে পূজা করত অন্তরে। সে মা তো এখন আর নেই, কিন্তু তার স্মৃতি-রক্ষাকল্পে এই রকম সমাজবিতাড়িত অত্যাচারিত হিন্দু মেয়েদের বিশেষভাবে আশ্রয় দান করার ব্রত তিনি নিয়েছিলেন।

কমলা তাদের কাছে যা পেল তা সে নিজের বাড়িতে কোনোদিন পেত না। সেখানে কাকি তাকে ‘দূর ছাই’ করত–কেবলই শুনত সে অলক্ষ্মী, সে সর্বনাশী, সঙ্গে এনেছে সে দুর্ভাগ্য, সে ম’লেই বংশ উদ্ধার পায়। তার কাকা তাকে লুকিয়ে মাঝে মাঝে কাপড়-চোপড় কিছু দিতেন, কিন্তু কাকির ভয়ে সেটা গোপন করতে হত। রাজপুতানীর মহলে এসে যে যেন মহিষীর পদ পেলে। এখানে তার আদরের অন্ত ছিল না। চারি দিকে তার দাসদাসী, সবই হিন্দু ঘরের ছিল।

অবশেষে যৌবনের আবেগ এসে পৌঁছল তার দেহে। বাড়ির একটি ছেলে লুকিয়ে লুকিয়ে আনাগোনা শুরু করল কমলার মহলে, তার সঙ্গে সে মনে-মনে বাঁধা পড়ে গেল।

তখন সে হবির খাঁকে একদিন বললে, ‘বাবা, আমার ধর্ম নেই, আমি যাকে ভালোবাসি সেই ভাগ্যবানই আমার ধর্ম। যে ধর্ম চিরদিন আমাকে জীবনের সব ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেছে, অবজ্ঞার আস্তাকুড়ের পাশে আমাকে ফেলে রেখে দিয়েছে, সে ধর্মের মধ্যে আমি তো দেবতার প্রসন্নতা কোনোদিন দেখতে পেলুম না। সেখানকার দেবতা আমাকে প্রতিদিন অপমানিত করেছে সে কথা আজও আমি ভুলতে পারি নে। আমি প্রথম ভালোবাসা পেলুম, বাপজান, তোমার ঘরে। জানতে পারলুম হতভাগিনী মেয়েরও জীবনের মূল্য আছে। যে দেবতা আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন সেই ভালোবাসার সম্মানের মধ্যে তাঁকেই আমি পুজো করি, তিনিই আমার দেবতা–তিনি হিন্দুও নন, মুসলমানও নন। তোমার মেজো ছেলে করিম, তাকে আমি মনের মধ্যে গ্রহণ করেছি–আমার ধর্মকর্ম ওরই সঙ্গে বাঁধা পড়েছে। তুমি মুসলমান করে নাও আমাকে, তাতে আমার আপত্তি হবে না–আমার না হয় দুই ধর্মই থাকল।’

এমনি করে চলল ওদের জীবনযাত্রা, ওদের পূর্বতন পরিজনদের সঙ্গে আর দেখাসাক্ষাতের কোনো সম্ভাবনা রইল না। এ দিকে হবির খাঁ কমলা যে ওদের পরিবারের কেউ নয়, সে কথা ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা করলে–ওর নাম হল মেহেরজান।

ইতিমধ্যে ওর কাকার দ্বিতীয় মেয়ের বিবাহের সময় এল। তার বন্দোবস্তও হল পূর্বের মতো, আবার এল সেই বিপদ। পথের মধ্যে হুঙ্কার দিয়ে এসে পড়ল সেই ডাকাতের দল। শিকার থেকে একবার তারা বঞ্চিত হয়েছিল সে দুঃখ তাদের ছিল, এবার তার শোধ নিতে চায়।

কিন্তু তারই পিছন পিছন আর এক হুঙ্কার এল, ‘খবরদার!’

‘ঐরে, হবির খাঁর চেলারা এসে সব নষ্ট করে দিলে।’

কন্যাপক্ষরা যখন কন্যাকে পালকির মধ্যে ফেলে রেখে যে যেখানে পেল দৌড় মারতে চায় তখন তাদের মাঝখানে দেখা দিল হবির খাঁয়ের অর্ধচন্দ্র-আঁকা পতাকা বাঁধা বর্শার ফলক। সেই বর্শা নিয়ে দাঁড়িয়েছে নির্ভয়ে একটি রমণী।

সরলাকে তিনি বললেন, ‘বোন, তোর ভয় নেই। তোর জন্য আমি তাঁর আশ্রয় নিয়ে এসেছি যিনি সকলকে আশ্রয় দেন। যিনি কারও জাত বিচার করেন না।–

‘কাকা, প্রণাম তোমাকে। ভয় নেই, তোমার পা ছোঁব না। এখন এঁকে তোমার ঘরে নিয়ে যাও, একে কিছুতে অস্পৃশ্য করে নি। কাকিকে বোলো অনেক দিন তাঁর অনিচ্ছুক অন্নবস্ত্রে মানুষ হয়েছি, সে ঋণ যে আমি এমন করে আজ শুধতে পারব তা ভাবি নি। ওর জন্যে একটি রাঙা চেলী এনেছি, সে এই নাও, আর একটি কিংখাবের আসন। আমার বোন যদি কখন দুঃখে পড়ে তবে মনে থাকে যেন তার মুসলমান দিদি আছে, তাকে রক্ষা করবার জন্যে।’