ভূমিকা

যে উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য ব্রক্ষ্মার প্রতিদিনে একবার, অর্থাৎ প্রতি ৮৬০,০০,০০,০০০ বৎসরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই পৃথিবীতে অবতরণ করেন, সেই উদ্দেশ্যকে অনুপ্রাণিত করে বদ্ধ জীবদের পথপ্রদর্শন করবার জন্যই এই ভগবদগীতা যথাযথ প্রকাশিত হয়েছে। ভগবানের সেই উদ্দেশ্যের কথা ভগবদগীতায় বর্ণিত হয়েছে এবং তা আমাদের যথাযথ ভাবে গ্রহণ করতে হবে; তা না হলে ভগবদগীতা ও তাঁর বক্তা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জানবার চেষ্টা করা বৃথা। ভগবতগীতায় ভগবান নিজেই বলেছেন যে, লক্ষ কোটি বৎসর আগে তিনি সূর্যদেবকে সর্বপ্রথম এই জ্ঞান দান করেন। এই সত্য আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে এবং এভাবেই শ্রীকৃষ্ণের উপদেশের কদর্থ না করে, ভগবদগীতার ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে। শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছার কথা উল্লেখ না করে ভগবদগীতার ব্যাখ্যা করা সবচেয়ে গর্হিত অপরাধ। এই অপরাধ থেকে রক্ষা পেতে হলে, শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবান ভ্লে জানতে হবে, ঠিক যেভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রথম শিষ্য অর্জুন তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে জেনে ছিলেন। ভগবদগীতাকে এভাবে উপলব্ধি করা যথার্থই লাভজনক এবং মানব জীবনের উদ্দেশ্য পরিপূরণে সমাজের যথার্থ কল্যাণ সাধনের জন্য অনুমোদিত।

 

কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন মানব সমাজের পক্ষে অপরিহার্য, যেহেতু তা জীবনের সর্বোচ্চ পূর্ণতা প্রদান করে। সেটি কিভাবে সম্ভব তা সম্পূর্ণভাবে ভগবদগীতায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত জড়াসক্ত তার্কিকেরা ভগবদগীতার অযুহাত দেখিয়ে তাদের আসুরিক প্রবৃত্তিগুলি চরিতার্থ করবার চেষ্টা করেছে এবং মানুষকে বিপথে চালিত করছে, যার ফলে সাধারন মানুষ তাদের জীবনের সহজ সরল উদ্দেশ্যটি উপলব্ধি করতে পারছে না। সকলেরই উচিত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম উপলব্ধি করা, এবং প্রতিটি জীবের স্বরূপ সম্বন্ধে অবগত হওয়া। প্রত্যেকেরই জানা উচিত যে, প্রতিটি জীব হচ্ছে ভগবানের নিত্য সেবক এবং শ্রীকৃষ্ণের সেবা না করলে তাকে জড়া প্রকৃতির তিনটি গুনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মায়ার সেবা করতে হবে এবং তার ফলে জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে নিত্যকাল আবর্তিত হতে হবে; এমন কি তথাকথিত মুক্ত মনোধর্মী মায়াবাদীদেরও এই প্রচন্ড দুঃখের হাত থেকে নিস্তার নেই। ভগবদগীতার জ্ঞান হচ্ছে একটি মহৎ বিজ্ঞান এবং নিজের যথার্থ কল্যাণ সাধন করবার জন্য এই জ্ঞান আহরণ করা প্রতিটি জীবের পরম কর্তব্য।

 

সাধারন মানুষ , বিশেষ করে এই কলি যুগে, শ্রীকৃষ্ণের বহিরঙ্গা প্রকৃতির দ্বারা মোহিত। বিভ্রান্ত হয়ে তারা মনে করে যে, জড় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের উন্নতি সাধন করার ফলেই প্রতিটি মানুষ সুখী হতে পারবে। তারা জানে না যে, এই জড়া প্রকৃতি বা ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তি অত্যন্ত প্রবল, যেহেতু প্রতিটি জীবই জড়া প্রকৃতির কঠিন নিয়মের বন্ধনে আবদ্ধ। ভগবানের বিভিন্ন অংশ হওয়ার ফলে জীব আনন্দময় এবং তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হচ্ছে ভগবানের সেবা করা। মায়ার দ্বারা মোহিত হয়ে জীব বিভিন্নভাবে তার ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তিসাধন করার মাধ্যমে সুখী হবার ভ্রান্ত চেষ্টা করে, কিন্তু সেভাবে সে কোনদিনই সুখী হতে পারে না। আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি সাধনের পরিবর্তে কৃষ্ণের ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তিসাধন করাটাই হচ্ছে তার কর্তব্য। সেটিই হচ্ছে জীবনের চরম সার্থকতা। ভগবান সেটিই চান এবং তিনি তা দাবী করেন। ভগবদগীতার এই মূল ভাবটি উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন সমস্ত জগৎ জুড়ে ভগবদগীতার এই মূল ভাবটি শিক্ষা দিচ্ছে, এবং আমরা যেহেতু ভগবদগীতা যথাযথের মূল ভাবটির কদর্থ করছি না, তাই যে সমস্ত মানুষ ভগবদগীতা অধ্যায়ণ করে ঐকান্তিকভাবে উপকৃত হতে চান, ভগবানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ভগবদগীতাকে যথাযথ ভাবে উপলব্ধি করার জন্য তাদের অবশ্যই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের সহায়তা গ্রহণ করতে হবে। তাই আমরা আশা করি যে, এই ভগবদগীতা যথাযথ পাঠ করে মানুষ পরম লাভবান হবে এবং যদি একজন মানুষও ভগবানের শুদ্ধ ভক্তে পরিণত হতে পারে, তা হলে আমাদের এই প্রচেষ্টা সার্থক বলে মনে করব।

 

—-এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী

 

১২মে, ১৯৭১

সিডনি, অস্ট্রেলিয়া