প্রথম অধ্যায়

বিষাদ- যোগ

শ্লোক – ০১

ধৃতরাষ্ট্র উবাচ

ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ।

মামকাঃ পান্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়।।  ১ ।।

ধৃতরাষ্ট্রঃ উবাচ – মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র বললেন; ধর্মক্ষেত্রে – ধর্মক্ষেত্রে; কুরুক্ষেত্রে – কুরুক্ষেত্র নামক স্থানে; সমবেতা – সমবেত হয়ে; যুযুৎসবঃ – যুদ্ধকামী; মামকা – আমার দল (পুত্রেরা); পান্ডবা – পান্ডুর পুত্রেরা; চ – এবং; এব – অবশ্যই; কিম – কি; অকুবর্ত – করেছিল; সঞ্জয় – হে সঞ্জয়।

গীতার গান

ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে হইয়া একত্র।

যুদ্ধকামী মমপুত্র পান্ডব সর্বত্র।।

কি করিল তারপর কহত সঞ্জয়।

ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসয়ে সন্দিগ্ধ হৃদয়।।

অনুবাদঃ ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করলেন – হে সঞ্জয়! ধর্মক্ষেত্রে যুদ্ধ করার মানসে সমবেত হয়ে আমার পুত্র এবং পান্ডুর পুত্রেরা তারপর কি করল?

তাৎপর্যঃ ভগবদগীতা হচ্ছে বহুজন-পঠিত ভগবৎ-তত্ত্ববিজ্ঞান, যার মর্ম গীতা-মাহাত্মে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভগবদগীতা পাঠ করতে হয় ভগবৎ-তত্ত্বদর্শী কৃষ্ণভক্তের তত্ত্বাবধানে। ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে গীতার বিশ্লেষন করা কখনই উচিত নয়। গীতার যথাযথ অর্থ উপলব্ধি করার দৃষ্টান্ত ভগবদগীতাই আমাদের সামনে তুলে ধরেছে অর্জুনের মাধ্যমে, যিনি স্বয়ং ভগবানের কাছ থেকে সরাসরিভাবে এই গীতার জ্ঞান লাভ করেছিলেন। অর্জুন ঠিক যেভাবে গীতার মর্ম উপলব্ধি করেছিলেন, ঠিক সেই দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোবৃত্তি নিয়ে সকলেরই গীতা পাঠ করা উচিত। তা হলেই গীতার যথাযথ মর্ম উপলব্ধি করা সম্ভব। সৌভাগ্যবশত যদি কেউ গুরুপরম্পরা-সূত্রে ভগবদগীতার মনগড়া ব্যাখ্যা ব্যতীত যথাযথ অর্থ উপলব্ধি করতে পারেন, তবে তিনি সমস্ত বৈদিক জ্ঞান এবং পৃথিবীর সব রকমের শাস্ত্রজ্ঞান আয়ত্ত করতে সক্ষম হন। ভগবদগীতা পড়ার সময় আমরা দেখি, অন্য সমস্ত শাস্ত্রে যা কিছু আছে, তা সবই ভগবদগীতায় আছে, উপরন্তু ভগবদগীতায় এমন অনেক তত্ত্ব আছে যা আর কোথাও নেই। এটিই হচ্ছে গীতার মাহাত্ম্য এবং এই জন্যই গীতাকে সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্র বলে অভিহিত করা হয়। গীতা হচ্ছে পরম তত্ত্বদর্শন, কারন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে এই জ্ঞান দান করে গেছেন।

মহাভারতে বর্ণিত ধৃতরাষ্ট্র ও সঞ্জয়ের আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে ভগবদগীতার মহৎ তত্ত্বদর্শনের মূল উপাদান। এখানে আমরা জানতে পারি যে, এই মহৎ তত্ত্বদর্শন প্রকাশিত হয়েছিল কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে, যা সুপ্রাচীন বৈদিক সভ্যতার সময় থেকেই পবিত্র তীর্থস্থানরুপে খ্যাত। ভগবান যখন মানুষের উদ্ধারের জন্য এই পৃথিবীতে অবতরণ করেছিলেন, তখন এই পবিত্র তীর্থস্থানে তিনি নিজে পরম তত্ত্ব সমন্বিত এই গীতা দান করেন।

এই শ্লোকে ধর্মক্ষেত্র শব্দটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, কারন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন তথা পান্ডবদের পক্ষে ছিলেন। দুর্যোধন আদি কৌরবদের পিতা ধৃতরাষ্ট্র তাঁর পুত্রদের বিজয় সম্ভাবনা সম্বন্ধে অত্যন্ত সন্দিগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। দ্বিধাগ্রস্থ-চিত্তে তাই তিনি সঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমার পুত্র ও পান্ডুর পুত্রেরা তারপর কি করল?” তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, তাঁর পুত্র ও পান্ডুপুত্রেরা কুরুক্ষেত্রের বিস্তীর্ণ ভূমিতে যুদ্ধ করবার জন্য সমবেত হয়েছিলেন। কিন্তু তবুও তাঁর অনুসন্ধানটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি চাননি যে, পান্ডব ও কৌরবের মধ্যে কোন আপস-মীমাংসা হোক, কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন যুদ্ধে তাঁর পুত্রদের ভাগ্য সুনিশ্চিত হোক। তার কারন হচ্ছে কুরুক্ষেত্রের পুণ্য তীর্থে এই যুদ্ধের আয়োজন হয়েছিল। বেদে বলা হয়েছে, কুরুক্ষেত্র হচ্ছে অতি পবিত্র স্থান, যা দেবতারাও পূজা করে থাকেন। তাই, ধৃতরাষ্ট্র এই যুদ্ধের ফলাফলের উপর এই পবিত্র স্থানের প্রভাব সম্বন্ধে শঙ্কাকুল হয়ে পড়েছিলেন। তিনি খুব ভালভাবে জানতেন যে, অর্জুন এবং পান্ডুর অন্যান্য পুত্রদের উপর এই পবিত্র স্থানের মঙ্গলময় প্রভাব সঞ্চারিত হবে, কারন তাঁরা সকলেই ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। সঞ্জয় ছিলেন ব্যাসদেবের শিষ্য, তাই ব্যাসদেবের আশীর্বাদে তিনি দিব্যচক্ষু প্রাপ্ত হন, যার ফলে তিনি ঘরে বসেও কুরুক্ষত্রের সমস্ত ঘটনা দেখতে পাচ্ছিলেন। তাই, ধৃতরাষ্ট্র তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন।

পান্ডবেরা এবং ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা ছিলেন একই বংশজাত, কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রের মনোভাব এখানে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি কেবল তাঁর পুত্রদেরই কৌরব বলে গণ্য করে পান্ডুর পুত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমেই ধৃতরাষ্ট্রের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি হৃদয়ঙ্গম করা যায়। ধানক্ষেতে এমন আগাছাগুলি তুলে ফেলে দেওয়া হয়, তেমনই ভগবদগীতার সূচনা থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে ধর্মের প্রবর্তক ভগবান স্বয়ং উপস্থিত থেকে ধৃতরাষ্টের পাপিষ্ট পুত্রদের সমূলে উৎপাটিত করে ধার্মিক যুধিষ্ঠিরের নেতৃত্বে ধর্মপরায়ণ মহাত্মদেব পুনঃ প্রতিষ্ঠা করবার আয়োজন করেছেন। বৈদিক এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছাড়াও সমগ্র গীতার তত্ত্বদর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মক্ষেত্রে ও কুরুক্ষেত্রে – এই শব্দ দুটি ব্যবহারের তাৎপর্য বুঝতে পারা যায়।

শ্লোক – ০২

সঞ্জয় উবাচ

দৃষ্টা তু পান্ডবানীকং ব্যূঢ়ং দুর্যোধনস্তদা।

আচার্যমুপসঙ্গম্য রাজা বচনমব্রবীৎ।। ২ ।।

সঞ্জয়ঃ উবাচ – সঞ্জয় বললেন; দৃষ্টা – দর্শন করে; তু – কিন্তু; পান্ডবানীকম – পান্ডবদেব সৈন্য; ব্যূঢ়ম – সামরিক ব্যূহ; দুর্যোধন – রাজা দুর্যোধন; তদা –  সেই সময়; আচার্যম – দ্রোনাচার্য; উপসঙ্গম্য – কাছে গিয়ে; রাজা – রাজা; বচনম – বাক্য; অব্রবীৎ – বলেছিলেন।

গীতার গান

সঞ্জয় কহিল রাজা শুন মন দিয়া।

পান্ডবের সৈন্যসজ্জা সাজান দেখিয়া।।

রাজা দুর্যোধন শীঘ্র দ্রোণাচার্য পাশে।

যাইয়া বৃত্তান্ত সব কহিল সকাশে।।

অনুবাদঃ সঞ্জয় বললেন – হে রাজন! পান্ডবদের সৈন্যসজ্জা দর্শন করে রাজা দুর্যোধন দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে বললেন-

তাৎপর্যঃ ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন জন্মন্ধ। দুর্ভাগ্যবশত, তিনি পারমার্থিক তত্ত্বদর্শন থেকেও বঞ্চিত ছিলেন। তিনি ভালভাবেই জানতেন যে, ধর্মের ব্যাপারে তাঁর পুত্রেরাও ছিল তাঁরই মতো অন্ধ, এবং তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, তাঁর পাপিষ্ট পুত্রেরা পান্ডবদের সঙ্গে কোন রকম আপস-মীমাংসা করতে সক্ষম হবে না, কারন পান্ডবেরা সকলেই জন্ম থেকে অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ছিলেন। তবুও তিনি ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষত্রের প্রভাব সম্বন্ধে সন্দিগ্ধ ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি সম্বন্ধে ধৃতরাষ্ট্রের এই প্রশ্ন করার প্রকৃত উদ্দেশ্য সঞ্জয় বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি নৈরাশ্যগ্রস্থ রাজাকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, এই পবিত্র ধর্মক্ষেত্রের প্রভাবের ফলে তাঁর সন্তানেরা পান্ডবদের সঙ্গে কোন রকম আপস-মীমাংসা করতে সক্ষম হবে না। সঞ্জয় তখনই ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন যে, তাঁর পুত্র দুর্যোধন পান্ডবদের মহৎ সৈন্যসজ্জা দর্শন করে, তার বিবরণ দিতে তৎক্ষণাৎ সেনাপতি দ্রোনাচার্যের কাছে উপস্থিত হলেন। দুর্যোধনকে যদিও রাজা বলা হয়েছে, তবুও সেই সঙ্কটময় অবস্থায় তাঁকে তাঁর সেনাপতির কাছে উপস্থিত হতে দেখা যাচ্ছে। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি, চতুর রাজনীতিবিদ হবার সমস্ত গুনগুলি দুর্যোধনের মধ্যে বর্তমান ছিল। কিন্তু পান্ডবদের মহতী সৈন্যসজ্জা দেখে দুর্যোধনের মনে যে মহাভয়ের সঞ্চার হয়েছিল, তা তিনি তাঁর চতুরতার আবরণে ঢেকে রাখতে পারেননি।

 

শ্লোক – ০৩

পশ্যৈতাং পান্ডুপুত্রাণামাচার্য মহতীং চমূম।

ব্যূঢ়াং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা।। ৩ ।।

পশ্য – দেখুন; এতাম – এই; পান্ডুপুত্রাণাম – পান্ডুর পুত্রদের; আচার্য – হে আচার্য; মহতীম – মহান; চমূম – সৈন্যবল; ব্যূঢ়াম – ব্যূহ; দ্রুপদপুত্রেণ – দ্রুপদপুত্রেণ – দ্রুপদের পুত্র কর্তৃক; তব – আপনার; শিষ্যেণ – শিষ্যের দ্বারা; ধীমতা – অত্যন্ত বুদ্ধিমান।

 

গীতার গান

আচার্য চাহিয়া দেখ মহতী সেনানী।

পান্ডুপুত্র রচিয়াছে ব্যূহ নানাস্থানী।।

তব শিষ্য বুদ্ধিমান দ্রুপদের পুত্র।

সাজাইল এই সব করি একসূত্র।।

অনুবাদঃ হে আচার্য! পান্ডবদের মহান সৈন্যবল দর্শন করুন, যা আপনার অত্যন্ত বুদ্ধিমান শিষ্য দ্রুপদের পুত্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যূহের আকারে রচনা করেছেন।

তাৎপর্যঃ চতুর কুটনীতিবিদ দুর্যোধন মহৎ ব্রাক্ষণ সেনাপতি দ্রোণাচার্যকে তাঁর ভুল-ত্রুটিগুলি দেখিয়ে দিয়ে তাঁকে সতর্ক করে দিতে চেয়েছিলেন। পঞ্চপান্ডবের পত্নী দ্রৌপদীর পিতা দ্রুপদরাজের সঙ্গে দ্রোণাচার্যের কিছু রাজনৈতিক মনোমালিন্য ছিল। এই মনোমালিন্যের ফলে দ্রুপদ এক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন, এবং যজ্ঞের সেই যজ্ঞের ফলে তিনি বর লাভ করেন যে, তিনি এক পুত্র লাভ করবেন, যে দ্রোণাচার্যকে হত্যা করতে সক্ষম হবে। দ্রোণাচার্য এই বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে অবগত ছিলেন, কিন্তু দ্রুপদ তাঁর সেই পুত্র ধৃষ্টদুম্নকে যখন অস্ত্রশিক্ষার জন্য তাঁর কাছে প্রেরণ করেন, তখন উদার হৃদয় সত্যনিষ্ঠ ব্রাক্ষণ দ্রোণাচার্য তাঁকে সব রকমের অস্ত্রশিক্ষা এবং সমস্ত সামরিক কলা-কৌশলের গুপ্ত তথ্য শিখিয়ে দিতে কোনও দ্বিধা করেননি। এখন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে ধৃষ্টদ্যুম্ন পান্ডবদের পক্ষে যোগদান করেন এবং পান্ডবদের সৈন্যসজ্জা তিনিই পরিচালনা করেন, যেই শিক্ষা তিনি দ্রোণাচার্যের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। দ্রোণাচার্যের এই ত্রুটির কথা দুর্যোধন তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, যাতে তিনি পূর্ণ সতর্কতা ও অনমনীয় দৃঢ়তার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। দুর্যোধন মহৎ ব্রাক্ষন দ্রোণাচার্যকে এটিও মনে করিয়ে দিলেন যে, পান্ডবদের, বিশেষ করে অর্জুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তিনি যেন কোন রকম কোমলতা প্রদর্শন না করেন, কারন তাঁরাও সকলে তাঁর প্রিয় শিষ্য, বিশেষত অর্জুন ছিলেব সবচেয়ে প্রিয় ও মেধাবী শিষ্য। দুর্যোধন সতর্ক করে দিতে চেয়েছিলেন যে, এই ধরনের কোমলতা প্রকাশ পেলে যুদ্ধে অবধারিতভাবে পরাজয় হবে।

 

শ্লোক – ৪-৬

অত্র শূরা মহেষাসা ভীমার্জুনসমা যুধি।

যুযুধানো বিরাটশ্চ দ্রুপদশ্চ মহারথঃ।। ৪ ।।

ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতানঃ কাশিরাজশ্চ বীর্যবান।

পুরুজিৎ কুম্ভিভোজশ্চ শৈব্যশ্চ নরপুঙ্গবঃ।। ৫ ।।

যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্যবান।

সৌভদ্রো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব এব মহারথাঃ।। ৬ ।।

অত্র – এখানে; শূরাঃ – বীরগণ; মহেষাসাঃ – বলবান ধনুর্ধরগণ; ভীমার্জুন – ভীম ও অর্জুন; সমাঃ – সমকক্ষ; যুধি – যুদ্ধে; যুযুধানঃ – যুযুধান; বিরাটঃ – বিরাট; চ – ও; দ্রুপদঃ – দ্রুপদ; চ – ও; মহারথঃ – মহারথী; ধৃষ্টকেতুঃ – ধৃষ্টকেতুঃ – ধৃষ্টকেতু; চেকিতানঃ – চেকিতান; কাশিরাজঃ – কাশিরাজ; চ – ও; বীর্যবান – অত্যন্ত বলবান; পুরুজিৎ – পুরুজিৎ; কুন্তিভোজঃ – কুন্তিভোজ; চ – এবং; শৈব্যঃ – শৈব্য; চ – ও; নরপুঙ্গবঃ – মানব সমাজে শ্রেষ্ঠ; যুধামন্যুঃ – যুধামন্যু; চ – এবং; বিক্রান্তঃ – বলবান; উত্তমৌজাঃ – উত্তমৌজা; চ – এবং; বীর্যবান – অত্যন্ত শক্তিশালী; সৌভদ্রঃ – সুভদ্রার পুত্র; দ্রৌপদেয়াঃ – দ্রৌপদীর পুত্রেরা; চ – এবং; সর্বে – সকলে; এব – অবশ্যই; মহারথাঃ – মহারথীগণ।

গীতার গান

এইস্থানে বর্তমান বহু যোদ্ধাগণ।

ভীমার্জুনসম তারা ধনুর্ধারী হন।।

যুযুধান বিরাট দ্রুপদ মহারথী সব।

ধৃষ্টকেতু চেকিতান কাশীর পুঙ্গব।।

পুরুজিৎ কুন্তিভোজ শৈব্যরাজাগণ।

যুধামন্যু বিক্রান্ত নহে সাধারন।।

বীর্যবান যে এই সৌভদ্র দ্রৌপদেয়।

সকলেই মহারথী কেহ নহে হেয়।।

অনুবাদঃ সেই সমস্ত সেনাদের মধ্যে অনেকে ভীম ও অর্জুনের মতো বীর ধনুর্ধারী রয়েছেন এবং যুযুধান, বিরাট ও দ্রুপদের মতো মহাযোদ্ধা রয়েছেন। সেখানে ধৃষ্টকেতু, চেকিতান, কাশিরাজ, পুরুজিৎ, কুন্তিভোজ ও শৈব্যের মতো অত্যন্ত বলবান যোদ্ধারাও রয়েছেন। সেখানে রয়েছেন অত্যন্ত বলবান যুধামন্যু, প্রবল পরাক্রমশালী উত্তমৌজা, সুভদ্রার পুত্র এবং দ্রৌপদীর পুত্রগণ। এই সব যোদ্ধারা সকলেই এক-একজন মহারথী।

তাৎপর্যঃ যদিও দ্রোণাচার্যের অসীম শৌর্য, বীর্য ও সামরিক কলা-কৌশলের কাছে ধৃষ্টদ্যুম্ন ছিলেন এক অতি নগণ্য প্রতিবন্ধক এবং তাঁর ভয়ে ভীত হবার কোন কারনই ছিল না দ্রোণাচার্যের পক্ষে, কিন্তু ধৃষ্টদ্যুম্ন ছাড়াও পান্ডবপক্ষে অন্য অনেক রথী-মহারথী ছিলেন, যারা সত্যিসত্যিই ভয়ের কারন হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দুর্যোধনের পক্ষে সেই যুদ্ধজয়ের পথে তাঁরা ছিলেন এক-একটি দুরতিক্রম্য প্রতিবন্ধকের মতো, কারন তাঁরা সকলেই ছিলেন ভীম ও অর্জুনের মতো ভয়ংকর। তাঁদের বীরত্বের কথা দুর্যোধন ভালভাবেই জানতেন, তাই তিনি অন্যান্য রথী-মহারথীদেরও ভীম ও অর্জুনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

 

শ্লোক – ৭

অস্মাকন্তু বিশিষ্টা যে তান্নিবোধ দ্বিজোত্তম।

নায়কা মম সৈন্যস্য সংজ্ঞার্থং তান ব্রবীমি তে।। ৭ ।।

অস্মাকম – আমাদের; তু – কিন্তু; বিশিষ্টাঃ – বিশেষভাবে শক্তিমান; যে – যারা; তান – তাঁদের; নিবোধ – জেনে রাখুন; দ্বিজোত্তম – দ্বিজশ্রেষ্ঠ; নায়কাঃ – সেনানায়কগণ; মম – আমার; সৈন্যস্য – সৈন্যদের; সংজ্ঞার্থম – অবগতির জন্য; তান – তাঁদের; ব্রবীমি – আমি বলছি; তে – আপনাকে।

গীতার গান

আমাদের মধ্যে যারা বিশিষ্ট মহান।

দ্বিজোত্তম শুন তাহা করিয়া মনন।।

সেনাপতি যে যে সব মম সৈন্যপাশে।

সংজ্ঞার্থে তোমারে কহি অশেষ বিশেষে।।

অনুবাদঃ হে দ্বিজোত্তম! আমাদের পক্ষে যে সমস্ত বিশিষ্ট সেনাপতি সামরিক শক্তি পরিচালনার জন্য রয়েছেন, আপনার অবগতির জন্য আমি তাঁদের সম্বন্ধে বলছি।

শ্লোক – ৮

ভবান ভীষ্মশ্চ কর্ণশ্চ কৃপশ্চ সমিতিঞ্জয়ঃ।

অশ্বত্থামা বিকর্ণশ্চ সৌমদত্তিস্তথৈব চ।। ৮ ।।

ভবান – আপনি স্বয়ং; ভীষ্ম – পিতামহ ভীষ্ম; চ – ও; কর্ণঃ – কুন্তীপুত্র কর্ণ; চ – এবং; কৃপঃ – কৃপাচার্য; চ – এবং; সমিতিঞ্জয়ঃ – সর্বদা সংগ্রামে বিজয়ী; অশ্বত্থামা –  দ্রোণাচার্যের পুত্র অশ্বত্থামা; বিকর্ণ – দুর্যোধনের ভ্রাতা বিকর্ণ; চ – ও; সৌমদত্তিঃ – সোমদত্তের পুত্র ভূরিশ্রবা; তথা – এবং; এব –  অবশ্যই; চ – ও।

গীতার গান

আপনি আর পিতামহ ভীষ্মাদিগণ।

কৃপাচার্য রণজয়ী হয় একত্রে বর্ণন।।

অশ্বত্থামা বিকর্ণাদি সৌমদত্তি আর।

যথাযথ তথা তথা সৈন্য সে অপার।।

অনুবাদঃ সেখানে রয়েছেন আপনার মতোই ব্যক্তিত্বশালী – ভীষ্ম, কর্ণ, কৃপা, অশ্বত্থামা, বিকর্ণ ও সোমদত্তের পুত্র ভূরিশ্রবা, যারা সর্বদা সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে থাকেন।

তাৎপর্যঃ পান্ডব-পক্ষের রথী-মহারথীদের বর্ণনা করবার পর দুর্যোধন তার স্বপক্ষে যে সমস্ত বীরেরা যোগদান করেছেন তাঁদের বর্ণনা করেছে। বিকর্ণ হচ্ছেন দুর্যোধনের ভাই, অশ্বত্থামা হচ্ছেন দ্রোনাচার্যের পুত্র এবং সৌমদত্তি বা ভূরিশ্রবা হচ্ছেন বাহ্লীকের রাজার ছেলে। কর্ণ ছিলেন অর্জুনের বৈপিত্রেয় ভ্রাতা, কেন না রাজা পান্ডুর সঙ্গে বিবাহ হবার আগে কুন্তীদেবীর কোলে তাঁর জন্ম হয়। কৃপাচার্যের যমজ ভগ্নীদ্বয়ের সাথে দ্রোনাচার্যের বিবাহ হয়।

শ্লোক – ৯

অন্যে চ বহবঃ শূরা মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ।

নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্বে যুদ্ধবিশারদাঃ।। ৯ ।।

অন্যে – অন্য অনেকে; চ – ও; বহবঃ – বহু; শূরাঃ – সেনানায়কগণ; মদর্থে – আমার জন্য; ত্যক্তজীবিতাঃ – তাঁদের জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত; নানা – নানা প্রকার; শস্ত্র – অস্ত্রশস্ত্র; প্রহরণাঃ – সুসজ্জিত; সর্বে – তাঁরা সকলে; যুদ্ধবিশারদাঃ – সামরিক বিজ্ঞানে অভিজ্ঞ যোদ্ধা।

গীতার গান

আর যে অনেক বীর আমার লাগিয়া।

আসিয়াছে হেথা সব জীবন ত্যজিয়া।।

নানা-অস্ত্রপাণি সব যুদ্ধে বিশারদ।

এরা সব হয় মোর যুদ্ধের সংসদ।।

অনুবাদঃ এ ছাড়া আরও বহু সেনানায়ক রয়েছেন, যারা আমার জন্য তাঁদের জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত। তাঁরা সকলেই নানা প্রকার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং তাঁরা সকলেই সামরিক বিজ্ঞানে বিশারদ।

তাৎপর্যঃ অন্য আর যে সমস্ত বীরেরা দুর্যোধনের পক্ষে ছিলেন, যেমন – জয়দ্রথ, কৃতবর্মা, শল্য আদি, এঁরা সকলেই দুর্যোধনের জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত  ছিলেন। এখানে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, পাপিষ্ঠ দুর্যোধনের পক্ষ অবলম্বন করার ফলে কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে এঁদের সকলেরই মৃত্যু অবধারিত ছিল। দুর্যোধনের কিন্তু দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এই সমস্ত বীরপুঙ্গবেরা স্বপক্ষে থাকায় তার জয় অনিবার্য।

 

শ্লোক – ১০-১১

অপর্যাপ্তং তদস্মাকং বলং ভীষ্মাভিরক্ষিতম।

পর্যাপ্তং ত্বিদমেতেষাং বলং ভীমাভিরক্ষিতম।। ১০ ।।

অয়নেষু চ সর্বেষু যথাভাগমবস্থিতাঃ।

ভীষ্মমেবাভিরক্ষন্তু ভবন্তুঃ সর্ব এব হই।। ১১ ।।

অপর্যাপ্তম – অপরিমিত; তৎ – তা; অস্মাকম – আমাদের; বলম – বল; ভীষ্ম – পিতামহ ভীষ্মের দ্বারা; অভিরক্ষতম – সম্পূর্ণরুপে রক্ষিত; পর্যাপ্তম – সীমিত; তু – কিন্তু; ইদম – এই সমস্ত; এতেষাম – পান্ডবদের; বলম – বল; ভীম – ভীমের দ্বারা; অভিরক্ষিতম – সতর্কভাবে রক্ষিত; অয়নেষু – যথাস্থানে; চ – ও; সর্বেষু – সর্বত্র; যথাভাগম – যথাযথভাবে বিভক্ত হয়ে; অবস্থিতাঃ – অবস্থিত; ভীষ্মম – পিতামহ ভীষ্মকে; এব – অবশ্যই; অভিরক্ষন্তু – রক্ষা করুন; ভবন্তুঃ – আপনারা; সর্বে – সকলে; এব হি – নিশ্চিতভাবে।

 

গীতার গান

অপর্যাপ্ত মম সৈন্য ভীষ্ম সেনাপতি।

পর্যাপ্ত ওদের সৈন্য ভীম যার গতি।।

যথাস্থানে স্থিত থাকি আপনি সকলে।

রক্ষ ভীষ্ম পিতামহে হেন যুদ্ধস্থলে।।

 

অনুবাদঃ আমাদের সৈন্যবল অপরিমিত এবং আমরা পিতামহ ভীষ্মের দ্বারা পূর্ণরুপে সুরক্ষিত, কিন্তু ভীমের দ্বারা সতর্কভাবে সুরক্ষিত পান্ডবদের শক্তি সীমিত। এখন আপনারা সকলে সেনাব্যূহের প্রবেশপথে নিজ নিজ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থিত হয়ে পিতামহ ভীষ্মকে সর্বতোভাবে সাহায্য প্রদান করুন।

 

তাৎপর্যঃ এখানে দুর্যোধন পান্ডব-পক্ষ ও কৌরব-পক্ষের সামরিক শক্তির তুলনা করেছে। পিতামহ বীরশ্রেষ্ঠ ভীষ্মদেবের রক্ষণাবেক্ষণাধীন অমিত শক্তিশালী এক সৈন্যবাহিনী ছিল দুর্যোধনের স্বপক্ষে। অপর পক্ষে, পান্ডবদের সৈন্যবাহিনী ছিল সীমিত এবং তার সেনাপতি ছিলেন ভীমসেন, যার শৌর্যবীর্য ও সৈন্য পরিচালনার ক্ষমতা পিতামহ ভীষ্মদেবের তুলনায় ছিল নিতান্তই নগণ্য। দুর্যোধন চিরকালই ভীমের প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিল। কারন সে জানত যে, যদি তাঁকে কোন দিন মরতে হয়, তবে ভীমের হাতেই তার মৃত্যু হবে। কিন্তু ভীষ্মের মতো বিচক্ষন ও দুর্ধর্ষ যোদ্ধা তার পক্ষের সেনাপতি থাকায় সে নিশ্চিতভাবে ধরে নিয়েছিল, জয় তার হবেই। দুর্যোধনের প্রতিটি কথাতে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধজয় সম্বন্ধে তার মনে কোনই সংশয় ছিল না।

 

ভীষ্মের শৌর্যবীর্যের প্রশংসা করার পরে, দুর্যোধন বিবেচনা করে দেখল, অন্যেরা মনে করতে পারে, তাঁদের শৌর্যবীর্যের গুরুত্ব লাঘব করে হেয় করা হচ্ছে, তাই তার স্বভাবসুলভ কুটনৈতিক চাতুরীর সাহায্যে সেই পরিস্থিতির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সে উপরোক্ত কথাগুলি বলেছিল। এভাবে সে মনে করিয়ে দিল যে, ভীষ্মদেব যত বড় যোদ্ধাই হন, তিনি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন এবং সব দিক থেকে তাই ভীষ্মদেবকে তাঁদের সকলেরই রক্ষা করা উচিত। যুদ্ধ করতে করতে যদি তিনি কোনও একদিকে এগিয়ে যান, তা হলে শত্রুপক্ষ তার সুযোগ নিয়ে অন্য দিক থেকে আক্রমণ করতে পারে। তাই অন্য বীরপুঙ্গবেরা যাতে নিজ নিজ স্থানে অধিষ্ঠিত থেকে শত্রুসৈন্যকে ব্যুহ ভেদ করতে পারে না দেয়, তার গুরুত্ব সম্বন্ধে দ্রোণাচার্যকে দুর্যোধন মনে করিয়ে দিয়েছিল। দুর্যোধন স্পষ্টই অনুভব করেছিল যে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তার জয়লাভ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে ভীষ্মদেবের উপর। দুর্যোধনের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, সেই যুদ্ধে ভীষ্মদেব ও দ্রোণাচার্য তাঁকে সম্পূর্ণভাবে সহযোগিতা করবেন। কারন সে আগেই দেখেছিল, যখন হস্তিনাপুরের রাজসভায় সমস্ত রাজপুরুষের সামনে দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ করা হচ্ছিল, তখন তাঁদের প্রতি অসহায় দ্রৌপদীর আকুল আবেদনে সাড়া দিয়ে তাঁরা একটি কথাও বলেননি। যদিও দুর্যোধন জানত, তার দুই সেনাপতিই পান্ডবদের বেশ স্নেহ করতেন, কিন্তু তার বিশ্বাস ছিল যে, পাশা খেলার নিয়মানুসারে তাঁরা যেমন তাঁদের স্নেহপ্রবণতা বর্জন করেছিলেন, এই যুদ্ধেও তাঁরা তাই করবেন।

 

শ্লোক – ১২

তস্য সঞ্জনয়ন হর্ষং কুরুবৃদ্ধঃ পিতামহঃ।

সিংহনাদং বিনদ্যোচ্চৈঃ শঙ্খং দধেমৌ প্রতাপবান।। ১২ ।।

তস্য – তাঁর; সঞ্জনয়ন – বর্ধিত করে; হর্ষম – হর্ষ; কুরুবৃদ্ধঃ – কুরুবংশের মধ্যে বৃদ্ধ; পিতামহঃ – পিতামহ; সিংহনাদম – সিংহের মতো গর্জন; বিন্দ্য – কম্পিত করে; উচ্চৈঃ – অতি উচ্চনাদে; শঙ্খম – শঙ্খ; দধেমৌ – বাজালেন; প্রতাপবান – প্রতাপশালী।

 

গীতার গান

তবে সেই পিতামহ বৃদ্ধ কুরুপতি।

হর্ষ উৎপাদনে যবে কৈল স্থিরমতি।।

সিংহনাদে বাজাইল শঙ্খ সেই বীর।

উচ্চরব সেই সব অতীব গম্ভীর।।

 

অনুবাদঃ তখন কুরুবংশের বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম দুর্যোধনের হর্ষ উৎপাদনের জন্য সিংহের গর্জনের মতো অতি উচ্চনাদে তাঁর শঙ্খ বাজালেন।

 

তাৎপর্যঃ কুরু-রাজবংশের পিতামহ দুর্যোধনের হৃদকম্প অনুভব করতে পেরে তাঁর স্বভাবসুলভ করুণার বশবর্তী হয়ে তাঁকে উৎসাহিত করবার জন্য সিংহনাদে তাঁর শঙ্খ বাজালেন। পরোক্ষভাবে, শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে তিনি তাঁর হতাশাচ্ছন্ন পৌত্র দুর্যোধনকে জানিয়ে দিলেন যে, এই যুদ্ধে জয়লাভ করার কোন আশাই তাঁর নেই, কারন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন তাঁর বিপক্ষে। তবুও, ক্ষাত্রধর্ম অনুসারে জয়-পরাজয়ের কথা বিবেচনা না করে যুদ্ধ করাই তাঁর কর্তব্য এবং এই ব্যাপারে তিনি কোন রকম অবহেলা করবেন না। সেই কথা তিনি দুর্যোধনকে মনে করিয়ে দিলেন।

 

শ্লোক – ১৩

ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্যশ্চ পণবানকগোমুখাঃ।

সহসৈবাভ্যহন্যন্ত স শব্দস্তুমুলোহভবৎ।। ১৩ ।।

ততঃ – তারপর; শঙ্খাঃ – শঙ্খসমূহ; চ – ও; ভের্যঃ – ভেরীসমূহ; চ – এবং; পণব-আনক – পণব ও আনক ঢাক; গোমুখাঃ – গোমুখ শিঙ্গা; সহসা – হঠাৎ; এব – অবশ্যই; অভ্যহন্যন্ত – একসঙ্গে বাজতে লাগল; সঃ – সেই; শব্দঃ – মিলিত শব্দ; তুমুলঃ – তুমুল; অভবৎ – হয়েছিল।

 

গীতার গান

শুনি সেই শত্রুরব যত শঙ্খ ভেরী।

গোমুখ পণবানক বাজিল সত্ত্বরি।।

সহসা উঠিল সেই রণের ঝঙ্কার।

তুমুল হইল শব্দ বহুল অপার।।

 

অনুবাদঃ তারপর শঙ্খ, ভেরী, পণব, আনক, ঢাক ও গোমুখ শিঙ্গাসমূহ হঠাৎ একত্রে ধ্বনিত হয়ে এক তুমুল শব্দের সৃষ্টি হল।

 

শ্লোক – ১৪

ততঃ শ্বেতৈরহয়ৈর্যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্থিতৌ।

মাধবঃ পান্ডবশ্চৈব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদধমতুঃ।। ১৪ ।।

ততঃ – তখন; শ্বেতৈঃ –  শ্বেত; হয়ৈঃ – অশ্বগণ; যুক্তে – যুক্ত হয়ে; মহতি – মহান; স্যন্দনে – রথ; স্থিতৌ – অবস্থিত হয়ে; মাধবঃ – শ্রীকৃষ্ণ (লক্ষ্মীর পতি); পান্ডবঃ – অর্জুন (পান্ডুর পুত্র); চ – ও; এব – অবশ্যই; দিব্যৌ – অপ্রাকৃত; শঙ্খৌ – শঙ্খগুলি; প্রদধমতুঃ – বাজালেন।

 

গীতার গান

তারপর শ্বেত অশ্ব রথেতে বসিয়া।

আসিল যে মহাযুদ্ধে নিযুক্ত হইয়া।।

মাধব আর পান্ডব দিব্য শঙ্খ ধরি।

বাজাইল পরে পরে অপূর্ব মাধুরী।।

 

অনুবাদঃ অন্য দিকে, শ্বেত অশ্বযুক্ত এক দিব্য রথে স্থিত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন উভয়ে তাঁদের দিব্য শঙ্খ বাজালেন।

তাৎপর্যঃ ভীষ্মদেবের শঙ্খের সঙ্গে বৈসাদৃশ্য দেখিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের শঙ্খকে ‘দিব্য’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই দিব্য শঙ্খধ্বনি যোষনা করল যে, কুরুপক্ষের যুদ্ধজয়ের কোন আশাই নেই, কারন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পান্ডবপক্ষে যোগদান করেছেন। জয়স্তু পান্ডুপুত্রাণাং যেষাং পক্ষে জনার্দনঃ। পান্ডবদের জয় অবধারিত, কারন জনার্দন শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের পক্ষে যোগ দিয়েছেন। ভগবান যে পক্ষে যোগদান করেন, সৌভাগ্য-লক্ষ্মীও সেই পক্ষেই থাকেন, কারন সৌভাগ্য-লক্ষ্মী সর্বদাই তাঁর পতির অনুগামী। তাই বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের দিব্য শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে ঘোষিত হল যে, অর্জুনের জন্য বিজয় ও সৌভাগ্য প্রতীক্ষা করছে। তা ছাড়া, যে রথে চড়ে দুই বন্ধু শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তা অগ্নিদেব অর্জুনকে দান করেছিলেন এবং সেই দিব্য রথ ছিল সমগ্র ত্রিভূবনে সর্বত্রই অপ্রাজেয়।

 

শ্লোক – ১৫

পাঞ্চজন্যং হৃষীকেশো দেবদত্তং ধনঞ্জয়ঃ।

পৌন্ড্রং দধেমৌ মহাশঙ্খং ভীমকর্মা বৃকোদরঃ।। ১৫ ।।

পাঞ্চজন্যম – পাঞ্চজন্য নামক শঙ্খ; হৃষীকেশঃ – হৃষীকেশ (শ্রীকৃষ্ণ, যিনি তাঁর ভক্তদের ইন্দ্রিয়ের পরিচালক); দেবদত্তম – দেবদত্ত নামক শঙ্খ; ধনঞ্জয়ঃ – ধনঞ্জয় (অর্জুন, যিনি ধনসম্পদ জয় করেছেন); পৌন্ড্রম – পৌন্ড্র নামক শঙ্খ; দধেমৌ – বাজালেন, মহাশঙ্খম – ভয়ংকর শঙ্খ; ভীমকর্মা – প্রচন্ড কর্ম সম্পাদনকারী; বৃকোদরঃ – বিপুল ভোজনপ্রিয় (ভীম)।

 

গীতার গান

হৃষীকেশ ভগবান পাঞ্চজন্যরবে।

ধনঞ্জয় বাজাইল দেবদত্ত সবে।।

ভীমকর্তা ভীমসেন বাজাইল পরে।

পৌন্ড্রনাম শঙ্খ সেই অতি উচ্চৈঃস্বরে।।

অনুবাদঃ তখন, শ্রীকৃষ্ণ পাঞ্চজন্য নামক তাঁর শঙ্খ বাজালেন, অর্জুন বাজালেন, তাঁর দেবদত্ত নামক শঙ্খ এবং বিপুল ভোজনপ্রিয় ও ভীমকর্তা ভীমসেন বাজালেন পৌন্ড্র নামক তাঁর ভয়ংকর শঙ্খ।

 

তাৎপর্যঃ শ্রীকৃষ্ণকে এই শ্লোকে হৃষীকেশ বলা হয়েছে, যেহেতু তিনি হচ্ছেন সমস্ত হৃষীক বা ইন্দ্রিয়ের ঈশ্বর। জীবেরা হচ্ছে তাঁর অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই জীবদের ইন্দ্রিয়গুলিও হচ্চে তাঁর ইন্দ্রিয়সমূহের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নির্বিশেষবাদীরা জীবের ইন্দ্রিয়সমূহের মূল উৎস কোথায় তার হদিস খুঁজে পায় না, তাই তারা সমস্ত জীবদের ইন্দ্রিয়বিহীন ও নির্বিশেষ বে বর্ণনা করতে তৎপর। সমস্ত জীবের অন্তরে অবস্থান করে ভগবান তাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে পরিচালিত করেন। তবে এটি নির্ভর করে আত্মসমর্পণের মাত্রার উপর এবং এবং শুদ্ধ ভক্তের ক্ষেত্রে তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে ভগবান প্রত্যক্ষভাবে পরিচালিত করেন। এখানে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের দিব্য ইন্দ্রিয়গুলিকে ভগবান সরাসরিভাবে পরিচালিত করেছেন, তাই এখানে তাঁকে হৃষীকেশ নামে অভিহিত করা হয়েছে। ভগবানের বিভিন্ন কার্যকলাপ অনুসারে তাঁর ভিন্ন ভিন্ন নাম আছে, যেমন, মধু নামক দানবকে সংহার করার জন্য তাঁর নাম মধুসুদন; গাভী ও ইন্দ্রিয়গুলিকে আনন্দ দান করেন বলে তাঁর নাম গোবিন্দ; বসুদেবের পুত্ররুপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম বাসুদেব; দেবকীর সন্তানরুপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম দেবকীনন্দন; বৃন্দাবনে যশোধার সন্তানরুপে তিনি তাঁর বাল্যলীলা প্রদর্শন করেন বলে তাঁর নাম যশোদানন্দন এবং অর্জুনের রথের সারথি হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম পার্থসারথি। সেই রকম, কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনকে পরিচালনা করেছিলেন বলে তাঁর নাম হৃষীকেশ।

 

এখানে অর্জুনকে ধনঞ্জয় বলে অভিহিত করা হয়েছে, কারন বিভিন্ন যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠান করার জন্য তিনি যুধিষ্ঠিরকে ধন সংগ্রহ করতে সাহায্য করতেন। তেমনই, ভীমকে এখানে বৃকোদার বলা হয়েছে, কারন যেমন তিনি হিড়িম্ব আদি দানবকে বধ করার মতো দুঃসাধ্য কাজ সাধন করতে পারতেন, তেমনই তিনি প্রচুর পরিমাণে আহার করতে পারতেন। সুতরাং পান্ডবপক্ষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহ বিভিন্ন ব্যক্তিরা যখন তাঁদের বিশেষ ধরনের শঙ্খ বাজালেন, সেই দিব্য শঙ্খধ্বনি তাঁদের সৈন্যদের অন্তরে অনুপ্রেরনা সঞ্চার করল। পক্ষান্তরে, কৌরবপক্ষে আমরা কোন রকম শুভ লক্ষণের ইঙ্গিত পাই না, সেই পক্ষে পরম নিয়ন্তা ভগবান নেই, সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মীদেবীও নেই। অতএব, তাঁদের পক্ষে যে যুদ্ধ জয়ের কোন আশাই ছিল না তা পূর্বেই নির্ধারিত ছিল এবং যুদ্ধের শুরুতেই শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে সেই বার্তা ঘোষিত হল।

 

শ্লোক – ১৬-১৮

অনন্তবিজয়ং রাজা কুন্তীপুত্রো যুধিষ্ঠিরঃ।

নকুলঃ সহদেবশ্চ সুঘোষমণিপুষ্পকৌ।। ১৬ ।।

কাশ্যশ্চ পরমেষাসঃ শিখন্ডী চ মহারথঃ।

ধৃষ্টদ্যুম্নো বিরাটশ্চ সাত্যকিশ্চাপরাজিত।। ১৭ ।।

দ্রুপদো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্বশঃ পৃথিবীপতে।

সৌভদ্রশ্চ মহাবাহুঃ শঙ্খান দধমুঃ পৃথক পৃথক।। ১৮ ।।

অনন্তবিজয়ম – অনন্তবিজয় নামক শঙ্খ; রাজা – রাজা; কুন্তীপুত্রঃ – কুন্তীর পুত্র; যুধিষ্ঠিরঃ – যুধিষ্ঠির; নকুলঃ – নকুল; সহদেবঃ – সহদেব; চ – এবং; সুঘোষ-মণিপুষ্পকৌ – সুঘোষ ও মণিপুষ্পক নামক শঙ্খ; কাশ্যঃ – কাশীর (বারাণসীর) রাজা; চ – এবং; পরমেষাসঃ – মহান ধনুর্ধর; শিখন্ডী – শিখন্ডী; চ – ও; মহারথঃ – সহস্র সহস্র যোদ্ধার বিরুদ্ধে একাকী যুদ্ধ করতে সক্ষম মহারথী; ধৃষ্টদ্যুম্নঃ – (মহারাজ দ্রুপদের পুত্র) ধৃষ্টদ্যুম্ন; বিরাটঃ – বিরাট (যিনি পান্ডবদের অজ্ঞাতবাস কালে আশ্রয় দিয়েছিলেন); চ – ও; সাত্যকিঃ – সাত্যকি (শ্রীকৃষ্ণের সারথি যুযুধানের মতো); চ – এবং; অপরাজিতঃ – যিনি কখনো পরাজিত হননি; দ্রুপদঃ – পাঞ্চালের রাজা দ্রুপদ; দ্রৌপদেয়াঃ – দ্রৌপদীর পুত্রগণ; চ – ও; সর্বশঃ – সকলে; পৃথিবী-পতে – হে মহারাজ; সৌভদ্রঃ – সুভদ্রার পুত্র অভিমন্যু; চ – ও; মহাবাহুঃ – মহা বলবান; শঙ্খান – শঙ্খসমূহ; দধমুঃ – বাজালেন; পৃথক পৃথক – একে একে।

 

গীতার গান

যুধিষ্ঠির ধরে শঙ্খ রাজা কুন্তীপুত্র।

অনন্তবিজয় সেই ঘোষনা সর্বত্র।।

নকুল বাজাল শঙ্খ সুঘোষ তার নাম।

সহদেব বাজাল মণিপুষ্পক নাম।।

তারপর একে একে যত মহারথী।

ধনুর্ধর কাশীরাজ শিখন্ডী সারথি।।

ধৃষ্টদ্যুম্ন বিরাটাদি বীর সে সাত্যকি।

মহাযোদ্ধা পারে যারা যুঝিতে একাকী।।

দ্রুপদ আর দ্রৌপদেয় পৃথিবীপতে।

সৌভদ্র বাজাল শঙ্খ যার যার মতে।।

 

অনুবাদঃ কুন্তীপুত্র মহারাজ যুধিষ্ঠির অনন্তবিজয় নামক শঙ্খ বাজালেন এবং নকুল ও সহদেব বাজালেন সুঘোষ ও মণিপুষ্পক নামক শঙ্খ। হে মহারাজ! তখন মহান ধনুর্ধর কাশীরাজ, প্রবল যোদ্ধা শিখন্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট, অপরাজিত সাত্যকি, দ্রুপদ, দ্রৌপদীর পুত্রগণ, সুভদ্রার মহা বলবান পুত্র এবং অন্য সকলে তাঁদের নিজ নিজ পৃথক শঙ্খ বাজালেন।

 

তাৎপর্যঃ সঞ্জয় সুকৌশলে ধৃতরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিলেন যে, পান্ডুপুত্রদের প্রতারনা করে তাঁর নিজের ছেলেদের সিংহাসনে বসাবার দুরভিসন্ধি করাটা তাঁর পক্ষে মোটেই প্রশংসনীয় কাজ হয় নি। চারদিক থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে, কুরুবংশের সমূলে বিনাশ হবে এবং পিতামহ ভীষ্ম থেকে শুরু করে অভিমন্যু আদি পৌত্রেরা সকলেই যুদ্ধে নিহত হবেন। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে উপস্থিত রাজা-মহারাজা ও রথী-মহারথীরা সকলেই নিহত হবেন। এই বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিলেন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র স্বয়ং, কারণ তাঁর পুত্রদের দুষ্কর্মে তিনি কখনো কোন রকম বাধা দেননি, উপরন্তু তাঁদের সব রকম দুষ্কর্মে তিনি অনুপ্রেরনা যুগিয়েছেন।

 

শ্লোক – ১৯

স ঘোষো ধার্তরাষ্ট্রাণাং হৃদয়ানি ব্যদারয়ৎ।

নভশ্চ পৃথিবীং চৈব তুমুলোহভ্যনুনাদয়ন।। ১৯ ।।

সঃ – সেই; ঘোষঃ – শব্দ স্পন্দন; ধার্তরাষ্ট্রাণআম – ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের; হৃদয়ানি – হৃদয়; ব্যদারয়ৎ – চূর্ণবিচূর্ণ করেছিল; নভঃ – আকাশ; চ – ও; পৃথিবীম – পৃথিবীকে; চ – ও; এব – অবশ্যই; তুমুলঃ – প্রচন্ড; অভ্যনুনাদয়ন – অনুরণিত হয়ে।

 

গীতার গান

সে শব্দ ভাঙ্গিল বুক ধার্তরাষ্ট্রগণে।

আকাশ ভেদিল পৃথ্বী কাঁপিল সঘনে।।

অনুবাদঃ শঙ্খ-নিনাদের সেই প্রচন্ড শব্দ আকাশ ও পৃথিবী প্রতিধ্বনিত করে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় বিদারিত করতে লাগল।

তাৎপর্যঃ ভীষ্মদেব আদি কৌরব-পক্ষের বীরেরা যখন শঙ্খ বাজিয়েছিলেন, তখন পান্ডবদের শঙ্খনাদে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় ভয়ে বিদীর্ণ হল। পাণ্ডবদের মনে কোন ভয় ছিল না, কারণ তাঁরা ছিলেন সদাচারী এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত। ভগবানের কাছে যিনি আত্মসমর্পণ করেন, তাঁর মনে কোন ভয় থাকে না, চরম বিপদেও তিনি থাকেন অবিচল।

 

শ্লোক – ২০

অথ ব্যবস্থিতান দৃষ্টা ধার্তরাষ্ট্রান কপিধ্বজঃ।

প্রবৃত্তে শস্ত্রসম্পাতে ধনুরুদ্যম্য পান্ডবঃ।

হৃষীকেশং তদা বাক্যমিদমাহ মহীপতে।। ২০ ।।

অথ – অতঃপর; ব্যবস্থিতান – অবস্থিত; দৃষ্টা – দেখে; ধার্তরাষ্ট্রান – ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের; কপিধ্বজঃ – যার পতাকায় হনুমান চিহ্ন শোভা পায়; প্রবৃত্তে – প্রবৃত্ত হওয়ার সময়; শস্ত্রসম্পাতে – অস্ত্র নিক্ষেপ করতে; ধনুঃ – ধনুক; উদ্যম্য – তুলে নিয়ে; পান্ডবঃ – পাণ্ডুপুত্র (অর্জুন); হৃষীকেশম – শ্রীকৃষ্ণকে; তদা – তখন; বাক্যম – বাক্য; ইদম – এই; আহ – বললেন; মহীপতে – হে মহারাজ।

 

গীতার গান

কপিধ্বজ দেখি ধার্তরাষ্ট্রের গণেরে।

যুদ্ধের সজ্জায় সেথা মিলিল অচিরে।।

নিজ অস্ত্র ধনুর্ধাণ যথাস্থানে ধরি।

যুদ্ধের লাগিয়া সেথা স্মরিল শ্রীহরি।।

 

অনুবাদঃ সেই সময় পাণ্ডুপুত্র অর্জুন হনুমান চিহ্নিত পতাকা শোভিত রথে অধিষ্ঠিত হয়ে, তাঁর ধনুক তুলে নিয়ে শর নিক্ষেপ করতে প্রস্তুত হলেন। হে মহারাজ! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সমরসজ্জায় বিন্যস্ত দেখে, অর্জুন তখন শ্রীকৃষ্ণকে এই কথাগুলি বললেন –

তাৎপর্যঃ কুরুক্ষেত্রের-যুদ্ধের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই, পান্ডবদের অপ্রত্যাশিত সৈন্যসজ্জা দেখে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদকম্প শুরু হয়ে গেছে। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে উপস্থিত থেকে পান্ডবদের পরিচালিত করেছিলেন, তাই কৌরবদের এই হৃদকম্প হওয়াটা স্বাভাবিক। অর্জুনের রথে হনুমান অঙ্কিত ধ্বজাও একটি বিজয়সূচক ইঙ্গিত, কারণ রাম-রাবনের যুদ্ধে হনুমান শ্রীরামচন্দ্রকে সহযোগিতা করেছিলেন এবং শ্রীরামচন্দ্র বিজয়ী হয়েছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও অর্জুনকে সাহায্য করবার জন্য তাঁর রথে শ্রীরামচন্দ্র ও হনুমান দুজনকেই উপস্থিত থাকতে দেখতে পাই। শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন শ্রীরামচন্দ্র এবং যেখানে শ্রীরামচন্দ্র, সেখানেই তাঁর নিত্য সেবক ভক্ত-হনুমান এবং নিত্য সঙ্গিনী সীতা লক্ষ্মীদেবী উপস্থিত থাকেন। তাই, অর্জুনের কোন শত্রুর ভয়েই ভীত হবার কারণ ছিল না, আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অধীশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে পরিচালিত করবার জন্য স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। এভাবে, যুদ্ধজয়ের সমস্ত শুভ পরামর্শ অর্জুন পাচ্ছিলেন। তাঁর নিত্যকালের ভক্তের জন্য ভগবানের দ্বারা আয়োজিত এই রকম শুভ পরিস্থিতিতে সুনিশ্চিত জয়েরই ইঙ্গিত বহন করে।

 

শ্লোক – ২১-২২

অর্জুন উবাচ

সেনয়োরুভয়োনর্মধ্যে রথং স্থাপয় মেহচ্যুত।

যাবদেতান্নিরীক্ষেহহং যোদ্ধুকামানবস্তিতান।। ২১ ।।

কৈর্ময়া সহ যোদ্ধব্যমস্মিন রণসমুদ্যমে।। ২২ ।।

অর্জুনঃ উবাচ – অর্জুন বললেন; সেনয়োঃ – সৈন্যদের; উভয়োঃ – উভয়; মধ্যে – মধ্যে; রথম – রথ; স্থাপয় – স্থাপন কর; মে – আমার; অচ্যুত – হে অচ্যুত; যাবৎ – যাতে; এতান – এই সমস্ত; নিরীক্ষে – দেখতে পারি; অহম – আমি; যোদ্ধুকামান – যুদ্ধ করতে অভিলাষী; অবস্থিতান – যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থিত; কৈঃ – কাদের সঙ্গে; ময়া – আমাকে; সহ – সঙ্গে; যোদ্ধব্যম – যুদ্ধ করতে হবে; অস্মিন – এই; রণ – সংগ্রাম; সমুদ্যমে – প্রচেষ্টায়।

 

গীতার গান

মহীপতে। পান্ডুপুত্র কহে হৃষীকেশে।

উভয় সেনার মাঝে রথের প্রবেশে।।

যাবৎ দেখিব এই যুদ্ধকামীগণে।

তাবৎ রাখিবে রথ অচ্যুত এখানে।।

দেখিবারে চাহি কেবা আসিয়াছে হেথা।

কাহার সহিত হবে যুঝিবারে সেথা।।

অনুবাদঃ অর্জুন বললেন – হে অচ্যুত। তুমি উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে আমার রথ স্থাপন কর, যাতে আমি দেখতে পারি যুদ্ধ করার অভিলাষী হয়ে কারা এখানে এসেছে এবং এই মহা সংগ্রামে আমাকে কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে।

তাৎপর্যঃ যদিও শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, তবুও তিনি অহৈতুকী কৃপাবশে তাঁর প্রিয় সখা অর্জুনের রথের সারথি হয়ে তাঁর সেবা করছেন। ভক্তের প্রতি করুণা প্রদর্শনে ভগবান কখনো চ্যুত হন না, তাই তাঁকে এখানে অচ্যুত বলে সম্ভাষণ করা হয়েছে। অর্জুনের রথের সারথি হবার ফলে তাঁকে অর্জুনের আদেশ অনুযায়ী কাজ করতে হয়েছিল এবং যেহেতু তা করতে তিনি কুন্ঠিত হননি, তাই তাঁকে অচ্যুত বলে সম্বোধন করা হয়েছে। যদিও তিনি তাঁর ভক্তের রথের সারথি হয়েছেন, তবুও তাঁর পরম পদ কেউ দাবি করতে পারে না। সকল অবস্থাতেই তিনি হচ্ছেন পরম পুরুষ ভগবান বা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অধীশ্বর হৃষীকেশ। ভগবানের সঙ্গে ভক্তের সম্পর্ক মধুর ও অপ্রাকৃত। ভক্ত সর্বদাই ভগবানের সেবায় উন্মুখ, ঠিক তেমনই ভগবানও তাঁর ভক্তের কোন রকম পরিচর্যা করতে সুযোগের অন্বেষণ করেন। ভগবান যখন তাঁর কোন শুদ্ধ ভক্তের আদেশ অনুসারে তাঁকে পরিচর্যা করার সুযোগ পান, তখন তিনি অসীম আনন্দ উপভোগ করেন। ভগবান হচ্ছেন সর্বলোক-মহেশ্বর। যেহেতু তিনি হচ্ছেন প্রভু, প্রত্যেকেই তাঁর আদেশের অধীন, এবং তাই তাঁকে আদেশ দেবার মতো তাঁর ঊর্ধ্বে আর কেউ নেই। কিন্তু যখন তিনি দেখেন যে, কোন শুদ্ধ ভক্ত তাঁকে আদেশ করছেন, তখন তিনি দিব্য আনন্দ লাভ করেন, যদিও সকল অবস্থাতেই তিনি হচ্ছেন অভ্রান্ত প্রভু।

ভগবানের শুদ্ধ ভক্তরুপে অর্জুন কখনই কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাননি, কিন্তু কোন রকম শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করতে অনাগ্রহী দুর্যোধনের দুর্দমনীয় মনোভাব তাঁকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে বাধ্য করেছিল। তাই, তিনি যুদ্ধের আগে একবার দেখে নিতে চেয়েছিলেন, তাঁর বিপক্ষে যুদ্ধ করতে কে কে সেই রণাঙ্গনে উপস্থিত হয়েছিল। যদিও কুরুক্ষেত্রের শান্তি স্থাপন করার কোন প্রশ্নই ওঠে না, তবুও যুদ্ধের আগে অর্জুন একবার সকলকে দেখতে চেয়েছিলেন এবং তিনি দেখে নিতে চেয়েছিলেন সেই অন্যায় যুদ্ধে কৌরবেরা কতখানি উৎসাহী ছিল।

 

শ্লোক – ২৩

যোৎস্যমানানবেক্ষেহহং য এতেহত্র সমাগতাঃ।

ধার্তরাষ্ট্রস্য দুর্বুদ্ধের্যুদ্ধে প্রিয়চিকীর্ষবঃ।। ২৩ ।।

যোৎস্যমানান – যারা যুদ্ধ করবে; অবেক্ষে – দেখতে চাই; অহম – আমি; যে – যে; এতে – যারা; অত্র – এখানে; সমাগতাঃ – সমবেত হয়েছে; ধার্তরাষ্ট্রস্য – ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রের পক্ষে; দুর্বুদ্ধেঃ – দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন; যুদ্ধে – যুদ্ধে; প্রিয় – ভাল; চিকীর্ষবঃ – বাসনা করে।

 

গীতার গান

যুদ্ধকামীগণে আজ নিরখিব আমি।

দুর্বুদ্ধি ধার্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধকামী।।

অনুবাদঃ ধৃতরাষ্ট্রের দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন পুত্রকে সন্তুষ্ট করার বাসনা করে যারা এখানে যুদ্ধ করতে এসেছে, তাদের আমি দেখতে চাই।

তাৎপর্যঃ এই কথা সকলেরই জানা ছিল যে, দুর্যোধন তার পিতা ধৃতরাষ্ট্রের সহযোগিতায় অন্যায়ভাবে পান্ডবদের রাজত্ব আত্মসাৎ করতে চেষ্টা করছিল। তাই, যারা দুর্যোধনের পক্ষে যোগ দিয়েছিল, তাঁরা সকলেই ছিল ‘এক গোয়ালের গরু’। যুদ্ধের প্রারম্ভে অর্জুন দেখে নিতে চেয়েছিলেন তাঁরা কারা। কৌরবদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করবার সব রকম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার ফলেই কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের আয়োজন করা হয়, তাই সেই যুদ্ধক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার কোন রকম বাসনা অর্জুনের ছিল না। অর্জুন যদিও স্থির নিশ্চিতভাবে জানতেন, জয় তাঁর হবেই, কারণ শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পাশেই বসে আছেন, তবুও যুদ্ধের প্রারম্ভে তিনি শত্রুপক্ষের সৈন্যবল কতটা তা দেখে নিতে চেয়েছিলেন।

 

শ্লোক – ২৪

সঞ্জয় উবাচ

এবমুক্তো হৃষীকেশো গুড়াকেশেন ভারত।

সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে স্থাপয়িত্বা রথোত্তমম।। ২৪ ।।

সঞ্জয়ঃ উবাচ – সঞ্জয় বললেন; এবম – এভাবে; উক্তঃ আদিষ্ট হয়ে; হৃষীকেশঃ শ্রীকৃষ্ণ; গুড়াকেশেন – অর্জুনের দ্বারা; ভারত – হে ভরতবংশীয়; সেনয়োঃ – সৈন্যদের; উভয়োঃ – উভয় পক্ষের; মধ্যে – মধ্যে; স্থাপয়িত্বা – স্থাপন করে; রথ-উত্তমম – অতি উত্তম রথ।

 

গীতার গান

সে কথা শুনিয়া হৃষীকেশ ভগবান।

উভয় সেনার দিকে হইল আগুয়ান।।

উভয় সেনার মধ্যে রাখি রথোত্তম।

কহিতে লাগিল কৃষ্ণ হইয়া সম্ভ্রম।।

অনুবাদঃ সঞ্জয় বললেন – হে ভরত-বংশধর! অর্জুন কর্তৃক এভাবে আদিষ্ট হয়ে, শ্রীকৃষ্ণ সেই অতি উত্তম রথটি চালিয়ে নিয়ে উভয় পক্ষের সৈন্যদের সৈন্যদের মাঝখানে রাখলেন।

তাৎপর্যঃ এই শ্লোকে অর্জুনকে গুড়াকেশ বলে অভিহিত করা হয়েছে। গুড়াকা মানে হচ্ছে নিদ্রা এবং যিনি নিদ্রা জয় করেছেন, তাঁকে বলা হয় গুড়াকেশ। নিদ্রা অর্থে অজ্ঞানতাকেও বোঝায়। অতএব শ্রীকৃষ্ণের বন্ধুত্ব লাভ করার ফলে অর্জুন এক মুহূর্তের জন্যও শ্রীকৃষ্ণকে বিস্মৃত হতেন না, কারণ এটিই হচ্ছে ভক্তের লক্ষণ। শয়নে অথবা জাগরণে ভক্ত ভগবানের নাম, রুপ, গুন ও লীলা স্মরণে কখনো বিরত হন না। এভাবেই কৃষ্ণভক্ত সর্বদাই কৃষ্ণচিন্তায় মগ্ন থেকে নিদ্রা ও অজ্ঞানতা জয় করতে পারেন। একেই বলা হয় কৃষ্ণভাবনা বা সমাধি। হৃষীকেশ অথবা সমস্ত জীবের ইন্দ্রিয় ও মনের নিয়ন্তা হবার ফলে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের অভিপ্রায় বুঝতে পেরেছিলেন, কেন তাঁকে সৈন্যের মধ্যে রথ স্থাপন করতে বলেছেন। এভাবে অর্জুনের নির্দেশ পালন করার পর তিনি বললেন।

 

শ্লোক – ২৫

ভীষ্মদ্রোণপ্রমুখতঃ সর্বেষাং চ মহীক্ষিতাম।

উবাচ পার্থ পশ্যৈতান সমবেতান কুরুনিতি।। ২৫ ।।

ভীষ্ম – পিতামত ভীষ্ম; দ্রোণ – দ্রোণাচার্য; প্রমুখতঃ – সম্মুখে; সর্বেষাম – সমস্ত; চ – ও; মহীক্ষিতাম – নৃপতিদের; উবাচ – বললেন; পার্থ – হে পার্থ; পশ্য – দেখ; এতান – এদের সকলকে; সমবেতান – সমবেত; কুরুন – কুরুবংশের সমস্ত সদস্যদের; ইতি – এভাবে।

গীতার গান

দেখ পার্থ সমবেত ধার্তরাষ্ট্রগণ।

ভীষ্ম দ্রোণ প্রমুখত যত যোদ্ধাগণ।।

অনুবাদঃ ভীষ্ম দ্রোণ প্রমুখ পৃথিবীর অন্য সমস্ত নৃপতিদের সামনে ভগবান হৃষীকেশ বললেন, হে পার্থ! এখানে সমবেত সমস্ত কৌরবদের দেখ।

তাৎপর্যঃ সর্বজীবের পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ জানতেন অর্জুনের মনে কি হচ্ছিল। এই প্রসঙ্গে তাঁকে হৃষীকেশ বলার মধ্য দিয়ে বোঝানো হচ্ছে, তিনি সবই জানতেন, তিনি সর্বজ্ঞ। এখানে অর্জুনকে পার্থ অর্থাৎ পৃথা বা কুন্তীর পুত্র বলে অভিহিত করাটাও খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বন্ধু হিসাবে তিনি অর্জুনকে জানাতে চেয়েছিলেন যে, যেহেতু অর্জুন হচ্ছেন তাঁর পিতা বসুদেবের ভগ্নী পৃথার পুত্র, তাই তিনি তাঁর রথের সারথি হতে সম্মত হয়েছেন। এখন শ্রীকৃষ্ণ যখন বললেন, “দেখ পার্থ, সমবেত ধার্তরাষ্ট্রগণ”, তখন তিনি কি অর্থ করেছিলেন? সেই জন্যই কি অর্জুন সেখানে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে, যুদ্ধ করতে অসম্মত হননি? পিতামহ ভীষ্ম, পিতৃতুল্য আচার্য দ্রোণ, এঁদের দেখে কি অর্জুনের হৃদয় আর্দ্র হয়ে ওঠেনি? কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পিতৃষ্বসা কুন্তীদেবীর পুত্র অর্জুনের কাছ থেকে এমন আচরণ কখনোই আশা করেননি। অর্জুনের মনের ভাব বুঝতে পেরে পরিহাসছলে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভবিষ্যৎ-বাণী করলেন।