প্রকৃতির শূন্যবিদ্বেষ

‘উন্মুক্ত আকাশ বসে আছে দেয়ালে হেলান দিয়ে।

যেন প্রার্থনায় মগ্ন এক মহাশূন্যতায়।

আর এই মহাশূন্যতায় কে যেন

আমাদের চোখে চোখ রেখে বলে যায়,

আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত’।

–টমাস ট্রান্সট্রোমার, আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত

ঠিক আছে, ‘শূন্যের’ একটা ঠিকানা হয়ে গেল অবশেষে; বাস্তবে না হলেও গণিতের পৃষ্ঠায়, চিন্তায়, দর্শনেও হয়তোবা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় তখনো। সত্যি সত্যিই কি শূন্য বলে কিছু আছে প্রকৃতিতে? অ্যারিস্টটলের তত্ত্ব অনুযায়ীঃ শূন্য অস্তিত্বহীন। শূন্যাবস্থাকে ঘোর অপছন্দ করে প্রকৃতি (nature abhors a vacuum)। তার অর্থ জড়জগতে ফাঁকা জায়গা নেই কোনখানে। ফাঁকার উপক্রম হওয়া মাত্র প্রকৃতি তাঁকে ভ্রাট করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যাবে।

সত্যিই কি তাই? এটা কি কেবলই বিশ্বাস, না, বৈজ্ঞানিক তথ্য?

গ্যালিলিওর জীবনকালে ইতালির একদল শ্রমিক একটা সমস্যা নিয়ে এসেছিলেন তার কাছে। কুয়ো থেকে নল আর পিস্টনের সাহায্যে, বা খাল থেকে, পানি তোলার সময় দেখা যায় যে নলের উপর দিকটায় খালি জায়গা থাকা স্বত্বেও পানি বড়জোর ৩৩ ফুট পর্যন্ত উঠে, তার উপরে কিছুতেই তোলা যায় না, হাজার পরিশ্রম করেও না। তার কারনটা কি?

গ্যালিলিও ছিলেন মূলত গণিতের লোক, ল্যাবরেটরির কাজ সাধারণত করতেন টরিসেলি (ইতালীয় উচ্চারন টরিচেলি) নামক তাঁর সুযোগ্য সেক্রেটারি। ১৬৪৩ সালে, অর্থাৎ গ্যালিলিওর মৃত্যুর বছর খানেক পর, এই রহস্যের সমাধান খোঁজার চেষ্টায় টরিসেলি একটা লম্বা টিউব জোগাড় করে সেটাকে পারদ দিয়ে ভরে ফেললেন একেবারে কানায় কানায়। তারপর টিউবটিকে উপুর করে ডোবালেন এক পারদভর্তি পাত্রের ভিতর, যাতে একফোঁটা পারদঅ বের হয় না হয়ে আসে নল থেকে। তিনি ভাবলেন, যেহেতু নলটি টায়ে টায়ে ভরা, এক কোণা বায়ু বেরোবার বা ঢুকবার কোন পথ নেই, সেহেতু উপুর অবস্থাতেও ঠিক একই রকম ভরাট অবস্থায় থাকবে নলটি। কিন্তু পরম বিস্ময়ে তিনি দেখলেন, বারবার পরীক্ষা করার পরও, পারার উপরের দাগটি নল বেয়ে ৩০ ইঞ্চি (৭৬ সেমি) পর্যন্ত উঠছে, তাঁর উপরে যেতে চাচ্ছে না, বা যেতে পারছে না। তাঁর অর্থ, যেখানে খালি থাকার কথা নয়, সেখানেও খালি সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে আপনা থেকেই। তাহলে সেই ৩০ ইঞ্চির উপরের জায়গাটুকু কি? কিছুই না। বাতাস ঢুকবার তো কোন উপায়ই ছিল না, সুতরাং সেটা নিশ্চয় শূন্যতায় ভরা, অর্থাৎ ভ্যাকুয়াম! এতে প্রমান হয়ে গেল যে প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ না করলেও অপছন্দের একটা সীমা আছে, ঐ ৩০ ইঞ্চি পর্যন্ত, পারাভর্তি নলে, আর ৩৩ ফুট (১০ মিটার) পর্যন্ত পানির টিউবে।

কিন্তু বিজ্ঞানের ধর্মই এমন যে এক সমস্যার সমাধান সাধারণত নতুন সমস্যার বীজ বুনে দেয়। ডেকারটের চেয়ে ২৭ বছরের ছোট ছিলেন ব্লেই প্যাস্কেল (১৬২৩-৬২) নামক এক তীক্ষ্মধী ফরাসি বিজ্ঞানী-গাণিতিক। তিনি প্রশ্ন দাঁড় করালেনঃ ঠিক আছে, বুঝলাম, পানি উঠে ৩৩ ফুট, আর পারা উঠে ৩০ ইঞ্চি, কিন্তু কেন? বিষয়টি কি? কি এক খেয়ালের বশে, এক সহকর্মীকে যন্ত্রপাতিসহ পাঠিয়ে দিলেন এক উঁচু পাহারের চূড়ায়। সেখানে ঠিক একই পরীক্ষা করে দেখা গেল, নলের পারদ ৩০ ইঞ্চিও উঠছে না, তার আরো নিচে উঠেই যেন দম হারিয়ে ফেলছে। প্যাস্কেল ভাবলেন, পাহাড়ের বৈশিষ্ট্যটা কি?

কম বায়ুচাপ, সমতলের তুলনায়। তাহলে রহস্যটা নিশ্চয়ই আর কিছুতে নয়, বায়ুচাপে। পাহাড়ে বায়ুর তেমন শক্তি নেই বেশি উপরে ঠেলার, কিন্তু নিচে চাপ একটু বেশি হওয়াতে পারা বা পানি ঠেলে উপরে তুলতে অতটা বেগ পেতে হয় না।

যাই হোক, একটা জিনিস তো মীমাংসা হয়ে গেলঃ প্রকৃতির সেই শূন্যভীতির ব্যাপারটি। অবস্থাবিশেষে প্রকৃতি শূন্যকে প্রশ্রয় দেয় বৈকি। সুতরাং অ্যারিস্টটলের শূন্য তত্ত্ব আর পিথাগোরাসের সরলগতি-বিরোধী তত্ত্ব একেবারেই অমূলক। প্রকৃতি যখন যে অবস্থা সে অবস্থাতেই নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। টরিসেলি আর প্যাস্কেলের পরীক্ষা থেকে এই সিদ্ধান্তটিই যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়। শূন্য সত্যি সত্যি আছে পৃথিবীতে। ভ্যাকুয়াম কোন আজগুবি কথা নয়। অন্তত আপাতদৃষ্টিতে।

কয়েক শতাব্দী কেটে গেল তারপর। শূন্য আছে এই বিশ্বাসটি বিজ্ঞানমানসে প্রায় স্থায়ী আসন দখল করে নিয়েছে। ভ্যাকুয়াম টিউবের ব্যবহার আধুনিক প্রযুক্তি জগতের সর্বত্র। তাহলে কি প্রকৃতিতে শূন্যের অস্তিত্ব অবিসংবাদিতভাবে প্রমানিত হয়ে গেল? হয়তো বা। আবার হয়তো না। আধুনিক বিজ্ঞানে, বিশেষ করে অনু পরমাণু বিষয়ক পদার্থ বিজ্ঞানে, এই শূন্যতাবাদী চিন্তা ভাবনা একটু নতুন আলোকে পরীক্ষিত হতে শুরু করেছে। কোন কোন পণ্ডিত বলছেনঃ আপাতদৃষ্টিতে যা শূন্য তা আসলে শূন্য নয়, সেখানেও পদার্থ আছে। ঠিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পদার্থ হয়তো নয়, কিন্তু পদার্থ পদবাচ্য অবশ্যই। কিন্তু সে প্রসঙ্গ এখানে নয়, বরং পরের কোন অধ্যায়ের জন্য তোলা থাকুক।

ভিন্ন আলোচনায় যাবার আগে ব্লেই প্যাস্কেল সম্বন্ধে দু চারটে মন্তব্য করার লোভ সামলানো যাচ্ছে না। প্যাস্কেলের জন্য এক প্রচন্ড রকমের গোঁড়া ক্যাথলিক পরিবারে, অনেকটা ডেকারটের মতই। কিন্তু ডেকারট পরিবার ছিল জেসুটপন্থী, আর প্যাসকেলরা ছিল জ্যানসেনবাদী। জ্যানসেনপন্থীরা এতোটাই উগ্র মতবাদের ছিলেন যে তাঁরা বিজ্ঞানকে পাপাচার ভাবতেন, বিজ্ঞান সাধনা ছিল শয়তানের অনুগামী হওয়ার সামিল। সৌভাগ্যবশত প্যাস্কেল নিজে ধর্মকর্ম নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না। বিজ্ঞান চর্চা নিষিদ্ধ জেনেও বেশির ভাগ সময় বিজ্ঞান নিয়েই কাটত তাঁর। প্যাস্কেল ছিলেন এক ক্ষণজন্মা পুরুষ, এতোবড় প্রতিভার মানুষ শতাব্দীতে একজন কি দুজন জন্মায় সারা পৃথিবীতে। কৈশোর আর যৌবনে খানিক উশৃঙ্খলতা হয়তো ছিল তাঁর চরিত্রে। বিজ্ঞান চর্চা থেকে যেটুকু বিরতি পেতেন, সেটুকু তাঁর কাটত জুয়ার আড্ডায়। ভীষণ জুয়ার নেশা ছিল লোকটার। নিজে যে জুয়া খেলতেন তেমন তা নয়, কিন্তু তাঁর অঙ্কের মাথা দিয়ে পেশাদার জুয়ারীদের পরামর্শ দিতেন কখন কোথায় কত টাকা বাজি রাখলে কত লাভ হতে পারে, কত লোকসান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ কাজে লেগে যেত। ফলে অত্যন্ত বিত্তশালী জুয়ারীরা টাকার বস্তা নিয়ে তাঁর কাছে ধরনা দিতেন বাজির পরামর্শ নেওয়ার জন্য। এতে প্যাস্কেল জুয়া না খেলেও প্রচুর ধনসম্পদ করে ফেলেছিলেন। কিন্তু এটা ছিল তাঁর ব্যক্তিগত লাভ। সেটা সাময়িক, অস্থায়ী। চিরস্থায়ী লাভটা হয়েছিল গোটা বিশ্বের।

তাঁর বাজিবিদ্যার সূত্র ধরে কালে কালে একটা নতুন শাখা তৈরি হয়ে যায় গণিতশাস্ত্রেরঃ সম্ভাবনা তত্ত্ব (Probability Theory)। বর্তমান জগতে Probability আর Statistics- এর ব্যবহার নেই এমন কোন শাখা বিজ্ঞানে তো নেইই, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, অর্থনীতি – এধরনের যাবতীয় মূল বিজ্ঞান বহির্ভূত বিষয়েও এর ব্যবহার প্রায় অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, ভাবতে অবাক লাগে যে জুয়ার মত একটি খারাপ নেশা, যার প্রতি ধর্ম ও সমাজ দুটোরই বিরুপ দৃষ্টি, সেই ঘৃণিত জিনিসটি থেকেই উৎপন্ন হয়েছে জ্ঞান বিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা, এবং শপ্তদশ শতাব্দীর এই পথভ্রষ্ট উশৃঙ্খল যুবক তার আদি জনক (যদিও এই জনকত্বের অংশীদার হিসেবে গেলারমো কারডানো এবং পিয়ের ফার্মার নামও উল্লেখ করা হয়)। আমার (মী.র) ব্যক্তিগত মতঃ সম্ভাবনাতত্ত্বের আবিষ্কার অনেকটা অভিকর্ষ তত্ত্বের মতই এক যুগান্তকারী, মৌলিক আবিষ্কার। প্রকৃতির অন্যান্য মৌলিক সত্যের মত সম্ভাবনাও একটি মৌলিক সত্য, আমার বিচারে।

প্যাস্কেলের গল্প অবশ্য এখানেই শেষ হয়ে যায় না। ১৬৫৪ সালের ২৩ নভেম্বর। তাঁর জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিন। পুরাকালের পয়গম্বররা যেমন দৈবাবানী বা অহি লাভ করতেন হঠাত হঠাত, তেমনি প্যাস্কেলেরও এক অতি প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতা হয়ে গেল সেদিন। কোথা থেকে এক ঐশী বাণী এসে  তাঁর জীবনের মোড় আগাগোরা বদলে দিল এক রাতের মাঝে। ধর্মকর্মে চরম উদাসীন মানুষটি হঠাত পরম ধার্মিক হয়ে উঠলেন। গণিত, জুয়া, বিজ্ঞান স্ব ছেড়েছুড়ে সাধু-ব্রত গ্রহণ করলেন পরের দিন থেকে। একেবারে ভিন্ন মানুষ। ৩১ বছর বয়সে প্যাস্কেল ফিরে গেলেন তাঁর পৈত্রিক ধর্মচর্চায়।

কিন্তু ঐশী বাণী হলে কি হবে, সহজাত মেধা যাবে কোথায়। কৌতূহল আর অনুসন্ধিৎসা যার রক্ত-মজ্জায় তাঁকে ধর্মের তাবিজ দিয়ে বশ বানানো কি সম্ভব? ধর্ম তাঁর এক প্রকারের অস্থিরতা ক্মাতে সক্ষম হলেও বুদ্ধির অস্থীরতা অন্য রকমের অশান্তির ঝড় তুলল মনে। চার বছর পর একটা শক্ত অসুখ হল তাঁর। তখন তিনি জ্ঞাতসারেই প্রভুর কাছে কিছুদিনের জন্য ছুটি কামনা করে জ্ঞানসাধনায় মনোযোগ দিলেন। ঠিক বিজ্ঞান না হলেও বিজ্ঞান সংক্রান্ত, সাথে সাথে ধর্ম বিষয়কও। ভাবলেন তাহলে নিশ্চয় মহাপ্রভূ ক্ষমার দৃষ্টিতেই দেখবেন তাঁর কর্মকাণ্ডকে। ঠিক করলেন, জুয়ার বাজিতত্ত্ব দিয়েই তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন। ঈশ্বর বিশ্বাস করাতে কত ঝুঁকি আর না করাতে কত ঝুঁকি তাঁর একটা আনুমানিক সংখ্যা দাঁড় করিয়ে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে, বিশ্বাস করাটাই কম ঝুঁকিপূর্ণ, না করাতে বিস্তর বিপদের আশঙ্কা। রীতিমতো অঙ্ক কষে বের করা স্ব ফলাফল, যদিও অঙ্কটা কিভাবে করা হল, কি ধ্যান ধারনার ভিত্তিতে সে বিষয়ে আধুনিক চিন্তাবিদদের কিছু প্রশ্ন থাকতে পারে বৈকি। প্যাস্কেলের যুক্তি ছিল অনেকটা এরকমঃ ধরুন, খোদা আছে। তাহলে তাঁকে বিশ্বাস করাতে ‘অসীম’ ফায়দা। তিনি যদি না থাকেন তাহলে বিশ্বাস করাতে লাভ বা লোকসান কোনটাই নেই, তার অর্থ ‘শূন্য’ ফায়দা। আর যদি খোদা থাকেন এবং তা স্বত্বেও বিশ্বাস করা হচ্ছে না তাহলে তার শাস্তি গুরুতর, অর্থাৎ ‘অসীম’ বিপদ। তবে তিনি না থাকলে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস তাতে কিছু আসে যায় না। মোটমাট তার হিসাব মতে বিশ্বাস করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ, এতে কোন ঝুঁকি নেই। পাকা ধার্মিকের যুক্তি নয় হয়তো এটা, তবে পাকা জুয়ারীর যুক্তি তাতে সন্দেহ নেই। জুয়ারির যুক্তি দিয়ে তিনি একাধারে শূন্য, অসীম ও ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমান করে ফেললেন। অবশ্য সেই যুক্তিতেও বেশ কিছু ফাঁক আছে, সেটা পরবর্তীকালের যুক্তিবাদীরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। এই বইয়ের লেখদের একজন (অ. রা) এ নিয়ে মুক্ত মনায় একটি বিস্তৃত পোস্ট লিখেছিলেন ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমানে প্যাস্কেলের বাজির অসারতা নিয়ে। ২০১২ সালের জুন মাসে মুক্তমনায় প্রকাশিত লেখাটির শিরোনাম ছিল – ‘প্যাস্কেলের ওয়েজার-আস্তিক হওয়াটাই কি একমাত্র নিরাপদ বাজি?’

ব্লেই পাস্কেলের বর্ণাঢ্য জীবনের বিচিত্র কাহিনী বিস্তৃতভাবে জানবার আগ্রহ থাকলে পাঠককে তাঁর পূর্ণ জীবনী পড়তে হবে।

 

জেনোর ধাঁধা ফিরে এলো

এবার কিছুক্ষনের জন্য জেনোর ধাঁধাতে ফিরে যাবো আমরা। ধাঁধাটির সূত্রপাত কোথায় সে ইঙ্গিত তো আগেই দিয়েছি। সেকালের পণ্ডিতরা বুঝতে পারছিলেন না

1,1/2,1/4,1/8,………..,1/2n,…..

এই যে অন্তহীন সংখ্যামালা, এগুলো তো যাচ্ছে না কোথাও, এদের কোন গন্তব্য নেই। শুধু তা-ই নয়, এগুলোকে যোগ করলে দাঁড়ায় আরেক অদ্ভুত জিনিসঃ

1+1/2+1/22+1/23+……..+1/2n+………

এরই বা শেষ কোথায়? অন্তহীন সংখ্যার যোগফল তো অন্তহীন হবারই কথা, তাই না?

আমরা যেন ভুলে না যাই যে যুগটা ছিল যিশুখৃষ্টের জন্মের দু-চারশ বছর আগে। এবং সমাজটি ছিল এমন যে বড় বড় পণ্ডিতরাও ভাবতেন, ‘শূন্য’ আর ‘অসীম’ দুটোই অমঙ্গলের সহোদর, দুষ্ট লোকের কল্পনাতেই আশ্রয় পায় তারা, বাস্তবে নয়।

এই দুটি প্রশ্নকেই একটু উল্টেপাল্টে পরীক্ষা করা যাক। জেনোর ধাঁধাতে ১/২ একটি বিশেষ সংখ্যা। এটি ১/২ না হয়ে ১/৩ বা ১/৫ হতে পারত, কিংবা অন্য যেকোন ভগ্নাংশ, যার মান ১-এর কম, ০-এর বেশি। সার্বজনীনতার খাতিরে বরং ধরা যাক

1,x,x2,x3,……….xn,……,

যেখানে x একটি সাংকেতিক সংখ্যা, যার মান শূন্য থেকে একের মাঝে। ‘অসীম’ নিয়ে যেহেতু কিঞ্চিৎ সমস্যা আছে আমাদের, সেহেতু n – সংখ্যক সংখ্যা নিয়ে আমরা অসীম পর্যন্ত না গিয়ে

1+x+x2+x3+…….+x(n-1)                 (১)

এই সীমিত রাশিটির যোগফল বের করার চেষ্টা করব। ছোটবেলার স্কুলের পড়া বিদ্যা দিয়েই আমরা অনায়াসে বুঝে ফেলতে পারছি যে সংখ্যাগুলো পরস্পরের সঙ্গে একটা গুণোত্তর প্রগতিসূত্রে বাঁধা। এধরনের গুণোত্তর রাশি নতুন কিছু নয়। ব্যাবিলীয়রা দুহাজার বছর আগেই এরকম রাশি নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেছিলেন। মিশরের ‘আহমেস প্যাপিরাস’ (আ. ১৫৫০ খ্রি.পূ.) নামক গণিত গ্রন্থে একটি গুণোত্তর রাশির বর্ণনা পাওয়া যায়। মজার ব্যাপার হল যে আহমেসে যে পদ্ধতি দেওয়া আছে, প্রায় একই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন ইতালির ফিবোনাচি তাঁর ১২০২ সালের গ্রন্থটিতে। আরকিমেডিস (আ. ২২৫ খ্রি.পূ.) নিজেও একটি অধিবৃত্তের ক্ষেত্রফল বের করতে গিয়ে (১)- এর মত রাশি ব্যবহার করেছিলেন, যাতে x- এর মান ছিল ১/৪।

N যদি ছোট সংখ্যা হয়, তাহলে হাতে গুনেরি ফলাফল বের করে ফেলা যায় রাশিটির যোগফল। কিন্তু গানিতিকেরা হলেন কুঁড়ে প্রকৃতির লোক, সব সময়ই একটা সহজ পথ বের করার তালে থাকেন। এই সহজ পন্থা বা চালাকিটির গাণিতিক নাম হল ‘ফর্মুলা’ বা আর্যা। দেখায যাক উপরের (১)- এর জন্য এমন একটি আর্যা বের করা যায় কিনা। প্রথমত x=0 হলে ওপরের স্ব x শূন্য হয়ে থাকে কেবল প্রথম সংখ্যাটি, অর্থাৎ ১। এবার ধরুন x=১. তাহলে সব সংখ্যাই ১-এর সমান। যেহেতু সর্বমোট সংখ্যা হল n, সেহেতু তাঁর যোগফলও n.

এবার মনে করুন x শূন্য বা ১ কোনোটাই নয়। তাহলে কি হবে? সুবিধার জন্য রাশিটির একটা নাম দেওয়া যাক, ধরুন S (x)। (বন্ধনীর ভেতরে x বেচারাটিকে আটকে ফেলার উদ্দেশ্য হল x- এর মান বদলালে যে S-এর মানও বদলাতে বাধ্য, সেটাই পরিষ্কার করে লিখে দেওয়া) এখন আমরা ওপরের রাশিটিকে নতুন করে লিখবঃ

S(x) =1+x+x2+……….+x(n-1)                  (২)

এবার দুধারে x দিয়ে গুন করলে দাঁড়ায়

xS(x) = x+x2+……..+x(n-1)+xn                (৩)

এ পর্যায়ে আমরা (২) থেকে (৩) বিয়োগ করব। ডান দিকে x থেকে x(n-1) পর্যন্ত ওপরে-নিচে কাটাকুটি হয়ে বাঁকি থাকে কেবল ১ আর একেবারে শেষেরটি, xn, সুতরাং ফল দাঁড়াচ্ছেঃ

(1-x)S(x) = 1-xn.                      (৪)

উদ্দিষ্ট্য লক্ষ্যে প্রায় পৌঁছে গেছি আমরা। বাঁকি রইল কেবল (1-x) দিয়ে ভাগ করা দুদিকে। (ভাগ করা কাজটি কিন্তু ভেবেচিন্তে করা দরকার, সেটা নিশ্চয়ই পাঠকের মনে আছে)। যা-ই হোক আপাতত ওসব জটিল চিন্তায় না দিয়ে সোজা হিসেবে দেখা যাচ্ছেঃ

S(x) = (1-xn)/(1-x).                  (৫)

অলস গানিতিকের জন্য একটি শিশুবোধ দাওয়াই বা ফর্মুলা বেরিয়ে গেল; কষ্ট করে এতগুলো সংখ্যা যোগ করবার প্রয়োজন নেই, (৫)-এর কল্যাণে চট করে সেরে ফেলা যায় কাজটি। যেমন ধরুন, জেনোর ধাঁধার ক্ষেত্রে x হল ১/২। তাহলে,

S(1/2) = (1-1/2n)/(1-1/2) = 2(1-1/2n)                        (৬)

আর্কিমিডিসের বেলায় x=1/4. সেক্ষেত্রে

S(1/4) = 4/3(1-1/4n).

দশ বছরের বাচ্চাও বেশ মজা পেয়ে উঠবে। তবে দশ বছরের বাচ্চা হয়তো যেটা ভাববে না সেটা এক মৌলিক প্রশ্নঃ

(৪) নম্বর সূত্রটি কি সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য? না, তা নয়। অন্তত সোজা পূরণ-ভাগের ব্যাপার নয় সেটা। প্রথমত দেখা যাক x-এর মান ০ আর ১ থেকে কি পাই আমরা।

S(0) = 1/1 = 1,

যা মিলে যাচ্ছে আগেকার পাওয়া ফলাফলের সঙ্গে। এবার x=1 বসানো যাক। (৪) দিচ্ছে ০/০, যার কোন অর্থ নেই। অথচ (১) আর (২) থেকে সোজা হিসেব করেই আমরা পেয়েছিলাম S(1) = n. তাহলে কি বোঝায় ০/০ আর n এক জিনিস? না, তাই বা হয় কিভাবে?

n তো যেকোনো পূর্ণ সংখ্যা হতে পারে। তার অর্থ ০/০ ভগ্নাংশটির কোনো নির্দিষ্ট মান নেই, যা আমরা আগেও উল্লেখ করেছিলাম একবার। এ এক ধাঁধা বটে।

এর পূর্ণ সমাধান পেতে অনেক অনেক শতাব্দী অপেক্ষা করতে হয়েছিল গণিতজগতকে। এর মূলে আছে সেই শূন্য দিয়ে ভাগ করবার নিষিদ্ধ ব্যপারটি। x যদি 1 হয়, 1-x তাহলে শূন্য হবে, এবং সেটা দিয়ে (৪)- এর দুপাশে ভাগ করা রীতিমতো বেআইনি। এই ডামাডোল থেকে আমাদের উদ্ধার করে দিয়েছে নিউটন আর লিবনিজের আবিষ্কৃত নতুন শাস্ত্র – ক্যালকুলাস। তবে এদুই মহারথির কেউই ০/০-এর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেন নি; সেটা করেছিলেন সপ্তদশ শতাব্দীর গাণিতিক জ্যা বার্নলি (১৬৬৭-১৭৪৮) [যদিও এর কৃতিত্ব নিয়েছিলেন ফ্রান্সের আরেক কৃতি গাণিতিক লোপিতাল (১৬৬১-১৭০৪), এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে সে নামেই পরিচিত এই জনপ্রিয় সূত্রটি]। সে প্রসঙ্গে আমরা যাব ক্যালকুলাসের মূল বিষয়গুলো নিয়ে একটু আলাপ-আলোচনার পর।

আচ্ছা, x যদি ০ আর ১-এর মধ্যে কোনো সংখ্যা হয় তাহলে xn– এর মান কি দাঁড়ায়? মনে করুন, x = ১/৩। তাহলে ১/৩2 =১/৯, ১/৩3 =১/২৭, ১/4 =১/৮১, ১/৩5 =১/২৪৩, অর্থাৎ দ্রুত ছোট হয়ে যাচ্ছে এর মান, n-এর মান যত বাড়ছে। সুতরাং n যদি লক্ষ কোটি বা তারও বেশি কোন সংখ্যা হয় তাহলে ভগ্নাংশটির কি দশা হবে? একেবারে তুচ্ছ, তাই না? যাকে অঙ্কের ভাষায় বলা যায় নগণ্য, negligible. এই যে n বেড়ে বেড়ে অসীমের দিকে ছোটা, এর মধ্যেই চুপিসারে এসে যাচ্ছে সেই ‘শূন্য’ আর ‘অসীম’- এর ব্যাপারটি। শুধু তা-ই নয়, আরো একটি বড় আইডিয়ার অংকুর গজিয়ে উঠছে, যাকে গণিতের ভাষায় বলা হয় লিমিট (limit). ভাসাভাসাভাবে আমরা এখনি বলে দিতে পারি যে n  যখন অসীম লিমিতে যায়, xn তখন যায় ০ লিমিটে। সাংকেতিক ভাষায় এটাকেই আমরা লিখি এভাবেঃ

limn→∞ xn = 0,

অর্থাৎ যখন n যায় অসীম লিমিটে। অবশ্য তার জন্য শর্ত দরকার যে x-কে একটি সত্যিকার ভগ্নাংশ হতে হবে, মানে তার মান যেন ১-এর কম হয়। এই ‘কম হওয়া’ ব্যাপারটিকে আমরা ‘<’ চিহ্ন দিয়ে নির্দেশিত করি। বেশি হওয়াকে লিখি ‘>’ চিহ্নের সাহায্যে। সুতরাং 0

limn→∞ S(x) = 1/(1-x),

যখন ন যায় অসীম লিমিটে।

জেনোর ধাঁধার বেলায় যেহেতু x-এর মান ১/২, সেহেতু S(1/2)- এর লিমিট হল ১/(১-১/২) অর্থাৎ ২, অসীম নয়। সুতরাং ‘অসীম’ সংখ্যক ধাপ অতিক্রম করতে হলেও খরগোশকে অসীম দূরত্বে যেতে হয় না, বা অসীম সময় ক্ষেপণ করতে হয় না, এক লাফেই পার হয়ে যায় দুই একক সময়ের মধ্যে – মাত্র তো দুই ফুট, ২ গজ বা ২ সেকেন্ড বা ২ মিনিটের ব্যাপার। এই সামান্য ঘটনাটি সেকালের মহা মহা পণ্ডিতদের মাথায় ঢোকেনি, যার একটাই কারন, শূন্য আর অসীমের অস্তিত্ব নিয়ে সমস্যা, এবং লিমিটের কোন ধারনা না থাকা।

অথচ কাজে কর্মে কিন্তু লিমিট বারবারই উঁকি মারছিল পুরাকালের গবেষকদের মস্তিষ্কে। সে গল্প করব পরবর্তী অধ্যায়ে। আপাতত শূন্য আর অসীম নিয়ে আরো কিছু সময় কাটানো যাক। ওপরের আলোচনা থেকে এটা বোঝা যাচ্ছে যে

S(x) =1+x+x2+………+xn+…….             (৭)

যদি দিগদিগন্ত পার হয়ে অসীম পারাপারে চলে যায় তাহলেও এর একটা সীমিত মান আছে, 1/(1-x), যার অর্থ দাঁড়ায়ঃ

S(x) =1/(1-x).              (৮)

এই উদাহরণ থেকে পাঠক যেন ভেবে না বসেন যে ১-এর চেয়ে কম এরকম অসীম সংখ্যক সংখ্যার সব যোগফলই সীমার মধ্যে থাকবে। যেমন,

১+১/২+১/৩+১/৪+…………….               (৯)

এই সহজ রাশিটি অসীমের দিকে যাচ্ছে ঠিকই, এবং সংখ্যা গুলোর মানও ছোট হতে হতে শূন্য হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তা স্বত্বেও এটি কোন সসীম সংখ্যায় পৌছুচ্ছে না, বরং যাচ্ছে অসীমেরই দিকে। ক্যালকুলাসের ছাত্রদের যেটা শিখতে হয় সেটা হল যে অসীম রাশির সংখ্যাগুলো ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে যাওয়াটাই যথেষ্ট নয়, কত দ্রুত ছোট হচ্ছে সেতাই হল আসল প্রশ্ন। গুণোত্তর রাশির বেলায় সে হারটি যথেষ্ট দ্রুত বলেই (৭) থেকে (৮) পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হল, কিন্তু (৯)-এর বেলায় তা পারা গেল না, কারন ১,১/২,১/৩,…… এ সংখ্যাগুলোর শূন্যে যাওয়ার গতিটা বড় ঢিলে।

অসীম সংখ্যক সংখ্যার যোগফল নিয়ে কাজ করার আরো অনেক বিড়ম্বনা আছে। সংখ্যাগুলো যদি সব ধনাত্মক হয়, বা সব ঋণাত্মক, তবু খানিক রক্ষা, মিশ্রিত হলে তো সেরেছে। যেমন ধরুনঃ

১-১+১-১+১-১+…………….                      (১০)

এর যোগফল কি হবে? আদৌ কোন যোগফল আছে কি না? প্রথম দৃষ্টিতে মনে হবে, এতে ভাববার কি আছে? (১০)- এর প্রথম জোড়ার যোগফল শূন্য, দ্বিতীয় জোড়া, তৃতীয় জোড়া, চতুর্থ, পঞ্চম,……, এভাবে যেতে যেতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সব জোড়া থেকে একই ফল পাচ্ছি আমরাঃ শূন্য।

অর্থাৎঃ

(১-১)+(১-১)+(১-১)+………… = 0                       (১১)

এতে ভুলের কি আছে? কিন্তু না, এত সহজে ছাড় পাবেন না। বন্ধনীগুলোকে (১১)-এর মতো করে না সাজিয়ে একটু অন্যভাবে সাজানো যাক। যেমন-

১- (১-১)-(১-১)-(১-১)………                    (১২)

এখন কি দেখছি আমরা? সবগুলো বন্ধনীযুক্ত সংখ্যাদ্বয় কাটাকুটি করে শূন্য হয়ে যাচ্ছে, থাকছে শুধু প্রথম সংখ্যাটি, অর্থাৎ ১। সুতরাং (১২)- এর যোগফল মনে হচ্ছে ১। কিন্তু একটু আগেই তো দেখলাম যোগফল শূন্য। শূন্য আর ১ এক হয় কি করে? কোনটা সত্য? সত্য হল যে কোনটাই সত্য নয়, আবার দুটোই সত্য। তার অর্থ এধরনের যোগ বিয়োগযুক্ত রাশি বড়ই ঝামেলা সৃষ্টি করে। বড় বড় মাথাওয়ালা ব্যক্তিদেরও মাথা ঘামিয়ে ফেলে। সুতরাং সে প্রসঙ্গ এখানেই শেষ করব। এগুলো শিখবার জায়গা প্রথম বর্ষের ক্যালকুলাস নয়, তারও একধাপ উপরের কোর্স, যাকে বলা হয় রিয়েল অ্যানালিসিস, বেশ জটিল বিষয়, সেখানে ঢুকতে হবে।

 

লিমিটের ছলাকলা

আমার (মী.র) ছাত্রজীবনে ক্যালকুলাস শেখা শুরু হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে। বিসমিল্লাতেই যে জিনিসটা শিখতে হয়েছিল আমাদের সেটা হল লিমিট, কারন লিমিটই হল ক্যালকুলাসের ভিত্তি। প্রথম সংজ্ঞাটিই বর্ণনা দেয় লিমিট কাকে বলে। একে এড়ানোর কোন উপায় নেই। প্রকৌশল আর ফলিত বিজ্ঞানের ছাত্ররা লিমিট পছন্দ করে না (তারা মনে করে, এটা অনর্থক সময় নষ্ট করা মাত্র), ডাক্তাররা ভাবে, এটা অনাবশ্যক, কলার ছাত্রদের মনোভাব, লিমিট একটি রসকষহীনশুষ্ক বিষয় যা মানবচিত্রের বিকাশ সাধনে বিন্দুমাত্র সহায়তা করে না। আর প্রথম বর্ষের গণিত ছাত্ররা? বেচারিদের কোন গত্যন্তর নেই। পড়েছি মোগলের হাতে, খানা অবশ্যই খেতে হবে সাথে। আক্কেল হারিয়েছিলাম বলেই তো অঙ্কতে অনার্স নেওয়া, এখন তিতে ঔষধটা আগেভাগে গিলে ফেলাই ভালো। তাই আমরা গিলে ফেলতাম। চোখ বুজে। মনে পড়ে না আমি (মী.র) বা আমার সহপাঠীদের এমন কেউ ছিল যে হলপ করে বলতে পারত সে সত্যি সত্যিই বুঝেছিল লিমিট জিনিসটা আসলে কি। মুখস্ত করা এক জিনিস আর সত্যি সত্যি বুঝে ফেলা আরেক জিনিস। এমনিতেই আমাদের দেশে বোঝার চেয়ে পড়া আর মুখস্তের ওপরই জোর বেশি, তার উপর লিমিটের মতো একটি দুরূহ বিষয় যা নিয়ে পুরাকালের বড় বড় পণ্ডিতদেরও মাথার তালু দিয়ে ধোঁয়া ছুটত। আমি (মী.র) সারা জীবন অঙ্ক পড়িয়েছি- ক্যালকুলাস আর লিমিট পড়িয়েছি অসংখ্যবার। অথচ এই আমিও লিমিট ব্যাপারটা অনার্সের একেবারে শেষ পরীক্ষার আগ পর্যন্ত ঠিক বুঝিনি। যন্ত্রের মত অঙ্ক কষে যেতে পারতাম, কিন্তু কোন আনাড়ি মানুষকে সহজ ভাষায় বোঝানো যায় এমন করে বুঝিনি। ‘ভালো করে শেখা’ বলতে এই বুঝি আমি- এটাই বুদ্ধির পরীক্ষা- রাস্তার মানুষকে রাস্তার ভাষাতেই জটিল একটা বিষয় ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারা, সেটাই পাণ্ডিত্যের লক্ষণ। সেই শেখাটুকু আমার শেখা হয়েছে ক্যানাডায় শিক্ষকতা শুরু করার বেশ কিছু পরে।

কিন্তু কেন? কেন লিমিটকে ঘিরে এতো রহস্য? মিথ্যে প্রবঞ্চনায় বার বার কেন বিভ্রান্ত করা মেধাবী-অমেধাবী সবাইকে সমানভাবে? প্রথম কারন, এতে ‘শূন্য’ দেখা দেয় খেলার সঙ্গী হবার জন্য, ধরা দেওয়ার জন্য নয়। সে এসেও ধরা দিতে চায় না। এখানে ‘শূন্য’ আসে 0/0- এর ভয়ঙ্করী মূর্তি নিয়ে, অথচ পুরোপুরি তা-ও নয়। এ এক অদ্ভুত জিনিস। ‘শূন্যের’ কাছে যাব, অতি কাছে, যত কাছে তোমার কল্পনায় আসে তত কাছে, তবু ঠিক শূন্যের গায়ে উপুর হয়ে পরব না। প্রিয় তোমার সঙ্গটুকু দাও শুধু, ছোঁয়াটুকু নয়, এই যেন লিমিটের কামনা।

ছোট্র একটা উদাহরণ দেই। ভারতীয় গাণিতিক ভাস্কর তাঁর স্বদেশী ব্রক্ষ্মগুপ্তের ভুল সংশোধন করে বলেছিলেন, সঠিকভাবেই, যে ১/০ বা (১৫৫৫৬)/০- জাতীয় ভগ্নাংশের মান হল অসীম। কিন্তু ধরুন কোন বিশেষ সংখ্যার উল্লেখ না করে আমরা চাচ্ছি, x সূচক একটি সংখ্যা শূন্যের দিকে অগ্রসর হলে, 1/x, এই ভগ্নাংশটি কোন পথে ধাবিত হবে তা জানতে। অর্থাৎ

Limx→∞0 (1/x) = ?                     (১৩)

এক মুহূর্ত অমনোযোগী হলেই কিহচু ফাঁদে পরে যাবেন, বলবেন কেন, এটা তো পরিষ্কারই দেখা যাচ্ছে অসীম। কিন্তু ১/০ যদি অসীম হয় তাহলে ওপরের লিমিটটি অসীম হবে না কেন? বলছি না যে আপনি ভুল বলছেন; না, ভুল নয়, আংশিক ভুল। অসীম বলতে সাধারনভাবে আমরা বুঝি অসীম বড় কোন সংখ্যা, অর্থাৎ ধনাত্মক অসীম। সেটা ঠিক, যদি (১৩)- এর লিমিটটিতে x শূন্যের দিকে যায় ডান দিক দিক থেকে, যার অর্থ ধনাত্মক দিক থেকে। কিন্তু লিমিট বলতে তো ডান দিক বাঁ দিক উভয় দিক বোঝাতে পারে। বাঁ দিক থেকে যদি x আসে শূন্যের দিকে তাহলে তো এটা ধনাত্মক অসীম থাকছে না, থাকছে ঋণাত্মক অসীম। এ থেকে কি সিদ্ধান্তে পৌঁছুব আমরা? দুটো লিমিটটই ঠিক? না, তা নয়। এখানে সঠিক সিদ্ধান্ত হল যে ওপরের লিমিটটির আসলে কোন অস্তিত্ব নেই। এই যে লিমিটের অস্তিত্ব থাকা বা না থাকা, এর উপরই গা ছড়িয়ে আছে অ্যানালিসিস শাখাটির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, যার প্রাথমিক পর্যায়ের নাম হল ক্যালকুলাস।

ক্যালকুলাসের একেবারে গোড়াতে যে আইডিয়াটি সেটা হল ‘ক্ষুদ্র সংখ্যা’। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় infinitesimal. সেই যে বললাম, শূন্যের নিকটতম প্রতিবেশি অথচ শূন্য নয়, যা চালাক মানুষকেও বোকা বানিয়ে ফেলে। বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে মানুষ এই আইডিয়াটি নিয়ে হিমশিম খেয়েছে, এটা নিয়ে কাজ করেছে, ব্যবহার করেছে দৈনন্দিন প্রয়োজনে, কিন্তু স্পর্শ করতে সাহস পায় নি। গরম লোহার মত, যা না হলে দা-কুড়াল বানানো যায় না, অথচ ছোঁয়া মানে নির্ঘাত হাত পোড়ানো।

‘ক্ষুদ্র সংখ্যা’র ব্যবহার আজকের নয়, পুরাকাল থেকেই।

 

দৈনন্দিন জীবনে ক্যালকুলাস

ব্যবহারিক প্রয়োজন বলতে কি বোঝায়? আহার্য। পরিধেয়। আলোবাতাস, জল, বৃষ্টি। বাসগৃহ। জমিজমার মাপজোক করতে হয়। গৃহের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপতে হয়। প্রাচীন মিশরীয়রা সেভাবেই জ্যামিতি আবিষ্কার করেছিলেন। সেভাবেই তাঁরা প্রথম সূচনা করেছিলেন সরলরেখা, সমতল, ত্রিভূজ, চতুর্ভুজ, কোন, সমকোণ, এসব শব্দ। একই সময় চীন, ভারতবর্ষ এবং অন্যান্য জাতির চিন্তাবিদদের মাথায় অনুরুপ ভাবনা জেগে থাকতে পারে, তার কোন লিপিবদ্ধ ইতিহাস আমাদের জানা নেই। সরল রেখার দৈর্ঘ্য বলতে কি বোঝায় সেটা আমরা জানি, একটা পাঁচ বছরের শিশুও সেটা বোঝে। দৈর্ঘ্য মাপার জন্য আছে মানদন্ড (রুলার)। আমেরিকায় ইঞ্চি, ফুট, গজ, ইত্যাদি, ক্যানাডা-ইউরোপে মিটার-সেন্টিমিটার-কিলোমিটার। অবশ্য দৈর্ঘ্য বলতে কি বোঝায় সে-ও এক মৌলিক প্রশ্ন। সক্রেটিস হলে হয়তো বলতেন, দৈর্ঘ্য মাপার আগে বাপু, আমাকে বুঝিয়ে দাও ‘দৈর্ঘ্য’ শব্দটার অর্থ কি। বর্তমান যুগের বিশুদ্ধতাবাদী তাত্ত্বিক গানিতিকেরা (pure mathematicians) বলবেনঃ দৈর্ঘ্য? কিসের দৈর্ঘ্য? সেট (set) টা কি? ওটা কি ফাঁকা ফাঁকা, না একটানা (discrete or continuous)? পরিমাপনীয় (measurable), না অপরিমাপনীয়? সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে আপনার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা দাঁড়াবে। বিশুদ্ধ গানিতিকেরা বড় খুঁতখুঁতে জাতি, আগেকার দিনের দার্শনিকদের মত। যুক্তির শক্ত গাথুনিতে বাঁধা না হলে কিছুতেই তাদের তুষ্টি হয় না। আপাতত আমরা সেই যুক্তিযুদ্ধ থেকে দূরত্ব বজায় রাখবো।

আলোচনার সুবিধার জন্য দু-চারটে তথ্য আমরা স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নেব, বিশেষ করে ইউক্লিডের বইতে যেসব তথ্য দেওয়া আছে, ধরে নেব যে সেগুলো বিনা প্রশ্নেই মেনে নেওয়া যায়। তাহলে একটি সমকোণী চতুর্ভুজের ক্ষেত্রফল হল তার ‘দৈর্ঘ্য’ ও ‘প্রস্থে’র গুণফল। (লক্ষ করুন যে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ দুটি শব্দেই ‘ ‘ চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। তার কারন চতুর্ভুজের কোন বাহুটা তার দৈর্ঘ্য, কোনটি প্রস্থ, সেটা নেহাতই দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে)। আমরা এ-ও ধরে নেব যে একটা ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল হল তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের গুনফলের অর্ধেক। এই সামান্য দু-তিনটে তথ্য জানা থাকলেই এক আশ্চর্য উপায়ে ক্যালকুলাসের দুটি মুখ্য শাখা, অন্তরকলন (differential calculus), এবং সমাকলন (integral calculus), তাদের একটা প্রাথমিক ধারনা দাঁড় করানো সম্ভব। এ দুয়ের মাঝেই চুপটি করে লুকিয়ে আছে ‘শূন্য’ আর 0/0- জাতীয় অনির্ণেয় সংখ্যার বীজ।

ধরুন একটি সমদ্বিবাহু (isosceles) ও সমকোণী (right-angle) ত্রিভূজ, যার দৈর্ঘ্য-লম্ব দুই-ই ৮ সেন্টিমিটার। ভূমিতে ক হল এক কোনায়, খ আরেক কোনায়, আর গ হল লম্বের মাথায়। অর্থাৎ ক থেকে গ রেখাটি ত্রিভূজের অতিভূজ। ইউক্লিডের জ্যামিতি থেকে আমরা জানি, এর ক্ষেত্রফল হল (৮x৮)/২ = ৩২ বর্গসেন্টিমিটার।

এখন এক কাজ করা যাক। ভূমির ঠিক মধ্যিখানে, অর্থাৎ ক থেকে চার একক দূরত্বে যে বিন্দুটি  সেখান থেকে একটা লম্ব আঁকা যাক যেটা মিশছে, ধরুন, অতিভূজ কগ রেখাটির ঘ বিন্দুতে। ঘ থেকে ভূমির সমান্তরাল একটি রেখা আঁকুন খগ অবধি। এটা মনে করুন চ বিন্দুতে মিশল। এভাবে গঠিত যে বর্গক্ষেত্রেটি পেলাম আমরা তার ক্ষেত্রফল কত? ৪X৪= ১৬, সোজা হিসাব। পুরো ত্রিভূজটির অর্ধেক।

আন্দাজ হিসেবে চলনসই, কিন্তু খুব সূক্ষ্ম আন্দাজ নয়। তার চেয়ে ভালো অনুমান পেতে হলে ভূমিতে আরো বেশি খন্ড বিন্দু নিতে হবে। দুভাগ না করে সমান করে যদি চার ভাগ করেন, তাহলে বর্গক্ষেত্র পাবেন না, পাবেন সমকোণী চতুর্ভুজ, যাদের সম্মিলিত ক্ষেত্রফল (সেটা আপনি অনায়াসে বের করে নিতে পারবেন) দাঁড়াবে ২৪ বর্গসেন্টিমিটার – আরেকটু কাছিয়ে আসা হল। ছবিটা একটু পরিষ্কার হচ্ছে, আশা করি। যত বেশি সংখ্যক খন্ড বিন্দু নেবেন, ক আর খ- এর মাঝে ততই ৩২ বর্গমিটারের কাছে যেতে পারবেন ফলশ্রুত চতুর্ভুজগুলোর সম্মিলিত ক্ষেত্রফল যোগ করে। রেখাটিকে কত মিহি করে ভাগ করতে পারবেন আপনি? যত সূক্ষ্ম ইচ্ছে আপনার, একেবারে শূন্য না হলেই হয়। এই খন্ডগুলো সব সমান মাপের হতে হবে তার কোনো প্রয়োজন নেই, তবে সমান হলে গুনতে সুবিধা, এই যা। তাছাড়া সমান- অসমান দুটিতে একই ফল পাওয়া যায় সচরাচর।

ভূমি-রেখার এই ছোট ছোট টুকরোগুলো অঙ্কের বইতে সাধারণত Δx সাংকেতিক চিহ্ন দিয়ে লেখা হয়। এই Δx দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট রেখাখন্ডের বাম বা ডান প্রান্তের বিন্দুর দূরত্ব যদি হয় x, আর সেখানকার লম্বরেখাটির উচ্চতা হয় f(x), তাহলে সেই সরু চতুর্ভুজটির ক্ষেত্রফল হবে f(x)Δx. সুতরাং এরকম সব ক্ষেত্রফল যোগ করলে একটি সংখ্যা দাঁড়াবে যাকে আমরা ∑Δxxf) ধরনের সাংকেতিক ভাষায় লিখতে পারি। (∑ দিয়ে sum অর্থাৎ যোগফল বোঝাচ্ছে) এই Δx সংখ্যাটি শূন্য না হয়ে শূন্যের একেবারে গায়ে গায়ে ঘেঁষে যাওয়ার অবস্থায় দাঁড়ালেও যদি এই যোগফল কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যাতে গিয়ে পৌঁছায় তাহলে সেই সংখ্যাটিকেই গণিতের সংজ্ঞায় বলা হয় ইন্টিগ্রাল (এক্ষেত্রে ত্রিভূজের ক্ষেত্রফল)। তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে ক্ষেত্রফলও একটি লিমিটঃ

limΔx0 ∑ f(x)Δx = ক্ষেত্রফল                         (১৪)

সজাগ পাঠক প্রশ্ন তুলতেই পারেন, এবং অত্যন্ত যুক্তিযুক্তভাবেই, যে সামান্য একটা ত্রিভূজের ক্ষেত্রফল বের করতে অনর্থক এত পরিশ্রম করার কি দরকার ছিল, যেখানে ইউক্লিডের জ্যামিতি বইতেই তার জবাব দেওয়া আছে পরিষ্কার অক্ষরে? আমাদের উত্তরঃ ঠিক সেই কারনেই উদাহরণটি বাছাই করা, সবাই পরিচিত এর সঙ্গে। পরিচিত জিনিস দিয়ে একটা অপরিচিত আইডিয়া ব্যাখ্যা করা অনেক সহজ, আমাদের মতে।

এটা সত্য যে ত্রিভূজের বেলায় কাটাকুটি, আন্দাজ-অনুমান এসবের কোন কিছুরই প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু এর চেয়ে জটিলতর এলাকার ক্ষেত্রফল বের করতে হলে ইউক্লিড সাহেবের সাহায্যের জন্য হাত বাড়ালে লাভ হবে না, সেখানে এই কাটাকুটি, আন্দাজ-অনুমানই বলতে গেলে একমাত্র ভরসা। যেমন ধরুন একটা বৃত্তাকার মাদুরের ক্ষেত্রফল বের করতে বলছেন আপনার স্ত্রী। কিংবা একটা বড়সড় কলাপাতার ক্ষেত্রফল বের করতে বললেন কেউ। সেক্ষত্রে ছোট ছোট চতুর্ভুজ বা ত্রিভূজ আকারের টুকরায় ভাগ করে শেষে লিমিটে চলে যাওয়া ছাড়া আর কি উপায় আছে আমি জানি না।

লিমিট নামের আইডিয়াটি বলতে গেলে বেশ আধুনিক, সপ্তদশ শতাব্দীতে ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হয়ে উনবিংশ শতাব্দীতে এসে পূর্ণ অবয়বে বিকশিত হয়ে উঠে। কিন্তু অনেকগুলো ছোট চতুর্ভুজ যোগ করে বৃত্তজাতীয় কোন জটিল এলাকার আনুমানিক ক্ষেত্রফল বের করার চেষ্টা আজকের নয়, অনাদিকাল থেকে চলে আসছে। খ্রি.পূ. সপ্তম শতকে জন্মলবদ্ধ মিসরীয় গাণিতিক আহমেস বৃত্তের ক্ষেত্রফল বের করার চেষ্টা করেছিলেন দারুন বুদ্ধিমত্তা ও অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় দিয়ে। প্রথমে একটি ৯ একক ব্যাসবিশিষ্ট বৃত্ত নিয়ে সেটাকে আটকালেন ঠিক ৯ একক লম্বা বর্গক্ষেত্রের ভেতর। খুব মোটা অনুমান হিসাবে এই বর্গের এলাকা আর বৃত্তের এলাকায় তেমন তফাত নেই। তবে এতে তিনি সন্তুষ্ট থাকলেন না। বর্গের চার কোনাকে চারটে স্পর্শক টেনে তৈরি করলেন চারটে সমদ্বিবাহু ত্রিভূজ। এই চারটে ত্রিভূজের ক্ষেত্রফল বের করা এমন কোন শক্ত ব্যাপার নয়। সেই সম্মিলিত ক্ষেত্রফলকে তিনি বিয়োগ করে ফেললেন পুরো বর্গের ক্ষেত্রফল থেকে। এভাবে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন তিনি যে ৯ একক ব্যাসবিশিষ্ট বৃত্তের ক্ষেত্রফল আর একটি ৮ একক ক্ষেত্রফল সমান।

সেটা অবশ্য ঠিক নয়, কিন্তু এতে গণিতের একটি সর্বজনীন অমূলদ সংখ্যা π (পাই),  যার আবিষ্কারের পেছনে সবচেয়ে বেশি প্রেরনা ছিল বৃত্তের, এবং যার আনুমানিক মান হিসেবে ধরা হয় ২২/৭ সংখ্যাটিকে, আহমেসের গণনাতে সেটা বেড়িয়ে এল ১৯/৬-তে। অর্থাৎ তারটি হল ৩+১/৬, আর আসলটি হল ৩+১/৭। আশ্চর্য মিল, যখন চিন্তা করি দুয়ের মাঝে প্রায় ৪০০০ হাজার বছরের ফারাক। সেকালে মানুষ কিই বা জানতেন, তবু তাঁদের উপজ্ঞা (intuition) ছিল প্রখর, ‘আন্দাজ’ ছিল অসাধারন। ঐতিহাসিকদের বিশ্বাস সে সময়কার মিসরীয় পণ্ডিতেরা পিরামিডের আয়তন বের করেছিলেন অঙ্ক কষে, যাদিও তাঁদের ‘প্রমান’ কতখানি নির্ভরযোগ্য সেটা বিতর্কের বিষয়। সঠিক ফর্মুলাটি হলঃ

পিরামিডের আয়তন = ১/৩ (উচ্চতা X ভূমির ক্ষেত্রফল)

এতে কোন সন্দেহ নেই যে মিসরীয়দের জানা ছিল এটি, সে যেভাবেই হোক। অ্যারিস্টটলের মতে এর নির্ভুল প্রমান দিয়েছিলেন গ্রিক গাণিতিক ডেমোক্রিটাস (জ. ৪৬০ খ্রি.পূ., আ.), যদিও সে দাবিটাও প্রমানসাপেক্ষ।

আধুনিক লেখকদের মতে, হয়তো একটা প্রমান তিনি দিয়েছিলেন, কিন্তু সম্ভবত বর্তমান যুগের উন্নত উন্নতমানের যুক্তির বিচারে ধোপে টেকার মতো ছিল না। ভারতবর্ষের আর্যভট্ট নিজেও একটা সূত্র দিয়েছিলেন পিরামিডের ঘনফলের জন্য, কিন্তু তাঁর ফর্মুলাতে ৩-এর জায়গায় ২ (হয়তো ত্রিভুজের উদাহরণ দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারনেই)। গানিতিকভাবে বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য প্রমান, সেটা পিরামিডের ঘনফলেরই হোক কিংবা বৃত্তের ক্ষেত্রফলই হোক, তাতে ক্যালকুলাসের সমকক্ষ আর কিছু নেই। অন্তত এখনো পর্যন্ত।

খেয়াল করুন যে আমরা এখনো ক্যালকুলাসের দ্বিতীয় শাখাটি নিয়ে টুঁ শব্দ করিনি – অন্তরকলন ক্যালকুলাস (Differential Calculus)। স্কুল কলেজের পাঠ্যসূচিতে প্রথমে শেখানো হয় অন্তরকলন, তারপর সমাকলন। আমরা ঠিক উল্টো পথটা বাছাই করলাম এখানে, কারন মৌলিক যুক্তি তর্কের দিক থেকে অন্তরকলনই হল বেশি জটিল। এতে, পর্দার আড়ালে, আছে সেই 0/0 এর ব্যাপারটি, যদিও কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রছাত্রীরা দু-তিন ক্লাস করার আগে টেরই পায় না সেই জটিলতাটুকুর উৎস কোথায়, বা আদৌ কোন জটিলতা আছে কিনা। যন্ত্রিক দক্ষতার সাথে অঙ্ক কষে ভালো নম্বর পাওয়া এক জিনিস, আর তার মর্মমূলে গিয়ে সারবস্তুটুকু উদ্ধার করতে পারা অন্য জিনিস। প্রথম বছর তারা শেখে, দ্বিতীয় বছর মুখস্ত করে, যাতে কাজ চালানোর দক্ষতা আসে, তৃতীয় বছর তারা ভাবে, এতো দিনে ব্যাপারটা সত্যি সত্যি বোঝা গেল। কতগুলো জিনিস আছে সংসারে যেগুলো বুঝতে একটু সময় লাগে। শুধু বই-পুস্তক আর শিক্ষক-অধ্যাপকই যথেষ্ট নয়। তার জন্য লাগে মানসিক ও বৌদ্ধিক পরিপক্কতা, একটু সৃজনশীলতাও। হ্যাঁ, এটা আমার (মী.র) ব্যক্তিগত অভিমত যে কোন সৃজনশীল মানুষের কাজ ভালো করে বুঝতে হলে নিজেরও খানিক সৃজনশীলতা থাকা দরকার। সেটা শিল্পকলাই বলুন আর গণিত বিজ্ঞানই বলুন। স্রষ্টার মস্তিষ্কের ভেতরে প্রবেশ করার আগে কি কেউ পুরোপুরি বুঝতে পারে কারো কাজ?

অন্তরকলন বোঝাতেও সেই একই ত্রিভুজের উদাহরণ ব্যবহার করব। সহজ, চোখে দেখা যায়, অথচ এতেই একটা মোটামুটি ধারনা দাঁড় করানো সম্ভব। এবার আমরা ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করব না। আমরা কল্পনা করব যে সমকোণী ত্রিভূজটির অতিভূজ একটা পাহাড়ি জায়গার খাড়া রাস্তা। ক থেকে গ পর্যন্ত পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে হলে আমাদের জানা দরকার কতখানি চড়াই, অর্থাৎ তার ঢাল (slope) কত। কিভাবে বের করব সেটা? সোজা! লম্ব খ-গ রেখাটির দৈর্ঘ্যকে ভাগ করুন ভূমিস্থ ক-খ রেখটির দৈর্ঘ্য দিয়ে। একেই আমরা বলি ‘ঢাল’। খেয়াল করুন যে, ‘ঢাল’ যদি শূন্য হয় (যার অর্থ গ আর খ একসাথে মিশে যাওয়া), তাহলে একেবারে সমতল, অর্থাৎ কোন রকম চড়াই উতরাই নেই। আবার যদি অসীম হয় তাহলে কি হবে? তার অর্থ খাড়া পাহাড়, একেবারে লম্বালম্বি উঠে গেছে। ‘অসীম’ কিন্তু এসে গেল এখানে। কেন হল এরকম? হল এজন্য যে পর্বত খাড়া হওয়া মানে খ বিন্দুটি ক-এর নিকটে আসতে আসতে একেবারে মিশে যাবার উপক্রম হচ্ছে, ওদিকে খ-গ রেখাটির দৈর্ঘ্য মোটেই বদলাচ্ছে না। তার অর্থ একটা সসীম সংখ্যাকে একটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হচ্ছে। সেই কারনেই ভগ্নাংশটি অসীমের পানে ছুটে যাচ্ছে সোল্লাসে।

যেহেতু ত্রিভূজটি গোড়া থেকেই ছিল সমদ্বিবাহু ও সমকোণী, আমরা জানি যে লম্ব/দৈর্ঘ্য= ১, কারন ক-খ আর খ-গ দুটি রেখারই সমান দৈর্ঘ্য। এবার কল্পনাতে আপনি খ-গ রেখাটির সমান্তরালতা বজায় রেখে তাঁকে সরিয়ে আনুন কেন্দ্রের পাশে, অর্থাৎ ক-এর কাছে। দুটি দৈর্ঘ্যই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের অনুপাত থাকছে একই। কাছে বলতে কিন্তু কাছেই বোঝানো হচ্ছে, মানে যত কাছে আসা সম্ভব, যতক্ষন না অবশ্য হুমড়ি খেয়ে পরে যায় ক-এর ঘাড়ের উপর। ক্ষুদ্র ত্রিভূজটি বড়টির সদৃশ হলেই হল, অর্থাৎ বাহুগুলোর অনুপাতে যেন কোন রদবদল না হয়। এবার মাপ নিয়ে দেখুন দুটি বাহুর দৈর্ঘ্য, এতো ছোট হয়ে গেছে যে রুলার বসানোরও উপায় নেই বলতে গেলে। ধরা যাক, ভূমিটুকুর দৈর্ঘ্য Δx আর লম্বের দৈর্ঘ্য Δy সুতরাং অতিভূজটির ঢাল দাঁড়াচ্ছে, Δy/Δx, যা আমরা একটু আগেই দেখলাম। এবং যার মান আগের মতই অপরিবর্তিত – ১। তাহলে কি আমরা লিখতে পারি না

LimΔx →∞0 Δy/Δx = 1?                        (১৫)

অবশ্যই পারি।

আশা কেরি আইডিয়াটির একটা ভাসা ভাসা ধারনা পাওয়া গেল। একটা ভগ্নাংশের লব আর বিভাজক যদি একেবারে শূন্য হয়ে যায়, তাহলে সে অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে, তার কোন মানে থাকে না। কিন্তু যদি দুটোই সমান হারে ছোট হয়, তুচ্ছাতিতুচ্ছ শূন্যতায় পৌঁছায়, তাহলে তাদের যে অনুপাত, সেটির একটা ‘লিমিট’ থাকলে থাকতেও পরে, এবং সেই লিমিটের একটা জ্যামিতিক তাৎপর্য আছে বৈকি – এক ক্ষেত্রে সেটা হতে পারে কোন রেখাবেষ্টিত সমতল ক্ষেত্র, আরেক ক্ষেত্রে হয়তোবা রেখার ঢাল।

ওপরের উদাহরণটি একটা ছেলেমানুষি উদাহরণ, মানছি, ছোট বাচ্চাও বুঝবে অনায়াসে। এবং সেই কারনেই নেওয়া। আমাদের বক্তব্য হল যে ত্রিভূজ আর সরলরেখা না হয়ে যদি বৃত্ত, পরিবৃত্ত, অধিবৃত্ত, কিংবা তার চেয়েও জটিল কোন রেখা হতো, তাহলেও প্রায় একই যুক্তি চালানো যেত। ঢালের সংজ্ঞাতে যা করা হয় সাধারণত, দুটি কাছাকাছি বিন্দু নেওয়া রেখাটির উপর। এবং প্রথমে বিন্দু দুটিকে একটি সরল রেখাতে যুক্ত করে তার ঢাল মাপা, ওপরে যে পদ্ধতিটা ব্যবহার করা হল, ঠিক সেই পদ্ধতিতে। তারপর সেই বিন্দুদ্বয়কে পরস্পরের কাছে টেনে নেওয়া; কাছে, আরো কাছে, যত কাছে আপনার কল্পনায় সম্ভব। সেবশেষে এই ঢালটির ‘লিমিট’ নেওয়া, ঠিক আগেরই মত করে। রেখাটি যদি যথেষ্ট ‘সুশীল’ হয়, অর্থাৎ হঠাত খাড়া হয়ে না যায়, বা বলা নেই কওয়া নেই, অকস্মাৎ বেঁকে না যায়, অথবা রেখাটি সেই বিন্দুতে না গিয়ে একেবারে উধাও হয়ে না যায়, তাহলে সেই লিমিটটিও সাধারণত ভদ্র ব্যবহার করবে, অর্থাৎ তার একটা সসীম মান থাকবে।

এই সহজ আইডিয়াগুলো আজকের মন মানসিকতায় একবারে ডাল ভাত মনে হতে পারে, কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীর উষালগ্নে সেগুলো মোটেই সেরকম ছিল না। বরং লোকে হাসাহাসি করত যদি কেউ উল্লেখ করত। শূন্য অথচ শূন্য নয়, ‘ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র’ তবে একেবারে শূন্য নয়, এসব তো স্রেফ হেঁয়ালি বলে অভিযোগ করত অনেকে। আইজ্যাক নিউটন নিজেও, infinitesiman শব্দটা মনে মনেই ভেবেছিলেন, প্রকাশ্যে উচ্চারন করতে সাহস পান নি, পাছে না কেউ পাগল ভেবে বসে তাঁকে। সেজন্য তাঁকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে হয়েছে একই কথা – নানা রকম উদ্ভট শব্দ প্রয়োগ করে। যেমন ‘ফ্লাক্সিয়ন’।

আইজ্যাক নিউটন মানবেতিহাসের সেরা প্রতিভাদের একজন ছিলেন তাতে কারোই কোন সন্দেহ নেই; এত বড় মাপের মানুষ হাজার বছরে দু-চার জনই জন্মায়। ভিঞ্চি ছিলেন সেই ক্ষণজন্মা পুরুষদের একজন। তারপর গ্যালিলি। তারপরই আমি (মী.র) স্থান দিই এক লোকটিকে। সাধারন মানুষদের কল্পনাতে নিউটন আর আইনস্টাইন যেন দুটি কিংবদন্তীয় যুব্রাজ, সর্বগুণে গুনবান, সর্বরুপে রুপবান, সর্বমেধায় মেধাবী। সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্রতারকাদের মতো। কিন্তু তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের খবর অনেকেরই জানা নেই, এবং এক হিসেবে জানার দরকারও নেই। মহৎ সৃষ্টির স্মৃতিই হোক মহৎ স্রষ্টার জীবন কাহিনী, এটা আমি সব সময়ই বলে থাকি। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে না-ই বা করলাম অহেতুক ঘাঁটাঘাঁটি। তবু কথা থাকে, বিশাল প্রতিভাই জাগায় বিপুল কৌতূহল। লোকটা কে? তিনি কি আমাদের মতই রক্তে মাংশে গড়া মানুষ? আমাদের মতই ভাত-কাপড় আর সংসারধর্ম নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকেন তাঁরা? হয়তো ঠিক তা নয়। তবে তাঁদের জীবনও অনেক সময় চিত্রতারকাদের মতোই বিচিত্র মনে হয়। তাঁরা আমাদের মত রক্ত মাংশ আর সুখ দুঃখ, রোগশোকে গড়া মানুষ হয়েও আমাদের চেয়ে আলাদা।

নিউটনের কথাই ধরুন। কথিত আছে যে তিনি জন্মের প্রথম মুহূর্ত থেকেই পৃথিবীর আর সব নবজাতকদের থেকে আলাদা ছিলেন। ১৬৪২ সালের ২৫ ডিসেম্বর তাঁর জন্মদিন। অপূর্ণকালিক জন্ম। এতো ছোট আকারের শিশু গোটা ব্রিটেনে সম্ভবত জন্মায় নি তাঁর আগে দু-চার পাউন্ডের বেশি ওজন ছিল না তাঁর। গ্রামের লোকেরা বলত, নিউটনকে একটা মদের গ্লাসের ভেতর পুরে রাখা যাবে অনায়াসে। তাঁর কৃষিজীবী বাবা-মা কারোরই আশা ছিল না ছেলে বাঁচবে। কিন্তু ছেলে যে বেঁচে ছিল সেটা পৃথিবী সুদ্ধ লোক জানে আজকে। দুর্ভাগ্যবশত নিউটনের বাবা ছেলের কীর্তিকাহিনী কিছুই দেখে যেতে পারেন নি; মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে তিনি ইহলোক ত্যাগ করে চলে গেলেন যুবতী স্ত্রীর উপর বৈধব্যের ভার গছিয়ে, নিউটনের জন্মেরও দু মাস আগে। দু-তিন বছর পর অবশ্য বিধবা আবার বিয়ে করেন স্থানীয় চার্চের পাদ্রীকে, যেটা বোধহয় শিশু নিউটন খুব একটা পছন্দ করেন নি। ছেলে চলে যায় নানার বাড়িতে। মনে মনে এমনই রাগ ছেলের যে কয়েক বছর পর যখন মা তাঁর ছেলেকে ডেকে পাঠান, তখন মায়ের ডাকে সারা দেওয়া দূরে থাক, তিনি নাকি এমন হুমকী দিয়েছিলেন যে গ্রামে গেলে মায়ের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিবেন। পরে অবশ্য মা-ছেলেতে মিটমাট হয়ে গিয়েছিল সব। এমনকি পরিণত বয়সে নিউটন দারুন মাতৃভক্ত হয়ে পরেছিলেন, নিউটনের জীবনীকারদের অনেকেই সেটা উল্লেখ করেছেন।

নিউটনের মা কোনদিন ভাবেন নি ছেলেকে স্কুলে পাঠাবেন; কৃষকের ছেলে কৃষিকর্ম করবে, খেতখামার, গরু-ছাগল দেখবে, বাপ-দাদা চৌদ্দপুরুষ যা করে এসেছে, এই ছিল তাঁর মনোবাসনা। কিন্তু ছেলের যে চাষবাষের দিকে বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই, অবসর সময়টা বরং গ্রামের লাইব্রেরিতে কাটাতেই বেশি আগ্রহ, সেটা তিনি জেনেও না জানার ভাব করে থাকতেন। বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে – যেমন করে ভাবেন সব দেশেরই বাবা-মায়েরা। সৌভাগ্যবশত নিউটনের এক কাকা ছিলেন চার্চের পাদ্রি। তিনি ভ্রাতুষ্পুত্রের মেধার গন্ধ পেয়েছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন যে এই ছেলে হালচাষ করে সুখী হবার নয়। তিনিই মাকে বুঝালেন যে নিউটনকে স্কুলে যেতে না দেওয়া অন্যায় হবে। মা মেনে নিলেন তাঁর যুক্তি – কত ভাগ্য আমাদের! তর পরই তাঁর লেখাপড়ার জীবন শুরু। কিন্তু স্কুলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে কি নিউটনের বিশাল মেধার পরিচয় প্রভাতের রবিকরের মতো উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল? মোটেও না। তাঁর চেয়েও ভালো রেজাল্ট করা ছেলে আরো দু-চারজন ছিল একই ক্লাসে। বন্ধু বান্ধবও ছিল না বেশি। একা একা থাকতেই যেন বেশি পছন্দ করতেন। লাজুক, আড়ালপ্রিয়, লোকভয়, এর সবই ছিল তাঁর চরিত্রে, ছোটবেলায় শুধু নয়, পরিণত বয়সে যখন তিনি ইউরোপব্যপী গৌরবের চর্ম শিখরে আরুঢ়, তখনো। তাঁর স্কুল জীবনের সেই ছাড়া ছাড়া ভাব, সেই আপাত-বৈরাগ্য, অন্য কারো সাথে মেলামেশা না করার প্রবণতা, তাঁকে সহজেই নানা রকম হাঁসিঠাট্রা, ব্যঙ্গ বিদ্রুপের শিকার করে তুলেছিল। একবার স্কুল প্রাঙ্গণে এক ছেলের সঙ্গে বেশ বড় রকমের ঝগড়া বেঁধে যায় তাঁর; ছেলেটি ছিল সেবছরের সেরা ছাত্র। সবার সামনে ভীষনভাবে অপমান করে তাঁকে, মারধরও করে থাকতে পারে। স্কুল বয়সের ছেলেমেয়েদের কতই বা হিতাহিতজ্ঞান। মজার ব্যাপার যে সেই প্রকাশ্য অপমান আর লাঞ্ছনাই বোধ হয় নিউটনের ভেতরকার সুপ্ত বজ্রকে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। স্কুলের বাঁদর ছেলেমেয়েদের উৎপীড়নে অস্থীর হয়ে বাচ্চারা যেমন রাগে দুঃখে পণ করে মনে মনে যে একদিন তাকে দেখিয়ে দেবে সত্যিকার জোর কার গায়ে, তেমনি কোন পণ করেছিলেন কি না নিউটন নিজের সঙ্গে জানি না, কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকে সেই যে পড়াশোনার জগতে ঢুকলেন তিনি, বলতে গেলে, সেখানেই আত্মবন্দি হয়ে থাকলেন সারা জীবন। সেই বছরেই তিনি সেই উৎপীড়ক ছেলেকে হার মানিয়ে অনেক অনেক উপরে চলে গেলেন, যেখানে আরোহন করার সাধ্য ছিল না কারো। পাঠ্য বিষয়ের সব কিছুতেই সমান পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন নিউটন তেমন দাবী করা যাবে না, কিন্তু গণিত আর পদার্থবিজ্ঞান (সে যুগে যাকে natural philosophy বলা হত ব্রিটেনে, সম্ভবত ইউরোপের গ্রিক-প্রভাবিত সাংস্ক্রিতিক্ক ঐতিহ্যেরই কারনে), এই দুটি বিষয়ে নিউটনের দখল সারা মহাদেশে আর কারো ছিল কি না সন্দেহ, সেই স্কুল বয়সেই।

যা-ই হোক স্কুল পাশ করলেন তিনি কৃতিত্বের সাথেই, যদিও গণিত আর বিজ্ঞান ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে তাঁর স্বভাবজাত ঔদাসিন্যের কারনে সর্বমুখী সাফল্যের পরিচয় দেওয়া সম্ভব হয় নি। স্কুল পাশের পর তিনি গেলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদালয়ের বিখ্যাত কলেজ ট্রিনিটিতে ভর্তি হতে, ১৬৬০ সালে, যখন তাঁর বয়স আঠারো। ভর্তি তিনি অনায়াসেই হয়ে গেলেন, কিন্তু সেই লাজুক স্বভাব আর লোকচক্ষুর বাইরে থাকার আজন্ম প্রবণতা, বুয়ে মিলে কেমব্রিজেও কারো চোখে পরার মতো দারুন কিছু করে ফেলেন নি। তার ওপর নিউটনের ছিল আর্থিক সমস্যা। মাসিক খরচ চালানোর জন্য সেই ছাত্রাবস্থাতেই টুকিটাকি কার করতেন তিনি কেলেজের কিচেন বা অধ্যাপক পাড়ায়। স্কুলের মত কেমব্রিজেও নিউটন ছিলেন আর দশটা ছাত্রের মতই অলক্ষ্যনীয় ও অবিশিষ্ট। তবে নিজের ঘরের নিরালাতে বসে তিনি জ্ঞান সাধনা করেন নি তা নয়, বলা হয় যে স্নাতক ছাত্র থাক কালেই বেশ কিছু মৌলিক চিন্তা তার মাথায় আসে যা তিনি কারো কাছে প্রকাশ করেন নি বা কারো সঙ্গে আলাক আলোচনা করেননি সেসব বিষয়ে। এই আরেকটা অদ্ভুত স্বভাব ছিল লোক্টার-ভীষন গোপন-প্রিয়তা। সব সময় যেন একটা আতঙ্কে থাকতেন পাছে না কেউ তাঁর আইডিয়া চুরি করে নেয়। একটা অসুস্থ সন্দেহপরায়ণতা, এমন অনূকুল উক্তিও করেছেন বেশ কিছু জীবনীকার।

১৬৬৫ সালে বিএ পাশ করলেন বেশ কৃতিত্বের সঙ্গেই, যদিও তাঁর মত অসামান্য মেধাবী ছাত্রের কাছ থেকে যতটা সাফল্য আশা করা যেত সেটুকু সাফল্য হয়তো অর্জন করা হয়নি। সম্ভবত একই কারনে, গণিত আর বিজ্ঞান বহির্ভূত বিষয়ের প্রতি নিদারুন অনাগ্রহ। কিন্তু গণিতে তিনি ছিলেন উজ্জলতম তারকা। অসম্ভব ভালো রেজাল্ট করেছিলেন গণিতে, কিন্তু সেখানেও সারা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে যে নাম করে ফেলা, সবার চোখে তাক লাগিয়ে দেওয়া, সেটা হয়ে ওঠেনি, প্রধানত সেই লোক চক্ষুর দূরে থাকা স্বভাবেরই জন্য। গোটা গণিত বিভাগের কেবল একটি গুনী লোকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি –  কেমব্রিজের সে সময়কার লুকাসিয়ান প্রফেসর আইজ্যাক ব্যারো। তিনিই ছিলেন একমাত্র শিক্ষক নিউটনের যিনি তাঁর ছাত্রটির ভেতরের আগুন দেখতে পেরেছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন এ ছেলে বড় কিছু করবে ভবিষ্যতে। যেটা তিনি জানতেন না তা হল সেই ভবিষ্যত তখনোই সমুপস্থিত দুয়ারে। পৃথিবী এখনই কেঁপে উঠবার উপক্রম। অনাগত ভবিষ্যত স্বাগতের অপেক্ষায় আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে।

১৬৬৫ সালের গ্রীষ্মকালে সারা দেশব্যাপী এক মারাত্মক ব্যাধিত প্রাদুর্ভাব হয়। এমন সর্বনাশা সেই মহামারি যে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ই বন্ধ হয়ে যায় অনির্দিষ্ট কালের জন্য। সে বন্ধ বন্ধই থাকলো পুরো দু বছর। নিউটন কলেজ ছুটির পর মুহূর্তই চলে গেলেন গ্রামের বাড়িতে। শুধু গেলেনই না, বলতে গেলে, দরজা বন্ধ করে ধ্যানমগ্ন সাধুসন্ন্যাস্যার মতো জ্ঞান সাধনার একনিষ্ঠ ব্রততে আত্মনিমগ্ন হয়ে থাকলেন। খাওয়া পরা ঘুম আরাম সব বাদ দিয়ে এক আবিষ্ট আত্মার মত বই খাতা আর অঙ্কের মধ্যে ডুবে রইলেন। বিপুল এই পৃথিবীর কোথায় কি হচ্ছে, কোথায় কি ওলটপালট হচ্ছে, কে কোন রহস্যপুরীর সন্ধান নিয়ে এল জড়জগতের মরমানবের জন্য, তাঁর কোনকিছুতেই তাঁর ছিল না বিন্দুমাত্র আগ্রহ। প্রথম যৌবনের আবেগ আর উচ্ছাস নিউটনের জীবন থেকে ছিল সম্পূর্ণ নির্বাসিত। ওসবের কোন অনুভূতিই যেন ছিল না তাঁর। ইউরোপের প্রখ্যাত গাণিতিক ও আইনজ্ঞ মারকুই লোপিতাল নিউটনকে দেখতেন এক রকম জ্যোতিষ্কের মত, যেন এ জগতের কেউ ছিলেন না তিনি। লোপিতালের বিখ্যাত উক্তি ‘আমার মানসপটে আমি তাঁকে দেখি দূরনীহারিকাবাসী এক নভোচারী প্রতিভা হিসেবে’। পরবর্তীকালের বিশ্ব বিখ্যাত ব্রিটিশ কবি ওয়ার্ডসওয়ারথ ট্রিনিটি কলেজ প্রাঙ্গণে নিউটনের প্রস্তর মূর্তি দেখে অনুপ্রানিত হয়ে লিখেছিলেনঃ

‘….Newton, with his prism and silent face

The marble index of a mind

Voyaging through the strange seas of thought alone’.

আসলেও তাই। নিউটনের জীবনী পড়লে অবাক বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না সাধারন মানুষের।

এবার বলি গ্রামের বাড়িতে সেই দুটি অপ্রত্যাশিত ছুটির বছর তিনি কিভাবে কাটিয়েছিলেন। ১৬৬৫-এর আগস্ট থেকে ১৬৬৭-এর আগস্ট – এই দুটি বছরই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গৌরবময়, সবচেয়ে দিব্যজ্যোতিপূর্ণ, সৃজনোল্লাসমুখর সময়কাল। বলা হয় যে ঐ দুটি বছরের মধ্যে যুবক নিউটন যা আবিষ্কার করেছিলেন তার সমতুল্য কাজ তাঁর ৮৪ বছরের দীর্ঘ আয়ুষ্কালে আর কখনো করা হয় নি, এবং সে কাজের সঙ্গে তুলনা হতে পারে এমন বিরল প্রতিভাধর মানুষ তাঁর আগে বা পরে জন্মগ্রহণ করেন নি, অন্তত বিজ্ঞান-গণিতের ক্ষেত্রে। বর্ণনাটি নিউটনের নিজের ভাষাতেই দেওয়া ভালোঃ

মূল উক্তি- ‘I picture him to myself as a celestial genious’.

মূল উক্তিঃ ‘In the beginning orf the year 1665, I found the method of approximating series and the rule for reducing any [power] of any binominal to such a series [i.e.,binominal theorem]. The same year in May [probably while still at Cambridge] I found the method of tangents of Gregory and Slusius, and in November had the direct method of fluxions [differential calculus] and the next year in January had the theory of colours and the May following I had the entrance into the inverse method of fluxious [integral calculus] and in the same year I began to think of gravity extending to the ord of the moon…. and having thereby campared the force requisite to keep the moon in her orb with the force of gravity at the surface of the earth, I found the to answer pretty nearly. All this was in the two years 1665 to 1666 for in those years I was in the prime of my age for invention and minded mathematics and philosophy more than anything since.’

(Portsmouth Collection, Sec.I,div.X, number 41, quoted from the article ‘Newton on Particles and Knietics’ in The world of the Atom, ed.Henry A. Boorse and Lloyed Motz, Basic Books, Inc., pubishers, New York and London, 1996).

১৬৬৫- এর গোড়াতে আমি দুটি জিনিস আবিষ্কার করলাম। একঃ সংখ্যার রাশিমালার যোগফল বের করার পদ্ধতি; দুইঃ দ্বিসংখ্যাবিশিষ্ট ঘাতকে (poer) কিভাবে যোগরাশিতে প্রকাশ করতে হয় (binominal theorem বা দ্বিঘাতী সূত্র)। একই বছর মে-তে (সম্ভবত কেমব্রিজে থাকাকালেই) আমি পেলাম গ্রেগরি আর স্লুসিয়াসের স্পর্শক পদ্ধতি। নভেম্বরে পেলাম ফ্ল্যাক্সিয়নের সরাসরি তত্ত্ব (অন্তরকলন ক্যালকুলাস)। পরবর্তী জানুয়ারীতে আবিষ্কার করলাম বর্ণতত্ত্ব। সেই মে-তেই পেয়ে গেলাম অন্তরকলনের বিপরীতটি, সমাকলন। একই বছর চিন্তাভাবনা করতে লাগলাম মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বিষয়টি নিয়ে, যে শক্তি চাঁদের অক্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত। নিজ অক্ষপথে চন্দ্রগ্রহণের নিয়মানুগ প্রদক্ষিনের জন্য বিশ্বপৃষ্ঠ হতে যে পরিমাণ আকর্ষণশক্তির প্রয়োজন তার মাপজোক করে একটা সন্তোষজনক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল। এ সবই আমি করতে পেরেছিলাম ১৬৬৫ থেকে ১৬৬৬, এই দুটি বছরের মধ্যে। ওটিই ছিল আমার উদ্ভাবনী জীবনের স্বর্ণযুগ। ঐ সময়টাতে আমি যতটা মনোযোগ দিতে পেরেছি গণিত আর দর্শনের উপর ততটা কখনোই দেওয়া হয় নি।

মাত্র দুটি বছর! যৌবনে যা আমরা অলস দিবাস্বপ্নতেই কাটিয়ে দিই, যার কোন মূল্যই দেওয়া হয় না সময় থাকতে, সেই দুটি অমর বছরই তিনি উপহার দিয়ে চিরধন্য করে গেছেন বিশ্ববাসী গোটা মানবজাতিকে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্রনির্বিশেষে। সেকথা নিউটন নিজেও হয়তো জানতেন না তখন। মানুষ কি কখনো জানতে পারে তার সৃষ্টির পূর্ণ তাৎপর্য বা মূল্য কতটুকু। কিন্তু আমরা জানি নিউটন আর সকল স্রষ্টার চেয়েও বড় স্রষ্টা ছিলেন।

অনেকে মনে করে, বিশেষ করে জ্ঞান সৃষ্টির যথার্থ প্রকৃতির সঙ্গে যারা পরিচিত নয়, যে আলবার্ট আইনস্টাইন নিউটনের বলবিদ্যাকে ‘ভুল’ প্রমানিত করে গেছেন। যারা একথা বলেন, তাঁরা হয়তো বুঝবেন না যে নিউটনের বিজ্ঞান জানা না থাকলে আইনস্টাইনও হয়তো আইনস্টাইন হতে পারতেন না। জ্ঞান বিজ্ঞানের কোন শাখারই কোন নতুন আবিষ্কার হঠাত আকাশ থেকে ঝরে পরে না। সব কিছুরই একটা পরিক্রমা আছে, একটা যৌক্তিক ধারাবাহিকতা আছে। নিউটনের বিস্ময়কর সৃষ্টিশীলতার ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে অনেক ভাষ্যকারই ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। অনেকে বলেছেন, নিউটন এমনই নাছোরবান্দা হয়ে লেগে থাকতেন একটা জিনিস নিয়ে, এবং দিনের পর দিন, রাতের পর রাত না খেয়ে, না নেয়ে তা নিয়ে মনের ভেতর বারবার ঘুরপাক খাওয়াতেন যে শেষ পর্যন্ত প্রকৃতিদেবী স্বয়ং তার কাছে নতি স্বীকার করে তার সমস্ত রহস্য উদোম করে দিতেন তাঁর কাছে। তিনি ছিলেন প্রকৃতির প্রিয়তম বরপুত্র, এধরনের মন্তব্যও করেছেন কেউ কেউ।

পাঠক হয়তো খেয়াল করে থাকবেন যে নিউটন তাঁর ‘দুটি বছরের’ বয়ান শোনাতে আরেকটি মস্ত বড় আবিষ্কারের কথা উল্লেখ করতে বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন, বা তিনি ওটাকে একেবারেই উল্লেখযোগ্য মনে করেননি। সেটা হল পদার্থের গতি সম্পর্কীয় গতির চালিকা শক্তির উৎস কোথায়। কি সমীকরণ দ্বারা আবদ্ধ গতি আর শক্তি যাকে আমরা বই-পুস্তকে গতিসূত্র (laws of motion) বলে জানি, সেগুলোও সেই দুটিমাত্র বছরের মধ্যে করা। সে যে কি সূদুরপ্রসারী কাজ তাঁর মর্ম শুধু পদার্থবিদেরাই জানে না, প্রতিটি প্রকৌশলী, প্রতিটি বিজ্ঞান সাধককে জানতে হয়, বিশ্বব্যাপী সকল ছাত্রছাত্রীকে জানতে হয়, মুখস্ত করতে হয়। মোটামুটি তিনটি সূত্র তাতেঃ

(১) জাড্যনীতি (law of inertia), যেটা আসলে গ্যালিলির সূত্র বলেই ধরা হয় (আগের একটি অধ্যায়ে আমরা উল্লেখও করেছি সেটা), একটা জিনিস যদি অলস ভাবে কোথাও ঠায় বসে থাকে তাহলে তাঁকে ‘ঠেলে’ নাড়ানো ছাড়া অন্য কোনভাবে নাড়াতে পারবে না কেউ। অর্থাৎ তাকে ‘জোর’ করে সরাতে হবে। ঠায় বসে না থেকে যদি কেউ ধীরবেগে চলতে থাকে সরলরেখাতে তাহলে তার ‘ধীরতা’ বদলাবার জন্যও একটু ঠেলার প্রয়োজন। নিউটন এটিকে তাঁর সূত্রাবলীর প্রথম সূত্রের সম্মান দিলেন।

(২) ভর X ত্বরণ = বল (mass x acceleration = force)।

(৩) ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া একবারে সমান সমান ও বিপরীতমুখী (action and reaction are equal and opposite)।

এই তিনটি সূত্রতে মিলে বিশ্বভুবনে যা কিছু চলে বা একেবারেই চলে না, কিংবা চললেও ভীষন ঢিমেতালে, যে শক্তি নিজেকে কোন কিছুর উপর আরোপ করে তাকে চালাতে চেষ্টা করে, তার সব কিছুর উপরই নিরবচ্ছিন্ন রাজত্ব করে গেছে নিউটনের ত্রিসূত্রমালার এই আশ্চর্য আলোকবর্তিকাটি। অথচ এই অসামান্য রকম ‘সামান্য’ জিনিসটির কথা তাঁর মনেই ছিল না আত্মজীবনী লেখার সময়! এমনই বিস্ময়কর ছিল নিউটনের মেধা জগত।

তিনটি সূত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় বোধহয় দ্বিতীয়টি, যাকে সাধারন ভাষায় গতির দ্বিতীয় সূত্র বলে আখ্যায়িত করা হয় (second law of motion)। তবে এ সূত্রটি ততটা শক্তি হয়তো পেত না যদি না তিনি এটিকে তাঁর নিজেরই সদ্য আবিষ্কৃত অন্তরকলনের ভাষায় প্রকাশ করতে পারতেন। এই ভাষাতে সূত্রটি দাঁড়ায়ঃ

F = mdv/dt                  (১৬)

এখানে F হল বল বা force, m হল ভর, আর v গতি বা velocity. নিউটনের সমসাময়িক যুগে কোন বস্তুর ভর গতির সঙ্গে বদলায় না, এটাই ছিল সর্বস্বীকৃত বিশ্বাস। সে কারনে উপরোক্ত সূত্রটিকে আরো একভাবে লেখা যেতে পারতঃ

F = dp/dt,                    (১৭)

যেখানে p অক্ষরটি বোঝায় ভরবেগ বা momentum. আধুনিক বিজ্ঞানের দিক থেকে চিন্তা করলে কিন্তু (১৬)-এর চাইতে (১৭)-টিই বেশি শক্তিশালী, কারন এটি অপরিবর্তিত থাকবে ভর গতির উপর নির্ভরশীল হলেও, কিন্তু (১৬) থাকবে না। (আইনস্টাইনের গতিবিজ্ঞানের প্রথম পদক্ষেপটিই তো ছিল স্থান আর সময় উভয়কে গতি নির্ভর করে ফেলা, যার ফলে ভর বেচারিকেও গতির মেজাজ অনুযায়ী ব্যবহার করা শিখতে হয়।)

পাঠককে যে জিনিসটা এখনো বলা হয়নি সেটা হল ‘গতি’ শব্দটির গাণিতিক সংজ্ঞা কি। ক্যালকুলাস বের হওয়ার আগে আসলে কোন সঠিক সংজ্ঞা ছিলও না। গতির সঙ্গে নিউটনের ফ্ল্যাক্সিয়ন আইডিয়াটির একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, সেটা অনুমান করা শক্ত নয়। এবং নিউটন ঠিক তাই-ই করলেন। যে মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারলেন যে তাইতো, গতি তো ফ্ল্যাক্সিয়ন ছাড়া কিছু নয়, তৎক্ষণাৎ যেন তিনি দিব্যবানী-প্রাপ্ত হয়ে লিখে ফেললেনঃ

V = dx/dt                    (১৮)

এখানে X হল একটা বস্তুর অবস্থান, বা দূরত্ব কোন কেন্দ্রবিন্দু থেকে, যেমন ডেকারটের ভূমিস্থ অক্ষরেখা।

0——————————x—————————–→ x – axis

সে হিসেবে নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রটি দাঁড়ায়ঃ

F = d2x/dt2,

বা F = (d/dt)(dx/dt),                (১৯)

অর্থাৎ ত্বরণ হল অবস্থানের দ্বিতীয় অন্তরকলন (second derivative with respect to time). আজকে এগুলো ডালভাত আমাদের কাছে। সেযুগে ছিল রীতিমত বিপ্লব।

আমাদের আজকের আলোচনার মূল বিষয় থেকে খানিক ভিন্ন দিকে চলে যাওয়া হচ্ছে হয়তো, তবে আশা করি, নেহাত অপ্রাসঙ্গিকও মনে হবে না পাঠকের কাছে।

 

ক্যালকুলাসের জন্ম

ফ্ল্যাক্সিয়ন (fluxion) শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘প্রবহণ’ বা ‘পরিবর্তন’-যা ক্রমাগত বইছে, পরিবর্তিত হচ্ছে। আইডিয়াটি কি প্রসঙ্গে উদয় হয়েছিল ২৪ বছর বয়স্ক যুবকের মস্তিষ্কে জানি না, কিন্তু এর প্রয়োগ যে গণিত আর বিজ্ঞানকে আগাগোড়া বদলে দিয়েছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। দুঃখের বিষয় যে একে গণিতে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে যে গাণিতিক সঙ্কেত বা প্রতীক তিনি ব্যবহার করেছিলেন, সেটা এমনই বিদঘুটে আর ব্যবহার অযোগ্য ছিল যে একমাত্র তিনি আর তাঁর কিছু ভক্ত ব্রিটিশ গণিতবিদ ছাড়া আর কেউ ব্যবহার করেছিলেন কি না সন্দেহ, এখানে বিজ্ঞানের গাণিতিক ভাষার একটা মৌলিক সত্য উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। সেটা হল এই ‘প্রতীকের’ ব্যাপারটি। তত্ত্বের সাথে সেই তত্ত্ব প্রকাশের ভাষাকেও কিন্তু বিজ্ঞানমাফিক হতে হয়, যাতে প্রথমত তার একটা যৌক্তিক সঙ্গতি থাকে, দ্বিতীয়ত থাকে সহজ ব্যবহারযোগ্যতা, তৃতীয়ত থাকে পরবর্তীকালের গবেষকদের জন্য ভাবসম্প্রসারণ বা অধিকতর সর্বজনীনতার পথে অগ্রসর হবার সহজ পন্থা। উদাহরণস্বরূপ ওপরের (১৬) আর (১৭)-এর পার্থক্যটা লক্ষ করুন। একই সমীকরণ, আইনস্টাইনের আগ পর্যন্ত। আইনস্টাইন এবং তাঁরও আগেকার দু-চারজন গবেষকদের জন্য (১৬)- এর চেয়ে (১৭)-ই ছিল বেশি মূল্যবান। তবে ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটেনে বসে কাউকে ক্যালকুলাস শিখতে হলে নিউটনের সেই কিম্ভূতকিমাকার প্রতীকই ব্যবহার করতে হতো। সৌভাগ্যবশত নিউটনের অল্প কয়েক বছর পর প্রায় একই আইডিয়া জন্ম নিয়েছিল ইউরোপের আরেক মনীষীর মাথায়, যার নাম গটফ্রিড লিবনিজ (১৬৭৬-১৭১৬)। জার্মানির এই আশ্চর্য প্রতিভাধর ব্যক্তিটি গণিতে যতটা পারদর্শী ছিলেন তার চেয়েও বেশি ছিলেন দর্শনশাস্ত্রে। এমনকি পদার্থবিজ্ঞানেও যথেষ্ট অবদান রেখে গেছেন তিনি। ক্যালকুলাসের মূল আবিষ্কারক যে নিউটন তাতে কারো কোন সন্দেহ নেই (সনতারিখ মেলালেই তো বের হয়ে যায় সেটা), প্রশ্ন হল লিবনিজ কি নিউটনের আবিষ্কারের কথা শোনার আগে নিজে থেকেই ভেবেছিলেন কিনা। যাই হোক, এ বিষয়েও কোন সন্দেহ নেই যে লিবনিজ যে প্রতীক সঙ্কেত ব্যবহার করেছিলেন সেটা ছিল সত্যিকার ব্যবহারযোগ্য সঙ্কেত, এবং এই অধ্যায়ে এযাবৎ যে সমস্ত প্রতীক ব্যবহৃত হয়েছে, তার সব কটিই তাঁরই প্রবর্তিত প্রতীক। লিবনিজের চিন্তায় dx,dy,dt- এগুলো হল সেই ‘ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র’ সংখ্যা, যাকে গাণিতিক ভাষায় বলা হয় infinitesimal, যা স্বয়ং নিউটন সাহেবও খুব একটা সুদৃষ্টিতে দেখতেন না এবং যা নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী তর্ক যুদ্ধ চলেছে তাত্ত্বিকদের মাঝে। কিন্তু লিবনিজ নির্দ্বিধায় তা গ্রহণ করে নিয়েছিলেন এবং তার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে গণিতের সম্পূর্ণ নতুন একটি শাখা তৈরি করে বিজ্ঞান আর গণিতকে তুমুল বেগে চলমান হয়ে উঠতে সাহায্য করেন। তাইতো বলি, আইডিয়াই পৃথিবী বদলায়। মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার আইডিয়া থাকে, যদি তা থাকবার মত হয় আদৌ।

এবার দুটি-একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাক নিউটন কিভাবে তাঁর ‘ফ্ল্যাক্সিয়ন’ দ্বারা অনেক অজানা বা কঠিন জিনিসের সহজ সমাধান দিতে পেরেছিলেন। প্রথমেই ধরে নেওয়া যাক যা পাঠক আগেই দেখেছেনঃ সেই সমদ্বিবাহু সমকোণী ত্রিভূজটি – ক থেকে খ, ভূমিতে, খ থেকে গ লম্বালম্বি – একই দৈর্ঘ্য দুটি রেখারই। কগ এই অতিভূজটির ঢাল আমরা জ্যামিতির কাছ থেকেই পেয়েছি,১। এবার দেখা যাক আমাদের নতুন শেখা ক্যালকুলাস কি দেয় এবং কত সহজে। ডেকারটের বীজগানিতিক জ্যামিতি আমাদের দিচ্ছেঃ

Y = x,               (২০)

কগ-এর সমীকরণ – ক্যালকুলাস ব্যবহার করতে হলে এটি অপরিহার্য। এবার x বিন্দু থেকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি দূরত্ব নিন, যেমন Δx, এবং সেখানে y-এর যে পরিবর্তন সেতাকে বলুন Δy. তাহলে (২০) আমাদের দিচ্ছে কগ রেখাটিতে দুটির সম্পর্কঃ Δy = Δx. যার ফলে এ বিন্দুটিতে রেখাটির ঢাল হল ১। যেহেতু ১ সংখ্যাটি কখনো বদলাবার নয়, এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে যেতে সেহেতু রেখার ঢালেও কোন পরিবর্তন হবে না। সুতরাং সমস্ত রেখাটির একই ঢালঃ ১, যা আগেরটির সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে।

ছোট বাচ্চাকেও শেখানো যায়, তাই না? ছোট বাচ্চা হয়তো যেটা শিখতে পারবে না চট করে সেটা হল একই উদাহরণ প্রয়োগ করে ত্রিভূজটির ক্ষেত্রফল, যা ৩২ বর্গ একক বলে আগেই আমরা জেনেছি, তা বের করা ক্যালকুলাসের সাহায্যে। প্রথমত ভূমিটিকে সমান n ভাগে ভাগ করুন, n- কে যথেষ্ট বড় ধরনের সংখ্যা হতে হবে, যে কোন বড় সংখ্যা হলেই চলবে আপাতত। তাহলে প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশের দৈর্ঘ্য দাঁড়াল 8/n. এবার r-সংখ্যক অংশের দূরত্বে, অর্থাৎ মূল ক থেকে যার দূরত্ব হচ্ছে 8r/n, সেখানে লম্বের দৈর্ঘ্যও একই-8r/n. সুতরাং সেখানে দাঁড় করানো ছোট একটি চতুর্ভুজের ক্ষেত্রফল হচ্ছে দৈর্ঘ্যXলম্ব, যার অর্থ, (8r/n) X (8/n) = 64r/n2. এখন আমরা r-কে ক থেকে খ বিন্দুতে নিয়ে যাব অর্থাৎ 0 থেকে n পর্যন্ত। সুতরাং ত্রিভূজটির আনুমানিক ক্ষেত্রফল দাঁড়াচ্ছেঃ

Area = 64(1+2+3+……+n)/n2             (২১)

ওপরের 1 থেকে n অবধি সন্নান্তর রাশিটির যোগফল স্কুলের দশ-বারো বছরের ছেলেমেয়েদেরও শেখা। সেটি ধার করে লেখা যায়ঃ

Area = 32(n(n+1))/n2.                                    (২২)

এযাবৎ একবারও কিন্তু লিমিট বা infinitesimal-জাতীয় শব্দ ব্যবহার করা হয় নি। (২২) পর্যায়ে সেটি করা হবে। 32/n-কে যত ছোট করা সম্ভব করে যান, (যার মানে, n যাবে অসীম লিমিটে) যতক্ষন না তাঁর অস্তিত্বই লোপ পেয়ে যায়। একেই তো বলি লিমিট, infinitesimal, তাই না? এই লিমিটে তাহলে 32/n সংখ্যাটির কি দশা দাঁড়াচ্ছে? প্রথম সংখ্যাটির তুলনায় একেবারেই তুচ্ছ। অর্থাৎ এর লিমিট হচ্ছে 0। এভাবেই ক্যালকুলাসে সমাকলন শাখা আমাদের আয়ত্তের মধ্যে এনে দেয় সমতল ভূমির ক্ষেত্রফল বের করার সহজ পদ্ধতি। ত্রিভূজটির ক্ষেত্রে এপথে যাওয়ার দরকার ছিল না, কিন্তু সরল রেখার চেয়ে হাজার জটিল রেখার ক্ষেত্রে ক্যালকুলাস ছাড়া অন্য কোন পথ এখনো পর্যন্ত কারো জানা নেই।

কোনো কোনো পাঠকের বিচারে ওপরের উদারহনগুলো নেহাত ছেলেখেলা মনে হতে পারে। তাই আগের সেই অধিবৃত্তের উদাহরণটি নিয়ে ক্যালকুলাসের কি দারুন শক্তি তার একটা আবছা আভাস দেবার চেষ্টা করব। ধরা যাক অধিবৃত্তটির সমীকরণ হলঃ

Y = x2 ,                         (২৩)

সুতরাং y + Δy = (x+Δx)2                    (২৪)

এখন (২৪) থেকে (২৩) বিয়োগ করুন।

থাকছেঃ Δy = 2xΔx+(Δx)2

যাকে Δx দিয়ে ভাগ করে পাইঃ

Δy/Δx = 2x+Δx                                  (২৫)

এ পর্যায়ে লিমিটের সাহায্য ছাড়া উপায় নেই। Δx আর Δy উভয়কে শূন্যের দিকে পাঠালে ডান দিকে কি থাকে? শুধু 2x, কারন Δx তো শূন্যেই চলে যাচ্ছে। তার অর্থ, এই (x,y) বিন্দুটিতে রেখাটির ঢাল হল 2x. গণিতের প্রচলিত সাংকেতিক ভাষাকে এটিকে এভাবে ব্যক্ত করা হয়ঃ

Dy/dx = LimΔx →0 Δy/Δx = 2x                                    (২৬)

ধারনা করা যায়, এভাবেই নিউটন তাঁর জীবনীতে বর্ণিত স্পর্শক-পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন।

এবার এই রেখাটিরই নিচের এলাকাটির ক্ষেত্রফল বের করার চেষ্টা করব লিমিটের সাহায্যে। আগেকার সেই ত্রিভুজের মত এটিরও ভূমি ধরা যাক ক থেকে ৮ একক দূরত্বে খ পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে আগের মত খ থেকে গ অবধি যে লম্ব রেখাটি তাঁর দৈর্ঘ্য বদলে গিয়ে দাঁড়াবে ৮-এর বর্গে, অর্থাৎ ৬৪।

কথা হলঃ এই যে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ও বাঁকা রেখা-পরিবেষ্টিত এলাকাটি, তার ক্ষেত্রফল কি? আগের সেই ত্রিভূজটির মত করেই ভূমিকে ভাগ করব n-সংখ্যক ক্ষুদ্র অংশে যাতে মূল থেকে x একক ডানে এর দূরত্ব দাঁড়াচ্ছে 8r/n, এবং সেখানে তার উচ্চতা হল (8r/n)2 = 64(r/n)2. সুতরাং মোটমাট গোটা এলাকাটির একটা আনুমানিক পরিমাপ লেখা যায় এভাবেঃ

Area =∑(64(r/n)2)(8/n)

= (512/n3) {1+22+32+……..+n2}                       (২৭)

{ } বদ্ধ রাশিগুলোর যোগফলের জন্য স্কুলপাঠ্য বীজগণিত বইয়ের সাহায্য নিতে হবে। এটা হলঃ

(n(n+1)(2n+1))/6

বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? n= 1,2,3,…… এরকম ছোট ছোট নিয়ে গুনে দেখুন মেলে কি না। ওই যে বললাম, গণিতের লোকেরা ভীষন কুঁড়ে, তাঁদের ফর্মুলা না হলে চলে না। তবে ফায়দাটা লক্ষ করুন। এবার যে সংখ্যাটি পাচ্ছি আমরা এই ক্ষেত্রফলের জন্য সেটা হলঃ

Area = 512n(n+1)(2N+1)/6n3                                    (২৮)

এইখানে এসে আমরা সেই একই কাজ করব, লিমিট নেব n-কে অসীম যাত্রায় পাঠিয়ে, মানে 1/n- কে শূন্যের দিকে নিয়ে।

শেষমেশ পাচ্ছি ৫১২/৩। এলাকাটির বর্গফল। ক্যালকুলাসের সমাকলন নিয়ম দিয়ে কষতে গেলে এত সময় লাগবে না এবং একই ফল পাওয়া যাবে।

ক্যালকুলাস নতুন বিদ্যা হলেও এরকম খন্ড খন্ড ভাগে বিভক্ত করে সেগুলোকে একসাথে যোগ করে ক্ষেত্রফল বের করার পদ্ধতি অতি পুরাতন সেটা তো আগেই বলেছি। পুরনো জ্ঞানের উপর ভর করেই তো নতুন জ্ঞান জন্ম নেয়। নিউটন সেটা নিজেই স্বীকার করে গিয়েছেন।

 

ক্যালকুলাসের জনক কে?

কলন-শাস্ত্রের জনক কে সে নিয়ে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল সেকালের ইউরোপে। এক পক্ষ বলে নিউটন, আরেক পক্ষ বলে লিবনিজ। অনেকটা বাংলাদেশের ‘জাতির জনক’ সমস্যাটির মত। অবশ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস যারা ভাল করে জানে তাদের মনে এ নিয়ে কোন সমস্যাই নেই, সমস্যা হল যখন একদল আরেক দলকে ঘায়েল করার চেষ্টায় গোটা ইতিহাসকেই বিকৃত করে ফেলে। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীর ক্যালকুলাস বিতর্কে ব্যাপারটি অত সাদামাটা ছিল না। সমস্যার গোড়াতে কিন্তু, অনেকের মতে দায়ী ছিলেন নিউটন নিজেই। তাঁর সেই অতিমাত্রিক গোপনীয়তা, সেই স্বভাবসিদ্ধ সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা, পাছে না কেউ কিছু চুরি করে নেয় তাঁর কাছ থেকে, সেই ভয়ে সব সময় সতর্কতা অবলম্বন করা। সেসব কারনে ক্যালকুলাসের উপর তাঁর যুগান্তকারী ফলাফলগুলো, আবিষ্কারের বহু বছর পর, ১৬৯৩ খ্রিষ্টাব্দে, প্রকাশ করেছিলেন। ওদিকে লিবনিজ তাঁর নিজের আইডিয়াগুলো পেয়েছিলেন ১৬৭৫ সালে। তারপর সেগুলোকে ভালো করে সাজিয়ে গুছিয়ে প্রকাশযোগ্য করে ছাপতে দিয়েছিলেন ১৬৮৪ সালে। খবর পেয়ে নিউটন ভাবলেন, বেটা নিশ্চয়ই তাঁর রেজাল্ট চুরি করে নিজের নামে ছাপিয়ে দিয়েছে। অভিযোগটা যে একেবারে দুনিয়াছাড়া গাঁজাখুরি ব্যাপার ছিল তা-ও বলা চলে না। লিবনিজ পেশাতে ছিলেন আইনজ্ঞ, ফরাসি নাগরিক পিয়ের ফার্মার মতো, এবং ফার্মারই মত দারুন বড়লোকের ছেলে, বিত্তবান ও প্রভাবশালী। তিনি পেশাগত কারনেই ১৬৭৩ থেকে ১৬৭৬ সাল পর্যন্ত পাকা চিন বছর কাটিয়েছিলেন লন্ডনে। তাঁর আগে নিউটনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও হতো চিঠি পত্রের মাধ্যমে। নিউটনের ‘ফ্লাক্সিয়ন’ তত্ত্বের খবর হয়তো তাঁর জানা ছিল, কিন্তু তাঁর কোন প্রভাব পরেছিল কিনা তাঁর উপর সে কথা কারো পক্ষেই হলফ করে বলা সহজ নয়। নিউটন তো ধরেই নিলেন যে লিবনিজ সাহেব লন্ডনে থাকাকালে কোনো-না-কোনো ভাবে বের করে নিয়েছে তাঁর গোপন আবিষ্কার। পয়সাওয়ালা জার্মান দুলালদের কি কোনো বিশ্বাস আছে? সে কি ঝগড়া দুজনের! নিউটন যেমন ছিলেন সন্দেহপ্রবন, লিবনিজ ছিলেন একটু উদ্ধত প্রকৃতির, ছেড়ে দেবার পাত্র মোটেও ছিলেন না তিনি। সেই ঝগড়া শেষ পর্যন্ত সারা ইউরোপের আবহাওয়াকে বিষাক্ত করে তোলে। ব্রিটেন আর ইউরোপ কেউ কারো মুখ দর্শন করবে না এমন অবস্থা।

বেশ কয়েক শতাব্দী লেগেছে দুপক্ষের মাথা ঠান্ডা হতে। ইতোমধ্যে আসল ক্ষতিটা হয়েছে ব্রিটেনেই। ইউরোপ যেখানে আধুনিক গণিতের বিবিধ শাখাতে শাঁই শাঁই করে এগিয়ে চলেছে, ব্রিটেন তখন নিউটনের অন্ধ অনুকরণে গতানুগতিকতার শেকলে আবদ্ধ হয়ে থাকে। সেই নিউটনীয় ধারারই ঢেউ লেগেছিল ভারতবর্ষ সহ সমগ্র ব্রিটিশ সম্রাজ্যে। সম্ভবত সেকারনেই ভারতের গণিত চর্চাতে সত্যিকার কোন গতি সৃষ্টি হয় নি গত কয়েক শতাব্দী। একই ধরনের সেকেলে ধারায় গৎবাঁধা জিনিস নিয়ে মগ্ন থেকেছি, এমনকি দেশ স্বাধীন হবার পরও।

রাজনীতির মত গণিতের ইতিহাসও কম বিচিত্র নয়।

গণিতের কলনশাস্ত্রের জন্মকাহিনীর একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হল। পরের অনুচ্ছেদে যাব সেই অস্বস্তিকর 0/0- এর প্রসঙ্গে, যাকে নিউটন বা লিবনিজ কেউই সরাসরি মোকাবিলা করতে সাহস পান নি। কিন্তু তার আগে একটু পরচর্চা করা যাক, মানে উচ্চ মানের গাণিতিক পরচর্চা।

 

একের কাম অন্যের নাম

১৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সের এক প্রতিপত্তিশালী অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ফ্রাসোয়া-আতোয়া দ্য লোপিতাল। (Guillaume-Francois-Antoine de l’Hopital)। আমাদের উপমহাদেশের বই পুস্তকে কখনো কখনো লেখা হয় L’Hospital, যার ফলে এর উচ্চারনটিও ল’হস্পিটাল হয়ে গেছে অধিকাংশ জায়গায় (আমরাও ছাত্র থাকাকালে এই উচ্চারনই শিখেছি)। ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় থেকেই অঙ্কের প্রতি ভীষন একটা আকর্ষণ জন্মায় লোপিতালের। সম্ভবত পারিবারিক কারনেই প্রাপ্ত বয়সে অংকে না গিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছিল সেনা বিভাগে। অশ্বারোহী বাহিনীর ক্যাপ্টেন পর্যন্ত পদোন্নতি হয়েছিল তাঁর। কিন্তু অচিরেই তাঁর মন ছুটে যায় সেই পুরনো প্রেম, অঙ্কের দিকে। সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে তিনি মজে গেলেন অঙ্ক নিয়ে। কিন্তু দীর্ঘকাল চর্চা না থাকাতে সবকিছু নতুন করে শিখবার উদ্যোগ নিতে হল। সারা মুল্লুকের সবচেয়ে নামকরা শিক্ষক খুঁজে পেলেন একজন, নাম ইউহান বার্নলি (১৬৬৭-১৭৪৮)। আদিবাস বেলজিয়াম থেকে সুইজারল্যান্ডে চলে আসা বার্নলি পরিবার পরিবার ধন সম্পদে খুব একটা সচ্ছল ছিলেন না, কিন্তু ধনী ছিলেন মেধা সম্পদে। তিনি এবং বড় ভাই জ্যাকব বার্নলি (১৬৫৪-১৭০৫), দুজনই ছিলেন সেযুগের শীর্ষস্থানীয় ইউরোপিয়ান গণিতজ্ঞ। ইউহান বার্নলির ছেলে ড্যানিয়েল বার্নলি (১৭০০-১৭৮২) ছিলেন আরেক মহিরুহ – ‘কিনেটিক থিওরী অফ গ্যাসেস’ নামক পদার্থ বিদ্যার নতুন একটি শাখাই সৃষ্টি করে ফেলেছিলেন তিনি। ড্যানিয়েলের বাপ-চাচা দুজনেরই নাম গণিতশাস্ত্রের সর্বত্র। সংখ্যাতত্ত্ব (Number Theory) থেকে পরিসাংখ্যিক গণিত (Probability Theory) সব কিছুতেই দুজনের কারো না কারো হাত ছিল। ইউহানের বিশেষ রকম ব্যুতপত্তি ছিল লিবনিজের নতুন গণিত ক্যালকুলাসে। কিন্তু স্বাধীনভাবে গবেষনাকর্মে মগ্ন থেকে জীবন যাপন করার মত আর্থিক সবচ্ছলতা ছিল না তাঁর। তাই লোপিতাল যখন তাঁকে শিক্ষক নিযুক্ত করার প্রস্তাব দেন, তিনি সানন্দে সেটা গ্রহণ করে নেন। লোপিতাল কোন গাধা ছাত্র ছিলেন না, তা মোটেও নয়। চট করে সব শিখে ফেলতে পারতেন।

প্রথম থেকে তিনি বার্নলির শেখানো ক্যালকুলাসের প্রতি দারুন আকৃষ্ট হয়ে পরেন। বিষয়টির প্রতি এতোই ঝোঁক হয়ে গেল তাঁর যে শিক্ষকের কাছে প্রস্তাব পেশ করলেন যে ক্যালকুলাস বিষয়ক যত কাজ কর্ম আছে তাঁর সবগুলোই তিনি কিনে ফেলতে প্রস্তুত, যত টাকা চান তিনি ততই দেবেন। আর্থিক অনটনে পরা ইউহান বার্নলি ভাবলেন, ক্ষতি কি, তাঁর মাথায় তো আরো নতুন আইডিয়া আসবে, কিন্তু এতোগুলো টাকা তো আর আসবে না এতো সহজে। তিনি রাজি হয়ে গেলেন ছাত্রের প্রস্তাবে। একটা শর্ত ছিল ছাত্রের, কাগজগুলো যদৃচ্ছ ব্যবহারের অধিকার থাকবে তাঁর, অর্থাৎ বার্নলির কাগজপত্রের যা কিছু ফলাফল তার উপর সমস্ত স্বত্বাধিকার তিনি স্বেচ্ছায় সপে দিচ্ছেন লোপিতালকে। সেই কাগজগুলোতে যে সমস্ত ফলাফল ছিল, তার সঙ্গে নিজের কিছু চিন্তাভাবনা যোগ করে আতোয়া লোপিতাল রীতিমতো একটা বই লিখে ফেললেন ক্যালকুলাসের উপর- Analyse des infiniment petits নাম দিয়ে। সে বই প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে – ক্যালকুলাস শাস্ত্রের ওপর পৃথিবীর প্রথম পাঠ্যপুস্তক। সে বইতে বার্নলির একটি গুরুত্বপূর্ণ রেজাল্ট ছিল যার ওপর তাঁর স্বত্ব ছিল না বলে সেটি ‘লোপিতাল রুল’ বলে পরিচিত হয়ে এসেছে দুনিয়াসুদ্ধ ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষক-অধ্যাপকদের কাছে। নিজের আবিষ্কৃত রেজাল্ট ব্যবহার করে নেহাত টাকার জোড়ে অন্য এক ব্যক্তি খ্যাতি অর্জন করছে সেটা দেখে বার্নলির যে খুব ভালো লাগছিল না সেটা তো সহজেই বোঝা যায়, কিন্তু চুক্তিবদ্ধ হওয়ার ফলে মুখ ফুটে কিছু বলারও উপায় ছিল না বেচারার। তারপর যখন লোপিতাল মারা যান ১৭০৪ সালে, তখন আর চুপ করে থাকার প্রয়োজন বোধ করলেন না, ফাঁস করে দিলেন আসল ঘটনাটা। যে সময় লোপিতাল এতোই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন যে বার্নলির কথায় কেউ কান দেয়নি। না দেবার আরেকটা কারনও ছিল। তিনি নিজেও এরকম একটি কুকর্ম করেছিলেন একবার, তা-ও নিজের আপন ভাইয়ের সঙ্গে। বড় ভাইয়ের একটা কাজকে নিজের বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। বড় কথা, দিতে গিয়ে ধরাও পরেছিলেন। তার ফলে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে যায়। যা-ই হোক, তাঁর মৃত্যুর পর পুরনো চিঠি-পত্র ঘেঁটে পরবর্তীকালের গবেষকেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে আসলেই কাজটা ছিল ইউহান বার্নলির। কিন্তু ততদিনে লোপিতাল নামটিই আঠার মত লেগে যায় সূত্রটির সঙ্গে।

এবার দেখা যাক কি সেই সূত্র। ধরা যাক ভগ্নাংশটি। x যদি ০ না হয় তাহলে এর একটা অর্থ আছে- উপরে নিচে কাটাকুটি করে ফল পেয়ে যাই ১। কিন্তু x যদি ০ হয় তাহলে তো বিপদ – ভগ্নাংশটি অর্থ হারিয়ে একটা অনির্ণেয় বর্জ্য দ্রব্য হয়ে দাঁড়ায়। কোন মানেই থাকে না তার। যুগ যুগ ধরে বেড় বড় পণ্ডিতেরা যমের মতো এড়িয়ে গেছেন একে। দার্শনিকেরা তিরস্কার করেছেন যারা এটা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার সাহস পায়। নিউটন আর লিবনিজের মত নবযুগের দিগদিশারী গণিতবিদেরা ও দূরত্ব বজায় রেখেছেন এর থেকে। কিন্তু লোপিতাল তাতে দমে যান নি (ঐতিহাসিক কারনে লোপিতালকেই কৃতিত্ব দিতে হচ্ছে যদিও সকলেরই জানা হয়ে গেছে এর মাঝে যে মূল আবিষ্কারক তিনি নন, ইউহান বার্নলি)। তিনি বরং উল্টো বললেন যে ভগ্নাংশের মান হলে ক্ষতি নেই, যদি ওপর-নিচ দুটি ফাংশনই ‘কলনযোগ্য’ (differentiable) হয়, এবং অন্তরকলনের ফলে যদি নতুন ফাংশন দুটি একটা সুনির্দিষ্ট ফলাফল দেয়, বসাবার পর। অবশ্য যদি এমন হয় যে দ্বিতীয় পর্যায়েও সেই একই অবস্থা দাঁড়াচ্ছে, অর্থাৎ ভগ্নাংশ দিচ্ছে, তাহলে পূর্ববর্ণিত সেই একই প্রক্রিয়া দ্বিতীয়বার চালানো যাবে। এবং এভাবে যতবার দরকার ততবারই যাওয়া যাবে, যতক্ষন না শেষমেশ একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব, হয় কোন সসীম সংখ্যায় যাবে, নয়তো অসীম সংখ্যাতে; কিংবা কোন লিমিটেই যাবে না। সবগুলোরই পেছনে কতগুলো আইন কানুন আছে, যেমন লিমিট থাকা বা না থাকা, কলনযোগ্য হওয়া বা না হওয়া (না হলে সেখানেই থেমে যেতে হবে), ইত্যাদি।

 

ফিবোনাচি, না বিরহাঙ্ক?

ইংরেজিতে প্লেজিয়েরিজম (plagiarism) বলে একটা কথা আছে, যার বাংলা তরজমা, ভদ্র ভাষাতে, ‘কুম্ভিলকতা’, অনতিভদ্রতে সোজা ‘চৌর্যবৃত্তি’। তবে এটা সাধারন পকেটমারা বা সিঁদকাটা চৌর্যবৃত্তি নয়, বুদ্ধিজগতের শিক্ষিত চৌর্য। জ্ঞান বিজ্ঞানের জগতে এর মানে দাঁড়ায়ঃ একজনের গবেষনালব্ধ মৌলিক কাজ আরেক জন তার নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া, এবং ফলত রীতিমত নাম করে ফেলা। এরকম ঘটনা অহরহি ঘটত আগেকার দিনে। ছাত্রের লেখা অভিসন্দর্ভের পুরো কৃতিত্বটাই হয়তো অবেক্ষক সাহেব আত্মসাৎ করে ছাপিয়ে দিলেন নামকরা জার্নালে, আর ছাত্র বেচারা ঘরে বসে রাগে-দুঃখে নিজের চুল ছেঁড়া ছাড়া আর কোন পথ খুঁজে পেল না, এধরনের অবিশ্বাস্য ঘটনাও যে ঘটেনি তা নয়। তবে বর্তমান যুগের ‘চৌর্যবৃত্তি’ একটু ভিন্ন রকম। ইন্টারনেটের কল্যাণে যেহেতু কেউ কারো কাছ থেকে সহজে কিছু লুকিয়ে রাখতে পারে না, সেহেতু ‘চুরি’টা হয় প্রধানত সেই ইন্টারনেটেরি কাছ থেকে। যেমন, গুগলের মারফতে ইন্টারনেট থেকে একটা তথ্য ‘ধার’ করার পর গবেষনাপত্রে সেই তথ্যসূত্রটি বেমালুম চেপে গিয়ে নিজের বলে দাবী করার চেষ্টা। মানব চরিত্রের এই ছোটখাট হীনতাগুলো চিরকালই ছিল, চিরকাল থাকবেও। তবে উঁচু-মানের গবেষক সাধকদের মধ্যে এই দুর্বলতাগুলো খুব কমই দেখা গেছে। যা অনেক ক্ষেত্রেই ঘটেছে তা হল একের কাজ সম্বন্ধে অন্যজন সম্পূর্ণ অনবহিত হয়েই তার নিজের কাজটি কোন পত্রিকায় করে ফেলেছেন, যদিও সেই একই কাজ হয়তো অন্য লোকটি অন্য কোন দেশের অন্য কোন পত্রিকায় তার আগেই প্রকাশ করে ফেলেছিলেন। সেটা ‘চৌর্যবৃত্তি’ নয়, এমনকি অনিচ্ছাকৃত ভুলও নয়, সেটা স্বাধীন ও যুগপৎ গবেষনা। দুজনেরই সমান অধিকার গবেষনার কৃতিত্ব দাবী করার।

একদিন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় অফিসের কফিরুমে বসে এক সহকর্মী বন্ধুর সাথে আলাপ করছিলাম কফি খেতে খেতে। কথা উঠল ফিবোনাচি সংখ্যা নিয়ে (বিজ্ঞ পাঠকদের মনে আছে নিশ্চয়, ফিবোনাচিকে নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি এই বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে)।  আমার (মী.র) বন্ধুটি গণিতের বীজগণিত শাখার একজন বিশ্বমাপের পণ্ডিত। হেসে বললেন, আরে কিসের ফিবোনাচি, তার বহু আগেই ভারতীয় গাণিতিকরা করে গেছেন সেটা। বন্ধুটি চেকোশ্লাভিয়ার অভিবাসী, আমারই মত দীর্ঘকাল ক্যানাডায়। তিনি একজন ইউরোপিয়ানকে ইতিহাসের পাতা থেকে সরিয়ে ভারতের এক হিন্দু গাণিতিককে বসিয়ে দেবেন সেটা একটু আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে আমাদের কাছে, কিন্তু আসলে জ্ঞানবিজ্ঞানের জগতে এই সততাটুকু কাম্যই কেবল নয়, সচরাচর তা-ই দেখা যায়। ওর কাছ থেকে এর সূত্র কোথায় তার খবর নিয়ে আমি (মী.র) ইন্টারনেট থেকে পেলাম পরমানন্দ সিংহ নামক এক গানিতিকের লেখা নিবন্ধ, যার শিরোনামঃ The so-called Fibonacci Numbers in Ancient and Medieval India. লেখাটির ভূমিকাতে তিনি তার বক্তব্যের মূল বিষয়টি মোট পাঁচটি ভাষাতে ব্যক্ত করেছেনঃ ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, হিন্দি ও বাংলা। তার বাংলা অনুবাদটি এখানে হুবহু তুলে দিচ্ছি-

এল ফিবোনাচির (১২০২ খৃষ্টাব্দ) পূর্বে বিরহাংক (খৃঃ ৫০০-খৃঃ ৬০০ এর মধ্যে), গোপাল (১১৩৫ খৃষ্টাব্দের আগে), এবং হেমচন্দ্রের (১১৫০ খৃষ্টাব্দের নিকট) সকলেই তথাকথিত ফিবোনাচি সংখ্যা এবং তার নির্মাণ বিধি বর্ণনা করে গেছেন। নারায়ন পণ্ডিত (১৩৫৬ খৃষ্টাব্দ) সামাসিক পঙক্তি, যার এক বিশেষ রুপ হচ্ছে ফিবোনাচি সংখ্যা, এবং বহুপদী গুনকের মধ্যে সম্বন্ধ স্থাপন করেছেন।

বিরহাংক বাবু ছিলেন সংস্কৃত কাব্যের ছন্দজ্ঞান বিশেষজ্ঞ, যা আমরা নই। বরং খোলাশা করে বলা যায়, সংস্কৃত বা যে কোন ভাষার কাব্যরচনা বিধি বিষয়টিতে এ বইয়ের লেখকদ্বয় রীতিমতো গণ্ডমূর্খ। অতএব নিচে যে আলোচনাতুকু নিবেদন করছি পাঠকের সুবিধা হবে ভেবে, তাতে যদি সুবিধার পরিবর্তে আরো ধাঁধার ভেতরে পরে যান পাঠক তাহলে আমাকে ক্ষমা করতে হবে।

পরমানন্দ মহাশয়ের ভূমিকা অনুযায়ী সংস্কৃত কাব্যে ছন্দের একমাত্র ধ্বনি বা স্বরকে (Syllable) বলা হয় ‘লঘু’, আর দ্বিমাত্রিক ধ্বনিকে বলা হয় ‘গুরু’। ধরা হোক যে প্রথমটির ওজন ১, আর দ্বিতীয়টির ২। লেখক বলছেন যে, সংস্কৃত আর প্রাকৃত কাব্যে তিন প্রকারের ছন্দরীতিঃ এক, বর্ণবৃত্ত, যাতে অক্ষর সংখ্যা বদলাবে না তবে ধ্বনি সংখ্যা বদলাতে পারবে। দুই, মাত্রাবৃত্ত, যেখানে ধ্বনি সংখ্যা অপরিবর্তিত, তবে অক্ষর সংখ্যা বদলাতে পারবে। তিন, গণ বা গুচ্ছবৃত্ত, যেখানে একই গুচ্ছের ভেতর প্রথম বা দ্বিতীয়টির বৈশিষ্ট্য বজায় থাকবে, তবে গুচ্ছে গুচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্টের সমাবেশ থাকা সম্ভব। আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্য দ্বিতীয়টিরই গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এখানে তৃতীয়টি একেবারেই নিষ্প্রয়োজন বলে এর আলোচনা স্থগিত রাখব – এটা গণিতের বিষয় তত না, যতটা ছন্দ বিন্যাসের।

প্রথমটির উদাহরণঃ

১ অক্ষর – ল (লঘু) বা গ (গুরু) – মোট সংখ্যা ২ =২

২ অক্ষর – লল, লঘ, ঘঘ, ঘল  – মোট সংখ্যা ৪ = ২ X ২

৩ অক্ষর – ললল, লগল, ললগ, গগগ, গগল, গলগ, গগগ – মোট সংখ্যা ৮ = ২X২X২

সজাগ পাঠকের কাছে ধারাটি বেশ পরিষ্কারভাবেই ফুটে উঠেছে, তাই না? এখন যে কেউ বলে দিতে পারবে n অক্ষর বিশিষ্ট লাইনের মোট কটি সংখ্যা দাঁড়াবেঃ ২-কে n বার ২ দিয়েই গুন করলে যা পাওয়া যায়। অর্থাৎ ৪ অক্ষর হলে ১৬ বার, ৫ হলে ৪২ বার, – এভাবে চলবে।

২, ৪, ৮, ১৬, – এই সংখ্যামালাটি যে ফিবোনাচি রাশির সঙ্গে একেবারেই সম্পর্কহীন সেটা স্পষ্ট। তবে এটা যে গণিতে অন্য কোন শাখার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাহীন তা কিন্তু মোটেও নয়। যেমন, একটা মুদ্রা একবার ছুড়লে হয় মাথা আসবে, নয় লেজ আসবে, অর্থাৎ দুইটি সম্ভাব্য ফলাফল। ২ বার ছুঁড়লে ২X২ = ৪টি, ৩ বার ছুঁড়লে ২X2X2 = ৮টি, – অবিকল ওপরের উদাহরণতির মতো। এই মুদ্রা নিক্ষেপের উদাহরণটি কিন্তু কোনো ছেলেখেলা নয়, প্রিস্নগখ্যান শাস্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মডেল একটি। অতএব ছন্দ ব্যাকরণের সঙ্গে গণিতের একাধিক শাখার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যা-ই হোক, বর্তমান নিবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বর্ণ-বৃত্তের আলোচনাতে এখানেই যদি টানব।

দ্বিতীয়টির উদাহরণঃ

১ অক্ষর ল (গ সম্ভব নয়, কারন গ’তে দুই মাত্রা), – মোট সংখ্যা ১

২ অক্ষর লল, গ – মোট সংখ্যা ২

৩ অক্ষর ললল, লগ, গল- মোট সংখ্যা ৩

৪ অক্ষর লললল, লগল, ললগ, গলল, গগ- মোট সংখ্যা ৫

৫ অক্ষর ললললল, লললগ, ললগল, লগলল, গললল, গলগ, গগল, লগগ- মোট সংখ্যা ৮

নিয়মটা নিশ্চয় বেশ পরিষ্কার হয়ে উঠছে? এবং এটাও নিশ্চয় প্রতিয়মান হয়ে উঠছে যে ডানদিকের সংখ্যা গুলোকে পাশাপাশি দাঁড় করালে দেখা যাবে এরা সেই ফবোনাচি রাশি –

১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩,…… 

তার অর্থ কবিতার মাত্রাবৃত্ত ছন্দের সাথে গণিতের ফিবোনাচি রাশি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এবং যেহেতু এই সম্পর্কটি অত্যন্ত সরাসরি, এবং বিরহাংক বাবু ফিবোনাচি থেকে অন্তত ছ’শ বছর আগে এটি আবিষ্কার করেছিলেন, সেহেতু আমার মনে হয় ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের কথা ভেবে এই গুরুত্বপূর্ণ রাশিটিকে এখন থেকে বিরহাংক-ফিবোনাচি রাশি বলে অভিহিত করা উচিত।

আশাকরি পাঠকদের কেউই ভাববেন না যে ফিবোনাচি সাহেব জেনেশুনেই বিরহাংকের নামটি চেপে গিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছিলেন। না, আমাদের মনে হয় না যে উনি ওরকম অসাধু ছিলেন। যদি হতেন তাহলে তিনি কেন গায়ে পরে ভারতীয় গণিত প্রচার করার উদ্দেশ্য নিয়ে রিতীমত একটা বই লিখে ফেলবেন? শুধু তা-ই নয়, রাশিটি যে ফিবোনাচির নামে ভূষিত হয়ে গেছে সেটা কিন্তু তিনি নিজে করেন নি, নামকরণটি করেছিলেন এডওয়ার্ড লুকাস (১৮৪২-৯১) নামক এক অনতিবিখ্যাত গাণিতিক ফিবোনাচির মৃত্যুর প্রায় সাড়ে ছ’শ বছর পর। না, এটা চৌর্যবৃত্তির ব্যাপার নিশ্চয় নয়, নেহাত অনবহিততার বিষয়।

আরেকটি উদাহরণ নেওয়া যাকঃ x/x2. ওপরে-নিচে দু জায়গাতেই শূন্য আসছে x যখন 0 হয়। সোভাগ্যবশত x এবং x2 দুটিরই ডেরিভেটিভ আমরা অনায়াসে বের করে ফেলতে পারি। x এর ডেরিভেটিভ হল 1, আর x2 এর 2x- এটা আগের পর্বের একটি উদাহরণ থেকে নেওয়া। সুতরাং লোপিতালের দাওয়াই অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছেঃ 1/2x. মহা বিপদ! ওপরে 1, যা অপরিবর্তনীয়, আর নিচে 2x, যা x=0- তে 0 ই থাকে। সুতরাং আমরা পাচ্ছিঃ

limx →0 (1/2x)→ অসীম,

যার কোন নির্দিষ্ট লিমিট নেই, ধনাত্মক অসীম হতে পারে, আবার ঋণাত্মক অসীমও হতে পারে, আগেকার সেই উদাহরণটির মতো। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দাঁড়াবে, এর কোন লিমিট নেই, x যখন 0- এর দিকে যায়।

পুরো নিয়মটা হল এরকমঃ

 দুটি ফাংশন নিনঃ f(x) আর g(x), এবং f(x) কে ভাগ করুন g(x) দিয়ে। অর্থাৎ f(x)/g(x), এই ভগ্নাংশটি আলোচনায় নিন। মনে করুন ফাংশনগুলোর দুটোই 0 হয়ে যাচ্ছে, যখন x-কে 0 ধরা হয়। তার মানে f(0) = g(0) = 0. এবার মনে করুন উভয় ফাংশনকে অন্তরকলন করে পাওয়া গেল h(x) আর k(x), প্রথমটি ওপরে, দ্বিতীয়টি নিচে। এবার সেই একই কাজ করুনঃ x =0 ব্যবহার করুন। তাতে যদি কাজ হয়, তার অর্থ একটা নির্দিষ্ট কিছু পাওয়া যায় – কোনো সসীম সংখ্যা বা অসীম সংখ্যা বা কোন নির্দিষ্ট সংখ্যাই নয়, তাহলে তো সমস্যা চুকেই গেল। নইলে একই পদ্ধতি দ্বিতীয়বার চালিয়ে যান, যতবার লাগে ততবার।

এই করেই শেষ পর্যন্ত যুগযুগান্তরের সেই বিভীষিকাময় ঘৃণ্য বস্তুটির একটা সম্মানজনক আশ্রয় পাওয়া গেল। খেয়াল করুন যে লোপিতালের গাণিতিক দাওয়াইতে 0/0 কে এড়ানো তো হচ্ছেই না, বরং এটিকে রীতিমত কাজে লাগানো হচ্ছে, যদিও আড়ালে কিন্তু সেই একই জিনিস- লিমিট। ক্যালকুলাসের এমন কোন অংশ নেই যেখানে লিমিট পাবেন না আপনি। সুতরাং এটিকে এড়ানোর চেষ্টা না করে বরং পরিশ্রম করে শিখে ফেলাই ভালো, কি বলেন?