সাংখ্য যোগ

শ্লোক – ১
সঞ্জয় উবাচ
তং তথা কৃপয়াবিষ্টমশ্রুপূর্ণাকুলেক্ষণম।
বিষীদন্তমিদং বাক্যমুবাচ মধুসূদনঃ ।। ১ ।।

সঞ্জয়ঃ উবাচ- সঞ্জয় বললেন, তম-অর্জুনকে, তথা- এভাবে, কৃপয়া- কৃপায়, আবিষ্টম- আবিষ্ট হয়ে, অশ্রুপূর্ণ- অশ্রুসিক্ত, আকুল- ব্যাকুল, ঈক্ষণম- চক্ষু, দিষীদন্তম- অনুশোচনা করে, ইদম- এই, বাক্যম- কথাগুলি, উবাচ- বললেন, মধুসূদনঃ- মধুহন্তা।

গীতার গান
সঞ্জয় কহিলঃ
দেখিয়া অর্জুনে কৃষ্ণ সেই অশ্রুজলে।
কৃপায় আবিষ্ট হয়ে ভাবিত বিকলে।।
কৃপাময় মধুসূদন কহিল তাহারে।
ইতিবাক্য বন্ধুভাবে অতি মিষ্টস্বরে।।

অনুবাদঃ সঞ্জয় বললেন- অর্জুনকে এভাবে অনুতপ্ত, ব্যাকুল ও অশ্রুসিক্ত দেখে, কৃপায় আবিষ্ট হয়ে মধুসূদন বা শ্রীকৃষ্ণ এই কথাগুলি বললেন।

তাৎপর্যঃ জাগতিক করুণা, শোক ও চোখের জল হচ্ছে প্রকৃত সত্ত্বার অজ্ঞানতার বহিঃপ্রকাশ। শাশ্বত আত্মার জন্য করুণার অনুভব হচ্ছে আত্ম-উপলব্ধি। এই শ্লোকে ‘মধুসূদন’ শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রীকৃষ্ণ মধু নামক দৈত্যকে হত্যা করেছিলেন এবং এখানে অর্জুন চাইছেন, অজ্ঞতারুপ যে দৈত্য তাঁকে তাঁর কর্তব্যকর্ম থেকে বিরত রেখেছে, তাকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হত্যা করুন। মানুষকে কিভাবে করুণা প্রদর্শন করতে হয়, তা কেউই জানে না। যে মানুষ ডুবে যাচ্ছে, তার পরনের কাপড়ের প্রতি করুণা প্রদর্শন করাটা নিতান্তই অর্থহীন। তেমনই, যে মানুষ ভবসমুদ্রে পতিত হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে, তার বাইরের আবরণ জড় দেহটিকে উদ্ধার করলে তাকে উদ্ধার করা হয় না। এই কথা যে জানে না এবং যে জড় দেহটির জন্য শোক করে, তাকে বলা হয় শূদ্র, অর্থাৎ যে অনর্থক শোক করে। অর্জুন ছিলেন ক্ষত্রিয়, তাই তাঁর কাছ থেকে এই ধরণের আচরণ আশা করা যায় না। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের শোকসন্তপ্ত হৃদয়কে শান্ত করতে পারেন, তাই তিনি অর্জুনকে ভগবদগীতা শোনালেন। গীতার এই অধ্যায়ে জড় দেহ ও চেতন আত্মার সম্বন্ধে বিশদভাবে আলোচনার মধ্যমে পরম নিয়ন্তা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন- আমাদের স্বরূপ কি, আমাদের প্রকৃত পরিচয় কি। পারমার্থিক তত্ত্বের উপলব্ধি এবং কর্মফলে নিরাসক্তি ছাড়া এই অনুভূতি হয় না।

 

শ্লোক – ২
শ্রীভগবানুবাচ
কুতস্তা কশ্মলমিদং বিষমে সমুপস্থিতম।
অনার্যজুষ্টমস্বর্গ্যমকীর্তিকরমর্জুন ।। ২ ।।

শ্রীভগবান উবাচ- পরমেশ্বর ভগবান বললেন, কুতঃ- কোথা থেকে, ত্বা- তোমার, কশ্মলম- কলুষ, ইদম-এই অনুশোচনা, বিষমে- সঙ্কটকালে, সমুপস্থিতম- উপস্থিত হয়েছে, অনার্য- যে মানুষ জীবনের মূল্য জানে না, জুষ্টম- উচিৎ, অস্বর্গ্যম- যে কার্য উচ্চতর লোকে নিয়ে যায় না, অকীর্তি- অপকীর্তি, করম- কারণ, অর্জুন- হে অর্জুন।

গীতার গান
শ্রীভগবান কহিলেনঃ
কিভাবে অর্জুন তুমি ঘোর যুদ্ধস্থলে।
অনার্যের শোকানল প্রদীপ্ত করিলে।।
অকীর্তি অস্বর্গ লাভ হইবে তোমার।
ছি ছি বন্ধু ছাড় এই অযোগ্য আচার।।

অনুবাদঃ পুরুষোত্তম শ্রীভগবান বললেন – প্রিয় অর্জুন, এই ঘোর সঙ্কটময় যুদ্ধস্থলে যারা জীবনের প্রকৃত মূল্য বোঝে না, সেই সব অনার্যের মতো শোকানল তোমার হৃদয়ে কিভাবে প্রজ্বলিত হল? এই ধরণের মনোভাব তোমাকে স্বর্গলোকে উন্নীত করবে না, পক্ষান্তরে তোমার সমস্ত যশরাশি বিনষ্ট করবে।

তাৎপর্যঃ শ্রীকৃষ্ণ ও পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন অভিন্ন। তাই সমগ্র ভগবদগীতায় তাঁকে ভগবান বলে সম্বোধন তিনটি স্তর রয়েছে- ব্রক্ষ্ম অর্থাৎ নির্বিশেষে সর্বব্যাপ্ত সত্ত্বা, পরমাত্মা অর্থাৎ প্রতিটি জীবের হৃদয়ে বিরাজমান পরমেশ্বরের প্রকাশ এবং ভগবান অর্থাৎ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। পরম-তত্ত্বের এই বিশ্লেষণ সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভাগবতে (১/২/১১) বলা হয়েছে –

বদন্তি তৎ তত্ত্ববিদস্তত্ত্বং যজজ্ঞানমদ্বময়।
ব্রক্ষেতি পরমেত্মেতি ভগবানিতি শব্দাতে।।

“যা অদ্বয় জ্ঞান, অর্থাৎ এক অদ্বিতীয় বাস্তব বস্তু, জ্ঞানীরা তাকেই পরমার্থ বলেন। সেই পরমতত্ত্ব ব্রক্ষ্ম, পরমাত্মা ও ভগবান- এই ত্রিবিধ সংজ্ঞায় অভিব্যক্ত হয়।“ এই তিনটি চিন্ময় প্রকাশ সূর্যের দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যায়। সূর্যেরও তিনটি বিভিন্ন প্রকাশ রয়েছে, যেমন – সূর্যরশ্মি, সূর্যগোলক ও সূর্যমণ্ডল। সূর্যরশ্মি সম্বন্ধে জানাটা প্রাথমিক স্তর, সূর্যগোলক সম্বন্ধে জানাটা আরো উচ্চ স্তরের এবং সূর্যমণ্ডলে প্রবেশ করে সূর্য সম্বন্ধে জানাটা হচ্ছে সর্বোচ্চ। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা সূর্যকিরণ সম্বন্ধে জেনেই সন্তুষ্ট থাকে- তার সর্বব্যাপকতা এবং তার নির্বিশেষ রশ্মিচ্ছটা সম্বন্ধে যে জ্ঞান, তাকে পরমতত্ত্বের ব্রক্ষ্ম-উপলব্ধির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যারা আরো উন্নত স্তরে রয়েছেন, তাঁরা সূর্যগোলকের সম্বন্ধে অবগত, সেই জ্ঞানকে পরম-তত্ত্বের পরমাত্মা উপলব্ধির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে এবং যারা সূর্যমণ্ডলের অন্তঃস্থলে প্রবিষ্ট হয়েছেন, তাঁদের জ্ঞান পরম-তত্ত্বের সর্বোত্তম সবিশেষ রুপ সম্বন্ধে অবগত হওয়ার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তাই ভগবদ্ভক্তবৃন্দ অথবা যে সমস্ত পরমার্থবাদী পরম-তত্ত্বের ভগবৎ-স্বরূপ উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তাঁরাই হচ্ছেন সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত পরমার্থবাদী, যদিও সমস্ত পরমার্থবাদীরা সেই একই পরম-তত্ত্বের অনুসন্ধানে রত। সূর্যরশ্মি, সূর্যগোলক ও সূর্যমণ্ডল – এই তিনটি একে অপর থেকে পৃথক হতে পারে না, কিন্তু তবুও তিনটি বিভিন্ন স্তরের অন্বেষণকারীরা সমপর্যায়ভুক্ত নন।

শ্রীল ব্যাসদেবের পিতা পরাশর মুনি ভগবান কথাটির বিশ্লেষণ করেছেন। সমগ্র ঐশ্চর্য, সমগ্র বীর্য, সমগ্র যশ, সমগ্র শ্রী, সমগ্র জ্ঞান ও সমগ্র বৈরাগ্য যার মধ্যে পূর্ণরূপে বর্তমান, সেই পরম পুরুষ হচ্ছেন ভগবান। অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা খুব ধনী, অত্যন্ত শক্তিশালী, সুপুরুষ, অত্যন্ত জ্ঞানী ও অত্যন্ত অনাসক্ত, কিন্তু এমন কেউ  নেই যার মধ্যে সমগ্র ঐশ্চর্য, সমগ্র বীর্য আদি গুনগুলি পূর্ণরুপে বিরাজমান। কেবল শ্রীকৃষ্ণই তা দাবি করতে পারেন, কারণ তিনি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান। কোন জীবই, এমন কি ব্রক্ষ্মা, শিব অথবা নারায়ণও শ্রীকৃষ্ণের মতো পূর্ণ ঐশ্চর্যসম্পন্ন হতে পারেন না। তাই, ব্রক্ষ্মসংহিতাতে ব্রক্ষ্মা নিজে বলেছেন যে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান। তাঁর চেয়ে বড় আর কেউ নেই, এমন কি তাঁর সমকক্ষও কেউ নেই। তিনিই হচ্ছেন আদি পুরুষ, অথবা গোবিন্দ নামে পরিজ্ঞাত ভগবান এবং তিনি হচ্ছেন সর্ব কারণের পরম কারণ –

ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম।।

“ভগবানের গুণাবলী ধারণকারী বহু পুরুষ আছেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরম পুরুষ, কারণ তাঁর ঊর্ধ্বে আর কেউ নেই। তিনি হচ্ছেন পরমেশ্বর এবং তাঁর শ্রীবিগ্রহ সচ্চিদানন্দময়। তিনি হচ্ছেন অনাদির আদিপুরুষ গোবিন্দ এবং তিনিই হচ্ছেন সর্ব কারণের কারণ।“ (ব্রক্ষ্মসংহিতা ৫/১)

ভাগবতেও পরমেশ্বর ভগবানের অনেক অবতারের বর্ণনা আছে, কিন্তু সেখানেও বলা হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পুরুষোত্তম এবং তাঁর থেকে বহু বহু অবতার ও ঈশ্বর বিস্তার লাভ করে –

এতে চাংশকলাঃ পুংসঃ কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ম।
ইন্দ্রারিব্যাকুলং লোকং মৃড়য়ন্তি যুগে যুগে।।

“সমস্ত অবতারেরা হচ্ছেন ভগবানের অংশ অথবা তাঁর অংশের অংশ-প্রকাশ, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান।“ (ভাগবত ১/৩/২৮)

তাই শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবানের আদিরুপ, পরমতত্ত্ব এবং পরমাত্মা ও নির্বিশেষ ব্রক্ষ্মের উৎস।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সামনে আত্মীয়-পরিজনদের জন্য অর্জুনের এই শোক অত্যন্ত অশোভব, তাই ভগবান আশ্চর্যান্বীত হয়ে ব্যক্ত করেছেন, কুতঃ, “কোথা থেকে।“ এই ধরণের ভাবপ্রবণতা পুরুষোচিত নয় এবং একজন সুসভ্য আর্যের কাছ থেকে এটি কখনই আশা করা যায় না। আর্য বলে তাঁকেই অভিহিত করা হয়, যিনি জীবনের মূল্য বোঝেন এবং যার সভ্যতা অধ্যাত্ম উপলব্ধির ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। যে সমস্ত মানুষ তাদের দেহাত্মবুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হয়, তারা কখনই উপলব্ধি করতে পারে না যে, জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমতত্ত্ব বিষ্ণু বা ভগবানকে উপলব্ধি করা। তারা জড় জগতের বহিরঙ্গা রুপের দ্বারা মোহিত হয়, তাই তারা জানে না মুক্তি বলতে কি বোঝায়। জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হবার জ্ঞান যাদের নেই, তাদেরকে বলা হয় অনার্য। যদিও অর্জুন ছিলেন ক্ষত্রিয়, তবুও যুদ্ধ করতে অস্বীকার করে তিনি তাঁর স্বধর্ম থেকে বিচ্যুত হচ্ছিলেন। এই ধরণের কাপুরুষতা অনার্যের কাছ থেকেই কেবল আশা করা যায়। এভাবে কর্তব্যকর্ম থেকে বিচ্যুত হলে আধ্যাত্মিক জীবনে অগ্রসর হওয়া যায় না, এমন কি পার্থিব জগতে কাউকে যশস্বী হওয়ার সুযোগও প্রদান করে না। আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি অর্জুনের এই তথাকথিত সহানুভূতিকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনুমোদন করেননি।

 

শ্লোক – ৩
ক্লৈব্যং মা স্ম গমঃ পার্থ নৈতত্বয্যুপপদ্যতে।
ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্বল্যং ত্যক্তোত্তিষ্ঠ পরন্তুপ ।। ৩ ।।

ক্লৈবাম- ক্লীবত্ব, মা স্ম- করো না, গমঃ- গ্রহণ করা, পার্থ- হে পৃথাপুত্র, ন- কখনোই নয়, এতৎ- এই, ত্বয়ি- তোমার, উপপদ্যতে- উপযুক্ত, ক্ষুদ্রম- ক্ষুদ্র, হৃদয়- হৃদয়ের, দৌর্বল্যম- দুর্বলতা, ত্যক্তা- পরিত্যাগ করে, উত্তিষ্ঠ-উঠ, পরন্তুপ- শত্রু দমনকারী।

গীতার গান
নপুংসক নহ পার্থ এ কি ব্যবহার।
যোগ্য নহে এ কার্য বন্ধু যে আমার।।
হৃদয়দৌর্বল্য এই নিশ্চয়ই জানিবে।
ছাড় এই, কর যুদ্ধ যদি শত্রুকে মারিবে।।

অনুবাদঃ হে পার্থ! এই সম্মান হানিকর ক্লীবত্বের বশবর্তী হয়ো না। এই ধরণের আচরণ তোমার পক্ষে অনুচিত। সে পরন্তুপ। হৃদয়ের এই ক্ষুদ্র দুর্বলতা পরিত্যাগ করে তুমি উঠে দাঁড়াও।

তাৎপর্যঃ অর্জুন ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের পিতা বসুদেবের ভগিনী পৃথার পুত্র, তাই তাঁকে এখানে ‘পার্থ’ নামে সম্বোধন করে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। ক্ষত্রিয়ের সন্তান যদি যুদ্ধ করতে অস্বীকার করে, তখন বুঝতে হবে, সে কেবল নামেই ক্ষত্রিয়; তেমনই, ব্রাক্ষ্মনের সন্তান যখন অধার্মিক হয়, তখন বুঝতে হবে, সে কেবল নামেই ব্রাক্ষ্মন। এই ধরণের ব্রাক্ষ্মন ও ক্ষত্রিয়েরা তাদের পিতার অযোগ্য সন্তান। তাই, শ্রীকৃষ্ণ চাননি, অর্জুন অযোগ্য ক্ষত্রিয় সন্তান বলে কুখ্যাত হোক। অর্জুন ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং শ্রীকৃষ্ণ তাঁর রথের সারথি হয়ে নিজেই তাঁকে পরিচালিত করছিলেন। কিন্তু এই সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থাকা স্বত্বেও যদি অর্জুন যুদ্ধ না করে, তবে তা হবে নিতান্ত অখ্যাতির বিষয়। তাই, শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বললেন, এই রকম আচরণ করা তাঁর পক্ষে অশোভন। অর্জুন যুক্তি দেখিয়েছিলেন, অত্যন্ত সম্মানীয় ভীষ্ম ও নিজের আত্মীয়ের প্রতি উদার মনোভাবহেতু তিনি যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করবেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, এই ধরণের মহানুভবতা হৃদয়ের দুর্বলতা ছাড়া আর কিছু নয়। এই ধরণের ভ্রান্ত মহানুভবতাকে মহাজনেরা কখনোই অনুমোদন করেননি। সুতরাং শ্রীকৃষ্ণের পরিচালনায় অর্জুনের মতো পুরুষের এই ধরণের মহানুভবতা, অথবা তথাকথিত অহিংসা পরিত্যাগ করা উচিৎ।

 

শ্লোক – ৪
অর্জুন উবাচ
কথং ভীষ্মমহং সংখ্যে দ্রোণং চ মধুসূদন।
ইষুভিঃ প্রতিযোৎস্যামি পূজারহাবরিসূদন ।। ৪ ।।

অর্জুনঃ উবাচ- অর্জুন বললেন, কথম- কিভাবে, ভীষ্মম- ভীষ্ম, অহম- আমি, সংখ্যে- যুদ্ধে, দ্রোণম- দ্রোণাচার্য, চ- ও, মধুসূদন- হে মধুহন্তা, ইষুভিঃ- বাণের দ্বারা, প্রতিযোৎস্যামি- প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব, পূজারহৌ- পূজনীয়, অরিসূদন- হে শত্রুহন্তা।

গীতার গান
অর্জুন কহিলেনঃ
মধুসূদন! কি আজ্ঞা কর তুমি মোরে।
ভীষ্ম দ্রোণ গুরুজন তারে মারিবারে?।।
পূজার যোগ্য যে তাঁরা হন নিত্যকাল।
তাঁদের শরীরে বাণ সুতীক্ষ্ণ ধারাল?।।

অনুবাদঃ অর্জুন বললেন- হে অরিসূদন হে মধুসূদন! এই যুদ্ধক্ষেত্রে ভীষ্ম ও দ্রোণের মতো পরম পূজনীয় ব্যক্তিদের কেমন করে আমি বাণের দ্বারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব?

তাৎপর্যঃ পিতামহ ভীষ্ম ও শিক্ষক দ্রোণাচার্যের মতো গুরুজনেরা সর্বদাই পূজনীয়। এমন কি যদি তাঁরা আক্রমণও করেন, তবুও তাঁদের প্রতি-আক্রমণ করা উচিৎ নয়। সাধারণ শিষ্টাচার হচ্ছে যে, গুরুজনদের প্রতি এমনকি মৌখিক তর্কযুদ্ধ করাও উচিৎ নয়। এমন কি তাঁদের আচরণ যদি কখনো কখনো রুঢ়ও হয়, তবুও তাঁদের প্রতি রুঢ়ভাবে আচরণ করা উচিৎ নয়। তা হলে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতি-আক্রমণ করা অর্জুনের পক্ষে কি করে সম্ভব? শ্রীকৃষ্ণ কি কখনো তাঁর পিতামহ উগ্রসেন অথবা তাঁর গুরুদেব সান্দীপনি মুনিকে আক্রমণ করতে সমর্থ হবেন? অর্জুন যুদ্ধ থেকে বিরত হবার জন্য শ্রীকৃষ্ণকে এই রকম যুক্তি প্রদর্শন করলেন।

 

শ্লোক – ৫
গুরুনহত্বা হি মহানুভাবান
শ্রেয়ো ভোক্তুং ভৈক্ষ্যমপীহ লোকে।
হত্বার্থকামাংস্তু গুরুনিহৈব
ভুঞ্জীয় ভোগান রুধিরপ্রদিগ্ধান ।। ৫ ।।

গুরুন- গুরুজনেরা, অহত্বা- হত্যা না করে, হি- অবশ্যই, মহানুভাবান- মহান আত্মাগণ, শ্রেয়ঃ- শ্রেয়, ভোক্তুম- ভোগ করা, ভৈক্ষ্যম- ভিক্ষার দ্বারা, অপি- ও, ইহ- এই জীবনে, লোকে, এই জগতে, হত্বা- হত্যা করে, অর্থ- লাভ, কামান- কামনা করে, তু- কিন্তু, গুরুন- গুরুজনদের, ইহ- এই জগতে, এব- অবশ্যই, ভুঞ্জীয়- ভোগ করতে হবে। ভোগান- ভোগ্যবস্তু, রুধির- রক্ত, প্রতিগ্ধান- মাখা।

শুধু গুরু নহে তাঁরা, মহানুভব হয় যারা,
হত্যা করি তাঁদের সবারে।
তদপেক্ষা ভিক্ষা ভাল, কাটিয়ে যাইবে কাল,
মিথ্যা যুদ্ধ করাও আমারে।।
হত্যা এই মহাকাম, বিধি যে হইল বাম,
এই যুদ্ধে গুরু হত্যা হবে।
সে ভোগ রুধিরমাখা, কেমনে করিব সখা,
সে যুদ্ধ কে করিয়াছে কবে।।

অনুবাদঃ আমার মহানুভব শিক্ষাগুরুদের জীবন হানি করে এই জগত ভোগ করার থেকে বরং ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করা ভাল। তাঁরা পার্থিব বস্তুর অভিলাষী হলেও আমার গুরুজন। তাঁদের হত্যা করা হলে, যুদ্ধলব্ধ সমস্ত ভোগ্যবস্তু তাঁদের রক্তমাখা হবে।

তাৎপর্যঃ শাস্ত্রনীতি অনুসারে, যে গুরু জঘন্য কার্যে লিপ্ত হয়েছে এবং ভাল-মন্দ বিচারবোধ হারিয়ে ফেলেছে, তাকে পরিত্যাগ করা উচিৎ। দুর্যোধনের কাছ থেকে অর্থ-সাহায্য পেতেন বলে ভীষ্ম ও দ্রোণ তাঁর পক্ষ অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছিলেন, যদিও কেবলমাত্র আর্থিক সাহায্য পাবার ফলে দুর্যোধনের পক্ষে যোগ দেওয়া তাঁদের উচিৎ হয়নি। এই অনুচিত কার্য করার ফলে, তাঁরা পান্ডবদের পরমারাধ্য শিক্ষাগুরুর পদের মর্যাদা থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। কিন্তু তা স্বত্বেও তাঁদের প্রতি অর্জুনের শ্রদ্ধা কোন অংশে হ্রাস পায়নি এবং অর্জুন এই কথা ভেবে মনে মনে শিহরিত হয়েছেন যে, জাগতিক সুখ উপভোগ করার জন্য তাঁদের হত্যা করা হলে, সেই ভোগ হবে তাঁদের রুধিরমাখা।

 

শ্লোক – ৬
ন চৈতদ বিদ্মঃ কতরম্নো গরীয়ো
যদ বা জয়েম যদি বা নো জয়েয়ুঃ।
যানেব হত্বা না জিজীবিষামস
তেহবস্থিতাঃ প্রমুখে ধার্তরাষ্ট্রাঃ ।। ৬ ।।

ন- না, চ- ও, এতৎ- এই, বিদ্মঃ- আমরা জানি, করতৎ- যা, নঃ- আমাদের, গরীয়ঃ- শ্রেয়ঃ, যৎ- যা, বা- অথবা, জয়েম- জয় করি, যদি- যদি, বা- অথবা, নঃ- আমাদের, জয়েয়ু- জয় করা হয়, যান- যারা, এব- অবশ্যই, হত্বা- হত্যা করে, না- না, জিজীবিষামঃ- জীবন ধারণের ইচ্ছা করি, তে- তারা সকলে, অবস্থিতাঃ- অবস্থিত, প্রমুখে- সম্মুখে, ধার্তরাষ্ট্রাঃ- ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ।

গীতার গান
বুঝিতে পারি না ভাল, কোথায় গরিমা হল,
কোন কার্য জুয়ায় আমায়।
কিবা আমি জয় করি, কিংবা আমি নিজে মরি,
দুই নৌকা আমারে নাচায়।।
যাদের মারিয়া রণে, বাঁচিব সে অকারণে,
তারা সব আমার সম্মুখে।
ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণ, আর যত বন্ধুজন,
মরিলে সে হবে মোর দঃখ।।

অনুবাদঃ তাদের জয় করা শ্রেয়, না তাদের দ্বারা পরাজিত হওয়া শ্রেয়, তা আমি বুঝতে পারছি না। আমরা যদি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করি, তা হলে আমাদের আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করবে না। তবুও এই রণাঙ্গনে তারা আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে।

তাৎপর্যঃ যুদ্ধ করাটা যদিও ক্ষত্রিয়ের ধর্ম, তবুও অর্জুন স্থির করতে পারছিলেন না যে, এই অনর্থক হিংসাত্মক যুদ্ধে রত হবেন, না কি ভিক্ষা বৃত্তি গ্রহণ করে জীবন ধারণ করবেন। তিনি যদি তাঁর শত্রুদের পরাজিত না করেন, তা হলে ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করা ছাড়া আর কোন পথ থাকবে না। আর তা ছাড়া, যুদ্ধে যে কোন পক্ষের জয় হবে, তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না। যুদ্ধে পান্ডবদের জয় হলেও (কারণ, তাঁদের দাবি ছিল ন্যায়সঙ্গত) ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের অবর্তমানে জীবন ধারণ করা তাঁদের পক্ষে নিতান্ত দুর্বিষহ হবে বলে অর্জুন মনে করেছিলেন। এদিক দিয়ে বিচার করলে সেটিও তাদের পক্ষে এক রকম পরাজয়। অর্জুনের এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বিবেচনা অবধারিতভাবে প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল মহৎ ভগবদ্ভক্তই ছিলেন না, তিনি গভীর তত্ত্বজ্ঞান-সম্পন্ন পুরুষ ছিলেন এবং তিনি তাঁর মন ও ইন্দ্রিয়গুলিকে সর্বতোভাবে সংযত করেছিলেন। যদিও তিনি রাজকীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তা স্বত্বেো তিনি ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করে জীবন ধারণ করতে মনস্থ করেছিলেন। এর মাধ্যমেও আমরা দেখতে পাই যে, অন্তরে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অনাসক্ত। এই সমস্ত সদগুণাবলী এবং তাঁর গুরুদেব শ্রীকৃষ্ণের মুখপদ্ম-বাক্যের প্রতি তাঁর গভীর নিষ্ঠা, এই দুইয়ের সমন্বয়ের ফলে তিনি ছিলেন প্রকৃত ধার্মিক। আমরা এখন এই সিদ্ধান্তে পৌছতে পারি যে, মুক্তি লাভের জন্য অর্জুন সম্পূর্ণরুপে যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন। ইন্দ্রিয় যদি সংযত না হয়, তবে দিব্যজ্ঞান উপলব্ধির স্তরে উন্নীত হওয়ার কোন সুযোগ থাকে না। এই দিব্যজ্ঞান ও ভক্তি ছাড়া জড় জগতের বন্ধন থেকে কোন রকমেই মুক্ত হওয়া যায় না। অর্জুন এই সমস্ত গুণাবলীর দ্বারা ভূষিত ছিলেন এবং সেই সঙ্গে ছিল জাগতিক সম্পর্কিত অস্বাভাবিক গুণাবলী।

 

শ্লোক – ৭
কার্পণ্যদোষোপহতস্বভাবঃ
পৃচ্ছামি ত্বাং ধর্মসম্মুঢ়চেতাঃ।
যচ্ছ্রেয়ঃ স্যান্নিশ্চিতং ব্রুহি তন্মে
শিষ্যস্তেহহং শাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম ।। ৭ ।।

কার্পণ্য- কৃপণতা, দোষ- দুর্বলতা, উপহত- প্রভাহিত হয়ে, স্বভাবঃ- স্বভাব। পৃচ্ছামি- আমি জিজ্ঞাসা করছি, ত্বাম- তোমাকে, ধর্ম- ধর্ম, সম্মুঢ়- হতবুদ্ধি, চেতাঃ- চিত্ত, যৎ- যা, শ্রেয়ঃ- শ্রেয়স্কর, স্যাৎ- হয়, নিশ্চিতম- নিশ্চিতভাবে, ব্রুহি- বল, তৎ- তা, মে- আমাকে, শিষ্যঃ- শিষ্য, তে- তোমার, অহম- আমি, শাধি- নির্দেশ দাও, মাম- আমাকে, ত্বাম- তোমার, প্রপন্নম- আত্মসমর্পিত।

গীতার গান
কার্পণ্য দোষেতে দূষী, মোহেতে হয়েছি বশী,
স্ব স্বভাব হল অপহত।
নিজ ধর্ম ছাড়ি মূঢ়, জিজ্ঞাসি তোমারে দৃঢ়,
কৃপা করি করহ সংযত।।
তুমি জান হিত মোর, হয়েছি মোহেতে ভোর,
ভালো যাতে করহ বিচারে।
হইনু তোমার শিষ্য, দেখুক সকল বিশ্ব,
শিক্ষা দাও এই প্রপন্নরে।।

অনুবাদঃ কার্পণ্যজনিত দুর্বলতার প্রভাবে আমি এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছি এবং আমার কর্তব্য সম্বন্ধে বিভ্রান্ত হয়েছি। এই অবস্থায় আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি, এখন কি করা আমার পক্ষে শ্রেয়স্কর, তা আমাকে বল। এখন আমি তোমার শিষ্য এবং সর্বতোভাবে তোমার শরণাগত। দয়া করে তুমি আমাকে নির্দেশ দাও।

তাৎপর্যঃ প্রকৃতির প্রভাবে জড়-জাগতিক কর্মচক্রের দ্বারা মোহাচ্ছন্ন হয়ে সকলেই হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা এই কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা অনুভব করি। তাই আমাদের সত্যদ্রষ্টা সদগুরুর শরণ নিতে হয় এবং তিনি আমাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধন করবার পথে পরিচালিত করেন। আমাদের অনাকংখিত জীবনের জটিল সমস্যাগুলি থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য সদগুরুর শরণাপন্ন হবার উপদেশ সমস্ত বৈদিক সাহিত্যে দেওয়া হয়েছে। জড়-জাগতিক ক্লেশ হচ্ছে দাবানলের মতো যা আপনা থেকেই জ্বলে ওঠে, এই আগুন কেউ লাগায় না। ঠিক তেমনই, জগতের এমনই অবস্থা যে, জীবনের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা আপনা থেকেই আবির্ভূত হয়, এই প্রকার বিভ্রান্তি আমরা না চাইলেও। কেউ আগুন চায় না, তবুও আগুন জ্বলতে থাকে এবং তার ফলে আমরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। বৈদিক সাহিত্য তাই উপদেশ দিচ্ছে যে, জীবনের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা সমাধানের জন্য এবং সেই সমাধানের বিজ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করবার জন্য গুরু-পরম্পরার ধারায় ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেছেন যে সদগুরু, তাঁর শরণাপন্ন হতে হবে। যে ব্যক্তি সদগুরু তিনি সর্ব বিষয়ে পারদর্শী। তাই, জড় জগতের মোহের দ্বারা আবদ্ধ না থেকে সদ্গুরুর শরণাপন্ন হওয়া উচিৎ। এটিই হচ্ছে এই শ্লোকের তাৎপর্য।

জড় জগতের মোহের দ্বারা আচ্ছন্ন কে? যে মানুষ তার সমস্যাগুলি সম্বন্ধে অবতগত নয়, সেই হচ্ছে মোহের দ্বারা আচ্ছন্ন। বৃহাদারণ্য উপনিষদে (৩/৮/১০) মোহাচ্ছন্ন মানুষের বর্ণনা করে বলা হয়েছে- যো বা এতদক্ষরং গার্গ্যবিদিত্বাস্মাল লোকাৎ প্রৈতি স কৃপণঃ। “যে মানুষ তার মনুষ্য জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান করে না এবং আত্মতজ্ঞ উপলব্ধি না করে কুকুর-বেড়ালের মতো এই জগত থেকে বিদায় নেয়, সেই হচ্ছে কৃপণ।“ এই মানব জন্ম হচ্ছে একটি অমূল্য সম্পদ, কারণ, জীব এই জন্মের সদ্ব্যবহার করে জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাই, যে এই অমূল্য সম্পদের সদ্ব্যবহার করে না, সে হচ্ছে কৃপণ। পক্ষান্তরে, যিনি যথার্থ বুদ্ধিমত্তা সহকারে মানব-জন্মের সদ্ব্যবহার করে জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান করেন, তিনি হচ্ছেন ব্রাক্ষ্মন। য এতদক্ষরং গার্গি বিতিত্বাস্মাল লোকাৎ প্রৈতি স ব্রাক্ষ্মনঃ।

যে কৃপণ সে পরিবার, সমাজ, দেশ, জাতি আদি জড় সম্বন্ধের প্রতি অত্যধিক আসক্ত হয়ে তার সময়ের অপচয় করে। মানুষ প্রায়ই এক ধরণের ‘চর্মরোগের’ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে স্ত্রী, পুত্র, পরিজন, সমন্বিত পরিবারের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়ে পড়ে। এই রোগকে ‘চর্মরোগ’ বলা হয়, কারণ দেহের ভিত্তিতে বা চর্মের ভিত্তিতে এই আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে ওঠে এবং এই বন্ধনের ফলে জীব অত্যন্ত ক্লেশদায়ক ভবযন্ত্রনা ভোগ করে। কৃপণ মনে করে, সে তার পরিবারের তথাকথিত আত্মীয়দের মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবে, নয়ত সে মনে করে, তার আত্মীয়স্বজন তাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবে। এই ধরণের পারিবারিক বন্ধন এমনকি পশুদের মধ্যেও দেখা যায়, তারাও তাদের সন্তানদের যত্ন করে। তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন অর্জুন বুঝতে পেরেছিলেন, আত্মীয় স্বজনদের প্রতি তাঁর মমতা এবং তাদের মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার বাসনাই ছিল তাঁর মহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার কারণ। যদিও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর যুদ্ধ করার কর্তব্য তাঁকে সম্পাদন করতে হবে, কিন্তু তবুও কৃপণতা জনিত দুর্বলতার ফলে  তিনি তাঁর কর্তব্য সম্পাদন করতে পারছিলেন না। তাই তিনি পরম গুরু ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে অনুনয় করছেন, তাঁর এই সমস্যার সমাধান করার উপায় প্রদর্শন করতে। তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে তাঁর শিষ্যরুপে আত্মসমর্পণ করেন। শ্রীকৃষ্ণকে তিনি আর বন্ধুরুপে সম্ভাষণ করছেন না। গুরু ও শিষ্যের মধ্যে যে কথা হয়, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এখন অর্জুন তাই গভীর গুরুত্বের সঙ্গে পরম গুরু শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে পরম তত্ত্বদর্শনের আলোচনা করতে চান। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন ভগবদগীতার তত্ত্ববিজ্ঞানের আদি গুরু এবং অর্জুন হচ্ছেন গীতার তত্ত্ব-উপলব্ধকারী প্রথম শিষ্য। অর্জুন কিভাবে ভগবদগীতার জ্ঞান উপলব্ধি করেছিলেন, তার ব্যখ্যা ভগবদগীতাতেই করা হয়েছে। কিন্তু তা স্বত্বেও গর্দভসদৃশ জড় পণ্ডিতেরা গীতার ব্যাখ্যা করে বলে, শ্রীকৃষ্ণ নামক কোন পুরুষের কাছে আত্মসমর্পণ করার কোন প্রয়োজন নেই, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের অন্তঃস্থিত অপ্রকাশিত যে-তত্ত্ব, তাঁকে উপলব্ধি করাই হচ্ছে গীতার প্রকৃত শিক্ষা। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন আনাদির আদিপুরুষ স্বয়ং ভগবান। তাঁর অন্তর ও বাইরের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই, তিনি সর্বব্যাপ্ত, সর্বশক্তিমান। কিন্তু এই জ্ঞান যার নেই, সেই মহামূর্খের পক্ষে গীতার মর্ম উপলব্ধি করা কখনোই সম্ভব নয়।

 

শ্লোক – ৮
ন হি প্রপশ্যামি মমাপনুদ্যাদ
যচ্ছোকমুচ্ছোষণমিন্দ্রিয়াণাম।
অবাপ্য ভূমাবসপত্নমৃদ্ধং
রাজ্যং সুরাণামপি চাধিপত্যম ।। ৮ ।।

ন- না, হি- অবশ্যই, প্রপশ্যামি- দেখছি, মম- আমার, অপনুদ্যাৎ- দূর করতে পারে, যৎ- যা, শোকম- শোক, উচ্ছোষণম- শুকিয়ে দিচ্ছে, ইন্দ্রিয়াণাম- ইন্দ্রিয়গুলিকে, অবাপ্য- প্রাপ্ত হয়ে, ভূমৌ- এই পৃথিবীতে, অসপত্নম- প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন, ঋদ্ধম- সমৃদ্ধিশালী, রাজ্যম- রাজ্য, সুরাণাম- দেবতাদের, অপি- এমন কি, চ- ও, আধিপত্যম- আধিপত্য।

গীতার গান
দেখি না আমি যে অন্ধ, তাহে বুদ্ধি অতি মন্দ,
শোকানল নিভিবে কিভাবে।
যে শোক জ্বালায় মোরে, ইন্দ্রিয়াদি স্ব পোড়ে,
ভবরোগ কিরুপে ঘুচাবে।।
যদি পাই ত্রিভূবন, রাজ্যলক্ষ্মী সুলোভন,
অসপত্ন রাজ্যের বিকাশ।
দেবলোকে আধিপত্য, তোমাকে কহিনু সত্য,
নাহি হবে এ শোক বিনাশ।।

অনুবাদঃ আমার ইন্দ্রিয়গুলিকে শুকিয়ে দিচ্ছে যে শোক, তা দূর করবার কোন উপায় আমি খুঁজে পাচ্ছি মা। এমন কি স্বর্গের দেবতাদের মতো আধিপত্য নিয়ে সমৃদ্ধিশালী, প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন রাজ্য এই পৃথিবীতে লাভ করলেও আমার এই শোকের বিনাশ হবে না।

তাৎপর্যঃ অর্জুন যদিও তাঁর মতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবার প্রয়াসে ধর্মগত ও নীতিগত যুক্তির অবতারণা করেছিলেন, কিন্তু তবুও যেন তিনি তাঁর গুরু শ্রীকৃষ্ণের সাহায্য ছাড়া তাঁর প্রকৃত সমস্যার সমাধান করতে পারছিলেন না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যে সমস্যা তাঁর সমস্ত সত্ত্বাকে দগ্ধ করেছিল, তাঁর তথাকথিত জ্ঞানের সাহায্যে তিনি সেই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না। তাই তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে গুরুরুপে বরণ করে তাঁর শরণাপন্ন হলেন। কেতাবী বিদ্যা, পান্ডিত্য, উচ্চপদ আদি জীবনের প্রকৃত সমস্যার সমাধান কখনোই করতে পারে না। শ্রীকৃষ্ণের মতো গুরুর কৃপার ফলেই কেবল সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়। তাই, সিদ্ধান্ত হচ্ছে, যে গুরু সর্বতোভাবে কৃষ্ণ চেতনার অমৃত আস্বাদন করেছেন, তিনিই হচ্ছেন সদগুরু, কেন না তিনিই কেবল পারেন মানব-জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন। যিনি কৃষ্ণ-তত্ত্ববেত্তা, তিনি ব্রাক্ষ্মনই হন বা শূদ্রই হন, তিনিই কেবল পারেন গুরু হতে।

কিবা বিপ্র, কিবা ন্যাসী, শূদ্র কেনে নয়।
যেই কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা, সেই ‘গুরু’ হয়।।
(চৈঃ চঃ মধ্য ৮/১২৮)

সুতরাং তত্ত্বজ্ঞানী না হলে সদগুরু হওয়া কখনোই সম্ভব নয়। বৈদিক শাস্ত্রেও বলা হয়েছে –

ষটকর্মনিপুণো বিপ্রো মন্ত্রতন্ত্রবিশারদঃ।
অবৈষ্ণবো গুরুর্ণ স্যাদ্বৈষ্ণবঃ শ্বপচো গুরুঃ।।

“সমস্ত বৈদিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্রাক্ষ্মন যদি বৈষ্ণব না হন, অথবা যদি তিনি কৃষ্ণ তত্ত্ববেত্তা না হন, তবে তিনি গুরু হবার যোগ্য নন। কিন্তু যদি নীচকুলোদ্ভূত চন্ডাল কৃষ্ণ-তত্ত্বজ্ঞানসম্পন্ন বৈষ্ণব হন, তবে তিনি গুরু হতে পারেন।“ (পদ্ম পুরাণ)

জন্ম, মৃত্যু, জড়া ও ব্যাধি – এই চতুর্বিধ সমস্যা জড় অস্তিত্বকে সর্বদাই জর্জরিত করছে এবং ধনৈশ্চর্যের সঞ্চয় অথবা অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যমে কখনোই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। পৃথিবীর অনেক দেশ সব রকমের জাগতিক সুখস্বাচ্ছন্দ্যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কিন্তু তা স্বত্বেও সেখানে জড় জীবনের যে সমস্ত সমস্যা তা কোন অংশেই লাঘব হয়নি। নানাভাবে তারা শান্তি পাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু তাদের সেই সমস্ত প্রচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে, কারণ শান্তি লাভ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ গ্রহণ করা, অর্থাৎ ভগবদগীতা ও শ্রীমদ্ভাগবতের উপদেশ গ্রহণ করা, অথবা শ্রীকৃষ্ণের যথার্থ প্রতিনিধি সদগুরুর শরণ গ্রহণ করা।

যদি অর্থনৈতিক উন্নতি এবং জাগতিক সুখস্বাচ্ছন্দ্য মানুষকে পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক প্রমত্ততা জনিত শোক থেকে উদ্ধার করতে পারত, তবে অর্জুন বলতেন না যে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন পৃথিবীর সম্রাজ্য অথবা স্বর্গলোকের আধিপত্য লাভ করলেও তিনি শোকমুক্ত হতে পারবেন না। তাই তিনি কৃষ্ণভাবনার আশ্রয় অবলম্বন করেছিলেন এবং সুখ ও শান্তি লাভের সেটিই হচ্ছে পন্থা। অর্থনৈতিক উন্নতি এবং জড় জগতের উপর আধিপত্য প্রকৃতির অঙ্গুলিহেলনে মুহূর্তের মধ্যেই ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। মানুষের গ্রহান্তরে যাবার আপ্রান প্রচেষ্টা, যেমন চাঁদে যাবার জন্য অনুসন্ধান করছে, তাও প্রকৃতির এক ঘাতে সর্বতোভাবে বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। ভগবদগীতায় তা প্রতিপন্ন হয়েছে – ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোকং বিশান্তি। “সমস্ত পুণ্যকর্মের ফল শেষ হয়ে গেলে, চরম সুখ ও সমৃদ্ধিপূর্ণ জীবন থেকে নিতান্তই নিম্নস্তরের জীবনে পতিত হতে হয়।“ অনেক রাজনীতিবিদ এভাবেই অধঃপতিত হয়েছে এবং এই ধরণের অধঃপতন কেবল দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তাই, আমরা যদি আমাদের মঙ্গলের জন্য সর্ববিধ শোকের নিরসন করতে চাই, তবে আমাদের অর্জুনের মতো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হতে হবে। সুতরাং অর্জুন যেমন শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে অনুরোধ করেছিলেন, প্রতিটি মানুষেরই উচিৎ সেভাবে ভগবানের শরণাগত হওয়া। সেটিই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃতের পন্থা।

 

শ্লোক – ৯
সঞ্জয় উবাচ
এবমুক্তা হৃষীকেশং গুড়াকেশঃ পরন্তুপঃ।
ন যোৎস্য ইতি গোবিন্দমুক্তা তূষ্ণীং বভূব হ ।। ৯ ।।

সঞ্জয়ঃ উবাচ- সঞ্জয় বললেন, এবম- এভাবে, উক্তা- বলে, হৃষীকেশম- ইন্দ্রিয়ের অধিপতি শ্রীকৃষ্ণকে, গুড়াকেশঃ নিদ্রাজয়ী অর্জুন, পরন্তুপঃ- শত্রু দমনকারী, ন যোৎস্যে- আমি যুদ্ধ করব না, ইতি- এভাবে, গোবিন্দম- ইন্দ্রিয়সমূহের আনন্দদাতা শ্রীকৃষ্ণকে, উক্তা- বলে, তূষ্ণীম- নীরব, বভূব- হলেন, হ- নিশ্চিতভাবে।

গীতার গান
সঞ্জয় কহিলঃ
সে কথা বলিয়া গুড়াকেশ পরতাপী।
হৃষীকেশে নিবেদিল যদিও প্রতাপী।।
হে গোবিন্দ! মোর দ্বারা যুদ্ধ নাহি হবে।
যুদ্ধ ছাড়ি সেই বীর রহিল নীরবে।।

অনুবাদঃ সঞ্জয় বললেন – এভাবে মনোভাব ব্যক্ত করে গুড়াকেশ অর্জুন তখন হৃষীকেশকে বললেন, “হে গোবিন্দ! আমি যুদ্ধ করব না”, এই বলে তিনি মৌন হলেন।

তাৎপর্যঃ ধৃতরাষ্ট্র যখন শুনলেন, অর্জুন যুদ্ধ না করে ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করে জীবন ধারণ করবেন, তখন তিনি মনে মনে খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে নিরাশ করার মানসে সঞ্জয় তাঁকে জানিয়ে দিলেন, অর্জুন হচ্ছেন পরন্তুপঃ অর্থাৎ শত্রুর বিনাশকারী। যদিও অর্জুন পারিবারিক বন্ধনের মোহের বশবর্তী হয়ে সাময়িকভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু তার পরই তিনি পরম গুরু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণে আত্মনিবেদন করে তাঁর শিষ্যত্ব বরণ করেছিলেন। এর থেকে বোঝা যায়, অর্জুন শীঘ্রই পারিবারিক বন্ধনের মোহ থেকে মুক্ত হয়ে অক্সিজেন বা কৃষ্ণভাবনামৃত লাভ করবেন এবং ভগবানের নির্দেশে সেই যুদ্ধে রত হয়ে নির্মমভাবে শত্রু সংহার করবেন। এভাবে ক্ষণস্থায়ী যে আশার আনন্দে ধৃতরাষ্ট্রের বুক ভরে উঠেছিল, তা অচিরেই অন্তর্হিত হল।

 

শ্লোক – ১০
তমুবাচ হৃষীকেশঃ প্রহসন্নিব ভারত।
সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে বিষীদন্তমিদং বচঃ।। ১০ ।।

তম- তাঁকে, উবাচ- বললেন, হৃষীকেশঃ- ইন্দ্রিয়সমূহের অধিপতি শ্রীকৃষ্ণ, প্রহসন- হেঁসে, ইব- এভাবে, ভারত- হে ভরতবংশজ ধৃতরাষ্ট্র, সেনয়োঃ- সৈন্যদের, উভয়োঃ- উভয় পক্ষের, মধ্যে- মাঝখানে, বিষীদন্তম- বিষাদপ্রস্ত, ইদম- এই, বচঃ- বাক্য।

গীতার গান
স্নিগ্ধ হাঁসি মনোহর হৃষীকেশ বলে।
হে ভারত। অর্জুনের শুনিয়া সকলে।।
যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যমধ্যে হাসিয়া হাসিয়া।
উপদেশ করেন গীতা বিষন্ন দেখিয়া।।

অনুবাদঃ হে ভরতবংশীয় ধৃতরাষ্ট্র! সেই সময় স্মিত হেসে, শ্রীকৃষ্ণ উভয় সৈন্যদের মাঝখানে বিষাদগ্রস্ত অরজুকে এই কথা বললেন।

তাৎপর্যঃ দুই অন্তরঙ্গ বন্ধু হৃষীকেশ ও গুড়াকেশের মধ্যে কথোপকথন হচ্ছিল। বন্ধু হিসাবে তাঁরা দুজনেই ছিলেন সমপর্যায়ভুক্ত, কিন্তু তাঁদের মধ্যে একজন স্বেচ্ছাকৃতভাবে অপরের শিষ্যত্ব বরণ করলেন। শ্রীকৃষ্ণ সেই সময় হাসছিলেন, কারণ তাঁর বন্ধু তাঁর শিষ্য হতে মনস্থ করেছিলেন। তিনি পরমেশ্বর, তাই প্রভুররুপে তিনি সকলেরই নিয়ন্তা, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর ভক্তের বাসনা অনুযায়ী তাঁদের বন্ধু, পুত্র ও গুরু হিসাবে গ্রহণ করেন, তখন তিনি তৎক্ষণাৎ গুরুর ভূমিকা গ্রহণ করে গুরুবৎ গাম্ভীর্য সহকারে উপদেশ দেন। এখানে আমরা দেখতে পাই, গুরু ও শিষ্যের মধ্যে কথোপকথন হয়েছিল প্রকাশ্যভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে দুই সেনানীর মাঝখানে, যার ফলে সেই কথা শ্রবণ করে সকলেই লাভবান হতে পেরেছিল। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, ভগবদগীতার বাণী কোন বিশেষ ব্যক্তি, সমাজ অথবা সম্প্রদায়ের জন্য নয়। এই বাণী সকলের জন্য এবং শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সকলেই এর যথার্থ মর্ম হৃদয়ঙ্গম করে ভগবানের চরণে শরণাগতি লাভ করতে পারে।

 

শ্লোক – ১১
শ্রীভগবানুবাচ
অশোচ্যাননশোচস্তং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ ভাযসে।
গতাসূনগতাস্যূংশ্চ নানুশোচন্তি পণ্ডিতাঃ ।। ১১ ।।

শ্রীভগবান উবাচ- পরমেশ্বর ভগবান বললেন, অশোচ্যান- যে বিষয়ে শোক করা উচিৎ নয়, অনশোচঃ- তুমি শোক করছ, ত্বম- তুমি, প্রজ্ঞাবাদান- প্রাজ্ঞ বচন, চ- ও, ভাযসে- বলছ, গত- বিগত, অসূন- জীবন, অগত- যা গত হয়নি, অসূন- জীবন, চ- ও, ন- না, অনুশোচন্তি- অনুশোচনা করেন, পণ্ডিতাঃ- পণ্ডিতগণ।

গীতার গান
শ্রীভগবান কহিলেনঃ
অশোচ্য বিষয়ে শোক কর তুমি বীর।
প্রজ্ঞাবাদ ভাষ্যকার যেন কোন ধীর।।
পণ্ডিত যে জন হয় শোক নাহি তার।
মৃত দেহ নিত্য আত্মা সে জানে বিচার।।

অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- তুমি প্রাজ্ঞের মত কথা বলছ, অথচ যে বিষয়ে শোক করা উচিৎ নয়, সেই বিষয়ে শোক করছ। যারা যথার্থই পণ্ডিত তাঁরা কখনো জীবিত অথবা মৃত কারো জন্যই শোক করেন না।

তাৎপর্যঃ শিষ্যরুপে ভগবানের কাছে আত্মসমর্পণ করা মাত্রই ভগবান আচার্যের ভূমিকা গ্রহণ করে, অর্জুনের ভুল সংশোধন করার জন্য পরোক্ষভাবে তাঁকে মহামূর্খ বলে শাসন করতে লাগলেন। ভগবান তাঁকে বললেন, “তুমি প্রাজ্ঞের মত কথা বলছ, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান তোমার নেই। যিনি জ্ঞানী তিনি জানেন, দেহ কি ও আত্মা কি, তাই তিনি জীবিত অথবা মৃত কোন অবস্থাতেই দেহের জন্য শোক করেন না। পরবর্তী অধ্যায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, প্রকৃত জ্ঞান হচ্ছে সেই জ্ঞান যা জড় দেহ ও চেতন আত্মার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে এবং পরম নিয়ন্তা ভগবানের সঙ্গে আমাদের নিত্য সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়। অর্জুন যুক্তি দেখাচ্ছিলেন যে, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তার থেকে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তিনি জানতেন না, জড় পদার্থ, আত্মা ও ভগবৎ-সম্বন্ধীয় জ্ঞান ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করার চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর যেহেতু তাঁর সেই জ্ঞান ছিল না, তাই তাঁর পক্ষে পান্ডিত্যপূর্ণ যুক্তি দেখানো অনুচিত। যেহেতু তিনি পরম জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন না, তাই তিনি অনর্থক শোক করিলেন। জড় দেহের জন্ম হয় এবং এক সময় না এক সময় তার বিনাশ হবেই, কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর তার কখনোই বিনাশ হয়না। তাই, জড় দেহটি আত্মার মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই আত্মাই হচ্ছে জীবের প্রকৃত স্বত্বা, তাই দেহের বিনাশ হবার ভয়ে শোক করা নিতান্তই মূর্খতা। এই সত্য সম্বন্ধে যিনি অবগত তিনিই হচ্ছেন প্রকৃত জ্ঞানী এবং তিনি কোন অবস্থাতেই জড় দেহের জন্য শোক করেন না।

 

শ্লোক – ১২
ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ।
ন চৈব ন ভবিষ্যামঃ সর্বে বয়মতঃপরম ।। ১২ ।।

ন- না, তু- কিন্তু, এব – অবশ্যই, অহম- আমি, জাতু- কোনও সময়, ন- না, আসম- অস্তিত্ব, ন- এমন নয়, ত্বম- তুমি, ন- না, ইমে- এই সমস্ত, জনাধিপাঃ- নৃপতিগণ, ন- না, চ- ও, এব- অবশ্যই, ন- তেমন নয়, ভবিষ্যামঃ- অস্তিত্ব থাকবে, সর্বে- সকলের, বয়ম- আমাদের, অতঃপরম- তারপর।

গীতার গান
তুমি আমি যত রাজা সম্মুখে তোমার।
এরা সব চিরনিত্য করহ বিচার।।
পূর্বে এরা নাহি ছিল পরে না থাকিবে।
মূর্খের বিচার এই নিশ্চয়ই জানিবে।।

অনুবাদঃ এমন কোন সময় ছিল না যখন আমি, তুমি ও এই সমস্ত রাজারা ছিলেন না এবং ভবিষ্যতেও কখনো আমাদের অস্তিত্ব বিনষ্ট হবে না।

তাৎপর্যঃ বেদ, কঠ উপনিষদ ও শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে বলা হয়েছে, কৃত কর্ম এবং তার ফল অনুসারে জীব যদিও বিভিন্ন অবস্থায় পতিত হয়, কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান সর্ব অবস্থাতেই তাদের পালন করেন। সেই পরমেশ্বর ভগবান পরমাত্মারুপে সকলের হৃদয়ে বিরাজ করেন। যে সমস্ত মহাত্মা অন্তরে ও বাইরে সেই একই পরমেশ্বর ভগবানকে দেখতে পান, তাঁরাই কেবল পূর্ণতা লাভ করে শাশ্বত শান্তি লাভ করতে পারেন।

নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাম
একো বহুনাং যো বিদধাতি কামান।
তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধীরাস
তেষাং শাস্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম।।
(কঠ উপনিষদ ২/২/১৩)

“যিনি নিত্যের মধ্যে পরম নিত্য, চেতনের মধ্যে পরম চেতন এবং যিনি এক হয়েও সকলের কামনা পূর্ণ করেন, যারা ধীর তাঁরা অন্তরের অন্তস্থলে সর্বদাই তাঁকে দর্শন করেন এবং শাশ্বত শান্তি অনুভব করেন। কিন্তু যারা তার ভজন করে না, তারা কখনোই তা লাভ করতে পারে না।“

এই বৈদিক তত্ত্বজ্ঞান যা ভগবান অর্জুনকে দান করলেন, তা তিনি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে দান করলেন, যারা নিজেদের মহাপণ্ডিত বলে জাহির করতে চায়, কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে যারা এক-একজন মহামূর্খ। ভগবান স্পষ্টভাবে বলছেন, তিনি, অর্জুন ও সেই যুদ্ধক্ষেত্রে সমবেত সমস্ত রাজারা সকলেই শাশ্বত স্বতন্ত্র জীব এবং ভগবান সমস্ত জীবকে তাদের বদ্ধ ও মুক্ত উভয় অবস্থাতেই প্রতিপালন করেন। পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন পরম স্বতন্ত্র পুরুষ এবং ভগবানের নিত্য পার্ষদ অর্জুন এবং সেখানে সমবেত সমস্ত রাজারা হচ্ছেন স্বতন্ত্র শাশ্বত ব্যক্তি। এমন নয় যে, পূর্বে তাঁরা ছিলেন না এবং ভবিষ্যতে থাকবেন না। তাঁদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র পূর্বে বর্তমান ছিল এবং ভবিষ্যতেও নিরবচ্ছিন্নভাবে বর্তমান থাকবে। তাই, কারো জন্য শোক করা নিতান্তই নিরর্থক।

মায়াবাদীরা বলে থাকে যে, মুক্তির পর স্বতন্ত্র আত্মা মায়ার আবরণমুক্ত হয়ে নির্বিশেষ ব্রক্ষ্মে বিলীন হয়ে যায় এবং তখন আর আত্মার নিজস্ব সত্ত্বা থাকে না- এই মতবাদ পরম শাস্ত্রজ্ঞ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে স্পষ্টভাবে বলছেন, ভগবানের নিজের এবং অন্য সকলের অস্তিত্ব শাশ্বত, কারো স্বতন্ত্র সত্ত্বার বিনাশ কখনোই হয় না – এই কথা উপনিষদেও বলা হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত এই সমস্ত কথা প্রামানিক, কারণ তিনি কখনোই মায়ার দ্বারা প্রভাবিত হন না। জীবের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য যদি সর্ব অবস্থায় বজায় না থাকত, তবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কখনোই বলতেন না যে, ভবিষ্যতেও কখনো এর বিনাশ হবে না। মায়াবাদী তার্কিকেরা বলতে পারে, শ্রীকৃষ্ণ যে ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের কথা বলেছেন তা চিন্ময় স্বাতন্ত্র্য নয়, তা হচ্ছে জড় স্বাতন্ত্র্য। কিন্তু এই যুক্তি মেনে নিলেও প্রশ্ন থেকে যায়, তা হলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর নিজের সম্বন্ধে যে স্বাতন্ত্র্যের কথা বলেছেন, সেটি কি ধরণের স্বাতন্ত্র্য? শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, যিনি অতীতেও ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। তিনি নানাভাবে তাঁর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রতিপন্ন করেছেন এবং তিনি ঘোষণা করেছেন ব্রক্ষ্মজ্যোতি হচ্ছে তাঁর অঙ্গকান্তি। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অপ্রাকৃত স্বাতন্ত্র্য সব সময়ই বজায় রেখে গেছেন, যদি তাঁকে সীমিত সাধারণ চেতনাবিশিষ্ট বদ্ধ জীবাত্মা বলে মনে করা হয়, তবে ভগবদগীতাকে কখনোই পরম তত্ত্বজ্ঞান সমন্বিত শাস্ত্র হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না।

সীমিত জ্ঞানবিশিষ্ট্য, ভ্রান্তিপূর্ণ সাধারণ মানুষ কখনোই পরম তত্ত্বজ্ঞানের শিক্ষা দিতে পারে না। ভগবদগীতা সাধারণ কাব্যগ্রন্থ নয়। সাধারণ মানুষের লেখা কোন বইয়ের সঙ্গেই ভগবদগীতার তুলনা চলে না। শ্রীকৃষ্ণকে যদি কেউ সাধারণ মানুষ বলে মনে করে, তবে তার কাছে ভগবদগীতার কোনই তাৎপর্য থাকতে পারে না। মায়াবাদী তার্কিকেরা বলে থাকে, প্রচলিত রীতি অনুসারে এই শ্লোকে বহুবচনের ব্যবহার করা হয়েছে এবং তা জড় দেহটিকে বোঝাচ্ছে। কিন্তু পূর্ববর্তী শ্লোকে জড় দেহগত পরিচয়কে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করার পর, প্রচলিত রীতি অনুসারে সেই জড় দেহগত পরিচয়কেই আবার অনুমোদন করা শ্রীকৃষ্ণের পক্ষে কি করে সম্ভব? তাই স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, অপ্রাকৃত স্তরেও জীব স্বতন্ত্র আত্মারুপে বর্তমান থাকে। এই কথা রামানুজার্য আদি মহৎ আচার্যেরা স্বীকার করে গেছেন। ভগবদগীতাতে বহু জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই অপ্রাকৃত স্বাতন্ত্র্য ভগবদ্ভক্তেরা উপলব্ধি করতে পারেন। যারা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ, ভগবদগীতার মতো মহৎ শাস্ত্রকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা তাদের নেই। ভগবদ্ভক্তিহীন মানুষের ভগবদগীতা  পাঠ করা মৌমাছির মধুর বোতল চাটার মতোই নিরর্থক। বোতল না খুললে যেমন মধুর স্বাদ পাওয়া যায় না, তেমনই ভগবানের ভক্ত না হলে ভগবদগীতার অন্তর্হিত তত্ত্ব উপলব্ধি করা যায় না। এই কথা চতুর্থ অধ্যায়ে বলা হয়েছে। ভগবানের অস্তিত্বের যে অবিশ্বাস করে, তার পক্ষে ভগবদগীতা স্পর্শ করাও সম্ভব নয়। তাই, মায়াবাদীরা গীতার যে ভাষ্য দিয়ে থাকে, তা সম্পূর্ণরুপে ভ্রান্ত এবং তা মানুষকে বিপথগামী করে। তাই মায়াবাদীরা গীতার যে ভাষ্য দিয়ে থাকে, তা সম্পূর্ণরুপে ভ্রান্ত এবং তা মানুষকে বিপথগামী করে। তাই, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু মায়াবাদীদের ভাষ্য পড়তে অথবা শুনতে নিষেধ করে গেছেন। কারণ, মায়াবাদী-ভাষ্যের দ্বারা একবার প্রভাবিত হলে গীতার অন্তর্হিত তত্ত্বকে আর উপলব্ধি করতে পারা যায় না। যদি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য অভিজ্ঞতালব্ধ বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডকে উল্লেখ করে, তা হলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশের কোন আবশ্যকতা থাকে না। স্বতন্ত্র আত্মার বহুবচন ও ভগবান চিরন্তন সত্য এবং তা বেদে প্রতিপন্ন হয়েছে, যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

শ্লোক – ১৩
দেহিনোহস্মিন যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা।
তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির্ধীরস্তত্র ন মুহ্যতি ।। ১৩ ।।

দেহিনঃ- দেহীর, অস্মিন- এই, যথা- যেমন, দেহে- দেহে, কৌমারম- কৌমার, যৌবনম- যৌবন, জরা- বার্ধক্য, তথা- তেমনই, দেহান্তর- দেহান্তর, প্রাপ্তিঃ- লাভ হয়, ধীরঃ- স্থিরবুদ্ধি, তত্র- তাতে, ন- না, মুহ্যতি- মোহগ্রস্থ হন।

গীতার গান
দেহ দেহী ভেদ দুই নিত্যানিত্য সেই।
কৌমার যৌবন জরা পরিবর্তন যেই।।
দেহের স্বকার্য হয় দেহী নিত্য রহে।
তথা দেহান্তরপ্রাপ্তি পণ্ডিতেরা কহে।।

অনুবাদঃ দেহীর দেহ যেভাবে কৌমার যৌবন ও জরার মাধ্যমে তার রুপ পরিবর্তন করে চলে, মৃত্যুকালে তেমনই ঐ দেহী (আত্মা) এক দেহ থেকে অন্য কোনও দেহে দেহান্তরিত হয়। স্থিতপ্রজ্ঞ পণ্ডিতেরা কখনো এই পরিবর্তনে মুহ্যমান হন না।

তাৎপর্যঃ যেহেতু প্রত্যেকটি জীব হচ্ছে একটি স্বতন্ত্র আত্মা, কিন্তু প্রতি মুহূর্তেই প্রত্যেকেই তার দেহ পরিবর্তন করে চলেছে, তার ফলে কখনো সে শিশু, কখনো কিশোর, কখনো যুবক এবং কখনো বৃদ্ধ। এভাবে সে নানা রুপ ধারণ করছে। কিন্তু জীবের প্রকৃত যুবক এবং কখনো বৃদ্ধ। এভাবে সে নানা রুপ ধারণ করছে। কিন্তু জীবের প্রকৃত সত্ত্বা আত্মার কোনও পরিবর্তন হয় না। এক সময় দেহটি যখন অকেজো হয়ে যায়, তখন আত্মা সেই দেহ ত্যাগ করে অন্য দেহ ধারণ করে। মৃত্যুর পর জড় অথবা চিন্ময় আর একটি দেহ প্রাপ্ত হওয়া যখন অবশ্যম্ভাবী, তখন ভীষ্ম দ্রোণাচার্য আদি আত্মীয়-পরিজনের জন্য শোক করার পরিবর্তে তাঁর আনন্দিত হওয়া উচিৎ ছিল, কারণ মৃত্যু হলে তাঁরা তাঁদের জরাগ্রস্থ বৃদ্ধদেহ ত্যাগ করে নতুন দেহ প্রাপ্ত হবেন এবং নবশক্তি লাভ করবেন। পূর্বকৃত কর্মের ফল অনুসারে জীব নতুন দেহ প্রাপ্ত হবেন এবং নবশক্তি লাভ করবেন। পূর্বকৃত কর্মের ফল অনুসারে জীব নতুন দেহ প্রাপ্ত হয় এবং নানা রকম সুখ ও দুঃখ ভোগ করে থাকে। তাই, ভীষ্ম ও দ্রোণের মতো মহাত্মারা যে দেহত্যাগের পর জড় জগতের বন্ধনমুক্ত হয়ে ভগবৎ-ধাম বৈকুন্ঠে ফিরে যাবেন, অথবা স্বর্গলোকে দিব্য দেহ প্রাপ্ত হয়ে নানা রকম সুখভোগ করবেন, সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। সুতরাং তাঁদের মৃত্যুতে শোক করার কোনই কারণ ছিল না।

যে মানুষ জীবাত্মা ও পরমাত্মার স্বরূপ এবং পরা ও অপরা উভয় প্রকৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবগত, তাঁকে বলা হয় ধীর। এই প্রকার মানুষ জড় দেহের পরিবর্তনের জন্য কখনো শোক করেন না।

আত্মাকে খন্ড খন্ড অংশে বিভক্ত করা যায় না এই যুক্তিতে, আত্মা ও পরমাত্মার একত্ব সম্বন্ধে মায়াবাদীদের যে মতবাদ, তা গ্রহণযোগ্য নয়। পরমাত্মাকে খন্ড খন্ড করে বিভক্ত করার ফলে যদি জীবাত্মার উদ্ভব হত, তবে পরমাত্মা হতেন পরিবর্তনশীল। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত পরমাত্মা যে অপরিবর্তনীয় তার পরিপন্থী। গীতাতে ভগবান বলেছেন, পরমেশ্বরের অংশ জীবাত্মা সনাতন এবং তাকে বলা হয় ক্ষর; অর্থাৎ, তার জড়া প্রকৃতিতে পতিত হবার প্রবণতা থাকে। জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশ এবং জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হবার পরেও সে পরমাত্মার অংশরুপেই বর্তমান থাকে। তবে মুক্ত হবার পর সে সৎ, চিৎ ও আনন্দময় দেহপ্রাপ্ত হয়ে ভগবৎ-ধামে ভগবানের সাহচার্য লাভ করে। জলে যখন আকাশের প্রতিফলন দেখা যায়, তখন তাতে সূর্য, চন্দ্র, এমন কি তারাদেরও পর্যন্ত দেখা যায়। তারাগুলিকে জীবাত্মার সঙ্গে তুলনা করা চলে এবং সূর্য অথবা চন্দ্রকে পরমেশ্বরের সঙ্গে তুলনা করা চলে। অর্জুন হচ্ছেন স্বতন্ত্র অণুচৈতন্য-বিশিষ্ট জীবাত্মা এবং বিভুচৈতন্য পরমাত্মা হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। জীবাত্মা ও পরমাত্মা সমপর্যায়ভুক্ত হতেন এবং শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের ঊর্ধ্বতন না হতেন তা হলে তাঁদের মধ্যে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক গড়ে উঠা কখনোই সম্ভব হত না। তাঁরা দুজনেই যদি মায়ার দ্বারা মোহাচ্ছন্ন হতেন, তা হলে একজন উপদেষ্টা এবং অন্য জন উপদেশ গ্রহণকারী হওয়ার কোন প্রয়োজন ছিল না। এই প্রকার উপদেশ অর্থহীন হয়ে পড়ে, কারণ মায়ায় কবলিত কেউ প্রামাণিক উপদেষ্টা হতে পারে না। এই অবস্থান আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, যিনি জীব থেকে অতি ঊর্ধ্বে অবস্থিত আর অর্জুন হচ্ছে বিস্মরণশীল আত্মা, যে মায়ার দ্বারা মোহিত।

 

শ্লোক – ১৪
মাত্রাস্পর্শাস্তু কৌন্তেয় শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ।
আগমাপায়িনোহ নিত্যাস্তাংস্তিতিক্ষস্ব ভারত ।। ১৪ ।।

মাত্রাস্পর্শাঃ- ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি, তু- কেবল, কৌন্তেয়- হে কুন্তীপুত্র, শীত- শীত, উষ্ণ- গ্রীষ্ম, সুখ- সুখ, দুঃখদাঃ- দুঃখদায়ক, আগম- আসে, অপায়িনঃ- চলে যায়, অনিত্যাঃ- অস্থায়ী, তান- সেগুলিকে, তিতিক্ষস্ব- সহ্য করার চেষ্টা কর, ভারত- হে ভারত।

গীতার গান
শীত উষ্ণ সুখ দুঃখ ইন্দ্রিয় বিকার।
ইন্দ্রিয়ের দাস যারা তাহে অধিকার।।
যে সব অনিত্য বস্তু আসি চলি যায়।
সহিষ্ণুতা মাত্র গুণ তাহার উপায়।।

অনুবাদঃ হে কৌন্তেয়! ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের সংযোগের ফলে অনিত্য সুখ ও দুঃখের অনুভব হয়। সেগুলি ঠিক যেন শীত ও গ্রীষ্ম ঋতুর গমনাগমনের মতো। হে ভরতকুল প্রদীপ! সেই ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতির দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সেগুলি সহ্য করার চেষ্টা কর।

তাৎপর্যঃ মানব জীবনের প্রকৃত কর্তব্য সম্পাদন করতে হলে মানুষকে সহনশীলতার মাধ্যমে বুঝতে হবে, সুখ ও দুঃখ কেবল ইন্দ্রিয়ের বিকার মাত্র। শীতের পর যেমন গ্রীষ্ম আসে, তেমনই পর্যায়ক্রমে সুখ ও দুঃখ আসে। সত্যকে উপলব্ধি করে দুঃখে ও সুখে অবিচলিত থাকাই মানুষের কর্তব্য। বেদে নির্দেশ দেওয়া আছে, খুব সকালে স্নান করা উচিৎ। যে শাস্ত্রের  অনুশাসন মেনে চলে, সে মাঘ মাসের প্রচন্ড শীতেও খুব ভোরে স্নান করতে ইতস্তত করে না। আবহাওয়া জনিত অসুবিধা সত্ত্বেও মানুষকে তার কর্তব্যকর্ম করে যেতেই হয়। তেমনই, যুদ্ধ করাটাই হচ্ছে ক্ষত্রিয়ের ধর্ম এবং কর্তব্যের খাতিরে তাকে যদি তার আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গেও যুদ্ধ করতে হয়, তবুও সে তার কর্তব্যকর্ম থেকে বিরত হতে পারে না। শাস্ত্র-নির্ধারিত অনুশাসন মেনে চলাটাই হচ্ছে সভ্য মানুষের লক্ষণ। এই অনুশাসন মেনে চলার ফলে মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ হয় এবং সে তখন ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হয়। এই জ্ঞানের প্রভাবে তার হৃদয়ে ভগবদ্ভক্তির সঞ্চার হয় এবং ভগবানের প্রতি তার এই আন্তরিক ভক্তি তাকে মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত করে।

এই শ্লোকে অর্জুনকে কৌন্তেয় ও ভারত নামে সম্বোধন করাটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁকে কৌন্তেয় নামে সম্বোধন করার মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মাতৃকুলের মহত্ত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। উভয় দিক থেকে তিনি সুমহান বংশজাত ছিলেন। মহৎ বংশে জাত পুরুষ কখনোই তাঁর কর্তব্যকর্ম থেকে বিচ্যুত হন না। তাই, শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে জানিয়ে দিলেন, তাঁর বংশ-গৌরবের কথা স্মরণ করে তাঁকে যুদ্ধ করতেই হবে।

 

শ্লোক – ১৫
যং হি ন ব্যথয়ন্ত্যেতে পুরুষং পুরুষর্ষভ।
সমদুঃখসুখং ধীরং সোহমৃতত্বায় কল্পতে ।। ১৫ ।।

যম- যে, হি- অবশ্যই, ন- না, ব্যথয়ন্তি- বিচলিত হন, এতে- এই সমস্ত, পুরুষম- ব্যক্তিকে, পুরুষর্ষভ- হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, সম- অপরিচিত, দুঃখ- দুঃখ, সুখম- সুখ, ধীরম- সহিষ্ণু, সঃ- তিনি, অমৃতত্বায়- মুক্তি লাভের, কল্পতে- যোগ্য হয়।

গীতার গান
ব্যথা নাহি দেয় যারে অনিত্য এইসব।
সেজন বুঝিল জান পুরুষার্থ বৈভব।।
সমদুঃখ সুখধীর অনিত্য ব্যাপারে।
অমরত্ব সেই পায় জিতিয়া সংসারে।।

অনুবাদঃ হে পুরুষশ্রেষ্ঠ (অর্জুন)। যে জ্ঞানী ব্যক্তি সুখ ও দুঃখকে সমান জ্ঞান করেন এবং শীত ও উষ্ণ আদি দ্বন্দ্বে বিচলিত হন না, তিনিই মুক্তি লাভের প্রকৃত অধিকারী।

তাৎপর্যঃ যে মানুষ সুখে-দুঃখে সম্পূর্ণ অবিচলিত থেকে তাঁর পারমার্থিক উন্নতি সাধন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন, তিনি অনায়াসে এই ভবযন্ত্রনা থেকে মুক্তি লাভের যোগ্য। বর্ণাশ্রম-ধর্মের চতুর্থ আশ্রম সন্ন্যাস অত্যন্ত কষ্টসাপেক্ষ পথ। কিন্তু যে মানুষ তাঁর জীবনকে সার্থক করে তুলতে চান, তিনি সমস্ত রকম অসুবিধা স্বত্বেও এই সন্ন্যাস-আশ্রম গ্রহণ করতে দ্বিধা করেন না। সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করলে মানুষকে তার সব রকম পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন করতে হয়, স্ত্রী, পুত্র, পরিজনের এই বন্ধনমুক্ত হওয়া খুবই কষ্টকর। কিন্তু যিনি এই বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারেন, নিঃসন্দেহে তাঁর পারমার্থিক জীবন সার্থক হয়ে ওঠে এবং অচিরেই তিনি ভগবৎ-দর্শন লাভ করেন। ঠিক তেমনই, অর্জুনকে তাঁর ক্ষাত্রধর্ম পালন করার উপদেশ দিয়ে ভগবান তাঁকে বললেন, এই ধর্মযুদ্ধে তাঁর আত্মীয় পরিজনদের সঙ্গে যুদ্ধ করা যদিও অত্যন্ত দুঃখদায়ক এবং কষ্টসাপেক্ষ, কিন্তু তবুও তাঁর কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করবার জন্য তাঁর দেহজাত আত্মীয়তার বন্ধন থেকে তাঁকে মুক্ত হতে হবে এবং যুদ্ধ করতে হবে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু চব্বিশ বছর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন, ঘরে তখন তাঁর যুবতী স্ত্রী এবং বৃদ্ধ মাতা ছিলেন। তাঁদের দেখাশোনা করার জন্য কেউই ছিল না। কিন্তু তা স্বত্বেও, মহত্তর উদ্দেশ্য সাধন করবার জন্য তিনি তাঁদের পরিত্যাগ করে সন্ন্যাস-ধর্ম গ্রহণ করেন। মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত হবার এই হচ্ছে উপায়।

 

শ্লোক – ১৬
নাসতো বিদ্যতে ভাবো নাভাবো বিদ্যতে সতঃ।
উভয়োরপি দৃষ্টোহন্তস্তনয়োস্তত্বদর্শিভিঃ।। ১৬ ।।

ন- না, অসতঃ- অনিত্য বস্তুর, বিদ্যতে- হয়, ভাবঃ- স্থায়িত্ব, ন- না, অভাবঃ- বিনাশ, বিদ্যতে- হয়, সতঃ- নিত্য বস্তুর, উভয়োঃ- উভয়ের, অপি- যথার্থই, দৃষ্টঃ- দর্শন করে, অন্তঃ- সিদ্ধান্ত, তু- কিন্তু, অনয়োঃ- তাদের, তত্ত্ব- সত্য, দর্শিভিঃ- দ্রষ্টাদের দ্বারা।

গীতার গান
অসৎ শরীর এই সত্ত্বা নাহি তার।
নিত্যসত্য জীব হয় মৃত্যু নাহি যার।।
উভয় বিচার করি করিল নিশ্চিত।
তত্ত্বদর্শী সেই কহে যেই হয় হিত।।

অনুবাদঃ যারা তত্ত্বদ্রষ্টা তাঁরা সিদ্ধান্ত করেছেন যে অনিত্য জড় বস্তুর স্থায়িত্ব নেই এবং নিত্য বস্তু আত্মার কখনো বিনাশ হয় না। তাঁরা উভয় প্রকৃতির যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।

তাৎপর্যঃ প্রতি মুহূর্তে এই জড় দেহের পরিবর্তন হচ্ছে- এই দেহের কোনই স্থায়িত্ব নেই। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাহায্যেও জানা যায়, বিভিন্ন জীবকোষের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে প্রতি মুহূর্তে জীবদেহের অবিরাম পরিবর্তন হচ্ছে, তার ফলে জীবদেহ শিশু অবস্থা থেকে ক্রমে ক্রমে পূর্ণ যৌবনে বিকশিত হয় এবং অবশেষে বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হয়। কিন্তু দেহ ও মনের সব রকম পরিবর্তন হওয়া স্বত্বেও জীবের প্রকৃত সত্ত্বা আত্মার কোন পরিবর্তন হয় না। জড় দেহ ও সনাতন আত্মার মধ্যে এটিই হচ্ছে পার্থক্য। দেহের প্রকৃতিই হচ্ছে চির-পরিবর্তনশীল আর আত্মা হচ্ছে চিরশাশ্বত- সনাতন। এই সিদ্ধান্ত নির্বিশেষবাদী ও সবিশেষবাদী উভয় শ্রেণীর তত্ত্বদ্রষ্টারা স্বীকার করেছেন। বিষ্ণু পুরাণে (২/১২/৩৮) বলা হয়েছে, শ্রীবিষ্ণু ও তাঁর ধামসকল স্বতঃস্ফূর্ত চিন্ময় জ্যোতির দ্বারা উদ্ভাসিত (জ্যোতীংষি বষ্ণুর্ভুবনানি বিষ্ণুঃ)। তত্ত্বদর্শী মহাজনেরা যথাক্রমে সৎ, অসৎ- নিত্য ও অনিত্য বলতে চেতন ও জড় বস্তুকেই উল্লেখ করেন।

মায়ার দ্বারা মোহাচ্ছন্ন বদ্ধ জীবের প্রতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এটিই হচ্ছে সর্বপ্রথম উপদেশ। জীব হচ্ছে ভগবানের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই সে ভগবানের নিত্যদাস। এই জ্ঞান উপলব্ধি করা হলেই অজ্ঞানতার আবরণ উন্মোচিত হয় এবং সে তখন ভগবানের সঙ্গে উপাস্য আর উপাসকের সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। পূর্ণের সঙ্গে অংশের যে সম্পর্ক, ভগবানের সঙ্গে জীবের সেই সম্পর্ক – ভগবান হচ্ছেন পূর্ণ, আর জীব তাঁর অংশ। বেদান্তসূত্রো শ্রীমদ্ভগবতে বলা হয়েছে, ভগবান হচ্ছেন সব কিছুর উৎস – সব কিছুই উদ্ভূত হয়েছে ভগবানের থেকে। ভগবানের থেকে উদ্ভূত এই প্রকৃতিতে পরা ও অপরা এই দুটি স্তর আছে। জীব ভগবানের পরা প্রকৃতির অন্ত্রগত। সপ্তম অধ্যায়ে এই সম্বন্ধে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। শক্তি ও শক্তিমানের মধ্যে যদিও কোন ভেদ নেই, তবুও শক্তিমান হচ্ছেন শক্তির নিয়ন্তা। পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন শক্তিমান এবং শক্তি বা প্রকৃতি সর্ব অবস্থাতেই তাঁর নিয়ন্ত্রনাধীন। তাই, প্রভু ও ভৃত্য অথবা গুরু ও শিষ্যের সম্পর্কের মতো জীবসমূহ পরমেশ্বর ভগবানের অধীন। মায়ার অন্ধকারে যখন জীব আচ্ছন্ন থাকে, তখন সে ভগবৎ-তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারে না। ভগবান তাই জীবকে মায়ান্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে সত্য দর্শন করবার জন্য এই ভগবদগীতার শিক্ষা দান করেছেন।

 

শ্লোক – ১৭
অবিনাশি তু তদ্বিদ্বি যেন সর্বমিদং ততম।
বিনাশমব্যয়স্যাস্য ন কশ্চিৎ কর্তুমরহতি।। ১৭ ।।

অবিনাশি- বিনাশ রহিত, তু- কিন্তু, তৎ- তা, বিদ্ধি- জানবে, যেন- যার দ্বারা, সর্বম- সমগ্র শরীর, ইদম- এই, ততম- ব্যাপ্ত, বিনাশম- বিনাশ, অব্যয়স্য- অক্ষয়ের, অস্য- এই, ন কশ্চিৎ- কেউ নয়, কর্তুম- করতে, অরহতি- সমর্থ।

গীতার গান
অবিনাশী সেই বুঝ সর্বত্র বিস্তার।
যাহার অভাবে হয় দেহ মহাভার।।
ক্ষয়ব্যয় নাহি যার কে মারিতে পারে।
অমরের মার কিবা করহ বিচার।।

অনুবাদঃ যা সমগ্র শরীরে পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে, তাকে তুমি অবিনাশী বলে জানবে। সেই অব্যয় আত্মাকে কেউ বিনাশ করতে সক্ষম নয়।

তাৎপর্যঃ এই শ্লোকে আরো স্পষ্টভাবে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই আত্মা সারা দেহ জুড়ে বিস্তৃত রয়েছে। যে-কেউ হৃদয়ঙ্গম করতে পারে, সমগ্র দেহ জুড়ে কি বিস্তৃত হয়ে আছে – সেটি হচ্ছে চেতনা। প্রত্যেকেই তার দেহের সুখ ও বেদনা সম্বন্ধে সচেতন। চেতনার এই বিস্তার প্রত্যকের তার নিজের দেহেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু একজনের দেহের অনুভুতি অন্য আর কেউ অনুভব করতে পারে না এর থেকে বোঝা যায়, এক-একটি দেহ হচ্ছে এক-একটি স্বতন্ত্র আত্মার মূর্তরুপ এবং স্বতন্ত্র চেতনার মাধ্যমে আত্মার উপস্থিতির লক্ষণ অনুভুত হয়। এই আত্মার আয়তন কেশাগ্রের দশ সহস্র ভাগের একভাগের সমান বলে বর্ণনা করা হয়েছে। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে (৫/৯) প্রতিপন্ন করা হয়েছে –

বালাগ্রশতভাগস্য শতধা কল্পিতস্য চ।
ভাগো জীবঃ স বিজ্ঞেয়ঃ স চানস্ত্যায় কল্পতে।।

“কেশাগ্রকে শতভাগে ভাগ করে তাকে আবার শত ভাগে ভাগ করলে তার  যে আয়তন হয়, আত্মার আয়তনও ততখানি।“ সেই রকম অনুরুপ একটি শ্লোকে বলা হয়েছে –

কেশাগ্রশতভাগস্য শতাং শসদৃশাত্মকঃ।
জীবঃ সূক্ষ্মস্বরূপোইয়ং সংখ্যাতীতো হি চিৎকণঃ।।

“অসংখ্য যে চিৎকণা রয়েছে, তার আয়তন কেশাগ্রের দশ সহস্র ভাগের এক ভাগের সমান।“

সুতরাং এর থেকে আমরা বুঝতে পারি, জীবাত্মা হচ্ছে এক-একটি চিৎকণা, যার আয়তন পরমাণু থেকেও অনেক ছোট এবং এই জীবাত্মা বা চিৎকণা সংখ্যাতীত। এই অতি ক্ষুদ্র চিৎকণাগুলি জড় দেহের ও চেতনার মূল তত্ত্ব। কোন ঔষধের প্রভাব যেমন দেহের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, এই চিৎ-স্ফুলিঙ্গের প্রভাবও তেমনই সারা দেহ জুড়ে বিস্তৃত থাকে। আত্মার এই প্রবাহ চেতনারুপে সমগ্র দেহে অনুভূত হয় এবং সেটিই হচ্ছে আত্মার উপস্থিতির প্রমাণ। সাধারণ মানুষও মানুষ বুঝতে পারে, জড় দেহে যখন চেতনা থাকে না, তখন তা মৃত দেহে পরিণত হয় এবং কোন রকম জড় প্রচেষ্টার দ্বারাই আর সেই দেহে চেতনা ফিরিয়ে আনা যায় না। এর থেকে বোঝা যায়, চেতনার উদ্ভব জড় পদার্থের সংমিশ্রণের ফলে হয় না, তা হয় আত্মার থেকে। চেতনা থেকে আত্মার স্বাভাবিক প্রকাশ। আত্মার পারমানবিক পরিমাপ সম্বন্ধে মুন্ডক উপনিষদে (৩/১/৯) বলা হয়েছে –

এষোহণুরাত্মা চেতসা বেদিতব্যো যস্মিন প্রাণঃ পঞ্চধা সংবিবেশ।
প্রাণৈশ্চিত্তং সর্বমোতং প্রজানাং যস্মিন বিশুদ্ধে বিভবত্যেষ আত্মা।।

“আত্মা পরমাণুসদৃশ এবং শুদ্ধ বুদ্ধিমত্তার দ্বারা তাকে অনুভব করা যায়। পরমাণুসদৃশ এই আত্মা পঞ্চবিধ বায়ুতে (প্রাণ, অপান, সমান, ব্যান ও উদান) ভাসমান থেকে হৃদয়ে অবস্থান করে এবং জীবাত্মার সমগ্র দেহে তার প্রভাব বিস্তার করে। আত্মা যখন এই পঞ্চবিধ জড় বায়ুর কলুষিত প্রভাব থেকে পবিত্র হয়, তখন তার অপ্রাকৃত গুণাবলীর প্রকাশ হয়।“

হঠযোগের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে বিভিন্ন আসন প্রণালী অভ্যাস করার মাধ্যমে জড় পরিবেশের বন্ধন থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আত্মাকে মুক্ত করার জন্য আত্মার চারদিকে পরিবেষ্টিত পঞ্চবিধ বায়ুকে নিয়ন্ত্রন করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, দেহ তত্ত্বের এই অতি উন্নত বিজ্ঞানকে তথাকথিত হঠযোগীরা এক অতি বিকৃত রুপ দান করে জাগতিক সুখভোগ ও ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির বাসনায় প্রয়োগ করছে।

সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রেই বলা হয়েছে, জীবাত্মা পরমাণুসদৃশ। সুস্থ বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন যে কোন মানুষই উপলব্ধি করতে পারে যে, জীবাত্মাই হচ্ছে সর্বব্যাপ্ত, বিষ্ণুতত্ত্ব, অতি সহজেই বোঝা যায় যে, তারা বিকৃত মস্তিষ্কসম্পন্ন – অপ্রকৃতস্থ মানুষ।

পরমাণু চৈতন্যবিশিষ্ট্য জীবাত্মা কোন একটি বিশেষ দেহের সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হতে পারে, কিন্তু জীবাত্মা কোন অবস্থাতেই সর্বব্যাপ্ত বিষ্ণুতত্ত্ব হতে পারে না। মুন্ডক উপনিষদে বলা হয়েছে, প্রতিটি জীবের হৃদয়ে জীবাত্মা বর্তমান থাকে, কিন্তু এই আত্মা এত সূক্ষ্ম যে জয় ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে তা দেখা যায় না। বর্তমান যুগে অনুবীক্ষন যন্ত্রের সাহায্যেও এই অতি সূক্ষ্ম আত্মা মানুষের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয় না। তাই আধুনিক যুগের তথাকথিত বৈজ্ঞানিকেরা হঠকারিতা করে আত্মার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। কিন্তু একটু সুস্থ মস্তিষ্কে চিন্তা করলেই আত্মার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সমস্ত সন্দেহের নিরসন হয়। কারণ জীবের হৃদয়ে আত্মার সঙ্গে একসাথে অধিষ্ঠিত থেকে পরমাত্মাই জীবকে পরিচালিত করেন। তাই আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায়, জীবদেহের সমস্ত কার্যকলাপ হৃদয়ের দ্বারা পরিচালিত হয়। যে সমস্ত রক্তকণিকা ফুসফুস থেকে অক্সিজেন বহন করে, তারা তাদের শক্তি আহরণ করে আত্মা থেকে। আত্মা যখন জড় দেহ ত্যাগ করে চলে যায়, তখন রক্ত সঞ্চালন, শ্বাস-প্রশ্বাস আদি দেহের সমস্ত ক্রিয়াগুলিই বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা রক্তকণিকার এই গুরুত্ব স্বীকার করে থাকে, কিন্তু সমস্ত শক্তির উৎস যে আত্মা, তা তারা বুঝতে পারে না। কিন্তু তা হলেও তারা স্বীকার করে যে, হৃদয়ই হচ্ছে দেহের সমস্ত শক্তির কেন্দ্রস্থল।

আত্মার এই পারমানবিক চিৎ-কণাগুলিকে সূর্যকিরনের অণুর সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। সূর্যকিরনের মধ্যে অসংখ্য প্রভাময় অণু আছে। সেই রকম, পরমেশ্বর ভগবানের বিচ্ছুরিত চিৎকণাগুলি পরমেশ্বরের জ্যোতির পারমানবিক কণাস্বরূপ – যাকে বলা হয় প্রভা অর্থাৎ উৎকৃষ্টা শক্তি। সুতরাং, বৈদিক তত্ত্ববিজ্ঞান কিংবা আধুনিক বিজ্ঞান, যা কিছুই অনুসরণ করা যাক, দেহের মধ্যে আত্মার অস্তিত্ব কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আত্মা সম্পর্কিত এই বৈজ্ঞানিক তথ্য পরম পুরুষোত্তম ভগবান স্বয়ং ভগবদগীতায় সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।

 

শ্লোক – ১৮
অন্তবন্ত ইমে দেহা নিত্যস্যোক্তাঃ শরীরিণঃ।
অনাশিনোহপ্রমেয়স্য তস্মাদ যুধ্যস্ব ভারত ।। ১৮ ।।

অন্তবন্তঃ- বিনাশশীল, ইমে- এই সমস্ত, দেহাঃ- জড় দেহসকল, নিত্যস্য- নিত্যস্থায়ী, উক্তাঃ বলা হয়, শরীরিণঃ- দেহী আত্মার, অনাশিনঃ- অবিনাশী, অপ্রমেয়স্য- অপরিমেয়, তস্মাদ- অতএব, যুধ্যস্ব- যুদ্ধ কর, ভারত- হে ভারত-বংশীয়।

গীতার গান
নিঃশেষ হইয়া যাবে এই জড় দেহ।
নিত্য আত্মা জান ভাল না মরিবে কেহ।।
বিনাশি প্রমেয় নহে আত্মা ভাল মতে।
সত্য বুঝি দৃঢ়ব্রত হও ত, যুদ্ধেতে।।

অনুবাদঃ অবিনাশী, অপরিমেয় ও শাশ্বত আত্মার জড় দেহ নিঃসন্দেহে বিনাশশীল। অতএব হে ভারত! তুমি শাস্ত্রবিহিত স্বধর্ম পরিত্যাগ না করে যুদ্ধ কর।

তাৎপর্যঃ জড় দেহের ধর্মই হচ্ছে বিনাশ প্রাপ্ত হওয়া। জড় দেহ এই মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, নয়তো একশ বছর পরে ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু একদিন না একদিন এর ধ্বংস হবেই। অনিরদিষ্টকাল পর্যন্ত আত্মাকে টিকিয়ে রাখার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু আত্মা এত সূক্ষ্ম যে, তাকে পরিমাপ করাও অসম্ভব। সুতরাং দেহ ও আত্মা এই দুই তত্ত্বের পরিপ্রেক্ষিতে জীবের স্বরূপ বিচার করলে তখন আর কোন অনুশোচনা থাকতে পারে না, কারণ মানুষের প্রকৃত স্বরূপ আত্মা চিরশাশ্বত এবং কোন অবস্থাতেই তার বিনাশ হয় না, আর জড় দেহ হচ্ছে অনিত্য, একদিন না একদিন যখন তার ধ্বংস হবেই, তখন কোনভাবেই অনির্দিষ্ট কালের জন্য অথবা চিরকালের জন্য দেহটিকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। পূর্বকৃত কর্ম অনুসারে সমগ্র আত্মার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ এক-একটি জড় দেহ প্রাপ্ত হয়। সেই জন্যই শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে জীবন যাপন করা উচিৎ। শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে কর্তব্যকর্ম অনুষ্ঠান করার ফলে উপযুক্ত দেহ প্রাপ্ত হয়ে জীবাত্মা জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে। বেদান্ত-সূত্রে আত্মাকে আলোক বলে সম্বোধন করা হয়েছে, কারণ সে হচ্ছে পরম আলোকের অংশ। সূর্যের আলোক যেমন সমস্ত ব্রক্ষ্মান্ডকে প্রতিপালন করে, তেমনই আত্মার আলোকও জড় দেহকে প্রতিপালন করে। যে মুহূর্তে আত্মা তার দেহটি পরিত্যাগ করে, তখন থেকেই সেই পথটি পচতে শুরু করে। এর থেকে বোঝা যায়, আত্মাই এই দেহটিকে প্রতিপালন করে। দেহে আত্মা থাকে বলেই দেহটিকে এত সুন্দর বলে মনে হয়, কিন্তু আত্মা ব্যতীত দেহের কোনই গুরুত্ব নেই। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাই অর্জুনকে উপদেশ দিয়েছিলেন, দেহাত্মবুদ্ধি পরিত্যাগ করে ধর্ম সংস্থাপনের জন্য যুদ্ধ করতে।

 

শ্লোক – ১৯
য এনং বেত্তি হন্তারং যশ্চৈনং মন্যতে হতম।
উভৌ তৌ ন বিজানীতো নায়ং হন্তি ন হন্যতে ।। ১৯ ।।

যঃ- যিনি, এনম- একে, বেত্তি- জানেন, হন্তারম- হন্তা, যঃ- যিনি, চ- এবং, এনম- একে, মন্যতে- মনে করেন, হতম- নিহত, উভৌ- উভয়ে, তৌ- তাঁরা, ন- না, বিজানীতঃ- জানেন, ন- না, অয়ম- এই, হন্তি- হত্যা করেন, ন- না, হন্যতে- নিহত হন।

গীতার গান
যে জন বুঝেছে আত্মা মরে যেতে পারে।
অথবা যে জন বুঝে আত্মা অন্যে মারে।।
উভয়েই ভ্রমাত্মক কিছু নাহি বুঝে।
মরে না মারে না আত্মা জান যুদ্ধ যুঝে।।

অনুবাদঃ যিনি জীবাত্মাকে হন্তা বলে মনে করেন কিংবা যিনি একে নিহত বলে ভাবেন, তাঁরা উভয়েই আত্মার প্রকৃত স্বরূপ জানেন না। কারণ আত্মা কাউকে হত্যা করেন না এবং কারো দ্বারা নিহতও হন না।

তাৎপর্যঃ যখন কোন দেহধারী জীব মারাত্মক অস্ত্রের দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হয়, তখন জানতে হবে যে, দেহের মধ্যে আত্মার মৃত্যু হয় না। আত্মা তখন আর সেই দেহে বাস করতে পারে না। বাস করার অনুপযোগী বলে আত্মা তখন সেই দেহটি ত্যাগ করে। যারা মূর্খ, তাঁরা আত্মার এই দেহত্যাগ করাকে আত্মার মৃত্যু বলে মনে করে। কিন্তু পরবর্তী শ্লোকে আমরা জানতে পারব – আত্মা এত সূক্ষ্ম যে, কোন অস্ত্রের দ্বারাই তাকে হত্যা করা সম্ভব নয়। আর তা ছাড়া আত্মা চিরশাশ্বত ও চিন্ময় হবার ফলে, কোন অবস্থাতেই তার বিনাশ হয় না। যার মৃত্যু হয় অথবা মৃত্যু হয়েছে বলে মনে হয়, তা হচ্ছে জড় দেহটি মাত্র। অবশ্য তা বলতে এটি বোঝায় না যে, দেহটিকে হত্যা করলে কোন অন্যায় হয় না। বেদে নির্দেশ দেওয়া আছে, মা হিংসাৎ সর্বা ভূতানি – কোন জীবের প্রতি হিংসা করো না। কোনও জীবের আত্মিক সত্ত্বাকে হত্যা করা যায় না, এই উপলব্ধি হওয়ার ফলে প্রাণিহত্যায় উৎসাহ লাভ করা উচিৎ নয়। বিনা কারণে অন্যায়ভাবে যখন পশু হত্যা করা হয়, তখন তাতে অবশ্যই পাপ হয়। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করলে যেমন রাষ্ট্রের আইন অনুসারে হত্যাকারী শাস্তি পায়, ভগবানের আইনেও তেমনই তার জন্য শাস্তি পেতে হয়। সনাতন-ধর্মকে রক্ষা করার জন্য ভগবান অবশ্য অর্জুনকে যুদ্ধ করতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, তিনি কখনোই অর্জুনকে তাঁর খেয়ালখুশি মতো হত্যা করতে আদেশ দেননি।

 

শ্লোক – ২০
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ।। ২০ ।।

ন- না, জায়তে- জন্ম হয়, ম্রিয়তে- মৃত্যু হয়, বা- অথবা, কদাচিৎ- কখনো (অতীত, বর্তমান অথবা ভবিষ্যতে), ন- না, অয়ম- এই, ভূত্বা- উৎপন্ন হয়ে, ভবিতা- উৎপন্ন হবে, বা- অথবা, ন- না, ভূয়ঃ- উৎপন্ন হয়েছে, অজঃ- জন্মরহিত, নিত্যঃ- নিত্য, শাশ্বতঃ- চিরস্থায়ী, অয়ম- এই, পুরাণঃ- পুরাতন, ন- না, হন্যতে- নিহত হয়, হন্যমানে- হত হলেও, শরীরে- দেহ।

গীতার গান
জনম মরণ নাই, হয় নাই, হবে নাই,
হয়েছিল তাহা নহে আত্মা।
অজ নিত্য শাশ্বত, পুরাতন নিত্যসত্য,
শরীরের নাশ নহে মৃত্যু।।

অনুবাদঃ আত্মার কখনো জনম হয় না বা মৃত্যু হয় না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁর উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না। তিনি জন্মরহিত, শাশ্বত, নিত্য এবং পুরাতন হলেও চিরনবীন। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনো বিনষ্ট হয় না।

তাৎপর্যঃ গুনগতভাবে পরমাত্মা ও তাঁর পরমাণুসদৃশ অংশ জীবাত্মার মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। জড় দেহের যেমন পরিবর্তন হয়, আত্মার তেমন কোন পরিবর্তন হয় না। তাই আত্মাকে বলা হয় কুটম্ব, অর্থাৎ কোন কালে, কোন অবস্থায় তার কোন পরিবর্তন হয় না। জড় দেহে ছয় রকমের পরিবর্তন দেখা যায়। মাতৃগর্ভে তার জন্ম হয়, তার বৃদ্ধি হয়, কিছুকালের জন্য স্থায়ী হয়, তা কিছু ফল প্রসব করে, ক্রমে ক্রমে তা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং অবশেষে তার বিনাশ হয়। আত্মার কিন্তু এই রকম কোন পরিবর্তনই হয় না। আত্মার কখনো জন্ম হয় না, কিন্তু যেহেতু সে জড় দেহ ধারণ করে, তাই সেই দেহটির জন্ম হয়। যার জন্ম হয়, তার মৃত্যু অবধারিত। এটিই প্রকৃতির নিয়ম। তেমনই আবার, যার জন্ম হয় না তার কখনোই মৃত্যু হতে পারে না। আত্মার কখনো জন্ম হয় না, তাই তার মৃত্যুও হয় না, আর সেই জন্য তার অতীত, বর্তমান অথবা ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। সে নিত্য, শাশ্বত ও পুরাতন, অর্থাৎ কবে যে তার উদ্ভব হয়েছিল তার কোনও ইতিহাস নেই। আমরা দেহ-চেতনার দ্বারা প্রভাবিত, তাই আমরা আত্মার জন্ম-ইতিহাস খুঁজে থাকি। কিন্তু যা নিত্য, শাশ্বত, তার তো কোনও শুরু থাকতে পারে না। দেহের মতো আত্মা কখনো জরাগ্রস্থ হয় না। তাই, বৃদ্ধ অবস্থাতেও মানুষ তার অন্তরে শৈশব অথবা যৌবনের উদ্যমতা অনুভব করে। দেহের পরিবর্তন কখনোই আত্মাকে প্রভাবিত করে না। জড় দেহের মতো আত্মার কখনো ক্ষয় হয় না। দেহের মাধ্যমে যেমন সন্তান-সন্ততি উৎপন্ন হয়, আত্মা কখনো তেমনভাবে অন্য কোনও আত্মা উৎপাদন করে না। দেহজাত সন্তান-সন্ততিরা প্রকৃতপক্ষে ভিন্ন ভিন্ন আত্মা। স্ত্রী-পুরুষের দেহের মিলনের ফলে আত্মা নতুন দেহ প্রাপ্ত হয় বলে, সেই আত্মাকে কোন বিশেষ স্ত্রী-পুরুষের সন্তান বলে মনে হয়। আত্মার উপস্থিতির ফলে দেহের বৃদ্ধি হয়, কিন্তু আত্মার কখনো বৃদ্ধি বা কোন রকম পরিবর্তন হয় না। এভাবেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি, দেহে যে ছয় রকমের পরিবর্তন হয়, আত্মা তার দ্বারা প্রভাবিত হয় না।

কঠ উপনিষদেও (১/২/১৮) গীতার এই শ্লোকের মতো একটি শ্লোক আছে –

ন জায়তে ম্রিয়তে বা বিপশ্চিন্নায়ং কুতশ্চিন্ন বভূব কশ্চিৎ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।।

এই শ্লোকটির সঙ্গে ভগবদগীতার শ্লোকটির পার্থক্য কেবল এখানে বিপশ্চিৎ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে জ্ঞানী অথবা হহানের সহিত।

আত্মা পূর্ণ জ্ঞানময়, অথবা সে সর্বদাই পূর্ণচেতন। তাই, চেতনাই হচ্ছে আত্মার লক্ষণ। এমন কি আত্মাকে হৃদয়ের মধ্যে দেখা না গেলেও চেতনার প্রকাশের মধ্যে দিয়ে তার উপস্থিতি অনুভব করা যায়। অনেক সময় মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাবার ফলে অথবা অন্য কোন কারণে সূর্যকে দেখা যায় না, কিন্তু সূর্যের আলো সর্বদাই সেখানে রয়েছে এবং আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, এখন দিনের বেলা। ভোরের আকাশে যখনই একটু আলোর আভাস দেখতে পাওয়া যায়, তখনই আমরা বুঝতে পারি, আকাশে সূর্যের উদয় হচ্ছে। ঠিক তেমনই, মানুষই হোক বা পশুই হোক, কীট-পতঙ্গই হোক বা উদ্ভিদই হোক, একটুখানি চেতনার বিকাশ দেখতে পেলেই আমরা তাদের মধ্যে আত্মার উপস্থিতি অনুভব করতে পারি। আত্মার সচেতনতা ও পরমাত্মার সচেতনতার মধ্যে অবশ্য অনেক পার্থক্য রয়েছে, কারণ পরমাত্মা হচ্ছেন সর্বজ্ঞ। স্বতন্ত্র জীবের চেতনা বিস্মৃতিপ্রবণ, সে যখন তার সচ্চিদানন্দময় স্বরূপের কথা ভুলে যায়, তখন সে শ্রীকৃষ্ণের পরম উপদেশ থেকে শিক্ষা ও আলোক প্রাপ্ত হয়। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বিস্মরণশীল জীবের মতো নন। যদি তাই হত, কৃষ্ণের ভগবদগীতার উপদেশাবলী অর্থহীন হয়ে পড়ত।

আত্মা দুই রকমের- অণু আত্মা ও পরমাত্মা বা বিভু-আত্মা। কঠ উপনিষদে (১/২/২০) তার বর্ণনা করে বলা হয়েছে –

অণোরণীয়ান্মহতো মহীয়ান আত্মাস্য জন্তোনিহিতো গুহায়াম।
তমক্রতুঃ পশ্যতি বীতশোকো ধাতুঃ প্রসাদান্মহিমানমাত্মনঃ।।

“পরমাত্মা ও জীবাত্মা উভয়েই বৃক্ষসদৃশ জীবদেহের হৃদয়ে অবস্থিত। যিনি সব রকম জড় বাসনা ও সব রকমের শোক থেকে মুক্ত হতে পেরেছেন, তিনি কেবল ভগবানের কৃপার ফলে আত্মার মহিমা উপলব্ধি করতে পারেন।“ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমাত্মারও উৎস, যা পরবর্তী অধ্যায়ে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। আর অর্জুন হচ্ছেন তাঁর প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে আত্মবিস্মৃত জীবাত্মা, তাই তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে অথবা তাঁর সুযোগ্য প্রতিনিধি সদগুরুর কাছ থেকে এই পরম তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে হয়।

 

শ্লোক – ২১
বেদাবিনাশিনং নিত্যং য এনমজমব্যয়ম।
কথং স পুরুষঃ পার্থ কং ঘাতয়তি হন্তি কম ।। ২১ ।।

বেদ- জানেন, অবিসাশিনম- অবিনাশী, নিত্যম- সর্বদা বর্তমান, যঃ- যিনি, এনম- এই (আল্লাকে), অজম- জন্মরহিত, অব্যয়ম- অক্ষয়, কথম- কিভাবে, সঃ- সেই, পুরুষঃ- ব্যক্তি, পার্থ- হে পার্থ (অর্জুন), কম- কাকে, ঘাতয়তি- বধ করাতে, হন্তি- হত্যা করতে, কম- কাউকে।

গীতার গান
যে জেনেছে আত্মা নিত্য অজ অবিনাশী।
অব্যয় অজর আত্মা সর্ব দিবানিশি।।
সে কেন মারিবে অন্যে মূর্খের মতন।
সে জানে নিশ্চিত আত্মা মরে না কখন।।

অনুবাদঃ হে পার্থ! যিনি এই আত্মাকে আবিনাশী, শাশ্বত, জন্মরহিত ও অক্ষয় বলে জানেন, তিনি কিভাবে কাউকে হত্যা করতে বা হত্যা করাতে পারেন?

তাৎপর্যঃ সব কিছুরই যথার্থ উপযোগিতা আছে এবং যিনি পূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন, তিনি জানেন কোন জিনিস কোথায় এবং কিভাবে নিয়োগ করলে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা হবে। আর সব কিছুর মতো হিংসারও যথার্থ উপযোগিতা আছে এবং যিনি যথার্থ জ্ঞানী, তিনি জানেন কোথায়, কখন, কিভাবে হিংসার প্রয়োগ করতে হয়। বিচারক যখন আসামীকে খুনের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে প্রাণদন্ড দেন, তখন হিংসাত্মক কাজ করেছেন বলে বিচারককে কেউ অভিযুক্ত করে না। তার কারণ, তিনি বিচারের রীতি অনুযায়ী এই দন্ড দেন। মানব-সমাজের শ্রেষ্ঠ নীতিশাস্ত্র মনুসংহিতাতে খুনীকে প্রাণদন্ডে দন্ডিত করার নির্দেশ দেওয়া আছে। কারণ, এই শাস্তি পাবার ফলে সেই খুনির মহাপাপের ভার লাঘব হয়, পরবর্তী জীবনে তাকে আর তার ফলভোগ করতে হয় না। সুতরাং, রাজা যখন খুনীকে প্রাণদন্ড দেন, তখন তার মঙ্গলের জন্যই তা দেওয়া হয়। তেমনই, শ্রীকৃষ্ণ যখন যুদ্ধ করবার আদেশ দেন, তখন আমরা সহজেই বুঝতে পারি, চরম বিচারের জন্যই তিনি এই হিংসার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। তাই, অর্জুনের কর্তব্য হচ্ছে ভগবানের নির্দেশ পালন করা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরম করুণাময়, তাই আপাতদৃষ্টিতে তাঁর কার্যকলাপ হিংসাত্মক বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা হচ্ছে তাঁর আশীর্বাদ। তেমনই, তাঁর নির্দেশে যখন হিংসার আশ্রয় গ্রহণ করা হয় তখন সেই হিংসা আশীর্বাদে পরিণত হয়। আর তা ছাড়া, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, মানুষের প্রকৃত পরিচয় হচ্ছে তার আত্মা এবং সেই আত্মাকে কখনো হত্যা করা যায় না। সুতরাং, সুবিচারমূলক প্রশাসনের স্বার্থে ঐ ধরণের হিংসাত্মক কার্যকলাপের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শল্য-চিকিৎসক অস্ত্রোপচার করেন রোগ সারাবার জন্য, রোগীকে মেরে ফেলবার জন্য নয়। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান তাঁর আদেশ আনুসারে যুদ্ধ করার ফলে অর্জুনের কোনও পাপ হবারই সম্ভাবনা নেই, উপরন্তু তাতে সমগ্র মানব-সমাজের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল হওয়াটাই স্বাভাবিক।

 

শ্লোক – ২২
বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়
নরানি গৃহ্নাতি নরোহপরাণি।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্য-
ন্যানি সংযাতি নবানি দেহী ।। ২২ ।।

বাসাংসি- বস্ত্র, জীর্ণানি- জীর্ণ, যথা- যেমন, বিহায়- পরিত্যাগ করে, নবানি- নতুন বস্ত্র, গৃহ্নাতি- গ্রহণ করে, নরঃ- মানুষ, অপরাণি- অন্য, তথা- তেমনই, শরীরাণি- শরীর, বিহায়- ত্যাগ করে, জীর্ণানি- জীর্ণ, অন্যানি- অন্য, সংযাতি- ধারণ করে, নবানি- নতুন দেহ, দেহী- শরীরী।

গীতার গান
পুরাতন বস্ত্র যথা, ভঙ্গুর শরীর তথা,
এক ছাড়ি অন্য বস্ত্র পরে।
পুরাতন বস্ত্র ছাড়ে, নবীন বসন পরে,
নবীন শরীর সেই ধরে।।
জীর্ণ শরীর ছাড়ি, নবীন শরীর ধরি,
দেহীনব্য হয় পুনর্বার।
দেহ দেহী এই ভেদ, তাহাতে বা কিবা খেদ,
ছাড় দুঃখ যুদ্ধ ক্রিবার।।

অনুবাদঃ মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, দেহীও তেমনই জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করেন।

তাৎপর্যঃ পারমাণবিক জীবাত্মা যে এক দেহ ছেড়ে আর এক দেহ ধারণ করে, তা সর্বজনস্বীকৃত তথ্য। তবু আধুনিক যুগের কিছু বৈজ্ঞানিক আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, অথচ হৃদয় থেকে কেমন করে শক্তি সঞ্চালিত হয় তা বোঝাতে পারে না। কিন্তু তারাও স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, প্রতি মুহূর্তে দেহের পরিবর্তন হচ্ছে এবং এই পরিবর্তনের ফলেই দেহে শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্য দেখা দেয়। বার্ধক্যের পর আত্মা অন্য দেহ ধারণ করে। এই সম্বন্ধে ইতিপূর্বেই (২/২৩) বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

পরমাত্মার কৃপার ফলেই অণু আত্মা ভিন্ন ভিন্ন দেহ প্রাপ্ত হয়। বন্ধু যেমন বন্ধুর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে, পরমাত্মাও তেমন অণু আত্মার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। মুন্ডক উপনিষদ ও শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে আত্মা ও পরমাত্মাকে একই গাছে বসে থাকা দুটি পাখির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একটি পাখি (জীবাত্মা) সেই গাছের ফল খাচ্ছে, অন্য পাখিটি (শ্রীকৃষ্ণ) তাঁর বন্ধুকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন। এই দুটি পাখি গুণগতভাবে যদিও এক, তবুও তাদের একজন সেই জড়-জাগতিক গাছের ফলের আকর্ষণে আবদ্ধ, আর অন্য জন একান্ত সুহৃদের মতো তার কার্যকলাপ কেবল পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সাক্ষীরুপ পাখি, আর অর্জুন হচ্ছেন ফল আহারে রত পাখি। যদিও তাঁরা একে অপরের বন্ধু, তবুও তাঁদের একজন হচ্ছেন প্রভু এবং অন্য জন হচ্ছেন ভৃত্য। জীবাত্মা পরমাত্মার সঙ্গে তার এই সম্পর্কের কথা ভুলে যাবার ফলেই এক গাছ থেকে আর এক গাছে অর্থাৎ এক দেহ থেকে আর এক দেহে সে ঘুরে বেড়ায়। এই জড় দেহরুপ বৃক্ষে জীবাত্মা কঠোর সংগ্রাম করছে, কিন্তু যে মুহূর্তে সে অন্য পাখিটিকে পরম গুরুরুপে গ্রহণ করতে সম্মত হয়, যেভাবে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ লাভের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করতে সম্মত হয়েছিলেন, তৎক্ষণাৎ অধীন পাখিটি সমস্ত শোক থেকে মুক্ত হয়। মুন্ডক উপনিষদে (৩/১/২) ও শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে (৪/৭) প্রতিপন্ন করে বলা হয়েছে –

সমানে বৃক্ষে পুরুষো নিমগ্নোহনীশয়া শোচতি মুহ্যমানঃ।
জুস্টং যদা পশ্যত্যন্যমীশমস্য মহিমানমিতি বীতশোকঃ।।

“দুটি পাখি একই গাছে বসে আছে, কিন্তু যে পাখিটি ফল আহারে রত সে গাছের ফলের ভোক্তারুপে সর্বদাই শোক, আশঙ্কা ও উদ্বেগের দ্বারা মুহ্যমান। কিন্তু যদি সে একবার তার নিত্যকালের বন্ধু অপর পাখিটির দিকে ফিরে তাকায়, তবে তৎক্ষণাৎ তার সমস্ত শোকের অবসান হয়, কারণ তার বন্ধু হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান এবং তিনি সমগ্র ঐশ্চর্যের দ্বারা মহিমান্বিত।“ অর্জুন তাঁর নিত্য কালের বন্ধু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দিকে ফিরে তাকিয়েছেন এবং তাঁর কাছ থেকে ভগবদগীতার তত্ত্ব জানতে পেরেছেন। এভাবেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে শ্রবণ করার ফলে তিনি ভগবানের পরম মহিমা উপলব্ধি করতে পারেন এবং সমস্ত শোক থেকে মুক্ত হন।

ভগবান এখানে অর্জুনকে উপদেশ দিয়েছেন, তাঁর বৃদ্ধ পিতামহ, শিক্ষক আদি আত্মীয়-স্বজনদের জন্য শোক না করতে। পক্ষান্তরে, সেই ধর্মযুদ্ধে প্রাণ ত্যাগ করার ফলে তাঁদের দেহগত কর্মফল জনিত সমস্ত পাপ থেকে তাঁরা মুক্ত হবেন বলে, আনন্দিত হওয়া উচিৎ। যজ্ঞবেদিতে অথবা ধর্মযুদ্ধে আত্মোৎসর্গ করলে তৎক্ষণাৎ সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায় এবং তাঁর ফলে উচ্চতর জীবন লাভ হয়। সুতরাং, অর্জুনের শোক করবার কোনই কারণ ছিল না।

 

শ্লোক – ২৩
নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রানি নৈনং দহতি পাবকঃ।
ন চৈনং ক্লেয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ ।। ২৩ ।।

ন- না, এনম- এই আত্মাকে, ছিন্দস্তি- ছেদন করতে পারে, শস্ত্রানি- অস্ত্রসমূহ, ন- না, এনম- এই আত্মাকে, দহতি- দহন করতে পারে, পাবকঃ- অগ্নি, ন- না, চ- ও, এনম- এই আত্মাকে, ক্লেদয়ন্তি- আর্দ্র করতে পারে, আপঃ- জল, ন- না, শোষয়তি- শুষ্ক করতে পারে, মারুতঃ- বায়ু।

গীতার গান
অস্ত্রাঘাতে নাহি কাটে চিন্ময় শরীর।
অগ্নি না জ্বালায় তাহা শুন বিজ্ঞ বীর।।
জল দ্বারা নাহি ভিজে বায়ু না শুকায়।
ঘাত প্রতিঘাত সব জড়েতে জুয়ায়।।

অনুবাদঃ আত্মাকে অস্ত্রের দ্বারা কাটা যায় না, আগুনে পোড়ানো যায় না, জলে ভেজানো যায় না, অথবা হওয়াতে শুকানোও যায় না।

তাৎপর্যঃ তরবারি, আগ্নেয় অস্ত্র, পর্জন্যাস্ত্র, বায়বীয় অস্ত্র আদি কোন রকমের অস্ত্রশস্ত্রই আত্মাকে হত্যা করতে পারে না। এই শ্লোকে বোঝা যায়, মহাভারতের যুগে আধুনিক যুগের মতো আগ্নেয়াস্ত্র তো ছিলই, আর তাছাড়া জল, বায়ু, আকাশ আদির তৈরি অস্ত্রের ব্যবহারও ছিল। আধুনিক যুগের পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্রগুলি এক রকমের আগ্নেয়াস্ত্র, কিন্তু তথাকথিতভাবে বিজ্ঞানের উন্নতি হলেও জল, বায়ু, আকাশ আদির দ্বারা নির্মিত অস্ত্রের ব্যবহার আধুনিক বৈজ্ঞানিকদের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। মহাভারতের যুগে জলীয় অস্ত্রের দ্বারা পারমাণবিক অস্ত্রের মতো আগ্নেয়াস্ত্রকে খন্ডন করা হত – যা আজকের বৈজ্ঞানিকদের কল্পনারও অতীত। সেই যুগের বীরেরা যে সমস্ত অদ্ভুত ঝটিকা অস্ত্রের ব্যবহার জানতেন, তা আধুনিক বৈজ্ঞানিকেরা কল্পনাও করতে পারে না। অগ্নি, জল, বায়ু, আকাশ আদির এত সমস্ত অস্ত্র থাকলেও, কোন বৈজ্ঞানিক অস্ত্রের দ্বারাই আত্মাকে হত্যা করা যায় না।

মায়াবাদীরা বোঝাতে পারেন না, কেমন করে জীবাত্মা নিতান্তই অজ্ঞতার ফলে জড় অস্তিত্ব লাভ করে এবং তার ফলে মায়াশক্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আত্মাকে যেমন অস্ত্রের দ্বারা কাটা যায় না, তেমনই আত্মাকে তার উৎস পরমাত্মার থেকেও কখনো বিচ্ছিন্ন করা যায় না, বরং স্বতন্ত্র জীবাত্মাগুলি পরমাত্মার শাশ্বত ভিন্নাংশ। যেহেতু সনাতন জীবাত্মা পরমাণুসদৃশ, তাই ভগবানের বহিরঙ্গা মায়াশক্তির দ্বারা তাঁদের আচ্ছাদিত হয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যায় এবং এভাবে তারা ভগবানের সান্নিধ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে, ঠিক যেমন আগুনের স্ফুলিঙ্গ, যদিও আগুনের সঙ্গে তা গুণগতভাবে এক ও অভিন্ন, কিন্তু আগুনের থেকে বেরিয়ে এলেই তা নিভে যায় এবং তখন আর তার মধ্যে আগুনের বৈশিষ্ট্যগুলি দেখা যায় না। তেমনই পরমাসদৃশ জীবাত্মা ভগবৎ-বিমুখ হয়ে পড়লে মায়াশক্তির দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে এবং তার প্রকৃত স্বরূপ বিস্মৃত হয়ে পড়ার ফলে নানা রকম দুঃখকষ্ট ভোগ করতে থাকে। বরাহ পুরানে বলা হয়েছে, জীবাত্মা পরমাত্মার বিভিন্নাংশ। ভগবদগীতাতেও বলা হয়েছে, জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার এই সম্পর্ক নিত্য শাশ্বত। সুতরাং, মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত হবার পরও জীবাত্মা স্বতন্ত্র স্বরূপেই বিদ্যমান থাকে, যা অর্জুনের প্রতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশেই সুস্পষ্ট উপলব্ধি হয়। ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান লাভ করার পর অর্জুন মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু তা বলে তিনি শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে এক হয়ে যাননি।

 

শ্লোক – ২৪
অচ্ছেদ্যোহয়মদাহ্যোহয়মক্লেদ্যোহশোষ্য এব চ।
নিত্যঃ সর্বগতঃ স্থাণুরচলোহয়ং সনাতনঃ ।। ২৪ ।।

অচ্ছেদ্যঃ- অচ্ছেদ্য, অয়ম- এই আত্মা, অদাহ্যঃ- পোড়ানো যায় না, অয়ম- এই আত্মাকে, অক্লেদ্যঃ- ভিজানো যায় না, অশোষ্যঃ- শুকানো যায় না, এব- অবশ্যই, চ- এবং, নিত্যঃ- চিরস্থায়ী, সর্বগতঃ- সর্বব্যাপ্ত, স্থাণুঃ- অপরিবর্তনীয়, অচলঃ- নিশ্চল, অয়ম- এই আত্মা, সনাতনঃ- নিত্য বর্তমান।

গীতার গান
অচ্ছেদ্য যে আত্মা হয় অক্লেদ্য অশোষ্য।
চিদানন্দ আত্মা নহে জড়ের সে পোষ্য।।
সর্বত্র আত্মার গতি স্থির সনাতন।
অচল অটল আত্মা নিত্য সে নূতন।।

অনুবাদঃ এই আত্মা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য ও অশোষ্য। তিনি চিরস্থায়ী, সর্বব্যাপ্ত, অপরিবর্তনীয়, অচল ও সনাতন।

তাৎপর্যঃ পারমাণবিক আত্মার এই সমস্ত গুণাবলী নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, সে অবশ্যই পরমাত্মার পরমাণুসদৃশ অংশ এবং সে নিত্যকাল অপরিবর্তিত ভাবে একই পরমাণুরুপে চিরকাল বর্তমান থাকে। অদ্বৈতবাদীরা যে বলে থাকেন, মায়ামুক্ত হলে জীবাত্মা পরমাত্মায় পরিণত হয়, সেই তত্ত্ব এই শ্লোকে ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়। মায়ামুক্ত হবার পর জীবাত্মা ইচ্ছা করলে ভগবানের দেহনির্গত ব্রক্ষ্মজ্যোতিতে চিৎকণারুপে বিরাজ করতে পারে, কিন্তু বুদ্ধিমান জীবাত্মারা ভগবৎ-ধামে প্রবেশ করে ভগবানের সাহচর্য লাভ করে।

এখানে সর্বগত (‘সর্বব্যাপ্ত’) শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ, কেন না কোন সন্দেহ নেই যে, ঈশ্বরের সৃষ্টির সর্বত্রই আত্মা বিরাজ করছে। জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে, এমন কি আগুনেও জীবাত্মা রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় আগুনে আত্মা নেই, কিন্তু এই শ্লোকে আমরা বুঝতে পারি, সেই ধারণাটি ভ্রান্ত, কারণ এখানে স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে, আগুন আত্মাকে দহন করতে পারে না। এর থেকে বোঝা যায়, সূর্যলোকেও সেখানকার উপযোগী দেহ ধারণ করে জীবাত্মা রয়েছে। সূর্যলোকে যদি জীব না থাকত, তা হলে সর্বগত, অর্থাৎ ‘সর্বত্র আত্মার গতি’ কথাটি ব্যবহার করা হত না।

 

শ্লোক – ২৫
অব্যক্তোহয়মচিন্ত্যোহয়মবিকার্যোহয়মুচ্যতে।
তস্মাদেবং বিদিতৈনং নানুশোচিতুমহরসি ।। ২৫ ।।

অব্যক্তঃ- ইন্দ্রিয়াদির অগোচর, অয়ম- এই আত্মা, অচিন্ত্যঃ- চিন্তার অতীত, অয়ম- এই আত্মা, অবিকার্যঃ- অপরিবর্তনীয়, অয়ম- এই আত্মা, উচ্যতে- বলা হয়, তস্মাৎ- অতএব, এবম- এভাবে, বিদিত্বা- ভালভাবে জেনে, এনম- এই আত্মাকে, ন- নয়, অনুশোচিতুম- শোক করা, অরহসি- উচিৎ।

গীতার গান
কাটা জ্বালা ভিজা শুকা জড়ের লক্ষণ।
জড়ের দ্বারা ব্যক্ত নহে অব্যক্ত কখন।।
মন দ্বারা চিন্ত্য হয় জড়ের লক্ষণ।
আত্মা জড় বস্তু নহে অচিন্ত্য কথন।।
জড়ের বিকার হয় আত্মা অবিকার।
জড় আত্মা বিভিন্নতা শুন বার বার।।
যথাযথ আত্মতত্ত্ব করহ বিচার।
বিচার করিলে চিত্তে পাবে চমৎকার।।

অনুবাদঃ এই আত্মা অব্যক্ত, অচিন্ত্য ও অবিকারী বলে শাস্ত্রে উল্লেখ হয়েছে। অতএব এই সনাতন স্বরূপ অবগত হয়ে দেহের জন্য তোমার শোক করা উচিৎ নয়।

তাৎপর্যঃ পূর্বে বলা হয়েছে, জড়-জাগতিক বিচারে আত্মার আয়তন এত সূক্ষ্ম যে, সবচেয়ে শক্তিশালী অণুবীক্ষন যন্ত্রের সাহায্যেও তাকে দেখা যায় না, তাই সে অদৃশ্য। আত্মার অস্তিত্বকে পরীক্ষামূলকভাবে বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার দ্বারা প্রমাণ করা যায় না, এর একমাত্র প্রমাণ হচ্ছে শ্রুতি-প্রমাণ বা বৈদিক জ্ঞান। আত্মার অস্তিত্ব আমরা সব সময়ই অনুভব করতে পারি। আত্মার অস্তিত্ব সম্বন্ধে কারো মনেই কোন সন্দেহ থাকা উচিৎ নয়। তাই এই বৈদিক সত্যকে আমাদের গ্রহণ করতেই হবে, কারণ এছাড়া আর কোন উপায়েই আত্মার অস্তিত্বের এই নিগূঢ় তত্ত্বকে জানতে পারা যায় না। উচ্চতর কর্তৃপক্ষের উপর নির্ভর করে আমাদের অনেক কিছুকেই স্বীকার করতে হয়। আমাদের পিতৃপরিচয় যেমন মায়ের কাছ থেকে জানা ছাড়া আর কোন উপায়েই জানতে পারা যায় না এবং মায়ের প্রদত্ত পিতৃপরিচয়কে যেমন আমরা অস্বীকার করতে পারি না, আত্মা স্মবন্ধেও তেমন বৈদিক জ্ঞান বা শ্রুতি প্রমাণ ছাড়া আর কোন উপায়েই জানা সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে বলা যায়, মানুষের সীমিত ইন্দ্রিয়লব্ধ জড় জ্ঞানের দ্বারা কখনোই আত্মার তত্ত্ব উপলব্ধি করা যায় না। বেদে বলা হয়েছে আত্মা হচ্ছে চেতন। আত্মার থেকেই সমস্ত চেতনের প্রকাশ হয়। এই সত্যকে আমরা অনায়াসে উপলব্ধি করতে পারি। তাই যারা বুদ্ধিমান, তাঁরা এই বৈদিক সত্যকে স্বীকার করেন। দেহের পরিবর্তন হলেও আত্মার কখনো কোন পরিবর্তন হয় না, চির-অপরিবর্তনীয় আত্মা চিরকালই বিভূচৈতন্য পরমাত্মার পরমাণু সদৃশ অংশরুপেই বিদ্যমান থাকে। পরমাত্মা অসীম-অনন্ত এবং আত্মা পরমাণুসদৃশ। আত্মার কখনো কোন রকম পরিবর্তন হয় না, তাই সে চিরকালই পরমাণুসদৃশই থাকে। তার পক্ষে বিভূচৈতন্য-বিশিষ্ট পরমাত্মা বা ভগবান হওয়া কখনোই সম্ভব নয়। বেদে নানা রকমভাবে বারবার এও কথার উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে আমরা আত্মার অস্তিত্বকে উপলব্ধি করতে পারি। কোনও তত্ত্বকে নির্ভুলভাবে ও সম্যকরুপে বুঝতে হলে, সেই জন্য তার পুনরাবৃত্তি দরকার।

 

শ্লোক – ২৬
অথ চৈনং নিত্যজাতং নিত্যং বা মন্যসে মৃতম।
তথাপি ত্বং মহাবাহো নৈনং শোচিতুমরহসি ।। ২৬ ।।

অথ- আর যদি, চ- ও, এনম-এই আত্মাকে, নিত্যজাতম- সর্বদা জন্মশীল, নিত্যম- নিত্য, বা- অথবা, মন্যসে- মনে কর, মৃতম- মৃত, তথাপি- তবুও, ত্বম- তুমি, মহাবাহো- হে মহাবীর, ন- না, এমন- এই আত্মার জন্য, শোচিতুম- শোক করা, অরহসি- উচিৎ নয়।

গীতার গান
বিচার করিবে যবে শোক নাহি রবে।
আত্মার নিত্যত্ব জানি নিত্যানন্দ পাবে।।
যদি তাই মান তুমি দেহই সর্বস্ব।
পরিচয় নাহি কিছু আত্মার নিজস্ব।।
নিত্যজন্ম নিত্যমৃত্যু দেহ মাত্র হয়।
তবুও তোমার দুঃখ নাহি তবু তায়।।

অনুবাদঃ হে মহাবাহো! আর যদি তুমি মনে কর যে, আত্মার বারবার জন্ম হয় এবং মৃত্যু হয়, তা হলেও তোমার শোক করার কোন কারণ নেই।

তাৎপর্যঃ প্রায় বৌদ্ধদের মতো কিছু দার্শনিক আছে, যারা আত্মার দেহাতীত স্বতন্ত্র অস্তিত্বের কথা মানতে চায় না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন ভগবদগীতা বলেন, সেই যুগেও এই ধরণের নাস্তিক ছিল, তাদের বলা হত লোকায়তিক ও বৈভাষিক। এই সমস্ত দার্শনিকদের মতবাদ হচ্ছে, জড় পদার্থের সমন্বয়ে কোন এক বিশেষ পরিণত অবস্থায় প্রাণের উদ্ভব হয়। আধুনিক জড় বিজ্ঞানী ও জড়বাদী দার্শনিকেরাও এই মতবাদ পোষণ করে। তাদের মতে, দেহটি হচ্ছে কতকগুলি জড় উপাদানের সমন্বয় মাত্র এবং কোনও এক পর্যায়ে জড় উপাদান ও রাসায়নিক উপাদানের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে প্রাণের লক্ষণ বিকশিত হয়। এনথ্রোপোলজি বা নৃবিজ্ঞান এই মতবাদের ভিত্তিতে প্রচলিত হয়েছে। আধুনিক যুগে, বিশেষ করে আমেরিকাতে এইও মতবাদ ও বৌদ্ধধর্মের নিরীশ্বরবাদের ভিত্তির উপর অনেক নকল ধর্ম গজিয়ে উঠছে।

বৈভাষিক দার্শনিকদের মতো অর্জুন যদি আত্মার অস্তিত্বে অবিশ্বাস করতেন, তা হলেও তাঁর শোক করার কোন কারণ ছিল না। কিছু পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থের বিনাশের জন্য কেউ শোক করে না এবং তার কর্তব্যকর্ম থেকে বিরত হয় না। পক্ষান্তরে, আধুনিক বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক যুদ্ধবিগ্রহে শত্রু জয় করার উদ্দেশ্য কত টন টন রাসায়নিক উপাদান তো নষ্টই হচ্ছে। বৈভাষিক দর্শন অনুসারে, দেহের সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত আত্মার বিনাশ হয়। সুতরাং, অর্জুন যদি বৈদিক মতবাদকে অস্বীকার করে আত্মাকে নশ্বর বলে মনে করতেন অর্থাৎ দেহের সঙ্গে সঙ্গে আত্মাও বিনাশপ্রাপ্ত হয় বলে মনে করতেন, তা হলেও তাঁর অনুশোচনা করার কোনই কারণ ছিল না। এই মতবাদ অনুযায়ী, যেহেতু ঘটনাচক্রে জড় পদার্থ থেকে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য জীবের উদ্ভব হচ্ছে এবং প্রতি মুহূর্তেই এই রকম অসংখ্য জীব বিনাশপ্রাপ্ত হয়ে পুনরায় জড় পদার্থে পরিণত হচ্ছে, তাই এর জন্য দুঃখ করার কোনই কারণ নেই। এই মতবাদের ফলে যেহেতু পুনর্জন্মের কোন প্রশ্নই ওঠে না, তাই অর্জুনের পিতামহ, আচার্য আদি আত্মীয়-পরিজনদের হত্যাজনিত পাপের ফল ভোগ করারও কোন ভয় নেই। কিন্তু সেই সঙ্গে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিদ্রুপ সহকারে অর্জুনকে মহাবাহু, অর্থাৎ যার বাহুদ্বয় মহাশক্তি-সম্পন্ন বলে সম্বোধন করেছেন, কারণ, অন্ততপক্ষে তিনি বৈদিক জ্ঞানের বিরোধী বৈভাষিকদের মতবাদ স্বীকার করেননি এবং তার ফলে তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি ক্ষত্রিয়, এই বর্ণ-বিভাগ বৈদিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং যে এই বৈদিক বর্ণাশ্রম-ধর্ম মেনে চলে, সে বৈদিক নির্দেশ অনুযায়ী আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে।

 

শ্লোক – ২৭
জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ।
তস্মাদপরিহার্যেহথৈ ন ত্বং শোচিতুমরহসি ।। ২৭ ।।

জাতস্য- যার জন্ম হয়েছে, হি- যেহেতু, ধ্রুবঃ- নিশ্চিত, মৃত্যুঃ- মৃত্যু, ধ্রুবম- নিশ্চিত, জন্ম- জন্ম, মৃতস্য- মৃতের, চ- এবং, তস্মাৎ- অতএব, অপরিহার্যে- অবশ্যম্ভাবী, অর্থে- বিষয়ে, ন- নয়, ত্বম- তুমি, শোচিতুম- শোক করা, অরহসি- উচিৎ।

গীতার গান
জড় দেহ উপজয় অনিবার্য ক্ষয়।
ক্ষয় হয়ে জড় দ্রব্য পুনঃ উপজয়।।
জড় দ্রব্য রুপ ছাড়ি অন্য রুপ হয়।
নতুন রুপের জন্য অন্য রুপ কয়।।
এই জড় বিজ্ঞ যদি করয়ে বিচার।
তথাপি শোকের কথা নহে তিলধার।।

অনুবাদঃ যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং যার মৃত্যু হয়েছে তার জন্মও অবশ্যম্ভাবী। অতএব অপরিহার্য কর্তব্য সম্পাদন করার সময় তোমার শোক করা উচিৎ নয়।

তাৎপর্যঃ পূর্বকৃত কর্ম অনুসারে কোন বিশেষ দেহপ্রাপ্ত হয়ে আত্মা জন্মগ্রহণ করে। আর সেই দেহের মাধ্যমে কিছুকাল জড় জগতে অবস্থান করার পর, সেই দেহের বিনাশ হয় এবং তার কর্মের ফল অনুযায়ী সে আবার আর একটি নতুন দেহ ধারণ করে জন্মগ্রহণ করে। এভাবেই আত্মা জড় বন্ধন থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে থাকে। সে যাই হোক, এই জন্ম-মৃত্যুর চক্র অনর্থক যুদ্ধ, হত্যা ও হিংসাকে কোন প্রকারেই অনুমোদন করে না। কিন্তু তবুও মানব-সমাজে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য হিংসা, হত্যা ও যুদ্ধ অপরিহার্য হয়ে পড়ে এবং তা যখন সমাজের মঙ্গলের জন্য সাধিত হয়, তখন তা সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত।

ভগবানের ইচ্ছার ফলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ আয়োজিত হয়েছিল বলে তা সম্পূর্ণ অবশ্যম্ভাবী ছিল এবং ন্যায়সঙ্গত কারণে যুদ্ধ করাটা ক্ষত্রিয়ের ধর্ম। যেহেতু তিনি সঠিকভাবে কর্তব্যকর্মের অনুষ্ঠান করছিলেন, তাই তাঁর আত্মীয়-স্বজনের বিয়োগে কেন তিনি ভীত অথবা শোকান্বিত হবেন? কর্তব্যকর্ম থেকে ভ্রষ্ট হলে পাপ হয় এবং অর্জুন যে স্বজন-হত্যার পাপের ভয়ে ভীত হচ্ছিলেন, প্রকৃতপক্ষে সেই পাপ তাঁর হত যদি তিনি যুদ্ধে বিমুখ হয়ে রণাঙ্গন পরিত্যাগ করতেন। এই ধর্মযুদ্ধ থেকে বিরত থাকলেও মৃত্যুর হাত থেকে তিনি তাঁর তথাকথিত আত্মীয়-স্বজনদের রক্ষা করতে পারতেন না। প্রকৃতির বিধান অনুসারে একদিন না একদিন তাদের মৃত্যু অবধারিত, কিন্তু অর্জুন যদি তাঁর কর্তব্যকর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়তেন, তা হলে তাঁর মান, মর্যাদা ধূলিসাৎ হত।

 

শ্লোক – ২৮
অব্যক্তদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা ।। ২৮ ।।

অব্যক্তাদীনি- পূর্বে অপ্রকাশিত, ভূতানি- প্রাণীসমূহ, ব্যক্ত- প্রকাশিত, মধ্যানি- মাঝখানে, ভারত- হে ভরতবংশজ, অব্যক্ত- অপ্রকাশিত, নিধনানি- বিনাশের পর, এব- এমনই, তত্র- সুতরাং, কা- কি, পরিদেবনা- শোক।

গীতার গান
জড়ের রুপাদি নাহি পরেও থাকে না।
মধ্যে মাত্র রুপ গুণ সকলি ভাবনা।।
অতএব নিরাকার যদি নিরাকার।
তাহাতে তোমার দুঃখ কিসের আবার।।

অনুবাদঃ হে ভারত! সমস্ত সৃষ্ট জীব উৎপন্ন হওয়ার আগে অপ্রকাশিত ছিল, তাদের স্থিতিকাল প্রকাশিত থাকে এবং বিনাশের পর আবার অপ্রকাশিত হয়ে যায়। সুতরাং, সেই জন্য শোক করার কি কারণ?

তাৎপর্যঃ আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসী উভয় মতবাদকে মেনে নিলেও শোকের কোন কারণ নেই। যারা আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করে না, বৈদিক মতাবলম্বীরা তাদের নাস্তিক বলে অভিহিত করে। তবুও এমন কি যদি তর্কের খাতিরে এই নাস্তিক মতবাদকে সত্য বলে গ্রহণ করা হয়, তা হলেও অনুশোচনা করার কোনই কারণ নেই। কারণ, জড়ের মধ্য থেকে প্রাণের উদ্ভব হয়ে যদি তা আবার জড়ের মধ্যেই বিলীন হয়ে যায়, তবে সেই অনিত্য বস্তুর জন্য শোক করা নিতান্তই নিরর্থক। আত্মার স্বতন্ত্র অস্তিত্বের কথা ছেড়ে দিলেও সৃষ্টির পূর্বে জড় উপাদানগুলি থাকে অব্যক্ত। এই সূক্ষ্ম অব্যক্ষ থেকে আকারের প্রকাশ হয়, যেমন আকাশ থেকে বায়ুর উদ্ভব হয়, বায়ু থেকে অগ্নি, অগ্নি থেকে জল এবং জল থেকে মাটির উদ্ভব হয়। এই মাটি থেকে নানা রুপের উদ্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় – ইট, সিমেন্ট, চুন, বালি, লোহা আদি সবই মাটি। সেই মাটি থেকে যখন একটি প্রাসাদ তৈরি হয়, তখন তা রুপ ও আকার প্রাপ্ত হয়। তারপর এক সময় সেই প্রাসাদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে মাটিতে মিশে যায়। যে বস্তু দিয়ে প্রাসাদটি গড়া হয়েছিল, তার অণু-পরমাণুগুলির কোন পরিবর্তন হয় না। শক্তি সংরক্ষণের নীতি বর্তমানই থাকে, কেবল সময়ের প্রভাবে তার রুপের প্রকাশ হয় এবং অন্তর্ধান হয় – সেটিই হচ্ছে পার্থক্য। সুতরাং, এই আবির্ভাব ও অন্তর্ধানের জন্য শোক করার কি কারণ থাকতে পারে? যে-কোনভাবেই হোক না কেন, এমন কি অব্যক্ত অবস্থাতেও বস্তুর বিনাশ হয় না। আদিতে ও অন্তে জড়ের রুপ থাকে না, কেবল মধ্যে তার রুপ ও গুণের প্রকাশ হয়ে আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়। সুতরাং, এর ফলে কোন জড়-জাগতিক পার্থক্য সূচিত হয় না।

আর আমরা যদি ভগবদগীতায় উক্ত বৈদিক সিদ্ধান্তকে মেনে নিই, অর্থাৎ অন্তবন্ত ইমে দেহাঃ- এই জড় দেহটি কালের প্রভাবে বিনষ্ট হবে, নিত্যস্যোক্তাঃ শরীরিণঃ- কিন্তু আত্মা চিরশাশ্বত, তা হলে আমাদের আর বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, দেহটি একটি পোশাকের মতো। তাই এই পোশাকটির পরিবর্তনের জন্য কেন আমরা শোক করব? আত্মার নিত্যতার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করে দেখলে সহজেই বুঝতে পারা যায়, জড় দেহের যথার্থই কোন অস্তিত্ব নেই- এটি অনেকটা স্বপ্নের মতো। স্বপ্নে যেমন কখনো আমরা দেখি, আকাশে উড়ছি অথবা রাজা হয়ে সিংহাসনেও বসিনি। আমাদের জড় অস্তিত্বটিও তেমনই আমাদের মন, বুদ্ধি ও অহংকারের বিকার। বৈদিক জ্ঞান আমাদের দেহের অনিত্যতার পরিপ্রেক্ষিতে আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান উপলব্ধি করতে অনুপ্রাণিত করে। সুতরাং, কেউ আত্মার অস্তিত্ব বিশ্বাস করুক অথবা আত্মার অস্তিত্বে অবিশ্বাস করুক না কেন, যে-কোন অবস্থাতেই জড় দেহ বিনাশের জন্য শোক করার কারণ নেই।

 

শ্লোক – ২৯
আশ্চর্যবৎ পশ্যতি কশ্চিদেনম
আশ্চর্যবদ বদতি তথৈব চান্যঃ।
আশ্চর্যবচ্চৈনমন্যঃ শৃণোতি
শ্রুত্বাপ্যেনং বেদ ন চৈব কশ্চিৎ ।। ২৯ ।।

আশ্চর্যবৎ- বিস্ময়জনক ভাবে, পশ্যতি- দেখেন, কশ্চিৎ- কেউ, এনম- এই আত্মাকে, আশ্চর্যবৎ- আশ্চর্যভাবে, বদতি- বলেন, তথা- সেভাবে, এব- নিশ্চিত, চ- ও, অন্যঃ- অপরে, আশ্চর্যবৎ- তেমনই আশ্চর্যরুপে, চ- ও, এনম- এই আত্মাকে, অন্যঃ অন্য কেউ, শৃণোতি- শ্রবন করেন, শ্রুতা- শুনেও, অপি- এমন কি, এনম- এই আত্মাকে, বেদ- জানতে পারেন, ন- না, চ- এবং, এব- নিশ্চিতভাবে, কশ্চিৎ- কেউ।

গীতার গান
আশ্চর্য আত্মার কথা, না বুঝিয়ে যথা তথা
আশ্চর্য তাহার দেখাশুনা।
আশ্চর্য কেহবা বলে, আশ্চর্য কেহবা ছলে
আশ্চর্য তাহার অধ্যাপনা।।
আশ্চর্য হইয়া শুনে, তথাপি বা নাহি মানে
আশ্চর্য যে আশ্চর্যের কথা।
আশ্চর্য হইয়া রহে, আশ্চর্য বুঝিতে নহে
আশ্চর্য অতি দুর্লভতা।।

অনুবাদঃ কেউ এই আত্মাকে আশ্চর্যবৎ দর্শন করেন, কেউ আশ্চর্যভাবে বর্ণনা করেন এবং কেউ আশ্চর্য জ্ঞানে শ্রবন করেন, আর কেউ শুনেও তাকে বুঝতে পারেন না।

তাৎপর্যঃ উপনিষদের তত্ত্বজ্ঞানের ভিত্তির উপর গীতোপনিষদ অধিষ্ঠিত, তাই এই শ্লোকের ভাব কঠ উপনিষদের (১/২/৭) শ্লোকটিতেও দেখা যায় –

শ্রবণয়াপি বহুভির্যো ন লভ্যঃ শৃণন্তোহপি বহবো যং ন বিদ্যুঃ।
আশ্চর্যো বক্তা কুশলোহস্য লব্ধাশ্চর্যো জ্ঞাতা কুশলানুশিষ্টঃ।।

সত্য ঘটনা হচ্ছে যে, পারমাণবিক আত্মা বিশালকায় পশুর দেহে, বিশাল বটবৃক্ষে, আবার অতি ক্ষুদ্র জীবানু যারা লক্ষ কোটি সংখ্যায় মাত্র এক ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাতেও থাকতে পারে, তাদের দেহেও অবস্থান করে, এটি অতি আশ্চর্যের কথা। যে সমস্ত মানুষ সীমিত জ্ঞানসম্পন্ন এবং যাদের চিন্তাধারা সংযম ও তপশ্চর্যার প্রভাবে পবিত্র হয়নি, তারা কখনোই পারমাণবিক জীবাত্মার বিস্ময়কর স্ফুলিঙ্গ রহস্য উপলব্ধি করতে পারে না। এমন কি বৈদিক জ্ঞানের মহান প্রবক্তা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, যিনি ব্রক্ষ্মান্ডের প্রথম সৃষ্ট জীব ব্রক্ষ্মাকে পর্যন্ত ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান দান করেছিলেন, তিনি নিজে এসে সেই জ্ঞান দান করার পরেও তার মর্ম তারা উপলব্ধি করতে পারে না। স্থুল জড় পদার্থের দ্বারা অতি মাত্রায় প্রভাবিত হয়ে পড়ার ফলে বর্তমান যুগের অধিকাংশ মানুষ কল্পনা করতে পারে না, পরমাণুর চাইতেও অনেক ছোট যে আত্মা, তা কি করে তিমি মাছের মতো বৃহৎ জন্তুর দেহে, আবার জীবানুর মতো অতি ক্ষুদ্র প্রাণীর দেহে উপস্থিত থেকে তাতে প্রাণ সঞ্চার করতে পারে। তাই, মানুষ আত্মার কথা শুনে অথবা আত্মার কথা অনুমান করে অত্যন্ত আশ্চর্য হয়। মায়াশক্তির প্রভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার ফলে, আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে কোন রকম চিন্তা করার সময় পর্যন্ত তাদের নেই। এমন কি যদিও এই কথাটি সত্য যে, এই আত্ম-উপলব্ধি ছাড়া জীবন-সংগ্রামে তাদের সমস্ত প্রচেষ্টাই শোচনীয় পরাজয়ে পর্যবসিত হবে। অনেকেই হয়তো আত্মজ্ঞান লাভ করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারে না, ফলে জড়-জাগতিক ক্লেশের পীড়নে তারা অহরহ নির্যাতিত হয় এবং তার থেকে মুক্ত হবার কোন উপায় খুঁজে পায় না।

অনেক সময় কিছু মানুষ আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান লাভ করার প্রয়াসী হয়, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সাধুসঙ্গ বলে মনে করে একদল মূর্খের সঙ্গ লাভ করে ভাবতে শেখে যে, জীবাত্মা ও প[রমাত্মার মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই – মায়ামুক্ত হলেই জীবাত্মা পরমাত্মাতে পরিণত হয়। এমন মানুষ খুবই বিরল যিনি জীবাত্মা, পরমাত্মা, তাদের নিজ নিজ কার্যকলাপ ও পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক এবং অন্যান্য পুঙ্খানুপুঙ্খ তত্ত্ব বুঝতে পারেন। আরো বিরল হচ্ছে সেই মানুষকে খুঁজে পাওয়া, যিনি এই তত্ত্বকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করেছেন এবং যিনি বিভিন্ন রুপের মধ্যে আত্মার অবস্থানের বর্ণনা দিতে সক্ষম। যদি কেউ আত্মার এই জ্ঞানকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে, তা হলেই তার জন্ম সার্থক হয়।

মানবজন্ম লাভ করার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে, এই তত্ত্বজ্ঞান উপলব্ধি করে মায়ামুক্ত হয়ে চিৎ-জগতে ফিরে যাওয়া, এই তত্ত্বজ্ঞান লাভ করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে অন্যান্য মতবাদের দ্বারা বিপথগামী না হয়ে মহত্তম প্রবক্তা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ-নিঃসৃত ভগবদগীতার বাণীর যথাযথ মর্ম উপলব্ধি করা এবং তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী জীবনযাপন করা। বহু জন্মের পুণ্যের ফলে এবং বহু তপস্যার বলে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে মানুষ সর্ব কারণের কারণ পরমেশ্বর রুপে উপলব্ধি করতে পারে এবং তাঁর চরণে আত্মনিবেদন করতে সমর্থ হয়। অনেক সৌভাগ্যের ফলে মানুষ সদগুরুর সন্ধান পায়, যার অহৈতুকী কৃপার ফলে সে ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে পারে।

 

শ্লোক – ৩০
দেহী নিত্যমবধ্যোহয়ং দেহে সর্বস্য ভারত।
তস্মাৎ সর্বাণি ভূতানি ন ত্বং শোচিতুমরহসি ।। ৩০ ।।

দেহী- জড় দেহের মালিক, নিত্যম- নিত্য, অবধ্যঃ- অবধ্য, অয়ম- এই আত্মা, দেহে- দেহে, সর্বস্য- সকলের, ভারত- হে ভরতবংশীয়, তস্মাৎ- অতএব, সর্বাণি- সমস্ত, ভূতানি- জীবসমূহ (যাদের জন্ম হয়েছে), ন- না, ত্বম- তুমি শোচিতুম- শোক করা, অরহসি- উচিৎ।

গীতার গান
সিদ্ধান্ত আত্মার কথা শুন হে ভারত।
বেদান্ত আমার কথা শুন সেই মত।।
দেহী নিত্য মরে নাহি সকল দেহের।
দেহের বিনাশ তাই নহে ত শোকের।।

অনুবাদঃ হে ভারত! প্রাণীদের দেহে অবস্থিত আত্মা সর্বদাই অবধ্য। অতএব কোন জীবের জন্য তোমার শোক করা উচিৎ নয়।

তাৎপর্যঃ আত্মার অবিনশ্বরতার কথা প্রতিপন্ন করে ভগবান আবার উপসংহারে অর্জুনকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, দেহের বিনাশ হলেও আত্মার বিনাশ হয় না। দেহ অনিত্য, কিন্তু আত্মা নিত্য, তাই দেহের বিনাশ হলে তা নিয়ে শোক করবার কোন কারণ থাকতে পারে না। অতএব পিতামহ ভীষ্ম ও আচার্য দ্রোণ নিহত হবেন বলে ভয়ে ও শোকে যুদ্ধ করতে বিমুখ হয়ে স্বধর্ম পরিত্যাগ করা ক্ষত্রিয় বীর অর্জুনের উচিৎ নয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্ভরযোগ্য প্রামাণিক উপদেশামৃতের উপর আস্থা রেখে, প্রত্যেকের বিশ্বাস করতে হবে যে, জড় দেহ থেকে ভিন্ন আত্মার অস্তিত্ব রয়েছে, এই নয় যে, আত্মা বলে কোন বস্তু নেই, অতএব রাসায়নিক পদার্থের পারস্পারিক ক্রিয়ার ফলে জাগতিক পরিপক্কতার কোন এক বিশেষ অবস্থায় চেতনার লক্ষণগুলির বিকাশ ঘটে। অবিনশ্বর আত্মার মৃত্যু হয়না বলে নিজের ইচ্ছার মতো হিংসার আচরণ করাকে কখনোই প্রশ্রয় দেওয়া যায় না, কিন্তু যুদ্ধ্বের সময় হিংসার আশ্রয় নেওয়াতে কোন অন্যায় নেই, কারণ সেখানে তার যথার্থ প্রয়োজনীয়তা আছে। এই প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আমাদের খেয়ালখুশি অনুযায়ী বিবেচিত হয় না – তা হয় ভগবানের বিধান অনুসারে।

 

শ্লোক – ৩১
স্বধর্মমপি চাবেক্ষ্য ন বিকম্পিতুমরহসি।
ধর্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োহন্যৎ ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে ।। ৩১ ।।

স্বধর্মম- স্বধর্মের প্রতি, অপি চ- আরো, অবক্ষ্যে- বিবেচনা করে, ন- না, বিকম্পিতুম- দ্বিধা করতে, অরহসি- উচিৎ, ধর্ম্যাৎ- ধর্মের জন্য, হি- যেহেতু, যুদ্ধাৎ- যুদ্ধ অপেক্ষা, শ্রেয়ঃ- শ্রেয়স্কর কর্ম, অন্যৎ- অন্য কিছু, ক্ষত্রিয়স্য- ক্ষত্রিয়ের, ন বিদ্যতে- নেই।

গীতার গান
নিজ ধর্ম দেখি পুনঃ না হও বিকল।
ক্ষত্রিয়ের যুদ্ধ করা ধর্ম যে সকল।।

অনুবাদঃ ক্ষত্রিয়রুপে তোমার স্বধর্ম বিবেচনা করে তোমার জানা উচিৎ যে, ধর্ম রক্ষার্থে যুদ্ধ করার থেকে ক্ষত্রিয়ের পক্ষে মঙ্গলকর আর কিছুই নেই। তাই, তোমার দ্বিধাগ্রস্থ হওয়া উচিৎ নয়।

তাৎপর্যঃ চতুর্বর্ণের দ্বিতীয় বর্ণকে বলা হয় ক্ষত্রিয়। এদের কাজ হচ্ছে রাজ্য শাসন ও প্রজাপালন করা। ক্ষৎ কথাটির অর্থ হচ্ছে আঘাত। আঘাত বা বিপদ থেকে (ত্রায়তে- ত্রাণ করে) যে ত্রাণ করে, সে ক্ষত্রিয়। ক্ষত্রিয়েরা অস্ত্রচালনা শিক্ষালাভ করে তাতে পারদর্শিতা লাভ করত। তাদের এই শিক্ষার একটি অঙ্গ হচ্ছে, বনে গিয়ে হিংস্র পশু শিকার করা। এভাবে অস্ত্র শিক্ষা সমাপ্ত হলে ক্ষত্রিয় সন্তান বনে গিয়ে হিংস্র বাঘকে যুদ্ধে আহ্বান করত এবং শুধু তলোয়ার হাতে সেই বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাঁকে নিধন করত। তারপর সেই বাঘকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সঙ্গে সৎকার করা হত। এই প্রথা আজও জয়পুরের ক্ষত্রিয় রাজপরিবারে প্রচলিত আছে। ক্ষত্রিয়েরা শত্রুকে যুদ্ধে আহ্বান করে তার প্রাণ সংহার করতে দ্বিধা করে না। রাজ্য শাসন ও প্রজাপালনের জন্য এই প্রথার প্রয়োজন অপরিহার্য। তাই, ক্ষত্রিয়েরা সরাসরিভাবে সন্ন্যাস গ্রহণ করতে পারে না। রাজনীতির ক্ষেত্রে অহিংসার পথ অবলম্বন করা কুটনীতি হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই নীতিগত পন্থা নয়। নীতিশাস্ত্রে আছে –

আহবেষু মিথোহন্যোন্যং জিঘাংসন্তো মহীক্ষিতঃ
যুদ্ধমানঃ পরং শক্ত্যা স্বর্গং যান্ত্যপরাঙ্মুখাঃ।
যজ্ঞেসু পশবো ব্রক্ষ্মন হন্যন্তে সততং দ্বিজৈঃ
সংস্কৃতাঃ কিল মন্ত্রৈশ্চ তেহপি স্বর্গমবাপ্লুবন।।

“কোন রাজা অথবা ক্ষত্রিয় যখন যুদ্ধক্ষেত্রে ঈর্ষান্বিত শত্রুর সঙ্গে সংগ্রামে রত হন, মৃত্যুর পর তিনি স্বর্গলোকে গমন করেন, তেমনই ব্রাক্ষ্মন যজ্ঞে পশু বলি দিলে স্বর্গ লাভ করেন।“ তাই, যুদ্ধক্ষত্রে শত্রুকে হত্যা করা এবং যজ্ঞে পশু বলি দেওয়াকে হিংসাত্মক কার্য বলে গণ্য করা হয় না, কারণ এই ধর্ম অনুষ্ঠানের ফলে সকলেই লাভবান হয়। যজ্ঞে উৎসর্গীকৃত পশু বিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে উন্নত থএকে উন্নততর জীব দেহ ধারণ না করে, সরাসরিভাবে মনুষ্য শরীর প্রাপ্ত হয় এবং সেই যজ্ঞের ফলে দেবতারা তুষ্ট হয়ে মর্ত্যবাসীদের ধনৈশ্চর্য দান করেন। সুতরাং, ধর্মাচরণ করলে এভাবে সকলেই লাভবান হয়।

স্বধর্ম দুই রকমের। জড় বন্ধনমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত জীবকে শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী তার দেহের ধর্ম পালন করতে হয় এবং তার ফলে সে জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হয়। মুক্ত অবস্থায় জীব তার অপ্রাকৃত স্বরূপে অধিষ্ঠিত থাকে। তখন আর তার দেহাত্মবুদ্ধি থাকে না, তাই তখন তাকে জড়-জাগতিক অথবা দেহগত আচার অনুষ্ঠান করতে হয় না। শাস্ত্রের বিধান অনু্যায়ী, বদ্ধ অবস্থায় দেহাত্মবুদ্ধির স্তরে জীবের ব্রাক্ষ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র – এই চারটি স্তর থাকে এবং তাদের স্ব-স্ব ধর্ম থাকে এবং এই ধর্ম  আচরণ করা অবশ্য কর্তব্য। ভগবান নিজেই গুণ ও কর্ম অনুসারে এই স্বধর্ম নির্ধারিত করেছেন এবং এই সম্বন্ধে চতুর্থ অধ্যায়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে। দেহগত স্বধর্মকে বলা হয় বর্ণাশ্রম-ধর্ম অথবা মানুষের পারমার্থিক উন্নতি লাভের উপায়। বর্ণাশ্রম-ধর্ম অথবা জড়া প্রকৃতির নির্দিষ্ট গুণ অনুসারে প্রাপ্ত দেহটির দ্বারা অনুষ্ঠিত বিশেষ কর্তব্যকর্মের স্তর থেকে মানব-সভ্যতা শুরু হয়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উচ্চ-কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুসারে এই বর্ণাশ্রম-ধর্ম আচরণ করার ফলে মানুষ ক্রমে ক্রমে উচ্চ থেকে উচ্চতর জীবন প্রাপ্ত হয়ে অবশেষে জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হয়।

 

শ্লোক – ৩২
যদৃচ্ছয়া চোপপন্নং স্বর্গদ্বারমপাবৃতম।
সুখিনঃ ক্ষত্রিয়াঃ পার্থ লভন্তে যুদ্ধমীদৃশম ।। ৩২ ।।

যদৃচ্ছয়া- আপনা থেকেই, চ- এবং, উপপন্নম- উপস্থিত হয়েছে, স্বর্গদ্বারম- স্বর্গদ্বার, অপাবৃতম- উন্মুক্ত, সুখিনঃ- সুখী, ক্ষত্রিয়াঃ- ক্ষত্রিয়েরা, পার্থ- হে পৃথাপুত্র, লভন্তে- লাভ করেন, যুদ্ধম- যুদ্ধ, ইদ্রিশম- এই রকম।

গীতার গান
অনায়াসে পাইয়াছ স্বর্গদ্বার খোলা।
সে যুদ্ধ কার্যেতে নাহি কর অবহেলা।।
ভাগ্যবান বীর সেই হেন যুদ্ধ পায়।
যুদ্ধ করি যজ্ঞফল ক্ষত্রিয় লভয়।।

অনুবাদঃ হে পার্থ! স্বর্গদ্বার ইন্মোচনকারী এই প্রকার ধর্মযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ না চাইতেই যে সব ক্ষত্রিয়ের কাছে আসে, তাঁরা সুখী হন।

তাৎপর্যঃ অর্জুন যখন বলেছিলেন, “এই যুদ্ধে কোন লাভ নেই। এই পাপের ফলে আমাকে অনন্তকাল ধরে নরক-যন্ত্রনা ভোগ করতে হবে।“ তখন সমস্ত জগতের পরম শিক্ষাগুরু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে তিরস্কার করে বলেছিলেন যে, তাঁর এই উক্তি তাঁর মূর্খতার পরিচায়ক। তাঁর স্বধর্ম- ক্ষাত্রধর্ম ত্যাগ করে অহিংস নীতি অবলম্বন করে, তবে তাঁকে একটি মস্ত বড় মূর্খ ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। পরাশর-স্মৃতিতে বাসুদেবের পিতা পরাশর মুনি বর্ণনা করেছেন –

ক্ষত্রিয়ো হি প্রজা রক্ষন শস্ত্রপাণিঃ প্রদন্ডয়ন।
নির্জিত্য পরসৈন্যাদি ক্ষিতিং ধর্মেণ পালয়েৎ।।

“সব রকম দুঃখ-দুর্দশা থেকে রক্ষা করে প্রজা-পালন করাই হচ্ছে ক্ষত্রিয়ের ধর্ম এবং সেই কারণে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখবার জন্য তাঁকে অস্ত্রধারণপূর্বক দন্ডদান করতে হয়। তাই তাঁকে বিরোধী ভাবাপন্ন রাজার সৈন্যদের বলপূর্বক পরাজিত করতে হয় এবং এভাবেই ধর্মের দ্বারা তাঁর পৃথিবী পালন করা উচিৎ।“

সব দিক দিয়ে বিবেচনা করে দেখলে দেখা যায়, অর্জুনের যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার কোনই কারণ ছিল না। যুদ্ধে যদি তিনি জয়লাভ করতেন, তবে তিনি রাজ্যসুখ ভোগ করতেন, আর যদি যুদ্ধে তাঁর মৃত্যু হত, তবে তিনি স্বর্গলোকে উন্নীত হতেন – যেখানে তাঁর জন্য দ্বার ছিল অবারিত। যুদ্ধ করলে উভয় ক্ষেত্রেই তিনি লাভবান হতেন।

 

শ্লোক – ৩৩
অথ চেত্ত্বমিমং ধর্ম্যং সংগ্রামং ন করিষ্যসি।
ততঃ স্বধর্মং কীর্তিং চ হিত্বা পাপমবাপ্স্যসি ।। ৩৩ ।।

অথ- সুতরাং, চেৎ- যদি, ত্বম- তুমি, ইমম- এই, ধর্ম্যম- ধর্ম, সংগ্রামম- যুদ্ধ, ন- না, করিষ্যসি- কর, ততঃ- তা হলে, স্বধর্মম- তোমার স্বীয় ধর্ম, কীর্তিম- কীর্তি, চ- এবং, হিত্বা- হারিয়ে, পাপম- পাপ, অবাপ্স্যসি- লাভ করবে।

গীতার গান
অতএব তুমি পার্থ যদি যুদ্ধ ছাড়।
স্বধর্ম স্বকীর্তি স্ব একত্রে উগার।।

অনুবাদঃ কিন্তু, তুমি যদি এই ধর্মযুদ্ধ না কর, তা হলে তোমার স্বীয় ধর্ম এবং কীর্তি থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পাপ ভোগ করবে।

তাৎপর্যঃ অর্জুনের বীরত্বের খ্যাতি ছিল সর্বজনবিদিত। তিনি মহাদেবের মতো দেবতাদেরও যুদ্ধে পরাস্ত করেছেন। কিরাতরুপী মহাদেবকে যুদ্ধে পরাস্ত করলে, সন্তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাঁকে পাশুপত নামক এক ভয়ঙ্কর অস্ত্র দান করেন। তাঁর অস্ত্রশিক্ষা-গুরু দ্রোণাচার্যও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে আশীর্বাদ করেন এবং এমন একটি অস্ত্র দান করেন, যার দ্বারা তিনি দ্রোণাচার্যকেও পর্যন্ত হত্যা করতে পারতেন। তাঁর ধর্মপিতা দেবরাজ ইন্দ্রও তাঁকে তাঁর বীরত্বের জন্য পুরস্কৃত করেন। এভাবে অর্জুনের বীরত্বের খ্যাতি সমস্ত বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডে সুবিদিত ছিল। তাই তিনি যদি যুদ্ধবিমুখ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করতেন, তবে তিনি কেবল তাঁর ক্ষাত্রধর্মেরই যে অবহেলা করতেন তা নয়, সেই সঙ্গে তাঁর বীরত্বের গৌরবও নষ্ট হত এবং তাঁকে নরকগামী হতে হত। পক্ষান্তরে, যুদ্ধ করার জন্য অর্জুনকে নরকে যেতে হত না, বরং যুদ্ধ না করার জন্যই তাঁকে নরকে যেতে হত।

 

শ্লোক – ৩৪
অকীর্তিং চাপি ভূতানি কথয়িষ্যন্তি তেহব্যয়াম।
সম্ভাবিতস্য চাকীর্তির্মরণাদতিরিচ্যতে ।। ৩৪ ।।

অকীর্তিম- কীর্তিহীনতা, চ- এবং, অপি- তা ছাড়া, ভূতানি- সমস্ত লোক, কথয়িষ্যন্তি- বলবে, তে- তোমার সম্পর্কে, অব্যয়াম- চিরকাল, সম্ভাবিতস্য- কোনও মর্যাদাবান লোকের পক্ষে, চ- আরও, অকীর্তি- অসম্মান, মরণাৎ- মৃত্যু অপেক্ষা, অতিরিচ্যতে- অধিক হয়।

গীতার গান
তোমার অকীর্তি লোক নিশ্চয়ই গাহিবে।
বাঁচিয়া মরণ তব বিঘোষিত হবে।।

অনুবাদঃ সমস্ত লোক তোমার কীর্তিহীনতার কথা বলবে এবং যে-কোন মর্যাদাবান লোকের পক্ষেই এই অসম্মান মৃত্যু অপেক্ষাও অধিকতর মন্দ।

তাৎপর্যঃ অর্জুনের বন্ধু ও উপদেষ্টারুপে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে জানিয়ে দিচ্ছেন, যুদ্ধ না করলে তার ফলাফল কি হবে। ভগবান বলেছেন, “অর্জুন! যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই যদি তুমি যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ কর, তবে সকলে বলবে – তুমি কাপুরুষ। তোমার মতো যশস্বী ও মহানুভব বীরের পক্ষে এই কুখ্যাতির চাইতে মৃত্যুবরণ করা শেষ। তাই প্রাণরক্ষার জন্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করার চাইতে যুদ্ধে প্রাণ ত্যাগ করা অনেক ভাল। তার ফলে, তুমি আমার বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করবে এবন সমাজে তোমার সুনামও অক্ষুন্ন থাকবে।“

এভাবেই ভগবান অর্জুনকে বোঝালেন, যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করার চাইতে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ ত্যাগ করা অনেক শ্রেয়।

 

শ্লোক – ৩৫
ভয়াদ রণাদুপরতং মংস্যন্তে ত্বাং মহারথাঃ।
যেষাং চ ত্বং বহুমতো ভূত্বা যাস্যসি লাঘবম ।। ৩৫ ।।

ভয়াৎ- ভয়বশত, রণাৎ- রণক্ষেত্র থেকে, উপরিতম- নিবৃত্ত, মংস্যন্তে- মনে করবে, ত্বাম- তোমাকে, মহারথাঃ- মহারথীরা, যেষাম- যাদের কাছে, চ- এবং, ত্বম- তুমি বহুমতঃ- অত্যন্ত সম্মানিত, ভূত্বা- হয়ে, যাস্যসি- প্রাপ্ত হবে, লাঘবম- লঘুতা।

গীতার গান
মহারথ যারা সব নিন্দা যে করিবে।
ভয় পেয়ে ছাড়ে রণ তারা যে বলিবে।।
যাহাদের গণ্যমান্য তুমি যে এখন।
সকলের চক্ষে ছোট হইবে তখন।।

অনুবাদঃ সমস্ত মহারথীরা মনে করবেন যে, তুমি ভয় পেয়ে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করেছ এবং তুমি যাদের কাছে সম্মানিত ছিলে, তারাই তোমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য জ্ঞান করবে।

তাৎপর্যঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর মতামত ব্যক্ত করে বললেন, “অর্জুন! তুমি মনে কর না যে, দুর্যোধন, কর্ণ আদি রথী-মহারথীরা মনে করবে, তুমি করুণার বশবর্তী হয়ে যুদ্ধ করতে বিমুখ হয়েছো। তারা বলবে, তুমি প্রাণ ভয়ে ভীত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেছ। ফলে, তোমার প্রতি তাদের যে উচ্চ ধারণা আছে, তা নস্যাৎ হবে।“

 

শ্লোক – ৩৬
অবাচ্যবাদাংশ্চ বহূন বদিষ্যন্তি তবাহিতাঃ।
নিন্দস্তস্তব সামর্থ্যং ততো দুঃখতরং নু কিম ।। ৩৬ ।।

অবাচ্য- অকথ্য, বাদান- বাক্য, চ- এবং বহূন- বহু, বদিয্যন্তি-বলবে, তব- তোমার, অহিতাঃ- শত্রুরা, নিন্দন্তঃ নিন্দা করে, তব- তোমার, সামর্থ্যম-সামর্থ্য, ততঃ- তার চেয়ে, দুঃখতরম- অধিক দুঃখদায়ক, নু- অবশ্য, কিম- আর কি আছে।

গীতার গান
কত গালাগালি দিবে অকথ্য কথন।
ভাবি দেখ তব হিত কি হবে তখন।।
নিজ নিন্দা শুনি তুমি নীরবে রহিবে।
বল পার্থ সেই নিন্দা কেমনে সহিবে।।

অনুবাদঃ তোমার শত্রুরা তোমার সামর্থ্যের নিন্দা করে বহু অকথ্য কথা বলবে। তার চেয়ে অধিকতর দুঃখদায়ক তোমার পক্ষে আর কি হতে পারে?

তাৎপর্যঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের অভাবনীয় হৃদয়-দৌর্বল্য দেখে আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, এই ধরণের মনোভাব কেবল অনার্যদেরই শোভা পায়, অর্জুনের মতো ক্ষত্রিয় বীরের পক্ষে তা সম্পূর্ণ অসঙ্গত। তাই তিনি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে অর্জুনকে বোঝালেন, অর্জুনের মতো ক্ষত্রিয়ের হৃদয়ে এই অনার্যোচিত দৌর্বল্যের কোন স্থান নেই।

 

শ্লোক – ৩৭
হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম।
তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ ।। ৩৭ ।।

হতঃ- নিহত হলে, বা- অথবা, প্রাপ্স্যসি- লাভ করবে, স্বর্গম- স্বর্গ, জিত্বা- জয় লাভ করলে, বা- অথবা, ভোক্ষ্যসে- ভোগ করবে। মহীম- পৃথিবী, তস্মাৎ- অতএব, উত্তিষ্ঠ- উত্থিত হও, কৌন্তেয়- হে কুন্তীপুত্র, যুদ্ধায়- যুদ্ধের জন্য, কৃত- দৃঢ়সঙ্কল্প, নিশ্চয়ঃ- নিশ্চিত হয়ে।

গীতার গান
মরে যদি স্বর্গ পাও সেও ভাল কথা।
বাঁচিয়া পাইবে ভোগ নহে সে অন্যথা।।
বাঁচা মরা দুই ভাল যুদ্ধেতে নিশ্চয়।
হেন যুদ্ধ ছাড় তুমি আশ্চর্য বিষয়।।
হে কৌন্তেয় উঠ তুমি নাহি কর হেলা।
যুদ্ধ করিবারে নিশ্চয় কর এই বেলা।।

অনুবাদঃ হে কুন্তীপুত্র! এই যুদ্ধে নিহত হলে তুমি স্বর্গলাভ করবে, আর জয়ী হলে পৃথিবী ভোগ করবে। অতএব যুদ্ধের জন্য দৃঢ়সঙ্কল্প হয়ে উত্থিত হও।

তাৎপর্যঃ যুদ্ধে যদি অর্জুনের জয় সুনিশ্চিত নাও হত, তবু সেই যুদ্ধ তাঁকে করতেই হত। কারণ, সেই যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হলেও, তিনি স্বর্গলোকেই উন্নীত হতেন।

 

শ্লোক – ৩৮
সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ৌ।
ততো যুদ্ধায় যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাপ্স্যসি।। ৩৮ ।।

সুখ- সুখ, দুঃখে- দুঃখে, সমে- সমানভাবে, কৃত্বা- করে, লাভালাভৌ- লাভ ও ক্ষতিকে, জয়াজয়ৌ- জয় ও পরাজয়কে, ততঃ- তারপর, যুদ্ধায়- যুদ্ধার্থে, যুজ্যস্ব- যুদ্ধ কর, ন- না, এবম- এভাবে, পাপম- পাপ, অবাপ্স্যসি- লাভ হবে।

গীতার গান
সুখদুঃখ সমকর নাহি লাভ সব।
জয়াজয় নাহি ভয় কর্তব্য বলিব।।
যুদ্ধের লাগিয়া তুমি শুধু যুদ্ধ কর।
নাহি তাতে পাপ ভয় এই সত্য বড়।।

অনুবাদঃ সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি ও জয়-পরাজয়কে সমান জ্ঞান করে তুমি যুদ্ধের নিমিত্ত যুদ্ধ কর, তা হলে তোমাকে পাপভাগী হতে হবে না।

তাৎপর্যঃ ভগবান এখানে স্পষ্টভাবে অর্জুনকে বলেছেন, জয়-পরাজয়ের বিবেচনা না করে কেবল কর্তব্যের খাতিরে যুদ্ধ করার জন্য যুদ্ধ করতে হবে। কারণ, ভগবানের ইচ্ছা অনুসারেই এই যুদ্ধ আয়োজিত হয়েছে। কৃষ্ণভাবনাময় কার্যকলাপের সময় সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, জয়-পরাজয় আদি জাগতিক ফলাফলের বিবেচনা করা নিরর্থক। কারণ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্য যে কর্মই করা হোক না কেন, যা জাগতিক ফলাফলের অতীত – সে সমস্ত কর্মই অপ্রাকৃত কর্ম। যে মানুষ তার ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি সাধন করবার জন্য কর্ম করে, তার সেই কর্মের জন্য তাকে শুভ অথবা অশুভ ফল ভোগ করতে হয়।  কিন্তু যে মানুষ ভগবানের সেবায় নিজেকে সর্বতোভাবে উৎসর্গ করেছেন, তাঁর কারো প্রতি কোন কর্তব্য আর বাঁকি থাকে না এবং কারো প্রতি তাঁর আর কোন ঋণও থাকে না। স্বয়ং ভগবান ছাড়া আর কেউ তাঁর কর্মের ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে না। সাধারণ অবস্থায় প্রতিটি কর্মের জন্য মানুষকে কারো না করো কাছে কৈফিয়ত দিতে হয়, কিন্তু ভগবানের সেবার নিজেকে উৎসর্গ করে কর্ম করলে আর সেই সমস্ত বন্ধন থাকে না। শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে –

দেবর্ষিভূতাপ্তনৃণাং পিতৃণাং
চ কিঙ্করো নায়মৃগী চ রাজন।
সর্বাত্মনা যঃ শরণং শরণ্যং
গতো মুকুন্দং পরিহৃত্য কর্তম।।

“যিনি শ্রীকৃষ্ণ বা মুকুন্দের চরণে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, অন্যান্য সমস্ত কর্তব্যকর্ম পরিত্যাগ করলেও তিনি দেবতা, ঋষি, জনসাধারণ, আত্মীয়স্বজন বা পিতৃপুরুষ, কারো কাছেই ঋণী নন।“ (ভাঃ ১১/৫/৪১) কোন রকম ফলাফলের বিচার না করে শ্রীকৃষ্ণের চরণে আত্মনিবেদন করাটাই যে মানব-জীবনের পরম কর্তব্য, সেই কথা ভগবান সংক্ষেপে অর্জুনকে জানিয়ে দিলেন। এই শ্লোকে অর্জুনের প্রতি এটিই পরোক্ষ ইঙ্গিত এবং পরবর্তী শ্লোকে ভগবান এই বিষয়ে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করবেন।

 

শ্লোক – ৩৯
এষা তেহভিহিতা সাংখ্যে বুদ্ধির্যোগে ত্বিমাং শৃণু।
বুদ্ধ্যা যুক্তো যয়া পার্থ কর্মবন্ধং প্রহাস্যসি ।। ৩৯ ।।

এষা- এই সমস্ত, তে- তোমাকে, অভিহিতা- বলা হল, সাংখ্যে- বিশ্লেষণ-মূলক জ্ঞান বিষয়ে, বুদ্ধিঃ- বুদ্ধি, যোগে- নিষ্কাম কর্মে, তু- কিন্তু, ইমাম- এই, শৃণু- শ্রবণ কর, বুদ্ধ্যা- বুদ্ধির দ্বারা, যুক্তঃ যুক্ত হলে, যয়া- যার দ্বারা, পার্থ- হে পৃথাপুত্র, কর্মবন্ধমৃ- কর্মের বন্ধন, প্রহাস্যসি- তুমি মুক্ত হতে পারবে।

গীতার গান
জ্ঞানের বিচারে সব বলিনু তোমাকে।
এবে শুন বুদ্ধিযোগে জ্ঞান পরিপাক।।
জ্ঞানীর যোগ্যতা যদি পরিপাক হয়।
ভক্তি দ্বারা বুদ্ধিযোগ তবে সে বুঝয়।।
ভক্তিযুক্ত কর্ম হয় কর্মযোগ নাম।
যাহার সাধনে কর্ম বন্ধন বিরাম।।

অনুবাদঃ হে পার্থ! আমি তোমাকে সাংখ্য-যোগের কথা বললাম। এখন ভক্তিযোগ সম্বন্ধিনী বুদ্ধির কথা শ্রবণ কর, যার দ্বারা তুমি কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারবে।

তাৎপর্যঃ নিরুক্তি বা বৈদিক অভিধান অনুযায়ী সংখ্যা কথাটির অর্থ হচ্ছে, যা কোন কিছুর বিশদ বিবরণ দেয় এবং সাংখ্য বলতে সেই দর্শনকে বোঝায় যা আত্মার স্বরূপ বর্ণনা করে। আর ‘যোগ’ হচ্ছে ইন্দ্রিয়গুলিকে দমন করার পন্থা। অর্জুনের যুদ্ধ না করার কারণ ছিল ইন্দ্রিয় সুখ ভোগের ইচ্ছে। তাঁর পরম কর্তব্যের কথা ভুলে গিয়ে অর্জুন যুদ্ধ করতে নারাজ হলেন, কারণ তিনি মনে করেছিলেন, ধৃতরাষ্ট্রের সন্তান এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করে রাজ্য সুখ ভোগ করার চাইতে অহিংসার পথ অবলম্বন করা অধিকতর সুখদায়ক হবে। উভয় ক্ষেত্রেই অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের ইচ্ছা। আত্মীয়-স্বজনদের পরাজিত করে রাজ্যসুখ ভোগ করা এবং তাদের জীবিত দেখে তাদের সান্নিধ্যে সুখ লাভ করা, এই দুই ক্ষেত্রেই ইন্দ্রিয়ের সুখভোগই হচ্ছে একমাত্র কারণ। এভাবেই অর্জুন তাঁর জ্ঞান ও কর্তব্য বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে এই চিন্তাধারা অবলম্বন করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাই অর্জুনকে বুঝাতে চেয়েছিলেন, তাঁর পিতামহকে হত্যা করলেও, তিনি তাঁর পিতামহের আত্মাকে কখনোই বিনাশ করতে পারবেন না, কারণ প্রতিটি জীব এবং ভগবান সনাতন ও স্বতন্ত্র। পূর্বেও এরা সকলেই এদের স্বতন্ত্র স্বত্বা নিয়ে বর্তমান ছিল, বর্তমানেও এরা আছে এবং ভবিষ্যতেও এরা থাকবে। প্রতিটি স্বতন্ত্র জীবের স্বরূপ হচ্ছে তার চিরশাশ্বত আত্মা। বিভিন্ন সময়ে সে ভিন্ন ভিন্ন ধরণের দেহ ধারণ করে, যা হচ্ছে পোশাকের মতো। তাই, জড় দেহের বন্ধন থেকে মুক্ত হবার পরেও জীবের স্বাতন্ত্র্য বর্তমান থাকে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে আত্মা ও দেহ সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে স্পষ্ট ব্যাখ্যা করেছেন। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে আত্মা ও দেহ সম্বন্ধে এই বর্ণনামূলক জ্ঞানকে নিরুক্তি অভিধান অনুসারে সাংখ্য-দর্শনের কোন যোগাযোগ নেই। ভন্ড কপিলের সাংখ্য-দর্শনের বহু পূর্বে শ্রীমদ্ভাগবতে প্রকৃত সাংখ্য-দর্শনের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ভগবানের অবতার কপিলদের (ইনি নিরীশ্বরবাদী কপিল নন) তাঁর মাতা দেবহূতিকে এই দর্শনের ব্যাখ্যা করে শোনান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, পুরুষ অথবা পরমেশ্বর ভগবান সক্রিয় এবং প্রকৃতির প্রতি তাঁর দৃষ্টিপাতের ফলে জড় জগতের উদ্ভব হয়। বেদে এবং ভগবাদ্গীতাতেও এই কথা স্বীকৃত হয়েছে। বেদে বলা হয়েছে, ভগবান যখন প্রকৃতির প্রতি দ্রিষ্টিপাত করেন, তখন তাঁর সেই দৃষ্টিপাতের ফলে প্রকৃতিতে অসংখ্য পারমাণবিক আত্মার সঞ্চার হয়। জড়া প্রকৃতিতে এইও সমস্ত আত্মা তাদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে এবং মায়ার প্রভাবের ফলে তারা মনে করছে, তারা ভোক্তা। এই বিকৃত মনোবৃত্তির সবচেয়ে অধঃপতিত অবস্থার প্রকাশ হয়, যখন তারা ভগবানের সঙ্গে এক হয়ে যাবার বাসনায় মুক্তি কামনা করে এবং তার পরিণতিতে নিজেদেরই ভগবান বলে জাহির করতে চেষ্টা করে। এটিই হচ্ছে মায়ার সবচেয়ে কঠিন ফাঁদ, কারণ তথাকথিত মুক্তিকামীরা মায়ামুক্ত হতে গিয়ে মায়ার সবচেয়ে জটিল ফাঁদে আটকে যায়। বহু বহু জন্ম এভাবে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করবার বাসনায় মায়ার দ্বারা ভবসমুদ্রে নাকানি-চোবানি খাবার পর, যখন জীবের অন্তরে শুভ বুদ্ধির উদয় হয়, তখন সে বুঝতে পারে, বাসুদেব বা শ্রীকৃষ্ণের চরণে আত্মসমর্পণ করাই হচ্ছে জীবের চরম উদ্দেশ্য এবং ভবসমুদ্র থেকে উদ্ধার পাবার একমাত্র পথ। তখন সে পরম সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে।

অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণে আত্মসমর্পণ করে তাঁকে গুরুরুপে গ্রহণ করেছেন – শিষ্যস্তেহহং শাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম। ফলস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ এখন তাঁকে ‘বুদ্ধিযোগ’ বা ‘কর্মযোগ’ অথবা নিজের অন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধন করার পরিবর্তে ভগবানের ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির জন্য ভক্তিযোগ অনুশীলনের পন্থা বর্ণনা করবেন। এই বুদ্ধিযোগকে দশম অধ্যায়ের দশম শ্লোকে সম্পূর্ণরুপে ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, ভগবানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন, যিনি পরমাত্মারুপে সকলের অন্তরেই বিরাজ করছেন। কিন্তু ভগবদ্ভক্তি ব্যতিট সেই রকম যোগাযোগ স্থাপন করা হয় না। তাই যদি ভগবানে অপ্রাকৃত প্রেমভক্তির স্তরে অবস্থিত, পক্ষান্তরে যিনি কৃষ্ণভাবনাময়, তিনিই ভগবানের বিশেষ কৃপায় এই বুদ্ধিযোগের স্তর লাভ করেন। তাই ভগবান বলেছেন যে, যারা প্রীতি পূর্বক ভগবৎ-সেবায় নিয়োজিত, কেবল তাদেরই তিনি প্রেম ভক্তির শুদ্ধ জ্ঞান প্রদান করবেন। এভাবে ভগবদ্ভক্ত চির-আনন্দময় ভগবানের রাজ্যে তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারেন।

এভাবে এই শ্লোকে বুদ্ধিযোগ বলতে ভক্তিযোগকে বোঝানো হয়েছে এবং এখানে সাংখ্য অর্থে নিরীশ্বরবাদী কপিলের ‘সাংখ্য-যোগ’কে বোঝানো হয়নি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যে সময়ে  ভগবদগীতা বলেছিলেন, তখন সেই সাংখ্য-যোগের কোন প্রভাব ছিল না, আর তা ছাড়া কপিলের মতো নাস্তিকের কল্পনাপ্রসূত এই ভ্রান্তিবিলাস নিয়ে মাথা ঘামাবার কোন প্রয়োজনই ভগবানের ছিল না। পূর্বেই বলা হয়েছে, ভগবানের অবতার কপিলদের প্রকৃত সাংখ্য বলতে এখানে দেহ ও আত্মার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণের বিবরণের কথা বলা হয়েছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে আত্মার সম্বন্ধে বিশদভাবে বর্ণনা করে শোনালেন যাতে তিনি বুদ্ধিযোগ বা ভক্তিযোগের মাহাত্ম উপলব্ধি করতে পারেন। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যে সাংখ্যের কথা বলেছেন এবং শ্রীমদ্ভগবতে বর্ণিত ভগবান কপিলদেবের সাংখ্যের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই, কারণ উভয় সাংখ্যই হচ্ছে ভক্তিযোগ। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরাই কেবল সাংখ্য-যোগ ও ভক্তিযোগকে ভিন্ন বলে মনে করে (সাংখ্যযোগৌ পৃথক বালাঃ প্রবদন্তি ন পণ্ডিতাঃ)।

নাস্তিক কপিলের যে সাংখ্য-যোগ তার সঙ্গে ভক্তিযোগের অবশ্যই কোন সম্পর্ক নেই, তবুও কিছু বুদ্ধিহীন লোক দাবি করে থাকে, ভগবদগীতায় নাকি নাস্তিক সাংখ্য-যোগের উল্লেখ আছে।

ভগবদগীতার মূল তত্ত্ব এখানে উদ্ঘাটিত হয়েছে। এই শ্লোকের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, বুদ্ধিযোগের অর্থ হচ্ছে কৃষ্ণভাবনায় মগ্ন হয়ে ভগবানের সেবা করা। ভগবানের তৃপ্তিসাধন করার জন্য ভগবদ্ভক্ত যখন বুদ্ধিযোগের মাধ্যমে কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করেন, সেই কর্তব্যকর্ম যতই কষ্টকর হোক না কেন, ভগবৎ-ভাবনায় মগ্ন হয়ে থাকার ফলে তিনি তখন অপ্রাকৃত আনন্দে মগ্ন থাকেন। ভগবানের এই সেবার ফলে অনায়াসে অপ্রাকৃত অনুভূতির আস্বাদ পাওয়া যায় এবং ভগবানের কৃপার ফলে কোন রকম বাহ্যিক প্রচেষ্টা ছাড়াই হৃদয়ে দিব্যজ্ঞানের প্রকাশ হয় এবং এভাবে তিনি মুক্তিলাভ করে পূর্ণতা প্রাপ্ত হন। কৃষ্ণভাবনাময় কর্ম ও সকাম কর্মের মধ্যে যথেষ্ট প্রভেদ রয়েছে, বিশেষ করে পারিবারিক ও জাগতিক সুখলাভের নিমিত্ত ইন্দ্রিয়-তর্পণের বিষয়ে। তাই বুদ্ধিযোগ হচ্ছে অপ্রাকৃত গুণসম্পন্ন কর্ম, যা আমাদের দ্বারা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

 

শ্লোক – ৪০
নেহাভিক্রমনাশোহস্তি প্রত্যবায়ো ন বিদ্যতে।
স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ ।। ৪০ ।।

ন- নেই, ইহ- এই যোগে, অভিক্রম- প্রচেষ্টা, নাশ- বিনাশ, অস্তি- আছে, প্রত্যবায়ঃ- হ্রাস, ন বিদ্যতে- হয় না, স্বল্পম- অল্প, অপি- যদিও, অস্য- এই, ধর্মস্য- ধর্মের, ত্রায়তে- ত্রাণ করে, মহতঃ- মহা, ভয়াৎ- ভয় থেকে।

গীতার গান
ক্ষয় ব্যয় নাহি নাশ সে কার্য সাধনে।
যাহা পার করে যাও সঞ্চয় এ ধনে।।
স্বল্প মাত্র হয় যদি সে ধর্ম সাধন।
মহাভয় হতে রক্ষা পাইবে তখন।।

অনুবাদঃ ভক্তিযোগের অনুশীলন কখনো ব্যর্থ হয় না এবং তার কোন ক্ষয় নেই। তার স্বল্প অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠাতাকে সংসাররুপ মহাভয় থেকে পরিত্রাণ করে।

তাৎপর্যঃ নিজের সুখ-সুবিধার কথা বিবেচনা না করে কৃষ্ণভাবনায় কর্ম বা শ্রীকৃষ্ণের সেবা করাই হচ্ছে সবচেয়ে মহৎ কাজ। কেউ যদি একটু একটু করেও ভগবানের সেবা করতে শুরু করে, তাতেও কোন ক্ষতি নেই এবং ভগবানের এই সেবা যত নগণ্যই হোক না কেন, কোন অবস্থাতেই তা বিফলে যায় না। জড়-জাগতিক স্তরে যে কোন কাজকর্ম যতক্ষন পর্যন্ত সুসম্পন্ন না হচ্ছে, ততক্ষণ তার কোন তাৎপর্যই থাকে না। কিন্তু অপ্রাকৃত কর্ম বা ভগবত-সেবা সুসম্পন্ন না হলেও, বিফলে যায় না – তার সুফল চিরস্থায়ী হয়ে থাকে। ভগবানের সেবা একবার যে শুরু করেছে, তার আর বিপথগামী হবার কোন সম্ভাবনা থাকে না। এক জন্মে যদি তার ভগবদ্ভক্তি সম্পূর্ণ নাও হয়, তবে তার পরের জন্মে সে যেখানে শেষ করেছিল, সেখান থেকে আবার শুরু করবে। এভাবেই ভগবদ্ভক্তির ফল চিরস্থায়ী থাকে বলে ক্রমান্বয়ে জীবকে মায়ামুক্ত করে। শ্রীমদ্ভাগবতে অজামিলের কাহিনীর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, খানিকটা ভগবদ্ভক্তি সাধন করে, অধঃপতিত হওয়া সত্ত্বেও সে ভাগবানের অহৈতুকী কৃপা লাভ করে উদ্ধার পেয়ে যায়। এই সম্পর্কে শ্রীমদ্ভাগবতে (১/৫/১৭) একটি সুন্দর শ্লোক আছে –

ত্যক্তা স্বধর্ম চরণাম্বুজং হরে-
র্ভজন্নপকোহথ পতেত্ততো যদি।
যত্র ক বাভদ্রমভূদমুষ্য কিং
কো বার্থ আপ্তোহভজতাং স্বধর্মতঃ।।

“যদি কেউ তার স্বীয় কর্তব্যকর্ম ত্যাগ করে ভগবানের শ্রীচরণাম্বুজের সেবা করে এবং সেই ভগবত-সেবা সম্পূর্ণ না করে অধঃপতিত হয়, তাতে ক্ষতি কি? আর যদি কেউ জড়-জাগতিক সমস্ত কর্তব্যকর্ম সুসম্পন্ন করে তাতে তার কি লাভ?”  কিংবাম,যেমন খৃষ্টধর্মীরা বলে থাকেন, “কোনও মানুষ সমগ্র পৃথিবী লাভ করেও যদি তার শাশ্বত আত্মাকেই হারিয়ে ফেলে, তবে তার কি লাভ?”

জড় দেহের বিনাশের সঙ্গে সঙ্গে সব রকম জড়-জাগতিক প্রচেষ্টা এবং সেই সমস্ত প্রচেষ্টালব্ধ ফল, সব কিছুরই বিনাশ ঘটে। কিন্তু ভগবানের সেবায় মানুষ যে সব কাজকর্ম করে, তার ফলে সে আবার আরও ভালভাবে ভগবানের সেবা করবার সুযোগ পায়, এমন কি দেহের বিনাশ হলেও। ভগবানের সেবাকার্য সম্পূর্ণ না করে যদি কেউ দেহত্যাগ করে, তবে পরজন্মে সে আবার মনুষ্যজন্ম লাভ করে। সৎ ব্রাক্ষ্মন অথবা প্রতিপত্তিশালী সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম লাভ করে সে আবার তার অসম্পূর্ণ ভগবদ্ভক্তিকে সম্পূর্ণ করে ভগবানের কাছে ফিরে যাবার সুযোগ পায়। কৃষ্ণভাবনাময় কর্মে আত্মনিয়োগ করার এই হচ্ছে অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য।

 

শ্লোক – ৪১
ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিরেকেহ কুরুনন্দন।
বহুশাখা হ্যনন্তাশ্চ বুদ্ধয়োহব্যবসায়িনাম ।। ৪১ ।।

ব্যবসায়াত্মিকা- নিশ্চয়াত্মিকা কৃষ্ণভক্তি, বুদ্ধিঃ- বুদ্ধি, একা- একটি মাত্র, ইহ- এই জগতে, কুরুনন্দন- হে কুরুবংশীয়, বহুশাখা- বহু শাখায় বিভক্ত, হি- যেহেতু, অনন্তাঃ- অনন্ত, চ- এবং, বুদ্ধয়ঃ- বুদ্ধি, অব্যবসায়িনাম- কৃষ্ণভক্তিবিহীন ব্যক্তিদের।

গীতার গান
ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধি হে কুরুনন্দন।
একমাত্র হয় তাহা বহু না কখন।।
অনন্ত অপার সে অব্যবসায়ী হয়।
বহু শাখা বিস্তারিত কে করে নির্ণয়।।

অনুবাদঃ যারা এই পথ অবলম্বন করেছে তাদের নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি একনিষ্ঠ। হে কুরুনন্দন, অস্থিরচিত্ত সকাম ব্যক্তিদের বহু শাখাবিশিষ্ট ও বহুমুখী।

তাৎপর্যঃ কৃষ্ণভাবনাময় ভক্ত নিঃশঙ্কচিত্তে বিশ্বাস করেন যে, ভক্তি সহকারে ভগবানের সেবা করলে, ভগবান তাঁকে এই জড় জগতের বন্ধনমুক্ত করে ভগবত-ধামে তাঁর নিজের কাছে নিয়ে যাবেন। এই বিশ্বাসকে বলা হয় ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধি। শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (মধ্য ২২/৬২) বলা হয়েছে –

‘শ্রদ্ধা’-শব্দে-বিশ্বাস কহে সুদৃঢ় নিশ্চয়।
কৃষ্ণে ভক্তি কৈলে সর্বকর্ম কৃত হয়।।

বিশ্বাস মানে কোন সুমহান বিষয়ে অবিচল আস্তা। সাধারণ অবস্থায় মানুষের নানা রকম দায়-দায়িত্ব থাকে। তার পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে, দেশের কাছে, তার কোন না কোন রকম কর্তব্য থাকে। এভাবে মনুষ্য সমাজ সকলের কাছ থেকেই কোন না কোন রকম কর্তব্য দাবি করে থাকে। আর মানুষও তার পূর্বকৃত ভাল-মন্দ কর্মের ফল অনুসারে জীবন অতিবাহিত করতে থাকে। কিন্তু যখন মানুষ ভগবত-সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে, তখন আর তাকে সৎ কর্ম করে অশুভ ফল ভোগ করার ভয়ে ভীত হতে হয় না। কারণ, ভগবত-সেবা হচ্ছে অপ্রাকৃত কর্ম, তা ভাল-মন্দ, শুভ-অশুভ, এই সব দ্বন্দ্বের অতীত। ভক্তিযোগের সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হলে জড় জগতের সঙ্গে আর কোন সম্পর্ক থাকে না – একেই বলে বৈরাগ্য। ভগবদ্ভক্তির বিকাশ হতে থাকলে, ভগবানের কৃপার ফলেই এক সময় এই স্তরে উপনীত হওয়া যায়।

কৃষ্ণভাবনায় কোন ব্যক্তির নিশ্চয়াত্মিকা কৃষ্ণভক্তির ভিত্তি হচ্ছে জ্ঞান। পরম তত্ত্বজ্ঞান উপলব্ধি করার পরই ভক্ত ভগবানের চরণে নিজেকে সমর্পণ করেন। বাসুদেবঃ সর্বমিতি স মহাত্ম সুদুর্লভঃ- একজন কৃষ্ণভাবনাময় ব্যক্তি দুর্লভ মহাত্মা এবং তিনি জ্ঞানের মাধ্যমে বুঝতে পারেন, বাসুদেব বা শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন সর্ব কারণের মূল। কারণ, তিনিই হচ্ছেন সমস্ত কিছুর উৎস। গাছের গোড়ায় জল দিলে যেমন সারা গাছকেই জল দেওয়া হয়, তেমনই, সব কিছুর উৎস ভগবানের সেবা করলে আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সমাজ, জাতি আদি সকলেরই সেবা করা হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যদি তুষ্ট হন, তা হলে সকলেই সন্তুষ্ট হবেন।

সদগুরুর সুদক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং তার নির্দেশ অনুসারে ভক্তিযোগের অনুশীলন করাই হচ্ছে মানব-জীবনের পরম কর্তব্যকর্ম। সদগুরু হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সুযোগ্য প্রতিনিধি। তিনি তাঁর শিষ্যের মনোভাব বুঝতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী তিনি তাকে ভগবানের সেবায় নিয়োজিত করেন। তাই, সুষ্ঠুভাবে ভক্তিযোগ সাধন করতে হলে ভগবানের প্রতিনিধি গুরুদেবের নির্দেশ শিরোধার্য করে এবং তাঁর আদেশকে জীবনের একমাত্র কর্তব্য বলে মনে করে তা পালন করতে হবে। শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর শ্রীগুর্বষ্টকে বলেছেন –

যস্য প্রসাদাদ্ভগবৎপ্রসাদো
যস্যাপ্রসাদান্ন গতিঃ কুতোহপি।
ধ্যায়ংস্তবংস্তস্য যশস্ত্রিসদন্ধ্যং
বন্দে গুরোঃ শ্রীচরণারবিন্দম।।

“গুরুদেব সন্তুষ্ট হলে ভগবান সন্তুষ্ট হন এবং গুরুদেবকে সন্তুষ্ট না করতে পারলে কখনই ভগদ্ভক্তি লাভ করা যায় না। তাই ত্রিসন্ধ্যায় আমি আমার পরমারাধ্য গুরুদেবের কীর্তিসমূহ ধ্যান করি, স্তব করি এবং তাঁর শ্রীচরণারবিন্দের বন্দনা করি।“

দেহাত্মবুদ্ধি পরিত্যাগ করে আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান লাভ করার ফলে ভক্তের হৃদয়ে ভগবদ্ভক্তির উন্মেষ হয় এবং তখন তিনি সর্বান্তকরণে ভগবানের সেবায় বর্তী হন। এই আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান জানলেই কেবল শুদ্ধ ভগবদ্ভক্ত হওয়া যায় না – পূর্ণরুপে তার উপলব্ধি এবং আচরণ করার মাধ্যমেই কেবল শুদ্ধ ভগবদ্ভক্তির বিকাশ হয়। যে মানুষের মন চঞ্চল ও বুদ্ধি অপরিণত, তার পক্ষে ভগবদ্ভক্তি সাধন করা সম্ভব নয়। কারণ, সে সকাম কর্মের দ্বারা অতিমাত্রায় প্রভাবিত থাকার ফলে সম্পূর্ণ নিষ্কাম ভগবদ্ভক্তির মর্ম উপলব্ধি করতে পারে না।

 

শ্লোক ৪২-৪৩
যামিমাং পুষ্পিতাং বাচং প্রবদন্ত্যবিপশ্চিতঃ।
বেদবাদরতাঃ পার্থ নান্যদন্তীতি বাদিনঃ ।। ৪২ ।।
কামাত্মানঃ স্বর্গপরা জন্মকর্মফলপ্রদাম।
ক্রিয়াবিশেষবহুলাং ভোগৈশ্বর্যগতিং প্রতি ।। ৪৩ ।।

যাম ইমাম- এই সমস্ত, পুষ্পিতাম- পুষ্পিত, বাচম- বাক্য, প্রবদন্তি- বলে, অবিপশ্চিতঃ- অবিবেকী মানুষ, বেদবাদরতাঃ- বেদের তথাকথিত অনুগামী, পার্থ- হে পৃথাপুত্র, ন- না, অন্যৎ- অন্য কিছু, অস্তি- আছে, ইতি- এভাবে, বাদিনঃ- মতবাদী, কামাত্মানঃ- কামনাযুক্ত, স্বর্গপরাঃ- স্বর্গ লাভই যাদের প্রধান উদ্দেশ্য, জন্মকর্মফলপ্রদাম- জন্মরুপ কর্মফলপ্রদ, ক্রিয়াবিশেষ- আড়ম্বরপূর্ণ ক্রিয়াকলাপ, বহুলাম- বিবিধ, ভোগ- ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ, ঐশ্চর্য- ঐশ্চর্য, গতিম- প্রগতি, প্রতি- প্রতি।

গীতার গান
পুষ্পের সাজনে যাহা ইষ্ট মিষ্ট কথা।
কর্মীর হৃদয় তাহা করে প্রফুল্লিতা।।
সেই বেদ বাদী সব ভোগের কারণ।
যথাসর্ব সেই কথা করয়ে বরণ।।
মূর্খ সেই ভোগবাদী আপাত মধুর।
দত্তচিত্ত হয়ে যায় আসলে ফতুর।।
কামাত্মনা লোক সব স্বর্গভোগ চায়।
কর্মফল ভোগলিপ্সা আর না বুঝায়।।
আড়ম্বরে ভুলে যায় ভোগৈশ্বর্য চায়।
বুদ্ধিযোগ এক লক্ষ্য তাহা না মানয়।।

অনুবাদঃ বিবেকবর্জিত লোকেরাই বেদের পুষ্পিত বাক্যে আসক্ত হয়ে স্বর্গসুখ ভোগ, উচ্চকুলে জন্ম, ক্ষমতা লাভ আদি সকাম কর্মকেই জীবনের চরম উদ্দেশ্য বলে মনে করে। ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ ও ঐশ্চর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তারা বলে যে, তার ঊর্ধ্বে আর কিছুই নেই।

তাৎপর্যঃ সাধারণত মানুষ অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন এবং তাদের মূর্খতার ফলে তারা বেদের কর্মকান্ডে বর্ণিত সকাম কর্মের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। ভোগ ও ঐশ্চর্যে পরিপূর্ণ স্বর্গলোকে গিয়ে ইন্দ্রিয়ের চরম তৃপ্তিসাধন করাই হচ্ছে তাদের পরম কাম্য। বেদে স্বর্গলোকে যাবার জন্য নানা রকম যজ্ঞের বিধান দেওয়া আছে, তার মধ্যে ‘জ্যোতিষ্টোম’ যজ্ঞ বিশেষভাবে ফলপ্রদ। বাস্তবিকই যে মানুষ স্বর্গলোকে যেতে চায়, তার পক্ষে এই সমস্ত যজ্ঞগুলি সম্পাদন করা অবশ্য কর্তব্য। তাই অল্পবুদ্ধি- সম্পন্ন মানুষেরা মনে করে, এটিই হচ্ছে বৈদিক জ্ঞানের চরম শিক্ষা। এই প্রকার অনভিজ্ঞ লোকদের পক্ষে একাগ্রচিত্তে ভগবদ্ভক্তি সাধন করা সম্ভবপর হয় না। মূর্খ যেমন বিষ-বৃক্ষের ফল দেখে লালায়িত হয়, তেমনই অপরিণত বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা স্বর্গলোকের ঐশ্চর্যের দ্বারা প্রলোভিত হয়ে তা ভোগ করবার বাসনায় লালায়িত হয়।

বেদের কর্মকাণ্ড উল্লেখ আছে- অপাম সোমমমৃতা অভূম। এ ছাড়া আরও উল্লেখ আছে – অক্ষয্যং হ বৈ চাতুর্মাস্যযাজিনঃ সুকৃতং ভবতি। এর মানে, চাতুর্মাস্য ব্রত পালন করলে মানুষ স্বর্গলোকে গিয়ে সোমরস পান করে অমরত্ব লাভ করে এবং চিরকালের জন্য সুখী হতে পারে। এমন কি এই পৃথিবীতেও বহু লোক আছে, যারা সোমরস পান করার জন্য নিতান্ত উৎসুক। কারণ, সোমরস পান করে বল ও বীর্য বর্ধন করে কিভাবে আরও বেশি করে ইন্দ্রিয়সুখ উপভোগ করতে পারবে, সেটিই তাদের এমকাত্র কাম্য। এই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে এরা ভগবানের কাছে ফিরে যেতে চায় না। এদের সীমিত বুদ্ধিতে এরা উপলব্ধি করতে পারে না যে, ভগবৎ-ধামে ফিরে যাওয়ার যে আনন্দ, তার তুলনায় স্বর্গসুখ নিতান্তই তুচ্ছ। তাই, তারা আড়ম্বরপূর্ণ বৈদিক যাগযজ্ঞের প্রতি বিশেষভাবে আসক্ত। এই ধরণের লোকেরা অত্যন্ত ইন্দ্রিয়-পরায়ণ, তাই তারা ইন্দ্রিয়-সুখের চরম স্তর স্বর্গলোকের অতীত যে আর কিছু থাকতে পারে, তা বুঝতে পারে না। মনে করে, স্বর্গের নন্দন-কাননে সোমরস পান করে অপরূপ রূপসী অপ্সরাদের সঙ্গ করে ইন্দ্রিয়সুখ উপভোগই হচ্ছে চরম প্রাপ্তি। এই প্রকার দৈহিক সুখ নিঃসন্দেহে ইন্দ্রিয়জাত; তাই যারা এই প্রকার জাগতিক অস্থায়ী সুখের প্রতি আসক্ত, তারা নিজেদেরকে পার্থিব জগতের প্রভু বলে মনে করে।

 

শ্লোক – ৪৪
ভোগৈশ্বর্যপ্রসক্তানাং তয়াপহৃতচেতসাম।
ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিঃ সমাধৌ ন বিধীয়তে ।। ৪৪ ।।

ভোগ- জড় সুখভোগে, ঐশ্চর্য- ঐশ্চর্যে, প্রসক্তানাম- যারা গভীরভাবে আসক্ত, তয়া- তাদের দ্বারা, অপহৃতচেতসাম- বিমূঢ়চিত্ত, ব্যবসায়াত্মিকা- দৃঢ়চিত্ত, নিশ্চয়াত্মিকা, বুদ্ধিঃ- ভগবানের ভক্তিযুক্ত সেবা, সমাধৌ- সংযতচিত্ত, ন- না, বিধীয়তে- হয় না।

গীতার গান
ভোগৈশ্চর্যে আসক্ত যে পাগলের মত।
নিজেকে হারিয়া বসে আশা শত শত।।
তারা নাহি বুঝে  ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধি।
আসক্তি তাদের শুধু ভুক্তি মুক্তি সিদ্ধি।।

অনুবাদঃ যারা ভোগ ও ঐশ্চর্যসুখে একান্ত আসক্ত, সেই সমস্ত বিবেকবর্জিত মূঢ় ব্যক্তিদের বুদ্ধি সমাধি অর্থাৎ ভগবানে একনিষ্ঠতা লাভ হয় না।

তাৎপর্যঃ চিত্ত যখন একাগ্র হয়, তখন তাকে বলা হয় সমাধি। বৈদিক অভিধান নিরুক্তিতে বলা হয়েছে, সম্যগাধীয়তেহস্মিন্নাত্মতত্ত্বযাথাত্ম্যম – “মন যখন আত্মাকে উপলব্ধি করার জন্য একাগ্র হয়, তাখন তাকে বলা হয় সমাধি।“ যে মানুষ ইন্দ্রিয়সুখ উপলব্ধি করতে উৎসুক এবং যারা অনিত্য জড় জগতের দ্বারা মোহাচ্ছন্ন, তাদের পক্ষে একাগ্রচিত্তে আত্ম-উপলব্ধি বা সমাধি লাভ করা অসম্ভব। মায়া তাদের এত গভীরভাবে বেঁধে রেখেছে যে, তাদের পক্ষে সেই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া দুষ্কর।

 

শ্লোক – ৪৫
ত্রৈগুণ্যবিষয়া বেদা নিস্ত্রৈগুণ্যো ভবার্জুন।
নির্দ্বন্দ্বো নিত্যসত্বস্থো নির্যোগক্ষেম আত্মাবান ।। ৪৫ ।।

ত্রৈগুণ্য- প্রকৃতির তিনটি গুণ সম্পর্কিত, বিষয়াঃ- বিষয়ে, বেদাঃ- বৈদিক শাস্ত্রসমূহ, নিস্ত্রৈগুণ্যঃ- জড়া প্রকৃতির ত্রিগুণের অতীত, ভব- হও, অর্জুন- হে অর্জুন, নির্দ্বন্দ্বঃ- দ্বন্দ্বরহিত, নিত্যসত্বস্থঃ- শুদ্ধ সত্ত্ব চিন্ময় অস্তিত্বে, নির্যোগক্ষেমঃ- অলব্ধ বস্তুর লাভ এবং তার রক্ষার চিন্তা থেকে মুক্ত, আত্মবান- আধ্যাত্ম চেতনায় অবস্থিত।

গীতার গান
ত্রিগুণের মধ্যে বেদ সত্ত্ব রজস্তম।
তাহার উপরে উঠ তবে সে উত্তম।।
তখনই দ্বন্দ্বভাব ঘুচিবে তোমার।
নিত্য শুদ্ধ সত্ত্বভাব হবে আবিষ্কার।।
আত্মবান হয় সদা নির্যোগ নিক্ষেম।
যে ধনে সে ধনী তাহা ভগবদ প্রেম।।

অনুবাদঃ বেদে প্রধাণত জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণ সম্বন্ধেই আলোচনা করা হয়েছে। হে অর্জুন! তুমি সেই গুণগুলিকে অতিক্রম করে নির্গুণ স্তরে অধিষ্ঠিত হও। সমস্ত দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হও এবং লাভ-ক্ষতি ও আত্মরক্ষার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে অধ্যাত্ম চেতনায় অধিষ্ঠিত হও।

তাৎপর্যঃ জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের প্রভাবে জড় জগতের প্রতিটি ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এই প্রতিক্রিয়া বা কর্মফল জীবকে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। বেদ সাধারণত সকাম কর্ম করার শিক্ষা দান করে, যার ফলে সাধারণ মানুষ জড় সুখ উপভোগ ও জড় ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তিসাধনের স্তর থেকে ক্রমশ অধোক্ষজ স্তরে উত্তীর্ণ হতে পারে। ভগবান তাঁর প্রিয় সখা ও প্রিয় শিষ্য অর্জুনকে উপদেশ দিয়েছেন, বেদান্ত দর্শনের মর্ম উপলব্ধি করে পরা প্রকৃতিতে অধিষ্ঠিত হতে। এই বেদান্ত দর্শনের প্রশ্ন হচ্ছে – ব্রক্ষ্ম জিজ্ঞাসা, অর্থাৎ পরব্রক্ষ্মের অনুসন্ধান করা। জড় জগতে প্রতিটি জীবই বেঁচে থাকার জন্য কঠোর সংগ্রাম করছে। এই সমস্ত মায়াবদ্ধ জীবকে উদ্ধার করার জন্য ভগবান সৃষ্টির আদিতে বৈদিক জ্ঞান দান করেন, যাতে তারা বুঝতে পারে, কি রকম জীবনযাপন করলে তারা এই জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারবে এবং তাদের প্রকৃত আলয় ভগবৎ-ধামে ফিরে যেতে পারবে। বেদের কর্মকাণ্ড নামক অধ্যায়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিভাবে যাগযজ্ঞ অনুষ্ঠান করার মাধ্যমে জাগতিক কামনা-বাসনার তৃপ্তিসাধন করা যায়। এভাবে ইন্দ্রিয়তৃপ্তি জনিত নানা রকম সুখভোগ করার পর জীব যখন বুঝতে পারে, জড় জগতের সমস্ত সুখই অনিত্য ও নিরর্থক, তখন তার মন পারমার্থিক তত্ত্ব অনুসন্ধানে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। তাই বেদে কর্মকান্ডের পর উপনিষদে ভগবৎ-তত্ত্ব সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন উপনিষদগুলি হচ্ছে বিভিন্ন বেদের মর্মার্থ, যেমন গীতোপনিষদ বা ভগবদগীতা হচ্ছে পঞ্চম বেদ মহাভারতের সারাংশ। এই উপনিষদগুলির মাধ্যমে মানুষের পারমার্থিক জীবন শুরু হয়।

যতক্ষন আমাদের জড় দেহ আছে, ততক্ষণ প্রকৃতির বিভিন্ন গুণের প্রভাবে আমাদের কর্ম করতে হয় এবং তার ফল ভোগ করতে হয়। এটিই হচ্ছে কর্মবন্ধন। কিন্তু অপ্রাকৃত জগতে উত্তীর্ণ হতে হলে যে সুখ-দুঃখ, শীত-উষ্ণের দ্বন্দ্বভাব, তাতে অবিচলিত থেকে তার প্রভাবমুক্ত হতে হয় এবং তখন আর লাভ-ক্ষতির বিচারবোধ থাকে না। মন তখন আর অনুশোচনা ও অহংকার দ্বারা বিমোহিত হয় না। এভাবেই জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে জীব যখন ভগবানের ইচ্ছার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করে, তখনই সে পরা প্রকৃতিতে অধিষ্ঠিত হয়ে তার সৎ, চিৎ ও আনন্দময় স্বরূপকে উপলব্ধি করতে পারে।

 

শ্লোক – ৪৬
যাবানর্থ উদপানে সর্বতঃ সংপ্লুতোদকে।
তাবান সর্বেষু বেদেষু ব্রাক্ষ্মণস্য বিজানতঃ ।। ৪৬ ।।

যাবান- যে সমস্ত, অর্থঃ- প্রয়োজন, উদপানে- ক্ষুদ্র জলাশয়ে, সর্বতঃ- সর্বতোভাবে, সংপ্লুতোদকে- অতি বৃহৎ জলাশয়ে, তাবান- তেমনই, সর্বেষু- সমস্ত, বেদেষু- বৈদিক শাস্ত্রে, ব্রাক্ষ্মণস্য- পরব্রক্ষ্ম সম্বন্ধে অভিজ্ঞ ব্যক্তির, বিজানতঃ- পূর্ণ জ্ঞানবান।

গীতার গান
সেই প্রেমে ভাসমান সর্ব লাভ পায়।
কূপ জল নদী জল যথা যথা হয়।।
এক কূপে হয় এক কার্যের সাধন।
নদীর জলেতে হয় একত্রে ভাজন।।
বেদের তাৎপর্য সেই এক লক্ষ্য হয়।
ব্রাক্ষ্মণ যে হয় সেই সমস্ত বুঝায়।।

অনুবাদঃ ক্ষুদ্র জলাশয়ে যে সমস্ত প্রয়োজন সাধিত হয়, সেগুলো বৃহৎ জলাশয় থেকে আপনা হতেই সাধিত হয়ে যায়। তেমনই, ভগবানের উপাসনার মাধ্যমে যিনি পরব্রক্ষ্মের জ্ঞান লাভ করে সব কিছুর উদ্দেশ্য উপলব্ধি করেছেন, তাঁর কাছে সমস্ত বেদের উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে।

তাৎপর্যঃ বেদের কর্মকান্ডে যে সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান ও যাগ-যজ্ঞের বিধান দেওয়া আছে, তার উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবকে ক্রমশ আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে উৎসাহিত করা। ভগবদগীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের পঞ্চদশ শ্লোকে (১৫/১৫) স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে, বেদ অধ্যয়ন করার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে সর্ব কারণের কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জানা। এভাবে আমরা দেখতে পাই, আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান লাভ করার অর্থ হচ্ছে ভগবানের সঙ্গে আমাদের নিত্য সম্পর্ক উপলব্ধি করা। ভগবদগীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ে (১৫৬/৭) ভগবানের সঙ্গে জীবের সম্পর্কের ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, জীব হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই, জীবের একমাত্র কর্তব্য হচ্ছে, ভগবানের সেবা করা – তার অন্তরের শাশ্বত কৃষ্ণভাবনা জাগিয়ে তোলা। এটিই হচ্ছে বৈদিক জ্ঞানের চরম সত্য। শ্রীমদ্ভগবতে (৩/৩৩/৭) তার সমর্থনে বলা হয়েছে –

অহো বত শ্বপচোহতো গরীয়ান
যজ্জিহ্বাগ্রে বর্ততে নাম তুভ্যম।
তেপুস্তপস্তে জুহুবুঃ সস্নুরার্ষা
ব্রক্ষ্মানূচুর্নাম গৃণন্তি যে তে।।

“হে ভগবান, নিরন্তর যিনি আপনার নাম কীর্তন করেন, তিনি যদি চন্ডালের মতো নীচকূলেও জন্মগ্রহণ করেন, তবুও তিনি অধ্যাত্ম-মার্গের অতি উচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত। এই প্রকার মানুষ বৈদিক শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে বহু তপশ্চর্যা করেছেন এবং সমস্ত পূর্ণতীর্থে বহু স্নান করে তিনি বহুবার বেদ অধ্যায়ন করেছেন। এমন মানুষকে আর্যকুলে শ্রেষ্ঠ বলেই বিবেচনা করা হয়।“

সুতরাং বেদ থেকে আমরা বুঝতে পারি, যাগ-যজ্ঞ ও আচার-অনুষ্ঠান করে স্বর্গলোকে উন্নততর ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করার শিক্ষা বৈদিক শাস্ত্র আমাদের দিচ্ছে না। বৈদিক শাস্ত্রের প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে ভগবদ্ভক্তি লাভ করা। বৈদিক শাস্ত্র-নির্দেশিত বিভিন্ন যাগ-যজ্ঞের অনুষ্ঠান করা, সমস্ত বেদ, বেদান্ত ও উপনিষদ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুশীলন করা এই যুগের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এই সমস্ত করার জন্য যে শক্তি, জ্ঞান, ঐশ্চর্য ও নিষ্ঠার প্রয়োজন, তা এই যুগের মানুষের নেই। তাই, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই কলিযুগে অধঃপতিত মানুষদের উদ্ধার করার জন্য ভগবানের দিব্য নামের সংকীর্তন করার পথ প্রদর্শন করে গেছেন। মহাপণ্ডিত প্রকাশানন্দ সরস্বতী যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে জিজ্ঞেস করেন, যদিও তাঁকে সাক্ষাৎ নারায়ণ বলে মনে হয়, তবু বেদান্ত দর্শন পাঠ না করে তিনি কেন ভাবুকের মতো ভগবানের নাম কীর্তন করছেন। এর উত্তরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেন, তাঁর গুরুদেব বুঝতে পারেন যে, তিনি অত্যন্ত মূর্খ, তাই তিনি তাঁকে শাসন করে উপদেশ দিলেন যে, বেদান্ত শাস্ত্র অধ্যয়নে তাঁর অধিকার নেই। এই বলে তিনি তাঁকে কৃষ্ণমন্ত্র জপ করার নির্দেশ দিলেন। এই নাম জপ করতে করতে তিনি ভগবদ্ভক্তির ভাবে উন্মাদ হয়ে উঠলেন। এই কলিযুগে অধিকাংশ মানুষই মূর্খ। বেদান্ত দর্শন বোঝার মতো ক্ষমতা তাদের নেই, তাই ভগবান বেদান্ত দর্শনের সারমর্ম ভগবদ্ভক্তির বার্তা বহন করে এনে, এই ভক্তি লাভ করার পথ প্রদর্শন করে গেলেন। নিষ্কলুষ চিত্তে নিরপরাধে ভগবানের নাম জপ করার মাধ্যমে জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হবার আশীর্বাদ দিয়ে গেলেন। বৈদিক জ্ঞানের শেষ কথা হচ্ছে বেদান্ত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই বেদান্ত দর্শনের প্রবক্তা। যে মহাত্মা নিরন্তর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম কীর্তন করে অসীম আনন্দ উপভোগ করেন, তিনিই হচ্ছেন প্রকৃত বেদান্ত-তত্ত্ববেত্তা। কারণ, সেটিই হচ্ছে বৈদিক অতীন্দ্রিয় তত্ত্বের চরম উদ্দেশ্য।

 

শ্লোক- ৪৭
কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।
মা কর্মফলহেতুর্ভুর্মা তে সঙ্গোহস্তকর্মণি ।। ৪৭ ।।

কর্মণি- নির্ধারিত কর্মে, এব- কেবলমাত্র, অধিকারঃ অধিকার, তে- তোমার, মা- না, ফলেষু- কর্মফলে, কদাচন- কখনো, মা- না, কর্মফল- কর্মফলের, হেতুঃ- কারণ, ভূঃ- হয়ো, মা- না, তে- তোমার, সঙ্গঃ- আসক্তি, অন্তু- হোক, কর্মমণি- স্বধর্ম অনুষ্ঠান না করায়।

গীতার গান

নিজ অধিকার মাত্র কর্ম করে যাও।

কর্মফল নাহি চাও আসক্তি ঘুচাও।।

কর্মফল হেতু সদা না হইবে তুমি।

অনুকূল কর্ম যেই সেই কর্ম ভূমি।।

অনুবাদঃ স্বধর্ম বিহিত কর্মে তোমার অধিকার আছে, কোন কোন কর্মফলে তোমার কধিকার নেই। কখনো নিজেকে কর্মফলের হেতু বলে মনে করো না, এবং কখনো স্বধর্ম আচরণ না করার প্রতিও আসক্ত হয়ো না।

তাৎপর্যঃ এখানে আমাদের তিনটি জিনিস সম্বন্ধে বিবেচনা করতে হবে – (১) কর্তব্যকর্ম, (২) খেয়ালখুশি মতো কর্ম এবং (৩) নৈষ্কর্ম। কর্তব্য কর্ম হচ্ছে প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা বদ্ধ অবস্থায় জাগতিক কর্ম। খেয়ালখুশি মতো কর্ম হচ্ছে শাস্ত্র অথবা গুরুদেবের অনুমোদন ব্যতীত কর্ম এবং কর্তব্যকর্ম সম্পাদন না করাকে বলা হয় নৈষ্কর্ম। ভগবান অর্জুনকে নিষ্কর্মা না হতে উপদেশ দিয়েছিলেন। তিনি তাঁকে বলেছিলেন, কর্মফলের প্রতি আসক্ত না হয়ে তাঁর কর্তব্যকর্ম করে যেতে। কারণ, মানুষ যখন তার কর্মফলের প্রত্যাশা করে, তখন সে কার্য-কারণে জড়িত হয়ে জড় বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এভাবেই সে কর্মের ফলস্বরূপ সুখ অথবা দুঃখ ভোগ করে।

কর্তব্যকর্মকে আবার তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা – বিধিবদ্ধ কর্ম, সঙ্কটকালীন কর্ম ও আকাঙ্ক্ষিত কর্ম। কোন রকম ফলের প্রত্যাশা না করে শাস্ত্রের অনুশাসন অনুসারে বিধিবদ্ধ কর্তব্যকর্ম হচ্ছে সত্ত্বগুণের কর্ম। ফলের প্রত্যাশা করে যে কর্ম করা হয়, তা সত্ত্ব, রজ অথবা তম, যে গুণের প্রভাবেই করা হোক না কেন, তা অশুভ। কারণ, ফলের প্রত্যাশা করা মানেই কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। কর্তব্যকর্ম সকলকেই করতে হয়, কিন্তু কোন রকম ফলের প্রত্যাশা না করে নিরাসক্তভাবে সেই কর্ম করতে হয়, এই প্রকার ফলের আশাবিহীন কর্তব্যকর্ম নিঃসন্দেহে মুক্তির পথে চালিত করে।

ভগবান তাই অর্জুনকে উপদেশ দিয়েছিলেন, ফলাফল না ভেবে নিরাসক্ত ভাবে যুদ্ধ করে তাঁর কর্তব্য করে যেতে। তাঁর যুদ্ধে যোগ না দেওয়াও ছিল অন্য এক প্রকারের আসক্তি। এই প্রকারের আসক্তি কাউকে মুক্তির পথে চালিত করে না। হ্যাঁ বাচক অথবা না বাচক, যে-কোন প্রকার আসক্তিই বন্ধনের কারণ। কর্তব্যকর্ম থেকে নিষ্কর্মার মতো বিরত থাকা পাপ, তাই কর্তব্যবোধে যুদ্ধ করাই ছিল অর্জুনের পক্ষে মুক্তির একমাত্র শুভ পথ।

 

শ্লোক – ৪৮
যোগস্থঃ কুরু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্তা ধনঞ্জয়।
সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ সমো ভূত্বা সমত্বং যোগ উচ্যতে ।। ৪৮ ।।

যোগস্থঃ- যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, কুরু- কর, কর্মাণি- তোমার কর্তব্যকর্ম, সঙ্গম- আসক্তি, ত্যক্তা- পরিত্যাগ করে, ধনঞ্জয়- হে অর্জুন, সিদ্ধি-অসিদ্ধ্যোঃ- সাফল্য ও ব্যর্থতায়, সমঃ- সমভাবে, ভূত্বা- হয়ে, সমত্বম- সমতা, যোগঃ- যোগ, উচ্যতে- বলা হয়।

গীতার গান
যোগী হয়ে কর কর্ম আসক্তি রহিত।
আসক্তি রহিত কর্ম ভগবানে প্রীত।।
ধনঞ্জয়! সঙ্গ ত্যজি কর্ম করে যাও।
সিদ্ধি বা অসিদ্ধি সম বৈষম্য ঘুচাও।।
এই সমভাব হয় যোগসিদ্ধি নাম।
সেই সিদ্ধিলাভে পূর্ণ সর্ব মনস্কাম।।

অনুবাদঃ হে অর্জুন! ফলভোগের কামনা পরিত্যাগ করে ভক্তিযোগস্থ হয়ে স্বধর্ম-বিহিত কর্ম আচরণ কর। কর্মের সিদ্ধি ও অসিদ্ধি সম্বন্ধে যে সমবুদ্ধি, তাকেই যোগ বলা হয়।

তাৎপর্যঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যোগে যুক্ত হয়ে কর্ম করার নির্দেশ দিচ্ছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যোগ বলতে কি বুঝায়? যোগের অর্থ হচ্ছে, সদা চিত্তচাঞ্চল্যকারী ইন্দ্রিয়াদি সংযম করে একাগ্রচিত্তে পরমেশ্বরের ধ্যান করা। পরমেশ্বর কে? সর্ব কারণের কারণ পরমেশ্বর হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। এখানে যেহেতু তিনি নিজেই অর্জুনকে যুদ্ধ করতে আদেশ করছেন, সুতরাং সেই যুদ্ধের ফলাফলের প্রতি তাঁর আসক্ত হওয়া উচিৎ নয়। আর তাঁর লাভ অথবা জয় নির্ভর করছে শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছার উপর। অর্জুনের কর্তব্য হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ অনুসারে যুদ্ধ করা। ভগবানের আদেশ পালন করাই হচ্ছে প্রকৃত যোগ এবং কৃষ্ণভাবনাময় ভগবদ্ভক্তির মাধ্যমে এই যোগের অনুশীলন করা হয়। ভগবদ্ভক্তির প্রভাবেই কেবল অহংকারমুক্ত হওয়া সম্ভব। ভগবানের দাসত্ব বা ভগবানের দাসের দাসত্ব বরণ করার ফলে অন্তরে ভগবদ্ভক্তির বিকাশ হয় এবং তখন বিজিতেন্দ্রিয় হয়ে যোগের সাধন করা সম্ভব হয়।

অর্জুন ছিলেন ক্ষত্রিয় এবং সেই হেতু শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে তিনি বর্ণাশ্রম-ধর্মের আচরণ করতেন। বিষ্ণু পুরাণে বলা হয়েছে, বর্ণাশ্রম –ধর্মের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে শ্রীবিষ্ণুকে তুষ্ট করা। জড় জগতের নীতি হচ্ছে যে, কারওই নিজেকে সন্তুষ্ট করা উচিৎ নয়, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করা উচিৎ। তাই কেউ যদি শ্রীকৃষ্ণকে সন্তুষ্ট না করে, তবে সে বর্ণাশ্রম ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান যথাযথভাবে পালন করতে পারে না। এভাবে ভগবান অর্জুনকে বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, তাঁর নির্দেশ অনুসারে কর্ম করাই হচ্ছে তাঁর একমাত্র কর্তব্য।

 

শ্লোক – ৪৯
দূরেণ হ্যবরং কর্ম বুদ্ধিযোগাদ্ধনঞ্জয়।
বুদ্ধৌ শরণমনিচ্ছ কৃপণাঃ ফলহেতবঃ ।। ৪৯ ।।

দূরেণ- দূরে পরিত্যাগ করে, হি- যেহেতু, অবরম- নিকৃষ্ট, কর্ম- কর্ম, বুদ্ধি যোগাৎ- ভগবদ্ভক্তির বলে, ধনঞ্জয়- হে ধনঞ্জয়, কৃপণাঃ- কৃপণেরা, ফলহেতবঃ- ফলাকাংখী ব্যক্তিগণ।

গীতার গান
বুদ্ধিযোগ দ্বারা ছাড়া কর্ম অবরাদি।
কাম কৃষ্ণ কর্মার্পণে না হও বিষাদী।।
অনুক্ষন সেই বুদ্ধে শরণাগতি যার।
কৃপণের ফল হেতু ইচ্ছা নহে তার।।

অনুবাদঃ হে ধনঞ্জয়! বুদ্ধিযোগ দ্বারা ভক্তির অনুশীলন করে সকাম কর্ম থেকে দূরে থাক এবং সেই চেতনায় অধিষ্ঠিত হয়ে ভগবানের শরণাগত হও। যারা তাদের কর্মের ফল ভোগ করতে চায়, তারা কৃপণ।

তাৎপর্যঃ যে মানুষ বুঝতে পেরেছেন্, তিনি ভগবানের নিত্যদাস, তিনি তখন তাঁর সমস্ত কর্ম ত্যাগ করে ভক্তি সহকারে ভগবৎ-সেবায় ব্রতী হন। পূর্বে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে যে, বুদ্ধিযোগ হচ্ছে ভগবানের অপ্রাকৃত সেবা। এই সেবাই হচ্ছে সমস্ত জীবের যথার্থ কর্তব্যকর্ম। একমাত্র কৃপণেরাই তাদের স্বকর্মফল ভোগের বাসনা করে, ফলে তারা পুনরায় জাগতিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ভক্তিযুক্ত কর্ম ছাড়া আর সমস্ত কাজকর্মই ঘৃণ্য, কারণ সেই সমস্ত কাজকর্ম মানুষকে নিরন্তর জন্ম ও মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত করে। তাই কখনোই কর্মফলের প্রত্যাশা করা উচিৎ নয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে তুষ্ট করার জন্য কৃষ্ণভাবনায় ভাবিত হয়ে সমস্ত প্রকার কাজকর্ম করা উচিৎ। বহু কষ্ট স্বীকার করে অথবা অসীম সৌভাগ্যের ফলে অর্জিত সম্পদ কিভাবে তার ব্যয় করতে হয়, কৃপণ তা জানে না। সকলেরই উচিৎ, কৃষ্ণভাবনাময় কাজকর্মে সমস্ত শক্তি নিয়োগ করা। তাতেই জীবনের সার্থকতা আসবে। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত হতভাগ্য মানুষেরা এই অমূল্য সম্পদ পাওয়া স্বত্বেও ভগবানের সেবায় ব্রতী না হয়ে, কৃপণের মতো এই অমূল্য সম্পদের অপচয় করে।

 

শ্লোক – ৫০
বুদ্ধিযুক্তো জহাতীহ উভে সুকৃতদুষ্কৃতে।
তস্মাদ যোগায় যুজ্যস্ব যোগঃ কর্মসু কৌশলম।। ৫০ ।।

বুদ্ধিযুক্তঃ- যিনি ভগবানের সেবায় যুক্ত, জহাতি- মুক্ত হতে পারে, ইহ- এই জীবনে, উভে- উভয়, সুকৃত-দুষ্কৃতে- পুণ্য ও পাপ, তস্মাৎ- সেই জন্য, যোগায়- নিষ্কাম কর্মযোগের জন্য, যুজ্যস্ব- যুক্ত হও, যোগঃ- কৃষ্ণভক্তি, কর্মসু- সমস্ত কর্মের, কৌশলম- কৌশল।

গীতার গান
বুদ্ধিযোগ দ্বারা কর্ম সুকৃতি যে ফল।
দুষ্কৃতি বা ফলে যাহা করয়ে নির্মল।।
অতএব তুমি সেই যোগে যুদ্ধ কর।
কর্মের কৌশল এই বুদ্ধিযোগ ধর।।

অনুবাদঃ যিনি ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করেন, তিনি এই জীবনেই পাপ ও পুণ্য উভয় থেকেই মুক্ত হন। অতএব, তুমি নিষ্কাম কর্মযোগের অনুষ্ঠান কর। সেটিই হচ্ছে সর্বাঙ্গীন কর্মকৌশল।

তাৎপর্যঃ স্মরণাতীত কাল ধরে প্রতিটি জীব তার শুভ ও অশুভ কর্মের ফল সঞ্চয় করছে। এই কর্মফলের জন্যই সে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হচ্ছে এবং জড়-জাগতিক ক্লেশের দ্বারা জর্জরিত হচ্ছে। অজ্ঞতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ার ফলেই জীব তার স্বরূপ ভুলে গেছে। এই দুঃখদায়ক অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পাবার উপায় হচ্ছে, গীতায় নির্দেশিত ভগবানের উপদেশ হৃদয়ঙ্গম করে তাঁর সেবায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করা। তা হলে আমাদের অজ্ঞতার আবরণ উন্মোচিত হবে এবং জন্ম-জন্মান্তরে কর্ম ও কর্মফলের শৃঙ্খলায়িত শাস্তিভোগের কবল থেকে আমরা মুক্ত হতে পারব। সেই জন্য, সকল কর্মফলের প্রক্রিয়াকে পরিশুদ্ধ করে তোলার পন্থাস্বরূপ কৃষ্ণভাবনাময় কর্মে নিযুক্ত থাকতে অর্জুনকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 

শ্লোক – ৫১
কর্মজং বুদ্ধিমুক্তা হি ফলং ত্যক্তা মনীষিণঃ।
জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম ।। ৫১ ।।

কর্মজম- কর্মজাত, বুদ্ধিযুক্তাঃ- ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত হয়ে, হি- নিশ্চয়ই, ফলম- ফল, ত্যক্তা- ত্যাগ করে, মনীষিণঃ- মহর্ষিগণ অথবা ভগবদ্ভক্তগণ, জন্মবন্ধ- জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে, বিনির্মুক্তাঃ- মুক্ত হয়ে, পদম- পদ, গচ্ছতি- লাভ করেন, অন্যাময়ম- দুঃখ দুর্দশা রহিত।

গীতার গান
মণীষী যেই কর্ম বুদ্ধিযোগ দ্বারা।
ত্যাগেতে সমর্থ হয় কর্মফল সারা।।
জন্মবন্ধ বিনির্মুক্ত সেই কর্মযোগী।
অনাময় পদ প্রাপ্ত হয় সেই ত্যাগী।।

অনুবাদঃ মনিষীগণ ভগবানের সেবায় যুক্ত হয়ে কর্মজাত ফল ত্যাগ করে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হন। এভাবে তাঁরা সমস্ত দুঃখ-দুর্দশার অতীত অবস্থা লাভ করেন।

তাৎপর্যঃ জড় জগতের দুঃখ-দুর্দশা যেখানে নেই, মুক্ত পুরুষেরা সেখানেই অবস্থান করেন। শ্রীমদ্ভাগবতে (১০/১৪/৫৮) বলা হয়েছে –

সমাশ্রিতা যে পদপল্লবপ্লবং
মহৎপদং পুণ্যযশো মুরারেঃ।
ভবাম্বুধির্বৎসপদং পরংপদং
পদং পদং যদ বিপদাং ন তেষাম।।

“পরমেশ্বর ভগবান, যিনি সব কিছুর আশ্রয় এবং যিনি মুক্তিদাতা মুকুন্দ নামে খ্যাত, তাঁর পদপল্লবস্বরূপ তরণীর আশ্রয় যিনি গ্রহণ করেছেন, তিনি অনায়াসে এই ভবসমুদ্র উত্তীর্ণ হন। তাঁর কাছে এই ভবসমুদ্র গোষ্পদতুল্য। পরং পদ বা যেখানে জড়-জাগতিক ক্লেশ নেই, অর্থাৎ বৈকুন্ঠ হচ্ছে তাঁর গন্তব্যস্থল। যে জগতে প্রতি পদক্ষেপে বিপদ, সেখানে তিনি আবদ্ধ থাকতে চান না।“

আমাদের অজ্ঞতার জন্য আমরা বুঝতে পারি না যে, এই জড় জগত প্রতি পদক্ষেপে দুঃখ-দুর্দশায় পরিপূর্ণ। এখানে প্রতি পদক্ষেপেই বিপদ। কিন্তু অজ্ঞতার বশবর্তী হয়ে অল্পবুদ্ধিমস্পন্ন লোকেরা মনে করে, নানা রকম জাগতিক প্রচেষ্টার দ্বারা প্রকৃতির প্রতিকুলতার নিরসন করে তারা সুখী হবে। তারা জানে না, এই জড় জগতে কোন জীবই জন্ম-মৃত্যু-জড়া-ব্যাধি আদি ক্লেসের থেকে রেহাই পেতে পারে না। কিন্রতু যে মানুষ তাঁর স্বরূপ উপলব্ধি করতে পেরে বুঝতে পেরেছেন যে, তিনি ভগবানের নিত্য দাস, তিনি তখন ভক্তিযোগের পথ অবলম্বন করে ভগবানের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তার ফলে তিনি বৈকুন্ঠলোকে উত্তীর্ণ হবার যোগ্যতা অর্জন করেন, সেখানে জড়-জাগতিক ক্লেশ এবং মৃত্যু ও কালের প্রভাব নেই। আত্মার স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ভগবানের মহিমান্বিত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারি। ভ্রান্তিবশত যে মানুষ মনে করে, ভগবান ও সে একই স্তরে অবস্থিত, অর্থাৎ যে মানুষ মনে করে, সে-ই ভগবান, তার পক্ষে ভক্তি সহকারে ভগবানের সেবা করা কখনোই সম্ভব নয়। অহংকারের দ্বারা বিমূঢ় হয়ে সে নিজেকে সর্ব কারণের কারণ বলে মনে করে জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে আরও গভীর ভাবে নিমজ্জিত হয়। ভক্তিযুক্ত ভগবৎ-সেবা ছাড়া আর কোন উপায়েই জড় বন্ধন মুক্ত হয়ে বৈকুন্ঠে উত্তীর্ণ হওয়া যায় না, এই ভগবৎ-সেবাকে বলা হয় কর্মযোগ বা বুদ্ধিযোগ, অথবা সরল ভাষায় একে বলা হয় ভক্তিযোগ।

 

শ্লোক – ৫২
যদা তে মোহকলিলং বুদ্ধিরব্যতিতরিয্যতি।
তদা গন্তাসি নির্বেদং শ্রোতব্যস্য শ্রুতস্য চ ।। ৫২ ।।

যদা- যখন, তে- তোমার, মোহ- মোহ, কলিলম- গভীর অরণ্য, বুদ্ধিঃ- বুদ্ধি, ব্যতিতরিষ্যতি- অতিক্রম করে, তদা- সেই সময়, গন্তাসি- প্রাপ্ত হবে, নির্বেদম- বিতৃষ্ণা, শ্রোতব্যস্য- শ্রোতব্য, শ্রুতস্য- ইতিপূর্বে যা শোনা গেছে, চ- এবং।

গীতার গান
যখন  তোমার মন বুদ্ধিযোগ দ্বারা।
মোহরুপ কর্দমাক্ত হয়ে যাবে পারা।।
তখন নির্বেদ সব হয়ে যাবে কাম।
শ্রুতির শ্রোতব্য তব নাহি রবে ধাম।।

 অনুবাদঃ এভাবে পরমেশ্বর ভগবানে অর্পিত নিষ্কাম কর্ম অভ্যাস করতে করতে যখন তোমার বুদ্ধি মোহরুপ গভীর অরণ্যকে সম্পূর্ণরুপে অতিক্রম করবে, তখন তুমি যা কিছু শুনেছ এবং যা কিছু শ্রবনীয়, সেই সবের প্রতি সম্পূর্ণরুপে নিরপেক্ষ হতে পারবে।

তাৎপর্যঃ ভগবানের মহান ভক্তদের অনেক সুন্দর দৃষ্টান্ত আছে, যারা কেবল মাত্র ভগবদ্ভক্তি গ্রহণ করার ফলে বৈদিক আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি উদাসীন হয়ে উঠেন। যখন কোন ব্যক্তি ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জানতে পেরে তাঁর সঙ্গে চিরশাশ্বত সম্পর্ক সম্বন্ধে অবগত হয়, সে স্বাভাবিক ভাবেই বৈদিক কর্মকান্ডের অনুষ্ঠানের প্রতি সম্পূর্ণরুপে উদাসীন হয়, এমন কি সে যদি অভিজ্ঞ ব্রাক্ষ্মনও হয়। মহাভাগবত ও গুরু পরম্পরা ধারয় আচার্য শ্রীমাধবেন্দ্রপুরী বলেছেন –

সন্ধ্যাবন্দন ভদ্রমস্ত ভবতো ভোঃ স্নান তুভ্যং নমো
ভো দেবাঃ পিতরশ্চ তর্পণবিধৌ নাহং ক্ষমঃ ক্ষম্যতাম।
যত্র ক্কাপি নিষদ্য যাদবকুলোত্তমস্য কংসদ্বিষঃ
স্মারং স্মারং অঘং হরামি তদলং মন্যে কিমন্যেন মে ।।

“হে ভগবান! ত্রিসন্ধ্যায় আমি তোমাকে বন্দনা করি, তোমার জয় হোক। হে দেবতাগণ! হে পিতৃগণ! স্নানান্তে আমি আর তোমাদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে পারি না। আমার এই অক্ষমতা তোমরা ক্ষমা করো। এখন আমি যেখানেই অবস্থান করি না কেন, আমি যদুকুলশ্রেষ্ঠ কংসারি শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করতে পারি এবং তার ফলে আমি সমস্ত পাপ বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারি। আমার মনে হয়, এটিই আমার পক্ষে যথেষ্ট।“

পারমার্থিক মার্গে যারা কনিষ্ঠ অধিকারী, তাঁদের পক্ষে বেদের নির্দেশ অনুযায়ী বিবিধ আচার-অনুষ্ঠান পালন করা একান্ত প্রয়োজন, যেমন- খুব সকালে স্নান করা, পিতৃ-পুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা, ত্রিসন্ধ্যায় মন্ত্র উচ্চারন করা আদি। কিন্তু কৃষ্ণগত প্রান হয়ে যিনি ভক্তিসহকারে ভগবানের সেবা করেন, তাঁকে আর কোন আচার অনুষ্ঠানের বিধি পালন করতে হয় না, কারণ তিনি ইতিমধ্যেই সমস্ত সাধনার পরম সিদ্ধি লাভ করেছেন। শাস্ত্রে যে সমস্ত তপশ্চর্যা, যাগজজ্ঞ, বিধি-নিষেধের আচরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে ভাগবানের কৃপা লাভ করে তার পদারবিন্দ্র সম্পূর্ণভাবে আত্মোৎসর্গ করা। তাই, ভগবানের সেবায় যিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছেন তাঁকে আর সেই সমস্ত আচার-অনুষ্ঠানের শরণ নিতে হয় না। সেই রকম, বেদের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবদ্ভক্তি লাভ করা, সেই কথা না জেনে যারা অন্ধের মতো আচার-অনুষ্ঠান আদিতে নিয়োজিত হয়, তারা অনর্থক তাদের সময় নষ্ট করে চলেছে। যে মানুষ ভগবদ্ভক্তি লাভ করেছেন, তিনি শব্দব্রক্ষ্মের স্তর উত্তীর্ণ হয়েছেন, অর্থাৎ তাঁর কাছে বেদ, উপনিষদের আর কোন প্রয়োজনীয়তা নেই।

 

শ্লোক – ৫৩
শ্রুতিবিপ্রতিপন্না তে যদা স্থাস্যতি নিশ্চলা।
সমাধাবচলা বুদ্ধিস্তদা যোগমবাপ্স্যসি ।। ৫৩ ।।

শ্রুতি- বৈদিক জ্ঞান, বিপ্রতিপন্না- বেদের কর্মকাণ্ডের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, তে- তোমার, যদা- যখন, স্থাস্যতি- থাকবে, নিশ্চলা- অবিচলিত, সমাধৌ- চিন্ময় চেতনায় বা কৃষ্ণভাবনায়, অচলা- স্থির, বুদ্ধিঃ- বুদ্ধি, তদা- তখন, যোগম- আত্ম-ত্ত্বজ্ঞান, অবাপ্স্যসি- লাভ করবে।

গীতার গান
শ্রুতির গৃহীত জ্ঞান যখন নিশ্চলা।
কর্ম জ্ঞান যোগ আদি তখনি সফলা।।
সমাধি তখন হয় কর্মযোগে স্থিতি।
স্থিতপ্রজ্ঞ তার নাম যোগারুঢ় গতি।।

অনুবাদঃ তোমার বুদ্ধি যখন বেদের বিচিত্র ভাষার দ্বারা আর বিচলিত হবে না এবং আত্ম-উপলব্ধির সমাধিতে স্থির হবে, তখন তুমি দিব্যজ্ঞান লাভ করে ভক্তিযোগে অধিষ্ঠিত হবে।

তাৎপর্যঃ জীব যখন সম্পূর্ণভাবে কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদন করে, তখন তার সেই অবস্থাকে বলা হয় সমাধি, যিনি পূর্ণ সমাধিমগ্ন হয়েছেন, তিনি ব্রক্ষ্ম-উপলব্ধি ও পরমাত্মা উপলব্ধির স্তর অতিক্রম করে সর্ব কারণের কারণ পরমেশ্বর ভগবানকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। অধ্যাত্ম-জ্ঞানের চরম পূর্ণতা হচ্ছে ভগবানের সঙ্গে জীবের নিত্য দাসত্ব সম্পর্কের উপলব্ধি করা, তাই ভক্তিসহকারে ভগবানের সেবা করাই হচ্ছে জীবের একমাত্র কর্তব্য। সেই জন্য, শুদ্ধ ভগবদ্ভক্ত বেদের সুন্দর বর্ণনার দ্বারা মোহিত হয়ে স্বর্গযুখ ভোগ করার জন্য যাগজজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন না। ভক্তিযোগে ভগবানের সেবা করলে ভগবানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং তার ফলে ভগবানের প্রতিটি উপদেশের মর্ম যথাযথভাবে উপলব্ধি করা যায়। শ্রীকৃষ্ণ অথবা তাঁর প্রতিনিধি শ্রীগুরুদেবের আদেশে ভগবানের সেবা করলে, অচিরেই তার ফল পাওয়া যায় এবং ভগবদ্ভক্তির মাধুর্য আস্বাদন করা যায়।

 

শ্লোক – ৫৪
অর্জুন উবাচ
স্থিতপ্রজ্ঞস্য কা ভাষা সমাধিস্থস্য কেশব।
স্থিতধীঃ কিং প্রভাষেত কিমাসীত ব্রজেত কিম ।। ৫৪ ।।

অর্জুন উবাচ- অর্জুন বললেন, স্থিতপ্রজ্ঞস্য- অচলাবুদ্ধিবিশিষ্ট ব্যক্তির, কা- কি, ভাষা- লক্ষণ, সমাধিস্তস্য- সমাধিস্থ ব্যক্তির, কেশব- হে কৃষ্ণ, স্থিতধীঃ- কৃষ্ণভাবনায় স্থির বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি, কিম- কি, প্রভাষেত- বলেন, কিম- কিভাবে, আসীত- অবস্থান করেন, ব্রজেত- বিচরণ করেন, কিম- কিভাবে।

গীতার গান
অর্জুন কহিলেনঃ
কি লক্ষণ স্থিতপ্রজ্ঞ কিবা তার ভাষা।
হে কেশব! কহ মোরে সমাধিস্থ আশা।।
স্থিতধী কি বলে কিংবা উঠাবসা করে।
কিভাবে গমন করে কহত বিস্তারে।।

অনুবাদঃ অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন- হে কেশব! স্থিতপ্রজ্ঞ অর্থাৎ অচলা বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের লক্ষণ কি? তিনি কিভাবে কথা বলেন, কিভাবে অবস্থান করেন এবং কিভাবেই বা তিনি বিচরণ করেন?

তাৎপর্যঃ বিশেষ অবস্থা অনুযায়ী প্রতিটি মানুষেরই যেমন কোন না কোন লক্ষণ থাকে, কৃষ্ণভাবনাময় মানুষেরও সেই রকম চলা, বলা, চিন্তাভাবনায় কতকগুলি প্রকৃতিগত লক্ষণ থাকে। একজন ধনীর কতকগুলি লক্ষণ দেখে যেমন বোঝা যায় সে ধনী, একজন রোগীর কতকগুলি লক্ষণ দেখে যেমন বোঝা যায় সে রোগী, একজন জ্ঞানীর লক্ষণ দেখে যেমন বোঝা যায় সে জ্ঞানী, তেমনই শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত ভাবনায় মগ্ন কোন ভগবাদক্তের কথা বলবার ধরণ, চলার ভঙ্গি, চিন্তাধারা, মনোবৃত্তি আদি দেখে বোঝা যায়, তিনি হচ্ছেন ভগবদ্ভক্ত। ভগবদ্ভক্তের এই সমস্ত লক্ষণের বর্ণনা ভগবদগীতাতে পাওয়া যায়। এই লক্ষণগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, তিনি কিভাবে কথা বলেন, কারণ, কথার মধ্য দিয়েই সবচেয়ে গভীর ভাবে মানুষের অন্তরের ভাবের প্রকাশ হয়। প্রবাদ আছে, মূর্খ যতক্ষন পর্যন্ত তার মুখ না খুলছে, ততক্ষণ তার মূর্খতা প্রকাশ পায় না। বিশেষ করে ভালো পোশাকে সজ্জিত মূর্খ যতক্ষন তার মুখ খুলছে না, তাকে চেনার উপায় নেই, কিন্তু যখনই সে মুখ খোলে, তখনই তার পরিচয় প্রকাশ পায়। কৃষ্ণভাবনাময় মানুষের প্রাথমিক লক্ষণ হচ্ছে, তিনি শ্রীকৃষ্ণ অথবা শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধীয় বিষয় ছাড়া আর কোন কথাই বলেন না। অন্যান্য লক্ষণ তখন স্বাভাবিক ভাবে তাঁর মধ্যে প্রকাশিত হয় এবং তা নীচে বর্ণিত হয়েছে।

 

শ্লোক – ৫৫
শ্রীভগবানুবাচ
প্রজহাতি যদা কামান সর্বান পার্থ মনোগতান।
আত্মন্যেবাত্মনা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্যতে ।। ৫৫ ।।

শ্রীভগবান উবাচ- পরমেশ্বর ভগবান বললেন, প্রজহতি- ত্যাগ করেন, যদা- যখন, কামান- কামনাসমূহ, সর্বান- সর্ব প্রকার, পার্থ- হে পৃথাপুত্র, মনোগতান- মনের জল্পনা কল্পনা, আত্মনি- আত্মার নির্মল অবস্থায়, এব- অবশ্যই, আত্মনা- বিশুদ্ধ চেতনার দ্বারা, তুষ্টঃ- সন্তুষ্ট, স্থিতপ্রজ্ঞঃ- চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত, তদা- তখন, উচ্যতে- বলা হয়।

গীতার গান
শ্রীভগবান কহিলেনঃ
নিজের ইন্দ্রিয়সুখে যত কাম আছে।
বদ্ধ জীব মনোধর্মে ধায় পাছে পাছে।।
সে সব কামনা ত্যজি আত্ম-ভগবানে।
সম্বন্ধ জানিয়া ক্রমে হয় আগুয়ানে।।
তখন জানিবে তুষ্ট স্থিতপ্রজ্ঞ সুখী।
এ ছাড়া আর যে লোক সকলেই দুঃখী।।

অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে পার্থ! জীব যখন মানসিক জল্পনা-কল্পনা থেকে উদ্ভূত সমস্ত মনোগত কাম পরিত্যাগ করে এবং তার মন যখন এভাবে পবিত্র হয়ে আত্মাতেই পূর্ণ পরিতৃপ্তি লাভ করে, তখনই তাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়।

তাৎপর্যঃ শ্রিমদ্ভগবতে দৃঢ়ভাবে বলা হয়েছে, সম্পূর্ণ কৃষ্ণভাবনায় মানুষ অর্থাৎ ভগবদ্ভক্তের মধ্যে মহৎ মুনি-ঋষিদের সমস্ত গুণাবলী পরিলক্ষিত হয়, আর যারা ভগবদ্ভক্ত নয়, তাদের মধ্যে কোন গুণই দেখা যায় না। কারণ, তারা তাদের সীমিত মনের জল্পনা-কল্পনার কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজেদের ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করে থাকে। সুতরাং, এখানে যথার্থই বলা হয়েছে যে, জল্পনা-কল্পনার মাধ্যমে সৃষ্ট ইন্দ্রিয় সুখ ভোগের সব রকমের ইচ্ছা পরিত্যাগ করতে হবে। কৃত্রিম ভাবে এই ইচ্ছাকে কখনোই সংবরণ করা যায় না। কিন্তু মানুষ যখন কৃষ্ণভাবনায় নিজেকে নিয়োজিত করে, তখন কোন রকম বাহ্যিক প্রচেষ্টা ছাড়া আপনা থেকেই এই সমস্ত ইন্দ্রিয় সুখভোগের বাসনা প্রশমিত হয়। তাই মানুষ মাত্রেরই কর্তব্য হচ্ছে দ্বিধাহীনভাবে ভক্তিযোগের পথ অবলম্বন করা, কেননা এই পথ অবলম্বন করার ফলে সেই অচিরেই অপ্রাকৃত চেতনায় অধিষ্ঠিত হতে পারে। যিনি মহাত্মা তিনি জানেন, তিনি হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্যকালের দাস এবং এই সত্য উপলব্ধির ফলে তিনি নিত্যানন্দ অনুভব করেন। জড় জগতকে ভোগ করার তুচ্ছ কোন বাসনাই তখন আর তাঁর থাকে না। তিনি তাঁর প্রকৃত স্বরূপে পরমেশ্বরের নিত্য সেবায় মগ্ন থেকে সদাই সুখে থাকেন।

 

শ্লোক – ৫৬
দুঃখেষনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীনর্মুনিরুচ্যতে ।। ৫৬ ।।

দুঃখেষু- ত্রিতাপ দুঃখে, অনুদ্বিগ্নমনাঃ- উদ্বেগশূন্য চিত্ত, সুখেষু- সুখে, বিগতস্পৃহঃ- স্পৃহাশূন্য, বীত- মুক্ত, রাগ- আসক্তি, ভয়- ভয়, ক্রোধঃ- ক্রোধ, স্থিতধীঃ- স্থিতপ্রজ্ঞ, মুনিঃ- মননশীল ব্যক্তি, উচ্যতে- বলা হয়।

গীতার গান
দুঃখে অনুদ্বিগ্নমনা সুখে নাহি স্পৃহা।
নিজ সেবাকার্যে যার একমাত্র ঈহা।।
বীতরাগ শোক ভয় ক্রোধ নাহি যার।
সে জন স্থিতধী মুনি বিদিত সবার।।

অনুবাদঃ ত্রিতাপ দুঃখ উপস্থিত হলেও যার মন উদ্বিগ্ন হয় না, সুখ উপস্থিত হলেও যার স্পৃহা হয় না এবং যিনি রাগ, ভয় ও ক্রোধ থেকে মুক্ত, তিনিই স্থিতধী অর্থাৎ স্থিতপ্রজ্ঞ।

তাৎপর্যঃ মুনি তাঁকে বলা হয়, যিনি কোন স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত না হয়ে নানা রকম অনুমান করবার জন্য মনকে নানাভাবে আলোড়িত করতে পারেন। তাই বলা হয় যে, ‘নানা মুনির নানা মত।‘ কোন মুনির মত যদি অন্য মুনির থেকে স্বতন্ত্র না হয়, তবে তাঁকে যথার্থ মুনি বলা যায় না। নাসাবৃষির্যস্য মতং ন ভিন্নম (মহাভারত, বনপর্ব ৩১৩/১১৭)। কিন্তু ভগবান এখানে বলেছেন, স্থিতধীমুনি সাধারণ মুনিদের থেকে ভিন্ন। স্থিতধীমুনি সর্বদাই কৃষ্ণভাবনায় মগ্ন, কেন না তিনি কল্পনা-কল্পনামূলক সমস্ত কার্যকলাপের পরিসমাপ্তি করেছেন। তাঁকে বলা হয় প্রশান্ত-নিঃশেষ-মনোরথান্তর (স্তোত্ররত্ন, ৪৩) অথবা যিনি জল্পনা-কল্পনার স্তর অতিক্রম করে উপলব্ধি করতে পেরেছেনযে, বসুদেব-তনয় ভগবান বাসুদেব বা শ্রীকৃষ্ণি হচ্ছেন সবকিছু (বাসুদেবঃ সর্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ)। তাঁকে বলা হয় মুনি, যার মন একনিষ্ঠ। এই ধরণের কৃষ্ণভাবনাময় ভগবদ্ভক্তকে জড় জগতের ত্রিতাপ ক্লেশের কোন আক্রমণই আর বিচলিত করতে পারে না। কারণ, তিনি সব রকমের দুঃখ-দুর্দশাকে ভগবানের আশীর্বাদ বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন, তাঁর পূর্বকৃত অসৎ কর্মের ফলস্বরূপ আরও দুঃখ-দুর্দশা তাঁর একমাত্র প্রাপ্য, কিন্তু ভগবানের অহৈতুকী করুণার ফলে তাঁর সেই সমস্ত দুঃখ-দুর্দশার ভার অনেক লাঘব হয়ে গেছে। তেমনই, যখন তাঁর সুখানুভূতি হয়, তখন তিনি নিজেকে সেই সুখের অযোগ্য বলেই মনে করেন, তিনি ভাবেন, ভগবানের কৃপাতেই তিনি ঐ রকম সুখপ্রদ অবস্থায় রয়েছেন এবং ভগবানের সেবায় তাই আরও বেশি করে আত্মনিয়োগ করতে পারছেন। ভগবানের সেবা করবার জন্য তিনি সব সময়ই সৎসাহসী ও তৎপর এবং কোন রকম আসক্তি বা বিরক্তি তাঁকে সেই সেবা থেকে বিরত করতে পারে না। নিজের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি করার আকাঙ্ক্ষাকে বলা হয় আসক্তি এবং এই ধরণের ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির আকাঙ্ক্ষা না থাকলে বলা হয় বিরক্তি। কিন্তু যিনি কৃষ্ণভাবনায় অবিচলিত, তাঁর কোন কিছুর প্রতি আসক্তিও নেই, বিরক্তিও নেই, কেন না ভগবানের সেবায় তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেছেন। তাই তাঁর কোন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি ক্রোধান্বিত হন না। সফল হন বা ব্যর্থই হন, তিনি তাঁর সঙ্কল্পে সর্বদাই একনিষ্ট।

 

শ্লোক – ৫৭
যঃ সর্বত্রানভিস্নেহস্তত্তৎ প্রাপ্য শুভাশুভম।
নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ।। ৫৭ ।।

যঃ- যিনি, সর্বত্র- সর্বত্র, অনভিস্নেহঃ- আসক্তি বর্জিত, তৎতৎ- সেই সেই, প্রাপ্য- লাভ করে, শুভ- ভাল, অশুভম- খারাপ, ন- না, অভিনন্দতি- প্রশংসা করেন, ন- না, দ্বেষ্টি- দ্বেষ করেন, তস্য- তাঁর, প্রজ্ঞা- পূর্ণ জ্ঞান, প্রতিষ্ঠিতা- প্রতিষ্ঠিত।

গীতার গান
দেহস্মৃতি নাহি যার শুভাশুভ কিবা তাঁর।
সর্বত্র অনভিস্নেহ লোক ব্যবহার।।
অভিনন্দন দ্বেষ নাই সর্ব হিতে রত।
তাহাঁর জানিও প্রজ্ঞা স্থির প্রতিষ্ঠিত।।

অনুবাদঃ জড় জগতে যিনি সমস্ত জড় বিষয়ে আসক্তি রহিত, যিনি প্রিয় বস্তু লাভে আনন্দিত হন না এবং অপ্রিয় বিষয় উপস্থিত হলে দ্বেষ করেন না, তিনি পূর্ণ জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

তাৎপর্যঃ জড় জগতে সব সময়ই নানা রকম উত্থান-পতন ঘটে চলেছে, সেগুলি কখনো শুভ বা অশুভ হতে পারে। যিনি এই ধরণের উত্থান-পতনে বিচলিত হন না, যিনি এই ধরণের উত্থান-পতনে বিচলিত হন না, যিনি ভাল-মন্দে প্রভাবিত হন না, তাঁকেই কৃষ্ণভাবনায় অবিচলিত বলে বিবেচনা করতে হবে। মানুষ জড় জগতে থাকলে সব সময়েই শুভ-অশুভ সম্ভাবনা থাকে, কারণ জড় জগতটাই এই দ্বন্দ্বভাবের দ্বারা প্রভাবিত। কিন্তু কৃষ্ণভাবনায় একনিষ্ট ভক্ত কখনোই এই শুভ-অশুভ দ্বন্দ্বের দ্বারা প্রভাবিত হন না, কারণ তিনি সর্বদাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় মগ্ন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি এই অনুরাগের ফলে তিনি জড় ইন্দ্রিয়ের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে বিশুদ্ধ অপ্রাকৃত অবস্থায় অধিষ্ঠিত হন, যাকে পরিভাষায় বলা হয় ‘সমাধি’।

 

শ্লোক – ৫৮
যদা সংহরতে চায়ং কূর্মোহঙ্গানীব সর্বশঃ।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা।।

যদা- যখন, সংহরতে- প্রত্যাহার করেন, চ- এবং, অয়ম- তিনি, কূর্মঃ- কচ্ছপ, অঙ্গানই- অঙ্গসমূহ, ইব- যেমন, সর্বশঃ- সর্বতোভাবে, ইন্দ্রিয়ানি- ইন্দ্রিয়সমূহ, ইন্দ্রিয়াথৈভ্যঃ- ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় থেকে, তস্য- তাঁর, প্রজ্ঞা- চেতনা, প্রতিষ্ঠিতা- প্রতিষ্ঠিত।

গীতার গান
গোদাস ইন্দ্রিয়সুখে বিচলিত সদা।
গোস্বামী হয়েছে ধীর আত্মাতে সর্বদা।।
তাই সে ইন্দ্রিয় সব কর্ম অঙ্গ মত।
ইন্দ্রিয় ভোগার্থ সদা বিষয়ে বিরত।।
অতএব জানি তাঁর প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত।
সে জন উপাধিমুক্ত গোস্বামী বিদিত।।

অনুবাদঃ কূর্ম যেমন তার অঙ্গসমূহ তার কঠিন বহিরাবরণের মধ্যে সঙ্কুচিত করে, তেমনই যে ব্যক্তি তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারেন, তাঁর চেতনা চিন্ময় জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত।

তাৎপর্যঃ আত্মতত্ত্বজ্ঞানী, যোগী অথবা ভগবদ্ভক্তের লক্ষণ হচ্ছে, তিনি তাঁর ইচ্ছা অনুসারে তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে দমন করতে পারেন। অধিকাংশ মানুষই তাদের ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করে অর্থাৎ তাদের ইন্দ্রিয়ের নির্দেশ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। প্রকৃত যোগীকে এভাবে চিনতে পারা যায়। ইন্দ্রিয়গুলিকে বিষধর সর্পের সঙ্গে তুলনা করা হয়। সাধারণ অবস্থায় ইন্দ্রিয়গুলি স্বেচ্ছাচারী, উচ্ছৃঙ্খল, কিন্তু সাপুড়ে যেমন সাপকে পোষ মানায়, যোগী বা ভগবদ্ভক্ত ঠিক তেমনভাবে তাঁদের ইন্দ্রিয়গুলিকে নিজের ইচ্ছা অনুসারে পরিচালিত করেন। তিনি তাদের কখনোই স্বাধীনভাবে কোন কাজ করতে দেন না। শাস্ত্রে কর্তব্য-অকর্তব্য, বিধি-নিষেধ সম্বন্ধে নানা রকম নির্দেশ দেওয়া আছে। এই সমস্ত বিধি-নিষেধের নির্দেশগুলি আচরণ করার মাধ্যমে ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত না করতে পারলে ঐকান্তিক নিষ্ঠার সঙ্গে ভগবদ্ভক্তি সাধন করা যায় না। এই সম্বন্ধে এখানে খুব সুন্দরভাবে কূর্মের উদাহরণ দেওয়া আছে। কূর্ম যে-কোন সময় তার হাত, পা, মাথা আদি অঙ্গগুলি তার খোলসের মধ্যে গুটিয়ে নিতে পারে, আবার প্রয়োজন হলে তাদের বার করে আনতে পারে। ঠিক তেমনই, কৃষ্ণভাবনাময় ভগবদ্ভক্ত ভগবানের বিশেষ প্রয়োজনেই তার ইন্দ্রিয়গুলিকে প্রয়োগ করেন, আর অন্য সময় তাদের গুটিয়ে রাখেন। এভাবেই ইন্দ্রিয়-দমন করার মাধ্যমে একাগ্রচিত্তে ভগবানের সেবা করা যায়। অর্জুনকে এখানে সেভাবেই নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তিনি নিজের তৃপ্তি-সাধনের জন্য তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে কাজে না লাগিয়ে ভগবানের সেবায় তা নিয়োগ করেন। ভগবানের সেবায় কিভাবে সর্বদা ইন্দ্রিয়াদি নিয়োজিত রাখতে হয়, কূর্মের দৃষ্টান্ত দিয়ে তা বোঝানো হয়েছে। কূর্মের মতো ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।

 

শ্লোক – ৫৯
বিষয়া বিনিবর্তন্তে নিরাহারস্য দেহিনঃ।
রসবর্জং রসোহপ্যস্য পরং দৃষ্টা নিবর্ততে ।। ৫৯ ।।

বিষয়াঃ- ইন্দ্রিয় সুখভোগের বিষয় সমূহ, বিনিবর্তন্তে- নিবৃত্ত হয়, নিরাহারস্য- কৃত্রিমভাবে বিষয় থেকে ইন্দ্রিয়গুলিকে নিবৃত্ত করে, দেহিনঃ- দেহীর, রসবর্জম- বিষয়রস বর্জন করে, রসঃ- ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ, অপি- যদিও, অস্য- তাঁর, পরম- উৎকৃষ্ট বস্তু, দৃষ্টা- দর্শন করে, নিবর্ততে- নিবৃত্ত হন।

গীতার গান
বৈরাগ্য করিয়া হয় বিষয় নিবৃত্তি।
তাহা নহে স্থিতপ্রজ্ঞা স্বাভাবিক বৃত্তি।।
পরমানন্দ জানি যেবা জড়ানন্দ ছাড়ে।
স্থিতপ্রজ্ঞ সেই বীর বিষয়ে বিহারে।।

অনুবাদঃ দেহবিশিষ্ট জীব ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ থেকে নিবৃত্ত হতে পারে, কিন্তু তবুও ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের আসক্তি থেকে যায়। কিন্তু উচ্চতর স্বাদ আস্বাদন করার ফলে তিনি সেই বিষয়তৃষ্ণা থকে চিরতরে নিবৃত্ত হন।

তাৎপর্যঃ অপ্রাকৃত স্তরে অধিষ্ঠিত না হলে মানুষ ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ পরিত্যাগ করতে পারে না। বিধি-নিষেদের দ্বারা ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ থেকে নিবৃত্ত হওয়ার পন্থা অনেকটা রোগীর বিশেষ ধরণের খাদ্যের প্রতি নিষেধাজ্ঞার মতো। রোগী সাধারণত এই সমস্ত বিধি-নিষেধ মানতে চায় না এবং তাঁর রোগের জন্য এই সমস্ত খাদ্য দ্রব্য খেতে সাময়িক ভাবে বিরত থাকলেও তার খাওয়ার লালসা কোন অংশে কমে না। তেমনই, যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা,ধ্যান আদি সমন্বিত অষ্টাংগ-যোগের মতো কিছু পারমার্থিক পদ্ধতির দ্বারা যে ইন্দ্রিয় সংযম, তা উন্নত জ্ঞানহীন, অল্প-বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু যিনি কৃষ্ণভাবনায় প্রগতি সাধনের মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কন্দর্প-কোটি কমনীয় রুপকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তাঁর আর নিষ্প্রাণ জড় বস্তুর প্রতি কোন রকম রুচি থাকে না। তাই, অধ্যাত্ম-মার্গের প্রাথমিক স্তরেই কেবল বিধি-নিষেধের মাধ্যমে ইন্দ্রিয়গুলিকে দমন করতে হয়, কিন্তু কৃষ্ণভাবনায় যতক্ষন রুচি না হয়, ততক্ষণ এই বিধি-নিষেধ মঙ্গলজনক নয়। যখন কেউ প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণভাবনায় অধিষ্ঠিত হন, তখন তিনি আপনা থেকেই ইতর বস্তুর প্রতি তাঁর রুচি হারিয়ে ফেলেন।

 

শ্লোক – ৬০
যততো হ্যপি কৌন্তেয় পুরুষস্য বিপশ্চিতঃ।
ইন্দ্রিয়াণি প্রমাথীনি হরন্তি প্রসভং মনঃ ।। ৬০ ।।

যততঃ- যত্নশীল, হি- যেহেতু, অপি- স্বত্বেও, কৌন্তেয়- হে কুন্তীপুত্র, পুরুষস্য- মানুষের, বিপশ্চিতঃ- বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন, ইন্দ্রিয়াণি- ইন্দ্রিয়সমূহ, প্রমাথীনি- চিত্ত বিক্ষেপকারী, হরন্তি- হরণ করে, প্রসভম- বলপূর্বক, মনঃ- মনকে।

গীতার গান
আত্মার সম্পর্ক নাই বৈরাগ্যের যতন।
পণ্ডিত হলেও তার প্রসভিত মন।।
প্রমাথী ইন্দ্রিয় তাকে বিষয়েতে ফেলে।
শুষ্ক বৈরাগীর লাগে আগুন কপালে।।

অনুবাদঃ হে কৌন্তেয়! ইন্দ্রিয়সমূহ এতই বলবান এবং ক্ষোভকারী যে, তারা অতি যত্নশীল বিবেকসম্পন্ন পুরুষের মনকেও বলপূর্বক বিষয়াভিমুখে আকর্ষণ করে।

তাৎপর্যঃ অনেক ঋষি, মুনি ও আধ্যাত্মবাদী আছেন, যারা ইন্দ্রিয়গুলিকে দমন করতে চেষ্টা করেন, কিন্তু ঐকান্তিক চেষ্টা স্বত্বেও অনেক সময় তাঁদের সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে যায় এবং তাঁরা ইন্দ্রিয়ের দাস হয়ে পড়েন। মহর্ষি বিশ্বামিত্রের মতো যোগী, যিনি তাঁর মন ও ইন্দ্রিয়কে সংযত করবার জন্য গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে কঠোর তপস্যায় রত ছিলেন, তিনি স্বর্গের অপ্সরা, মেনকার রুপে মুগ্ধ হয়ে কামান্ধ হয়ে অধঃপতিত হন। পৃথিবীর ইতিহাসে এই রকম অনেক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এর থেকে বোঝা যায়, কৃষ্ণভক্তি ছাড়া মন ও ইন্দ্রিয়কে সংযত করা অত্যন্ত কঠিন। মনকে শ্রীকৃষ্ণে নিয়োজিত না করে, কেউই এই প্রকার জাগতিক কার্যকলাপ থেকে বিরত হতে পারে না। একটি কার্যকর দৃষ্টান্তের মাধ্যমে মহাসাধক ও ভগবদ্ভক্ত শ্রীযামুনাচার্য বলেছেন –

যদবধি মম চেতঃ কৃষ্ণপদারবিন্দে
নবনবরসধামন্যুদ্যতং রন্তুমাসীৎ।
তদবধি বত নারীসঙ্গমে স্মর্যমাণে
ভবতি মুখবিকারঃ সুষ্ঠু নিষ্ঠীবনং চ।।

“আমার মন এখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণাবৃন্দের সেবায় নিয়োজিত হয়েছে এবং আমি প্রতিনিয়তই নব নব অপ্রাকৃত রসের আস্বাদন করছি। এখন কোন স্ত্রীলোকের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের কথা মনে হলেই আমার মন বিতৃষ্ণায় ভরে ওঠে এবং আমি সেই চিন্তার উদ্দেশ্যে থুথু ফেলি।“

কৃষ্ণভক্তি এমনই এক অপ্রকৃত আনন্দে পরিপূর্ণ যে, এর স্বাদ একবার পেলে জড় সুখভোগের প্রতি আর কোন আকর্ষণ থাকে না। নানা রকম সুস্বাদু খাবার খেয়ে ক্ষুধার নিবৃত্তি হলে যেমন আর আজেবাজে জিনিস খাবার ইচ্ছা থাকে না, তেমনই কৃষ্ণভক্তির স্বাদে পরিতৃপ্ত মন আর কিছুই চায় না। কৃষ্ণভক্তি আস্বাদন করার পর মন আপনা থেকেই শান্ত হয়ে যায় এবং কোন অবস্থাতেই তা আর বিচলিত হয় না। তাই আমরা দেখতে পাই, মহারাজ অম্বরীষকে বিনাশ করতে উদ্যত হলে, মহা-তেজস্বী মুনি দুরবাসার প্রাণ বিপন্ন হয়ে পড়ে এবং অবশেষে তিনি মহারাজ অম্বরীষের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে প্রাণ রক্ষা করেন। কারণ, মহারাজ অম্বরীষের মন কৃষ্ণভাবনায় মগ্ন ছিল (স বৈ মনঃ কৃষ্ণপদারবিন্দয়োর্বচাংসি বৈকুন্ঠগুণানুবর্ণনে)।

 

শ্লোক – ৬১
তানি সর্বাণি সংযম্য যুক্ত আসীত নৎপরঃ।
বশে হি যস্যেন্দ্রিয়াণি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ।। ৬১ ।।

তানি- সেই ইন্দ্রিয়সমূহ, সর্বাণি- সমস্ত, সংযম্য- সংযত করে, যুক্তঃ- যুক্ত হয়ে, আসীত- অবস্থিত হয়ে, মৎপরঃ- আমার সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত, বশে- সম্পূর্ণরুপে বশীভূত, হি- অবশ্যই। যস্য- যার, ইন্দ্রিয়াণি- ইন্দ্রিয়সমূহ, তস্য- তাঁর, প্রজ্ঞা- জ্ঞান, প্রতিষ্ঠিতা- প্রতিষ্ঠিত।

গীতার গান
কৃষ্ণসেবা যুক্ত হয় ইন্দ্রিয় সংযত।
ইন্দ্রিয় সে বশ হয় প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত।।

অনুবাদঃ যিনি তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণরুপে সংযত করে আমার প্রতি উত্তমা ভক্তিপরায়ণ হয়ে তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণরুপে বশীভূত করেছেন, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ।।

তাৎপর্যঃ ভক্তিযোগই যে শ্রেষ্ঠ যোগ তা এখানে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কৃষ্ণভক্তি ছাড়া ইন্দ্রিয়কে সংযত করা যায় না। ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, মহা-তেজস্বী দুর্বাসা মুনি অকারণে মহারাজ অম্বরীষের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর ইন্দ্রিয়-সংযম হারিয়ে ফেলেছিলেন। পক্ষান্তরে, মহারাজ অম্বরীষ দুর্বাসার মতো শক্তিশালী তপস্বী ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন কৃষ্ণভক্ত। অন্তরে ভগবানের ধ্যনে মগ্ন থেকে তিনি দুর্বাসার সমস্ত অত্যাচার ও অপমান নীরবে সহ্য করেছিলেন এবং তার ফলে তাঁর জয় হয়েছিল। শ্রীমদ্ভাগবতে (৯/৪/১৮-২০) বর্ণিত নিন্মোক্ত গুণাবলীর অধিকারী হবার ফলেই মহারাজ অম্বরীষ তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে দমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন –

স বৈ মনঃ কৃষ্ণপদারবিন্দয়ো-
র্বচাংসি বৈকুন্ঠগুণানুবর্ণনে।
করৌ হরের্মেন্দিরমার্জনাদিষু
শ্রুতিং চকারাচ্যুতসৎকথোদয়ে।।
মুকুন্দলিঙ্গালয়দর্শনে দৃশৌ
তদভৃত্যগাত্রস্পর্শেহঙ্গসঙ্গমম।
ঘ্রাণং চ তৎপাদসরোজসৌরভে
শ্রীমত্তুলস্যা রসনাং তদার্পিতে।।
পাদৌ হরেঃ ক্ষেত্রপদানুসর্পণে
শিরো হৃষীকেশপদাভিবন্দনে।
কামং চ দাস্যে ন তু কামকাম্যয়া
যথোত্তমশ্লোকজনাশ্রয়া রতিঃ।।

“মহারাজ অম্বরীষ তাঁর মনকে শ্রীকৃষ্ণের চরণারবিন্দের ধ্যানে, তাঁর বাণী দিয়ে বৈকুন্ঠের গুণ বর্ণনায়, তাঁর হাত দিয়ে তিনি ভগবানের সচ্চিদানন্দময় রুপ দর্শনে, তাঁর দেহ দিয়ে ভক্তদেহ স্পর্শনে, তাঁর নাক দিয়ে ভগবানের শ্রীচরণে অর্পিত ফুলের ঘ্রাণ গ্রহণে, তাঁর জিহ্বা দিয়ে ভগবানকে অর্পিত তুলসীর স্বাদ আস্বাদনে, তাঁর পদদ্বয় দ্বারা যেখানে ভগবানের মন্দির বিরাজমান সেই সব তীর্থস্থানে ভ্রমণে, তাঁর মস্তক দিয়ে ভগবানকে প্রণতি নিবেদনে এবং তাঁর কামনা দিয়ে ভগবানের কামনা সম্পাদনে নিয়োজিত করেছিলেন। এই সমস্ত গুণাবলী তাঁকে ভগবানের মৎপর ভক্ত করে তোলে।“

এখানে মৎপর শব্দটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। কিভাবে মৎপর হওয়া যায়, তা মহারাজ অম্বরীষের আচরণের মাধ্যমে আমরা উপলব্ধি করতে পারি। মৎপর পরম্পরায় আচার্য মহাপণ্ডিত শ্রীল বলদেব বিদ্যাভূষণ মন্তব্য করেছেন, মদ্ভক্তিপ্রভাবেন সর্বেন্দ্রিয়বিজয়পূর্বিকা স্বাত্মদৃষ্টিঃ সুলভেতি ভাবঃ। “ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করার মাধ্যমেই কেবল ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণভাবে সংযত করা যায়।“ তাছাড়া, কখনো কখনো আগুনের দৃষ্টান্ত দেওয়া হয় – “একটি আগুনের শিখা যেমন একটি ঘরের মধ্যে সবকিছু পুড়িয়ে ফেলতে পারে, তেমনই যোগীর হৃদয়ে অবস্থিত ভগবান শ্রীবিষ্ণু তারর অন্তর থেকে সব রকমের কলুষতা দহন করেন।“ যোগসূত্রেও ধ্যানের প্রণালী বর্ণনা করে নিরদে দেওয়া হয়েছে যে, ভগবান শ্রীবিষ্ণুকে ধ্যান করতে। শুন্যকে ধ্যান করার কোন কথাই বলা হয়নি। যে সমস্ত তথাকথিত যোগী শ্রীবিষ্ণু ছাড়া অন্য কিছুর ধ্যান করে, তারা কোন অলীক ছাড়ামূর্তির দর্শন করার আশায় অনর্থক সময় নষ্ট করে থাকে। কিন্তু যারা পরমার্থ সাধনের প্রয়াসী, তাঁরা  কেবল ভগবদ্ভক্তিই আকাঙ্ক্ষা করেন – সর্বতভাবে ভগবানের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করেন। এটিই হচ্ছে যোগের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

 

শ্লোক – ৬২-৬৩
ধ্যায়তো বিষয়ান পুংসঃ সঙ্গস্তেষূপজায়তে।
সংজ্ঞাৎ সঞ্জায়তে কামঃ কামাৎ ক্রোধাহভিজায়তে ।। ৬২ ।।
ক্রোধাদ ভবতি সম্মোহঃ সম্মোহাৎ স্মৃতিবিভ্রমঃ।
স্মৃতিভ্রংশাদ বুদ্ধিনাশো বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশ্যতি ।। ৬৩ ।।

ধ্যায়তঃ- ধ্যান করতে করতে, বিষয়ান- ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ, পুংসঃ- মানুষের, সঙ্গঃ- আসক্তি, তেষু- ইন্দ্রিয়-বিষয়ে, উপজায়তে- উৎপন্ন হয়, সঙ্গাৎ- আসক্তি থেকে, সঞ্জায়য়তে- সঞ্জাত হয়, কামঃ- কাম, কামাৎ- কাম থেকে, ক্রোধঃ- ক্রোধ, অভিজায়তে- জন্মায়, ক্রোধাৎ- ক্রোধ থেকে, ভবতি- হয়, সম্মোহঃ- পূর্ণ মোহ, সম্মোহাৎ- সম্মোহ থেকে, স্মৃতি- স্মৃতির, বিভ্রমঃ- বিভ্রান্তি, স্মৃতিভ্রংশাৎ- স্মৃতিভ্রংশ হওয়ার ফলে, বুদ্ধিনাশ- সৎ-অসৎ বিচারবুদ্ধির বিনাশ, বুদ্ধিনাশাৎ- বুদ্ধিনাশ হওয়ার ফলে, প্রণশ্যতি- অধঃপতিত হয়।

                               গীতার গান
শুষ্ক বৈরাগ্য যে আর বিষয়েতে ধ্যান।
ক্রমে ক্রমে সঙ্গ সেই হয় আগুয়ান।।
সঙ্গ ক্রমে কাম হয় কামে ক্রোধ হয়।
ক্রোধে সম্মোহন পরে বিভ্রম বাড়ায়।।
স্মৃতি ভ্রষ্ট হলে পরে বুদ্ধিনাশ হয়।
বৈরাগীর সর্বনাশ সেই সে পর্যায়।।

অনুবাদঃ ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ সম্বন্ধে চিন্তা করতে করতে মানুষের তাতে আসক্তি জন্মায়, আসক্তি থেকে কাম উৎপন্ন হয় এবং কামনা থেকে ক্রোধ উৎপন্ন হয়। ক্রোধ থেকে সম্মোহ, সম্মোহ থেকে স্মৃতিবিভ্রম, স্মৃতিবিভ্রম থেকে বুদ্ধিনাশ এবং বুদ্ধিনাশ হওয়ার ফলে সর্বনাশ হওয়ার ফলে সর্বনাশ হয়। অর্থাৎ, মানুষ পুনরায় জড় জগতের অন্ধকূপে অধঃপতিত হয়।

তাৎপর্যঃ যার অন্তরের ভগবদ্ভক্তির উদয় হয়নি, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় সম্বন্ধে চিন্তা করা মাত্রই তার মনে আসক্তি জন্মায়। ইন্দ্রিয়গুলিকে সঠিকভাবে নিযুক্ত করা দরকার, তাই সেগুলিকে যখন ভগবানের প্রেমময় সেবায় নিয়োজিত করা না হয়, তখন সেই ইন্দ্রিয়গুলি জড়-জাগতিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হবার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। জড়-জগতের সকলেই ইন্দ্রিয়গাহ্য বিষয়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়, এমন কি ব্রক্ষ্মা এবং শিবও এর দ্বারা প্রভাবিত – স্বর্গলোকের অন্যান্য দেব-দেবীদের তো কোন কথাই নেই। জড় জগতের এই গোলক-ধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসবার একমাত্র উপায় হচ্ছে কৃষ্ণভাবনায় ভাবিত হওয়া। এক সময় মহাদেব গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, পার্বতী যখন কামার্ত হয়ে তাঁর সঙ্গ কামনা করেন, তখন তাঁর ধ্যান ভঙ্গ হয় এবং তিনি পার্বতীর সঙ্গে মিলিত হন, ফলে কার্তিকের জন্ম হয়। ভগবানের একনিষ্ট ভক্ত ঠাকুর হরিদাসও এভাবে স্বয়ং মায়াদেবীর দ্বারা প্রলুব্ধ হন, কিন্তু ভগবানের প্রতি ঐকান্তিক ভক্তির প্রভাবে তিনি অনায়াসে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। শ্রীযামুনাচার্যের লেখা পূর্বোক্ত শ্লোকের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, নিষ্ঠাবান ভক্ত ভগবানের দিব্য সাহচার্য লাভ করে এক অপ্রাকৃত আনন্দের স্বাদ লাভ করেন, যার ফলে তিনি জড় ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ পরিহার করতে পারেন। ভগবদ্ভক্তির প্রভাবে মন আপনা থেকেই আসক্তি রহিত হয়ে পড়ে এবং হৃদয়ে বৈরাগ্যের উদয় হয়। সেটিই হচ্ছে সাফল্যের রহস্য। পক্ষান্তরে, ভগবদ্ভক্তি ছাড়া জোর করে ইন্দ্রিয়-দমন করার চেষ্টা করলে তা কখনোই ফলপ্রসূ হয় না, কারণ ইন্দ্রিয় সম্ভোগের সামান্য চিন্তার ফলে সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে গিয়ে ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির বাসনায় মন উন্মত্ত হয়ে ওঠে।

শীল রুপ গোস্বামী আমাদেরকে এই নির্দেশ দিয়েছেন –

প্রাপঞ্চিকতয়া বুদ্ধ্যা হরিস্মবন্ধিকস্তুনঃ।
মুমুক্ষুভিঃ পরিত্যাগো বৈরাগ্যং ফল্গু কথ্যতে।।
(ভক্তিরসামৃতসিন্ধু ১/২/২৫৬)

ভগবদ্ভক্তির বিকাশ হলে ভক্ত বুঝতে পারেন, সব কিছু দিয়েই ভগবানের সেবা করা যায়। যারা ভগবৎ-তত্ত্ব জানে না, তারা কৃত্রিম উপায়ে জড় বিষয়বস্তু পরিহার করার চেষ্টা করে এবং ফলস্বরূপ, যদিও তারা জড় বন্ধন থেকে মুক্তির কামনা করে, কিন্তু এই রকম শত চেষ্টা করেও তাদের হৃদয়ে বৈরাগ্যের উদয় হয় না। তাদের তথাকথিত বৈরাগ্যকে বলা হয় ফল্গু অর্থাৎ অসার। পক্ষান্তরে, ভগবদ্ভক্ত জানেন কিভাবে সব কিছু ভগবানের সেবায় ব্যবহার করতে হয়, তাই তিনি আর জড় চেতনার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন না। দৃষ্টান্তস্বরূপ, নির্বিশেষবাদীদের মতে, ভগবান অথবা পরম তত্ত্ব হচ্ছেন নিরাকার, তাই তিনি খেতে পারেন না, ভোগও করতে পারেন না। সেই জন্য নির্বিশেষবাদীরা জোর করে ইন্দ্রিয়-দমন করবার অভিপ্রায়ে ভাল খাবার আদি সব রকমের ভোগ পরিত্যাগ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ভগবদ্ভক্ত জানেন যে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরম ভোক্তা এবং ভক্তিভরে যা কিছু নৈবেদ্য তাঁকে নিবেদন করা হয়, তা তিনি ভোজন করেন। তাই, ভক্ত উৎকৃষ্ট খাদ্যদ্রব্য ভগবানের ভোগের জন্য নিবেদন করে, সেই নিবেদিত প্রসাদ গ্রহণ করেন। ভক্তকে তাই জোর করে ইন্দ্রিয়-দমন করতে হয় না। এভাবেই ভগবানকে নিবেদন করার ফলে সব কিছু পবিত্র হয়ে ওঠে এবং সেই ভগবৎ-প্রসাদ গ্রহণ করার ফলে অধঃপতনের আর কোন সম্ভাবনা থাকে না। পক্ষান্তরে, নির্বিশেষবাদীরা জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হবার প্রয়াসে সব কিছুই পার্থিব বলে পরিত্যাগ করতে সচেষ্ট হয়, কিন্তু এই ধরনের কৃত্রিম বৈরাগ্যের ফলে তারা জীবনকে উপভোগ করতে পারে না। সামান্য উত্তেজনাতেই তাই তাদের সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে যায় এবং তারা জড় জগতের আবর্তে পতিত হয়। সেই জন্যই এই সমস্ত মুক্তিকামীরা জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হবার পরেও, ভগবদ্ভক্তির অবলম্বন না থাকার ফলে, আবার জড়া প্রকৃতিতে পতিত হয়।

 

শ্লোক – ৬৪
রাগদ্বেষবিমুক্তৈস্তু বিয়য়ানিন্দ্রিয়ৈশ্চরন।
আত্মবশ্যৈর্বিধেয়াত্মা প্রসাদমধিগচ্ছতি ।। ৬৪ ।।

রাগ- আসক্তি, দ্বেষ- বিদ্বেষ, বিমুক্তৈঃ- যিনি মুক্ত হয়েছেন, তু- কিন্তু, বিষয়ান- ইন্দ্রিয়ের বিষয়, ইন্দ্রিয়ৈঃ- ইন্দ্রিয়ের দ্বারা, চরণ- আচরণ- আচরণ করে, আত্মবশৈঃ- স্বীয় বশীভূত, বিধেয়াত্মা- সংযতচিত্ত মানুষ, প্রসাদম- ভগবানের কৃপা, অধিগচ্ছতি- লাভ করেন।

গীতার গান
অতএব রাগ দ্বেষ নাহি যার অতি।
মুক্ত যেবা হইয়াছে বিষয়ের গতি।।
চিত্ত প্রসাদে সে হয় কৃষ্ণার্পিত মন।
বিষয়ে থাকিয়া তিনি জীবন্মুক্ত হন।।

অনুবাদঃ সংযতচিত্ত মানুষ প্রিয় বস্তুতে স্বাভাবিক আসক্তি এবং অপ্রিয় বস্তুতে স্বাভাবিক বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয়ে, তাঁর বশীভূত ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করে ভগবানের কৃপা লাভ করেন।

তাৎপর্যঃ ইতিপূর্বে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, অষ্টাঙ্গ-যোগ, হঠযোগ আদি কৃত্রিম উপায়ে সাময়িকভাবে ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করা সম্ভব হলেও, ভগবানের সেবায় তাদের নিযুক্ত না করলে, প্রতি মুহূর্তে মায়ার দ্বারা মোহাচ্চন্ন হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। অনেক সময় ভগবানের ভক্তকে আপাতদৃষ্টিতে ইন্দ্রিয়াসক্ত বলে মনে হলেও, ভগবানের প্রতি নির্মল ভক্তি লাভ করার ফলে ইন্দ্রিয়-পরায়ণ কার্যকলাপের প্রতি তাঁর কোন আসক্তি থাকে না। ভগবানের প্রতি ভালবাসা এতই গভীর যে, আর কোন কিছুর প্রতি তাঁর কোন রকম মোহ থাকে না। ভগবানের প্রেমামৃতের আস্বাদন অর্জন করার ফলে বিষয়-বিষের প্রতি তাঁর আর আসক্তি থাকে না। ভগবানের ভক্তের একমাত্র চিন্তা হচ্ছে, কিভাবে তিনি ভগবানের সেবা করবেন, কিভাবে ভগবানকে তুষ্ট করবেন, এ ছাড়া আর কোন বিষয়েই তিনি চিন্তা করেন না। তাই তিনি সমস্ত রকমের আসক্তি ও নিরাসক্তির অতীত। শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছা অনুসারে কেবল তিনি তাঁর সমস্ত কর্তব্যকর্ম করেন। শ্রীকৃষ্ণ যদি চান, তবে তিনি এমন কাজও করেন, যার জন্য সারা জগত তাঁকে নিন্দা করতে পারে। আবার শ্রীকৃষ্ণ না চাইলে তিনি তাঁর অবশ্য করণীয় কর্মও পরিত্যাগ করেন। কর্তব্যকর্ম সাধন সাধারণত নির্ভর করে আমাদের ইচ্ছার উপরে, কিন্তু কৃষ্ণভক্ত কেবল ভগবানের নির্দেশ অনুসারে তাঁর কর্তব্যকর্ম করে চলেন। ভগবানের অহৈতুকী কৃপার ফলে ভক্ত এই ধরনের শুদ্ধ চেতনা লাভ করেন, যার ফলে কোন রকম জড় কলুষময় পরিবেশে তিনি সংশ্লিষ্ট থাকলেও কোন কলুষতা আর তাকী স্পর্শ করতে পারে না।

 

শ্লোক – ৬৫
প্রসাদে সর্বদুঃখানাং হানিরস্যোপজায়তে।
প্রসন্নচেতসো হ্যাশু বুদ্ধিঃ পর্যবতিষ্ঠতে ।। ৬৫ ।।

প্রসাদে- ভগবানের অহৈতুকী কৃপা লাভ করার ফলে, সর্ব- সমস্ত, দুঃখানাম- জড় দুঃখের, হানিঃ- বিনাশ, অস্য- তাঁর, উপজায়তে- হয়, প্রসন্নচেতসঃ- প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তির, হি- অবশ্যই, আশু- অতি শীঘ্র, বুদ্ধিঃ- বুদ্ধি, পরি- সর্বতোভাবে, অবতিষ্ঠতে- স্থির হয়।

গীতার গান
পরমানন্দ সুখ যেই প্রসাদ তার নাম।
যাহার প্রাপ্তিতে দুঃখ হয় অন্তর্ধান।।
সে প্রসাদে প্রতিষ্ঠিত যে হয় নিশ্চিত।
আত্মনিষ্ঠা বৃদ্ধি তার জগতে বিদিত।।

অনুবাদঃ চিন্ময় চেতনায় অধিষ্ঠিত হওয়ার ফলে তখন আর জড় জগতের ত্রিতাপ দুঃখ থাকে না, এভাবে প্রসন্নতা লাভ করার ফলে বুদ্ধি শীঘ্রই স্থির হয়।

 

শ্লোক -৬৬
নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চাযুক্তস্য ভাবনা।
ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্তস্য কুতঃ সুখম ।। ৬৬ ।।

ন অস্তি- থাকতে পারে না, বুদ্ধিঃ- চিন্ময় বুদ্ধি, অযুক্তস্য- যে কৃষ্ণভাবনায় যুক্ত নয়, চ- না, চ- এবং অযুক্তস্য- কৃষ্ণভাবনাময় যুক্ত নয়, ন- না, চ- এবং, অযুক্তস্য- কৃষ্ণভক্তিবিহীন ব্যক্তির, ভাবনা- সুখের চিন্তায় মগ্নচিত্ত, ন- না, চ- এবং, অভাবয়তঃ- পরমার্থ চিন্তাশূন্য ব্যক্তির, শান্তিঃ- শান্তি, অশান্তস্য- শান্তিরহিত ব্যক্তির, কুতঃ- কোথায়, সুখম- সুখ।

গীতার গান
জীবের স্বরূপ হয় আনন্দেতে মতি।
বুদ্ধিযোগ বিনা তার কোথায় বা গতি।।
অতএব সে ভাবনা নাহি যার স্থিতি।
কোথা শান্তি তার বল সুখের প্রগতি।।

অনুবাদঃ যে ব্যক্তি কৃষ্ণভাবনাময় যুক্ত নয়, তার চিত্ত সংযত নয় এবং তার পারমার্থিক বুদ্ধি থাকতে পারে না। আর পরমার্থ চিন্তাশূন্য ব্যক্তির শান্তি লাভের কোন সম্ভাবনা নেই। এই রকম শান্তিবিহীন ব্যক্তির প্রকৃত সুখ কোথায়?

তাৎপর্যঃ ভগবানের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত না করলে কোন মতেই শান্তি পাওয়া যেতে পারে না। ভগবান নিজেই পঞ্চম অধ্যায়ে (৫/২৯) প্রতিপন্ন করেছেন যে, যখন কেউ হৃদয়ঙ্গম করতে পারে, কৃষ্ণই হচ্ছে সমস্ত যজ্ঞ ও তপস্যার একমাত্র ভোক্তা, তিনিই সমস্ত বিশ্ব-চরাচরের অধীশ্বর এবং তিনিই সমস্ত জীবের প্রকৃত শুভাকংখী বন্ধু, তবেই সে প্রকৃত শান্তি লাভ করতে পারে। তাই, যে কৃষ্ণভাবনায় যুক্ত নয়, তার জীবনের কোন চরম উদ্দেশ্যই থাকে না। জীবনের চরম উদ্দেশ্য কি, তা মা জানাই তার সমগ্র অশান্তির কারণ। কিন্তু কেউ যখন বুঝতে পারে, শ্রীকৃষ্ণের হচ্ছেন পরম ভোক্তা, অধীশ্বর ও সর্বভূতের পরম সুহৃদ, তখন শান্তি লাভ করে। তাই, শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সম্বন্ধ রহিত হয়ে যে তার সময় অতিবাহিত করে, সে যতই লোক দেখানো তথাকথিত শান্তি ও পারমার্থিক প্রগতির বুলি আওড়াক না কেন, সে সর্বদাই দুঃখ-দুর্দশায় পীড়িত ও অশান্ত। কৃষ্ণভাবনামৃত হচ্ছে একটি স্বয়ং-প্রকাশিত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, যা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে একমাত্র সম্বন্ধ গড়ে তোমার মাধ্যমেই লাভ করা যায়।

 

শ্লোক – ৬৭
ইন্দ্রিয়াণাং হি চরতাং যন্মনোহনুবিধীয়তে।
তদস্য হরতি প্রজ্ঞাং বায়ুর্ণাবমিবাম্ভসি।। ৬৭ ।।

ইন্দ্রিয়াণাম- ইন্দ্রিয়সমূহের, হি- নিশ্চিতভাবে, চরতাম- বিচরণকালে, যৎ- যার দ্বারা, মনঃ- মন, অনুবিধীয়তে- সদা অনুসরণ করে, তৎ- তা, অস্য- তার, হরতি- হরণ করে, প্রজ্ঞাম- বুদ্ধিকে, বায়ুঃ- বায়ু, নাবম- নৌকা, ইব- মতো, অম্ভসি- জলে।

গীতার গান
ইন্দ্রিয় চালিত করি মনোধর্মে স্থিতি।
বায়ুর মধ্যেতে যথা নৌকার প্রগতি।।
সে নৌকা যেমন সদা টলমল করে।
অযুক্ত ব্যক্তির প্রজ্ঞা সেইরুপ হরে।।

অনুবাদঃ প্রতিকূল বায়ু নৌকাকে যেমন অস্থির করে, তেমনই সদা বিচরণকারী যে কোন একটি মাত্র ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণেও মন অসংযত ব্যক্তির প্রজ্ঞাকে হরণ করতে পারে।

তাৎপর্যঃ ভগবদ্ভক্ত যদি তাঁর সব কয়টি ইন্দ্রিয়কে ভগবানের সেবায় নিয়োজিত না করেন, যদি তাঁর কোন একটি ইন্দ্রিয়ও জড় সুখ উপভোগ করার প্রয়াসী হয়, তা হলেও তাঁর মন ভগবানের শ্রীচরণকমল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, ফলে তাঁর পারমার্থিক উন্নতি বাধাপ্রাপ্ত হবে। মহারাজ অম্বরীষের ভগবদ্ভক্তির মাধ্যমে আমরা শিক্ষা পাই, তাঁর মতো আমাদেরও সব কয়টি ইন্দ্রিয়কে ভগবানের সেবায় নিয়োজিত করতে হবে। তা হলেই মন একাগ্র হয়ে ভগবানের শ্রীচরণে সমাধিস্থ হবে, কেন না সেটিই হচ্ছে মনকে নিয়ন্ত্রণ করার যথার্থ কৌশল।

 

শ্লোক – ৬৮
তস্মাদ যস্য মহাবাহো নিগৃহীতানি সর্বশঃ।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ।। ৬৮ ।।

তস্মাৎ- অতএব, যস্য- যার, মহাবাহো- হে মহাবীর, নিগৃহীতানি- নিবৃত্ত হওয়ার ফলে, সর্বশঃ- সর্ব প্রকারে, ইন্দ্রিয়াণি- ইন্দ্রিয়সমূহ, ইন্দ্রিয়ার্থেভ্যঃ- ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে, তস্য- তাঁর, প্রজ্ঞা- প্রজ্ঞা, প্রতিষ্ঠিতা- স্থির।

গীতার গান
অতএব মহাবাহো শুন মন দিয়া।
নিগৃহীত মন যার আমারে সপিয়া।।
তাঁহার ইন্দ্রিয় বশ মোরে সমর্পিত।
তাঁহারই প্রজ্ঞা হয় পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত।।

অনুবাদঃ সুতরাং, হে মহাবাহো! যার ইন্দ্রিয়গুলি ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে সর্বপ্রকারে নিবৃত্ত হয়েছে, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ।

তাৎপর্যঃ কেবলমাত্র কৃষ্ণভাবনা অথবা ভগবানের অপ্রাকৃত প্রেমময়ী সেবায় সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়োজিত করার মাধ্যমে ইন্দ্রিয়-তর্পণের বেগগুলিকে দমন করা যায়। যেমন উচ্চতর শক্তি প্রয়োগ করে শত্রুদের দমন করা যায়, ইন্দ্রিয়গুলিকে তেমনই উপায়ে দমন করতে হয় – কোনও মানবিক প্রচেষ্টায় তা হয় না। সেগুলিকে ভগবানের সেবায় নিয়োজিত রাখার মাধ্যমেই তা সম্ভব। এই সত্য যিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, কৃষ্ণভাবনাই মানুষকে পরিশুদ্ধ বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা এনে দেয় এবং কোন সদগুরুর পথনির্দেশ মতোই সেই পদ্ধতির অনুশীলন করতে হয়, তাঁকেই বলা হয় সাধক, অর্থাৎ তিনি জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হবার যোগ্য পাত্র।

 

শ্লোক – ৬৯
যা নিশা সর্বভূতানাং তস্যাং জাগর্তি সংযমী।
যস্যাং জাগ্রতি ভূতানি সা নিশা পশ্যতো মুনেঃ ।। ৬৯ ।।

যা- যা, নিশা- রাত্রি, সর্ব- সমস্ত, ভূতানাম- জীবদের, তস্যাম- তাতে, জাগর্তি- জাগ্রত থাকেন, সংযমী- আত্মসংযমী, যস্যাম- যাতে, জাগ্রতি- জাগ্রত থাকেন, ভূতানি- সমস্ত জীব, সা- তা, নিশা- রাত্রি, পশ্যতঃ- তত্ত্বদর্শী, মুনে- মননশীল ব্যক্তির পক্ষে।

গীতার গান
বিষয়ী বিষয়ে নিষ্ঠা করে সে প্রচুর।
সর্বদা জাগ্রত সেই সদা ভরপুর।।
সংযমীর সেই চেষ্টা নিশার সমান।
সংযমী জাগ্রত থাকে আত্মবিষয়ান।।
বিষয়ীর সেই আত্মা রাত্রির সমান।
উভয়ের কার্য হয় বহু ব্যবধান।।

অনুবাদঃ সমস্ত জীবের পক্ষে যা রাত্রিস্বরূপ, স্থিতপ্রজ্ঞ সেই রাত্রিতে জাগরিত থেকে আত্ম-বুদ্ধিনিষ্ঠ আনন্দকে সাক্ষাৎ অনুভব করেন। আর যখন সমস্ত জীবেরা জেগে থাকে, তখন তত্ত্বদর্শী মুনির নিকট তা রাত্রিস্বরূপ।

তাৎপর্যঃ এও জগতে দুই রকমের বুদ্ধিমান লোক আছে। এক ধরনের বুদ্ধিমান লোক ইন্দ্রিয় ভোগতৃপ্তির উদ্দেশ্যে বৈষয়িক ব্যাপারে খুব উন্নতি লাভ করে, আর অন্য ধরনের বুদ্ধিমানেরা আত্মানুসন্ধানী এবং আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান লাভের চেষ্টায় সদা জাগ্রত। আত্মানুসন্ধানী সাধু বা চিন্তাশীল মানুষের কাজকর্ম জড়-জাগতিক ভাবে আচ্ছন্ন মানুষদের কাছে যেন রাত্রির অন্ধকার বলে মনে হয়। আত্ম-উপলব্ধি সম্পর্কে অজ্ঞতার জন্যই জড়-জাগতিক মানুষেরা তেমন রাত্রির অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু তত্ত্বদর্শী মুনি জড়-জাগতিক মানুষদের রাত্রিতে সজাগ থাকেন। সেই সময় সাধুজন আধ্যাত্মিক চর্চায় ক্রমশ অগ্রগতির পথে অপ্রাকৃত আনন্দ উপলব্ধি করেন, তখন সংসারী লোক রাত্রিতে ঘুমিয়ে থেকে নানা রকম ইন্দ্রিয় উপভোগের স্বপ্ন দেখে এবং সেই স্বপ্নে সে কখনো নিজেকে সুখী মনে করে, কখনো ঘুমের ঘোরে দুঃখীও মনে হয়। এই সমস্ত জড়-জাগতিক সুখ-দুঃখের প্রতি আত্মনুসন্ধানী ব্যক্তি সর্বদাই উদাসীন থাকেন। তিনি জড়-জাগতিক প্রতিক্রিয়ায় সম্পূর্ণ নিস্পৃহ থেকে আত্ম-উপলব্ধির কাজে সচেষ্ট থাকেন।

 

শ্লোক – ৭০
আপূর্যমাণমচলপ্রতিষ্ঠং
সমুদ্রমাপঃ প্রবিশন্তি যদ্বৎ।
তদ্বৎ কামা যং প্রবিশন্তি সর্বে
স শান্তিমাপ্নোতি ন কামকামী ।। ৭০ ।।

আপূর্যমাণম- সর্বদা পূর্ণ, অচলপ্রতিষ্ঠম- স্থির, সমুদ্রম- সমুদ্রে, আপঃ- জলরাশি, প্রবিশন্তি- প্রবেশ করে, যদ্বৎ- যেমন, তদ্বৎ- তেমন, কামাঃ- কামনাসমূহ, যম- যার মধ্যে, প্রবিশন্তি- প্রবেশ করে, সর্বে- সমস্ত, সঃ- সেই ব্যক্তি, শান্তিম- শান্তি, আপ্নোতি- লাভ করেন, ন- না, কামকামী- বিষয়কামী ব্যক্তি।

গীতার গান
সমুদ্রে নদীর জল যেমন প্রবেশ।
বিচলিত নহে সেই সদা নির্বিশেষ।।
সেইভাবে মনে যার কামের চালনা।
সে শান্তি পাইবে ফল শান্তির সাধনা।।

অনুবাদঃ বিষয়কামী ব্যক্তি কখনো শান্তি লাভ করে না। জলরাশি যেমন সদা পরিপূর্ণ এবং স্থির সমুদ্রে প্রবেশ করেও তাকে ক্ষোভিত করতে পারে না, কামসমূহও তেমন স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তিকে প্রবিষ্ট হয়েও তাঁকে বিক্ষুব্ধ করতে পারে না, অতএব তিনিই শান্তি লাভ করেন।

তাৎপর্যঃ যদিও মহাসমুদ্র সব সময় জলে পূর্ণ থাকে এবং বর্ষার সময় নদীবাহিত হয়ে আরও জল সমুদ্রে প্রবেশ করে, কিন্তু সমুদ্রের কোনও পরিবর্তন হয় না – স্থির থাকে, সমুদ্র তখনও বিক্ষুদ্ধ হয় না, এমন কি বেলাভূমিতে অতিক্রম করে প্লাবিত হয় না। কৃষ্ণভাবনায় মগ্ন কৃষ্ণভক্তও সর্ব অবস্থাতেই তেমনই অবিচল থাকেন। যতক্ষন মানুষ জড় দেহ নিয়ে আছে, ততক্ষণ ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির জন্য দেহের চাহিদাও থাকবেই। কিন্তু ভগবানের ভক্ত তাঁর পূর্ণতার জন্য এই সমস্ত কামনা-বাসনার দ্বারা কখনোই বিচলিত হন না। কারণ, কৃষ্ণভক্তের কোন কিছুরই অভাব নেই, ভগবান তাঁর সমস্ত অভাব মোচন করেছেন। তাই তিনি সমুদ্রের মতো – নিজের মধ্যেই সর্বদা পরিপূর্ণ। ইন্দ্রিয়ের নদী বেয়ে কামনা-বাসনার যত জলই তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করুক, তাঁর হৃদয় সমুদ্রের মতোই অবিচলভাবে পরিপূর্ণ থাকে। এটিই হচ্ছে ভগবদ্ভক্তের লক্ষণ – জড় জগতের ভোগবাসনার প্রতি তিনি সম্পূর্ণ উদাসীন, যদিও বাসনাগুলি তাঁর মধ্যে রয়েছে। ভগবানের সেবায় গভীরভাবে মগ্ন থাকার ফলে তিনি যে শান্তি লাভ করেছেন, তা সমুদ্রের মতোই অতলস্পর্শী। কোন কিছুই তাঁকে আর বিচলিত করতে পারে না। পক্ষান্তরে, অন্যেরা, এমন কি যারা মুক্তির আকাঙ্ক্ষী – জাগতিক সাফল্যের আকাঙ্ক্ষীদের কি আর কথা, তারাও সর্বদাই অশান্ত। সকাম কর্মী, মুক্তিকামী যোগী – সকলেই অশান্ত, যেহেতু তাদের অপূর্ণ বাসনা। কিন্তু কৃষ্ণভক্ত ভগবানের সেবায় সর্বতোভাবে পরম শান্তি লাভ করে থাকেন, তাঁর কোন বাসনাই অপূর্ণ থাকে না। বাস্তবিকপক্ষে, তিনি এমন কি জড় জগতের তথাকথিত বন্ধন থেকে মুক্তির কামনাও করেন না। কৃষ্ণভক্তদের কোন জড় কামনা থাকে না, তাই তাঁরা সম্পূর্ণরুপে শান্ত।

 

শ্লোক – ৭১
বিহায় কামান যঃ সর্বান পুমাংশ্চরতি নিঃস্পৃহঃ।
নির্মমো নিরহঙ্কারঃ স শান্তিমধিগচ্ছতি ।। ৭১ ।।

বিহায়- ত্যাগ করে, কামান- ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের বাসনাসমূহ, যঃ- যে ব্যক্তি, সর্বান- সমস্ত, পুমান- পুরুষ, চরতি- বিচরণ করেন, নিঃস্পৃহঃ- স্পৃহাশূন্য, নির্মমঃ- মমত্ববোধ রহিত, নিরহঙ্কারঃ- অহংকারশূন্য, সঃ- তিনি, শান্তিম- প্রকৃত শান্তি, অধিগচ্ছতি- প্রাপ্ত হন।

গীতার গান
কাম ছাড়ি সব যেবা নিস্পৃহ ধীমান।
সর্বত্র ভ্রমণ করে নারদীয় গান।।
মমতাবিহীন আর অহংকার নাই।
তার শান্তি বিনিশ্চিত সেইত গোঁসাই।।

অনুবাদঃ যে ব্যক্তি সমস্ত কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করে জড় বিষয়ের প্রতি নিস্পৃহ, নিরহঙ্কার ও মমত্ববোধ রহিত হয়ে বিচরণ করেন, তিনিই প্রকৃত শান্তি লাভ করেন।

তাৎপর্যঃ নিষ্কাম হওয়ার অর্থ হচ্ছে নিজের ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির জন্য কোন কিছু কামনা না করা। পক্ষান্তরে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সেবা করার কামনাই হচ্ছে নিষ্কামনা। এই জড় দেহটিকে বৃথাই আমাদের প্রকৃত সত্ত্বা বলে না ভেবে এবং জগতের কোনও কিছুর উপরে বৃথা মালিকানা দাবি না করে, শ্রীকৃষ্ণের নিত্যদাস রুপে নিজের যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করাটাই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনার পরিশুদ্ধ পর্যায়। এই পরিশুদ্ধ পর্যায়ে যে উন্নীত হতে পারে, সে বুঝতে পারে, যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সব কিছুর অধীশ্বর, তাই তাঁকে সন্তুষ্ট করবার জন্য সব কিছুই তাঁর সেবায় উৎসর্গ করা উচিৎ। কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধের প্রারম্ভে অর্জুন নিজের ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করতে নারাজ হয়েছিলেন, কিন্তু ভগবানের কৃপার ফলে তিনি যখন পরিপূর্ণভাবে কৃষ্ণভাবনাময় হলেন, তখন ভগবানের ইচ্ছা অনুসারে তিনি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হলেন। নিজের জন্য যুদ্ধ করার ইচ্ছা অর্জুনের ছিল না, কিন্তু ভগবানের ইচ্ছার কথা জেনে সেই একই অর্জুন যথাসাধ্য বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। ভগবানকে সন্তুষ্ট করার বাসনাই হচ্ছে বাসনা রহিত হওয়ার একমাত্র উপায়। কোন রকম কৃত্রিম উপায়ে কামনা-বাসনাগুলিকে জয় করা যায় না। জীব কখনোই ইন্দ্রিয়া-নুভূতিশূন্য অথবা বাসনা রহিত হতে পারে না। তবে ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও কামনা-বাসনার বন্ধন থেকে মুক্ত হবার জন্য সে তাদের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারে। জড়-জাগতিক বাসনাশূন্য মানুষ অবশ্যই বোঝেন যে, সব কিছুই শ্রীকৃষ্ণের (ঈশাবাস্যমিদং সর্বম) এবং সেই জন্য তিনি কোন কিছুর উপরেই মালিকানা দাবি করেন না। এই পারমার্থিক জ্ঞান আত্ম-উপলব্ধির উপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ, তখন যথাযথভাবে বোঝা যায় যে, চিন্ময় স্বরূপে প্রত্যেকটি জীব শ্রীকৃষ্ণের নিত্য অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাই জীবের নিত্য স্থিতি কখনোই শ্রীকৃষ্ণের সমকক্ষ বা তাঁর চেয়ে বড় নয়। কৃষ্ণভাবনামৃতের এই সত্য উপলব্ধি করাই হচ্ছে প্রকৃত শান্তি লাভের মূল নীতি।

 

শ্লোক – ৭২
এষা ব্রাক্ষ্মী স্থিতিঃ পার্থ নৈনাং প্রাপ্য বিমুহ্যতি।
স্থিত্বাস্যামন্তকালেহপি ব্রক্ষ্মনির্বাণমৃচ্ছতি ।। ৭২ ।।

এষা- এই, ব্রাক্ষ্মী- চিন্ময়, স্থিতিঃ স্থিতি, পার্থ- হে পৃথাপুত্র, ন- না, এনাম- এই, প্রাপ্য- লাভ করে, বিমুহ্যতি- বিমোহিত হন, স্থিত্বা- স্থিত হয়ে, অস্যাম- এতে, অনন্তকালে- জীবনের অন্তিম সময়ে, অপি- ও, ব্রক্ষ্মনির্বাণম- জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে চিন্ময় স্তর, ঋচ্ছতি- লাভ করেন।

গীতার গান
সেই সে স্মৃতির নাম ব্রাক্ষ্মীস্থিতি হয়।
যার প্রাপ্তি হয় তাঁর মোহন কোথায়।।
সেই স্থিতি যদি হয় মরণের কালে।
ব্রক্ষ্মস্থিতি ভাব নহে কালের কবলে।।

অনুবাদঃ এই প্রকার স্থিতিকেই ব্রাক্ষ্মীস্থিতি বলে। হে পার্থ! যিনি এই স্থিতি লাভ করেন, তিনি মোহপ্রাপ্ত হন না। জীবনের অন্তিম সময়ে এই স্থিতি লাভ করে, তিনি  এই জড় মোহপ্রাপ্ত হন না। জীবনের অন্তিম সময়ে এই স্থিতি লাভ করে, তিনি এই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবৎ-ধামে প্রবেশ করেন।

তাৎপর্যঃ কৃষ্ণভাবনামৃত অর্থাৎ ভগবৎ-পরায়ণ দিব্য জীবন এক মুহূর্তের মধ্যে লাভ করা সম্ভব, আবার লক্ষ-কোটি জীবনেও তার নাগাল পাওয়া সম্ভব না হতেও পারে। এই জীবন লাভ করতে হলে কেবল পরম সত্যকে উপলব্ধি করে তাকে গ্রহণ করতে হবে। খটাঙ্গ মহারাজ তাঁর মৃত্যুর মাত্র কয়েক মুহূর্ত পূর্বে ভগবানের চরণারবিন্দে আত্মোৎসর্গ করার ফলে জীবনের সেই পর্যায়ে উপনীত হয়েছিলেন। নির্বাণ কথাটির অর্থ হচ্ছে জড় জীবনের সমাপ্তি। বৌদ্ধদের মতে জড় জীবনের সমাপ্তি হলে আত্মা অসীম শুন্যতায় বিলীন হয়ে যায়। ভগবদগীতা কিন্তু আমাদের সেই শিক্ষা দেয় না। এই জড় জীবনের সমাপ্তি হবার পরে আমাদের প্রকৃত জীবন শুরু হয়। এই জড়-জাগতিক জীবনধারা পরিসমাপ্ত করতে হবে, সেই কথাটি জানাই স্থুল জড়বাদীর পক্ষে যথেষ্ট, কিন্তু যিনি পারমার্থিক জ্ঞান অর্জন করেছেন তিনি জানেন যে, এই জড় জীবনের পরেও আর একটি জীবন আছে। এই জীবনের পরিসমাপ্তির পূর্বে, সৌভাগ্যক্রমে কেউ যদি কৃষ্ণভাবনাময় হয়, তবে সে তৎক্ষণাৎ ব্রক্ষ্মনির্বাণ স্তর লাভ করে। ভগবৎ-ধাম ও ভগবৎ-সেবার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। যেহেতু উভয়ই চিন্ময়, তাই ভক্তিযোগে ভগবানের অপ্রাকৃত প্রেমময়ী সেবায় নিয়োজিত হওয়াই হচ্ছে ভগবৎ-ধাম প্রাপ্তি। জড় জগতের সমস্ত কর্মই ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির জন্য সাধিত হয়। এমন কি এই জীবনে কৃষ্ণভাবনায় উদ্বুদ্ধ হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্রক্ষ্মপ্রাপ্তি হয় এবং কৃষ্ণভাবনায় মগ্ন, তিনি নিঃসন্দেহে ইতিমধ্যেই ভগবৎ-ধামে প্রবেশ করেছেন।

ব্রক্ষ্মা হচ্ছে জড় বস্তুর ঠিক বিপরীত। তাই ব্রাক্ষ্মী স্থিতি বলতে বোঝায় ‘জড়-জাগতিক স্তরের অতীত’। ভক্তিযোগে ভগবানের সেবা নিবেদনকে ভগবদগীতায় মুক্ত স্তররুপে স্বীকার করা হয়েছে (স গুণান সমতীত্যৈতান ব্রক্ষ্মভূয়ায় কল্পতে)। তাই, জড় বন্ধন থেকে মুক্তিই হচ্ছে ব্রাক্ষ্মী স্থিতি।

শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর ভগবদগীতার দ্বিতীয় অধ্যায়কে সমগ্র ভগবদগীতার সারাংশ বলে বর্ণনা করেছেন। ভগবদগীতার বিষয়বস্তু হচ্ছে কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগ। দ্বিতীয় অধ্যায়ে কর্মযোগ ও জ্ঞানযোগের বিশদ বর্ণনা করা হয়েছে এবং সমগ্র গীতার সারমর্ম-স্বরূপ ভক্তিযোগের আভাস দেওয়া হয়েছে।

ভক্তিবেদান্ত কহে শ্রীগীতার গান।
শুনে যদি শুদ্ধ ভক্ত কৃষ্ণগতপ্রাণ।।

ইতি – গীতার বিষয়বস্তুর সারমর্ম পরিবেশিত বিষয়ক ‘সাংখ্য-যোগ’ নামক শ্রীমদ্ভবদগীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য সমাপ্ত।