তোমার আলোয় মশাল জ্বেলে আমরা সবাই অভিজিৎ

রায়হান আবীর

( ১ )

মায়ের গর্ভ থেকে সংগ্রাম শুরু হয়েছিলো অভিজিৎ রায়ের। ১৯৭১ এর উত্তাল মার্চে তার বাবা অজয় রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাত্র চার বছর আগে লীডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি এবং পোস্টডক্টরেট গবেষণা শেষ করে অজয় রায় ফিরে আসেন বাংলাদেশে, প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশে এসে শিক্ষকতা, গবেষণার পাশাপাশি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন প্রিয় দেশকে পাকিস্থানি শোষকদের হাত থেকে রক্ষার আন্দোলনে। ১৯৭১ সালের পচিশে মার্চের কালো রাতে পৃথিবীর ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে পাকিস্থানি সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাংলাদেশের উপর। রাত এগারোটায় ঢাকায় কারফিউ জারি করা হয়। টেলিফোন টেলিগ্রাফ সহ বাংলাদেশের সকল পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঢাকাকে আলাদা করে ফেলা হয় পুরো বাংলাদেশ থেকে। মানুষ হত্যার জন্য একের পর এক সামরিক অভিযান চলতে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে, ইপিআর এর সদর দফতর থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সব স্থানে। ট্যাঙ্ক, গ্রেনেড, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নির্বিচারে চলে সাধারণ ,মানুষ, ছাত্র নারী পুলিশ আধা-সামরিক সদস্যদের উপর আক্রমণ।

সেই ভয়ঙ্কর সময়টাতে অজয় রায়, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী শেফালী রায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায়। ক্র্যাক ডাউনের সেই সময়ে তালিকা হাতে অজয় রায়কে হত্যার উদ্দেশ্যে হাজির হয় পাকিস্থানি সেনাবাহিনীর একটি দল। সদর দরজায় নকল তালা লাগিয়ে সে রাতে পাকিস্থানী সেনাসদস্যের বোকা বানিয়ে নিজেকে, পরিবারকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন অজয় রায়। ইংল্যান্ডের চাকরি-গবেষণা-নিশ্চিত জীবনকে ঠেলে সরিয়ে যেই মানুষটি বাংলাদেশে ফিরেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন, পরদেশের হয়েনাদের আক্রমণে সপরিবারে বাধ্য হন গৃহত্যাগে। তার স্ত্রী শেফালী রায়ের গর্ভে তখন বড় হচ্ছে বড় ছেলে অভিজিৎ রায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় ছেড়ে তখন ঢাকায় আত্মীয়, বন্ধুবান্ধবের বাসায় আশ্রয় নেন অজয় রায়। কারফিউ উঠে যাবার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সপরিবারে ঢাকা ত্যাগ করেন কুমিল্লার সোনামুড়া সীমান্ত দিয়ে। ভারতের আপার আসামে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কমিশনে কর্মরত প্রকৌশলী বড় ভাইয়ের বাসায় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য চলে যান অজয় রায়। পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাকে আপাতত দূরে ঠেলে কাঁধে তুলে নেন অস্ত্র, কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন পাকিস্থানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। অজয় রায়ের সেই মুক্তিযোদ্ধা দলটির বীরত্বপূর্ণ অভিযানের কথা বর্ণনা হতে থাকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া বেতার তরঙ্গে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগের নেতা এম. আর. সিদ্দীকীর পরামর্শে আগরতলা হয়ে মুজিবনগরে চলে আসেন অজয় রায়। সেখানে গিয়ে জড়িত হয়ে পড়েন তাজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত প্রবাসী স্বাধীন বাংলা সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। অবৈতনিক সদস্য হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ সরকারের প্ল্যানিং সেলে যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে সেক্রেটারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

যুদ্ধের সেই উত্তাল সময় সেপ্টেম্বরের বারো তারিখ রোববার সকাল ১২:৪২ মিনিটে শিবসাগর জেলার নাজিরাতে একটি মাতৃসেবা হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন অভিজিৎ রায়। রণাঙ্গনে থাকা বাবা অজয় রায় এক স্বেচ্ছাসেবকের কাছে জানতে পারেন তার প্রথম পুত্র সন্তানের পৃথিবীতে আগমনের খবর। চাইলেই তখন ছেলের কাছে চলে যাওয়ার উপায় ছিল না তার, ছেলেকে কোলে তুলে নেবার সৌভাগ্য হয় অভিজিৎ রায়ের চৌদ্দ দিন বয়সে। ফিরে যান আবার রণাঙ্গনে। ১৬ই ডিসেম্বর চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলে, ১১ জানুয়ারী, ১৯৭২ সালে সদ্য ভূমিষ্ট অভিজিৎ রায়কে নিয়ে ত্রিশ লক্ষ মানুষের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন অজয় রায়। যোগ দেন কর্মস্থলে। ফিরে আসেন ফুলার রোডের বাসায়। শিক্ষকদের আবাসিক এলাকার স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়ালের ছোট এক বাড়িতে বেড়ে উঠতে থাকেন অভিজিৎ রায়। ছোট বেলার সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অভিজিৎ রায় লিখেছিলেন –

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের এক ছোট্ট বাড়ির নোনাধরা দেওয়াল আর স্যাঁতস্যাঁতে ছাদের নীচে থেকে আমরা সেটাকেই আমরা দু-ভাই তাজমহল ভেবেছি। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসেই ছিলো উদয়ন স্কুল। সেখানে পড়তে গেছি পায়ে হেঁটে। দূরে কোথাও যেতে হলে রিক্সাই ছিলো অবলম্বন। বাড়ির পাশেই বিরাট মাঠে ফুটবল ক্রিকেট খেলে কাটিয়েছি। বাবার কাছে বায়না ছিলো ভাল একটা ক্রিকেট ব্যাট। আমার মনে আছে, প্রথম যখন একটা ভাল ক্রিকেট ব্যাট বাবা নিউমার্কেট থেকে কিনে দিয়েছিলেন, আনন্দে প্রায় কেঁদে ফেলেছিলাম। পরে শুনেছিলাম বাবাও নাকি ছাত্রজীবনে ক্রিকেট খেলতেন। বাবা আমাকে ‘রাজপুত্রে’র মত বড় করতে পারেননি বটে, কিন্তু বাবাই আমাকে যত রাজ্যের বইয়ের জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের শেলফে হাজারো বইয়ের পাশাপাশি ছিলো মুক্তধারার কিশোর – বিজ্ঞানের মজার মজার সমস্ত বই। জাফর ইকবালের ‘মহাকাশে মহাত্রাস’ কিংবা স্বপন কুমার গায়েনের ‘স্বাতীর কীর্তি’ কিংবা ‘বার্নাডের তারা’ এগুলো তার কল্যাণেই পড়া। বাবাই আমাকে হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন সুকুমার রায়ের রচনা সমগ্র। হযবরল – এর বিড়াল, পাগলা দাশু আর হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়রির কথা জেনেছি তার কাছ থেকেই। বাবাই আমার মনে বপন করছিলেন মুক্তবুদ্ধি আর সংশয়ের প্রথম বীজ। বাবাই আমাকে আবৃত্তি করতে শিখিয়েছিলেন রবিঠাকুরের প্রশ্ন কবিতা।

 

( ২ )

মুক্তিযুদ্ধ করে বিদেশী হায়েনাদের কাছ প্রিয় বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছিলো ঠিকই, যদিও আমাদের অনেকের মনে প্রাণে লালিত পাকিস্থানি ভাইরাস ঠিকই রয়ে গেলো। সকল মুসলমান ভাই ভাই, এই বালখিল্য ফালতু কথার অসারতা আমরা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে টের পেয়েছিলাম। আমরা ধর্মীয় সকল কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে একটি বৃহৎ মুসলমান রাষ্ট্র দ্বিখণ্ডিত করে বের হয়ে এসেছিলাম। আমরা যুদ্ধ করেছিলাম মোল্লাদের বিপক্ষে, আল্লাহর আইন দিয়ে জাস্টিফায়েড করা গণিতের মাল মেয়েদের ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে।

কিন্তু সেই গৌরব কি আমরা ধরে রাখতে পেরেছি? পারি নি। ফেব্রুয়ারি, যে মাসটাকে আমি ভাবতাম ঢাকা শহরের সবচেয়ে প্রাণময় মাস, ২০১৫ সালের সেই মাসটির ছাব্বিশ তারিখ রাতে ইসলামিক সেক্যুলার বাংলাদেশে চাপাতি দিয়ে হামলা করে মেরে ফেলা হয় মুক্তমনা প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কে। অভিজিৎ রায় ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ, মানবতাবাদী লিখতেন। তিনি ভালোবেসেছিলেন বিজ্ঞান, ভালোবেসেছিলেন যুক্তি। তিনি লিখেছেন বিজ্ঞান, মুক্তচিন্তা, মানবতাবাদ, সাহিত্যসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। শুধু লেখালিখি করেই থেমে থাকেননি তিনি, একইসাথে বাংলাদেশের মুক্তচিন্তার আন্দোলনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। ভাইরাসের চাপাতির আঘাতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অভিজিৎ রায় বাংলায় লিখেছেন এবং সম্পাদনা করেছেন দশটি বই।

সে’রাতে অভিজিৎ রায়ের সাথে থাকা তার স্ত্রী বন্যা আহমেদকেও কুপিয়ে আহত করা হয়, বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় তার হাতের আঙ্গুল, চাপাতি দিয়ে আঘাত করা হয় তার মাথায় এবং চোখের সামনে ধ্বংস করে দেওয়া হয় তার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। অসহায়ের মতো বন্যা আহমেদ হারিয়ে যেতে দেখলেন তার প্রিয়তমকে আর আমরা দেখলাম আমাদের প্রিয় দাদার মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকা, শুনলাম আমার বোনের আর্ত-চিৎকার, আরও দেখলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের কেচিগেট। কেগেটের ওপারে উপুর হয়ে শুয়ে থাকা আমার ভাই কিছুক্ষন আগেই হাঁটছিলেন আমার বোনের হাত ধরে, হাজারো মানুষকে আপন ভেবে তারা এগিয়ে যাচ্ছিলেন সামনের দিকে, তখনো হয়তো তার মস্তিষ্কের নিউরনে লেখা হচ্ছিলো নতুন কোনো প্রবন্ধ, সমাধান হচ্ছিলো মুক্তমনার কারিগরি কোনো সমস্যা। আমার দাদা কিংবা বোন আমার দেখা শ্রেষ্ঠতম মানুষ তারা নিজেদের বদলে ভালোবেসেছিলেন তাঁদের দেশকে, ভালোবেসেছিলেন দেশের মানুষকে, আলোকিত করতে চেয়েছিলেন অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজটিকে। কিন্তু আলো অন্ধকারের সবচেয়ে বড় শত্রু, কারণ আলো জ্বালালেই দূর হয় অন্ধকার। আলোকে চাপাতি দিয়ে অন্ধকারকে কোপাতে হয় না, গুলি করতে হয় না, ঘিলু ফেলে দিতে হয় না। অন্ধকারে আলো হাতে পথ চলাই ছিলো তাঁদের অপরাধ, আমাদের ক্ষয়ে যাওয়া সমাজে এই অপরাধ সর্বোচ্চ অপরাধ, এমন অপরাধীদের আমরা পেছন থেকে এসে হত্যা করি। কারণ আমরা অন্ধকার চাই। নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা থাকা স্বত্বেো সে রাতে আলো হাতে গিয়েছিলেন আমাদের আঁধারের যাত্রী , কারণ তাঁকে বলা হয়েছিল বিজ্ঞান লেখকদের সাথে আড্ডার কথা। যদিও সেখানে বিজ্ঞান লেখকদের সংখ্যার তুলনায় অনেক অনেক বেশি লিপ্ত ছিল গুপ্ত ঘাতকেরা। যারা তাঁকে ডেকে নিয়ে অন্ধকারে সপে দিয়েছিল, তারা সেদিন তাঁর মৃত্যুতে একটুও আলোড়িত হয়নি, ক্ষুধা পেলে আমাদের যেমন খেতে হয়, তাদেরও সে রাতে ক্ষুধা মেটাতে বিরিয়ানি খেতে হয়েছে, কারও বা খেতে হয়েছে মার হাতের রাতের খাবার কিংবা অংশ নিতে হয়েছে র‍্যাডিসনের পার্টিতে। সব শেষে তারা শান্তির নিদ্রা দিতে পেরেছে, কারও কারও সেই নিদ্রা ভাঙ্গতে লেগেছে বিশ দিন।

 

( ৩ )

স্বাধীন বাংলাদেশের এক অসম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়ে, টুপি পড়ে আইডিয়াল স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেনী পর্যন্ত পড়ালেখা করলাম, সপ্তম শ্রেনীতে চলে গেলাম খাকি চত্বরের খোঁয়াড় ক্যাডেট কলেজে। কলেজ শেষ করে মুসলমান কোটায় কোনো ভর্তি পরীক্ষা না দিয়ে ঢুকে গেলাম ইসলাম প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (আইইউটি) তে। আইইউটি, OIC পরিচালিত বাংলাদেশের অন্যতম ‘আন্তর্জাতিক’ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গল্প শুনেছি তারা প্রত্যের ছাত্রের পেছনে পনেরো হাজার ডলার ব্যয় করে শিক্ষাজীবনের চার বছরের বাজেট হিসেবে। ওআইস্যার সেই ফান্ডিং আমার কপালে জুটে নি, কারণ মুসলমান হলেও ভাল মুসলিম ছাত্র ছিলাম না, বাবা-মার পকেট থেকে মোটা অংকের টিউশন ফি দিয়েই তাই পড়াশোণা করতে হয়েছে।

আইইউটিতে ভর্তি হবার আগেই জানতাম এখানে কেবলমাত্র ‘মানুষ’ (শর্ত প্রযোজ্য) দের ভর্তি হবার সুযোগ দেওয়া হয়। ‘মুসলিম পুরুষ’ হওয়াটাই সেখানে মানুষ হওয়ার একমাত্র শর্ত। আইইউটির দুয়ার নারী এবং অমুসলিমদের জন্য বন্ধ। এই চরম সাম্প্রদায়িক আচরণ আমাকে অবাক করলেও- অন্য সবার কাছে শুনেছি- জ্ঞান- বিজ্ঞান- প্রযুক্তিতে মুসলমানদের অবস্থা সারাবিশ্বেই খুব খারাপ, এখন মুসলমানরা যদি তাদের আত্মিক উন্নতি সাধনের জন্য নিজেরা নিজেরা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে নিজেরা নিজেরা পড়াশোণা করে নিজেদের উন্নতি সাধন করে সেটা নাকি ভালো। নারীদের ঢুকতে না দেওয়ার উছিলাটা ছিলো, তাতে করে বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে শুধু পাপাচার হবে। প্রথম বর্ষেই আমাদের তৎকালীন তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের প্রধান পাকিস্থানি অধ্যাপক বলেছিলেন ঠিক এই কথাটাই। রুমের ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেও তার যুক্তি – ইসলাম ধর্মে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে যাবার পর ভাই আর বোনেরও এক রুমে থাকা নিষিদ্ধ। ইন্টারনেটও ঠিক তেমন একটি প্রাপ্ত বয়স্ক আপন বোন, রুমে তাকে আমাদের সাথে একা রাখা যাবে না।

২০০৭ সাল। দ্বিতীয় বর্ষের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা শেষে দীর্ঘ তিনমাসের ছুটি চলছে, আমার বাসায় থাকতে ভালো লাগতো না, তাই ছুটির সময়েও হলে থাকতাম। সপ্তাহান্তে ছোট ভাই জান্নাকে দেখতে খুব ইচ্ছা হতো। ও তখন ক্লাস টু এর পুচকা এবং প্রতি সপ্তাহের শুক্রবারে আমাকে দেখতে পেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেতো কারণ আমাকে বললেই আমি চকলেট, আইসক্রিম আর কোক খাওয়াতাম। গাজীপুর থেকে জ্যাম ঠেলে ঢাকা আসতে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। সেই সময় আমার প্রথম পরিচয় হয় ‘অভিজিৎ রায়’ এর লেখার সাথে। প্রিয় বন্ধু ‘শিক্ষানবিস’ আজিজ মার্কেট থেকে দুইটা বই কিনে এনেছিলও। ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ এবং ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’। শিক্ষানবিস ময়মনসিংহের এক লাইব্রেরিতে আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রীর সামান্য অংশ পড়ে অভিজিৎ রায়ের লেখনীর উপর বেশ মুগ্ধ হয়েছিলো, তাই আজিজ থেকে ‘আস্ত’ দু’টি বই কিনে আনা। পরের সপ্তাহান্তে জান্নাকে দেখার জন্য ‘আলো হাতে আঁধারের যাত্রী’কে সঙ্গী করে জ্যাম হাতে বাস যাত্রী হলাম। সেই থেকে শুরু। অভিজিৎ রায়ের আলোয় কাল্পনিক সত্ত্বার দাসত্ব থেকে মুক্ত জীবন।

আমাদের সমাজ সদ্যজন্মজাত শিশুর ইহলৌকিক খেলার মাঠের মৌলিক চাহিদা পূরণে খুব একটা আগ্রহী না হলেও তার পরকাল নিশ্চিত করতে সিদ্ধহস্ত। জন্মগ্রহণ করতে না করতেই সে একটি নির্দিষ্ট ধর্মযুক্ত হয়ে যায়, তারপর ধিরে ধীরে তাকে শেখানো হয় সে যে দলভুক্ত তারাই সেরা, একমাত্র সত্যপথের অনুসারী। অন্যান্যদের জন্য রয়েছে … (কি রয়েছে সেটা দিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করুন)। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ছোটবেলা থেকেই আশেপাশের সবার কাছে আমার ধর্মের মুজেজা শুনেছি, আর ভেবেছি “ওয়াও!!”। আমার বন্ধু বান্ধব কেউ অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী ছিলো কিনা এখন মনে নেই থাকলেও তার সাথে ধর্ম সংক্রান্ত ব্যাপারে, আমরা কথা হয়নি নিশ্চিত। হলে তখনই জানতে পারতাম, নিজ ধর্মকে অন্যদের চেয়ে সেরা প্রতিয়মান করার জন্য প্রত্যেক ধর্মই নানা ধরণের আকর্ষণীয় মুজেজা সংক্রান্ত গল্পের আশ্রয় নেয়। এই সহজ সত্যটা বোধহয় পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই না জেনে ইন্তেকাল করেন।

আমিও হয়তো সে পথেই যাচ্ছিলাম। ক্যাডেট কলেজে কোনো এক শুক্রবার আমাদের মসজিদের ঈমাম আবেগঘন ওয়াজ করতে করতে এক গল্প শোণালেন। সে গল্পে ঈশ্বরের অসীম কুদরতে বিখ্যাত কোনো ব্যক্তির পাতে থাকা ভাজা মাছ হঠাত করে জ্যান্ত হয়ে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে ছুটে চলে গভীর জলে, ঠিক যেন অলিম্পিক সাঁতারু মাইকেল ফেল্প’স মত। পারিবারিক কারণে আমি সেই সময় সাচ্চা ধার্মিক ছিলাম। ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হতে পারলে “মান’ত” করেছিলাম সেখানে ছয় বছর এক ওয়াক্ত নামাজ বাদ দেবো না। সেটা সবসময় সম্ভবপর না হলেও সম্ভব করার জন্য যথসাধ্য চেষ্টা ছিলো। কোনো ভ্যাজালে পড়লে আর রহমান সুরা এগারো বার পড়ে ঈশ্বরের নিকট ঝামেলা মুক্তির আবেদন করতাম এ আশায় যে এগারো বার সূরা রহমান পড়লে যেকোনো ধরণের ঝামেলা থেকে প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টা একেবারেই অব্যর্থ। এছাড়া পাশের বাড়ির কোনো মেয়েকে ভালো লাগলেও আর রহমান এবং সূরা ইয়াসিনের আশ্রয় নিতাম কারণ সুরাগুলো যথাক্রমে এগারোবার ও তিন বার পড়লে মনোবাসনা পূরণ হতে বাধ্য। সুতরাং নিষ্ঠাবান ধার্মিক ছিলাম বলাই বাহুল্য। সেই আমিও হুজুরের বয়ানের পর বেঁকে বসলাম। মনে মনে ভাবলাম যদি সত্যিকার অর্থেই এখন ঘটনা কোরান হাদিসে থেকে থাকে আমি তবুও ভাজা মাছের অভাজা হয়ে যাওয়া বিশ্বাস করতে পারবোনা। ধন্যবাদ।

কিন্তু তাতে করে কোনো কিছুই বদলায় না। কোরান মহাসত্য গ্রন্থ এবং আল্লাহ এক এবং তিনি শুধু আমাদের দলে। এমন করে কেটে যেতে থাকা সময়ে একদিন কাঁটাবন মসজিদের লাইব্রেরীতে দুর্দান্ত এই বইয়ের সন্ধান পেলাম। ইসলাম এবং বিজ্ঞান বিষয়ে আহমদ দিদাত এর লেখা। সে বইয়ে “মিরাকল নাইন্টিন” নিয়ে একটি অধ্যায় ছিলো – যা পড়ে আল্লাহ এবং বিশেষ করে কোরান যে অলৌকিক গল্প সে ব্যাপারে একেবারে নিঃসংশয় হয়ে গেলাম। “রাস্তা ঠিকাছে, এখন শুধু ঠিক ঠাক ড্রাইভ করে বেহেশতে পৌছতে হবে, তারপরইইইই…”। তখন বাংলাউইকিপিডিয়াতে সময় পেলেই নতুন নতুন নিবন্ধ তৈরি করি। বইটা পড়ার পর কোরানের সাংখ্যিক মাহাত্ম্য নিয়ে একটা নিবন্ধ খুলে ফেললাম। এই নিবন্ধই পরবর্তীতে জীবন বদলে দিয়েছিলো, কিভাবে সেটাতেই আসছি।

সচলায়তনে অভিজিৎ দা বিজ্ঞানময় কিতাব নামে এক পোস্ট দিলেন। ধর্মসংক্রান্ত অনেক বিষয়েই আমার সংশয় ছিলো, ছিলো সেই সংশয় মনের এক কোণে ফেলে রেখে স্বাভাবিক জীবন যাপনের চেষ্টাও। ধর্ম পালন না করলেও সমাজের অন্ধকার শিক্ষায় তখনও মানতাম ইসলাম একমাত্র ধর্ম, মানতাম আল্লাহ বলে আসলেই একজন আছে, মানতাম তিনি বই লিখে সেটা গোপনে একজনের কানে কানে বলে বিশ্বমানবতাকে পথ দেখান। কিন্তু অভিদার “বিজ্ঞানময় কিতাব” লেখাটা পড়ে সেদিন সবকিছু তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়লো। অনুভব করলাম এতোদিন যা জানতাম সব মিথ্যা, যে গ্রন্থকে বিজ্ঞানময় ভাবতাম সেটা মোটেও বিজ্ঞানময় নন, বিজ্ঞানময়তার উদাহরণগুলো বক্তদের বানানো মিথ্যা কথা। এভাবে শুধু মিথ্যা বলে একটা গ্রন্থকে এভাবে অলৌকিক করে ফেলা সম্ভব বুঝতে পারলাম। অবশ্য বিজ্ঞানময় কিতাব সে লেখাতে অভিদা মিরাকল নাইন্টিনের উল্লেখ করেননি। বুঝে গেলাম এটাও মিথ্যা দাবীই হবে। ইন্টারনেটে খুঁজলাম, অভিদার কাছে জানতে চাইলাম এবং দেখলাম আসলেই তাই। সেই থেকে শুরু আমার ধর্ম সংক্রান্ত স্কেপটিক ইনকোয়ারি। যত গভীরে যেতে থাকলাম, যতো পড়তে থাকলাম, ততো দেখলাম শৈশব থেকে লালন করা সংস্কারগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে যাচ্ছে। হাজার বছর ধরে চলা ধর্মীয় ভন্ডামি আর মিথ্যাচারের মুখোশ ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকলো আমার কাছে।

‘শিক্ষানবিস’ তখন বিজ্ঞান এবং মাঝে মাঝে ধর্ম-বিজ্ঞান, সংশয়বাদ নিয়ে লিখতো। আমি সেগুলো পড়তাম, আর পড়তাম মুক্তমনার বিশাল আর্কাইভ। নিজেও তখন একটু একটু ব্লগিং শুরু করেছি যদিও সেটা নিতান্ত; ভাত খেয়ে যাচ্ছি, খেয়ে এসে ঘুমাবো টাইপের কথা বার্তা। কিন্তু হঠাত একদিন মনে হল, একটা পাপ মোচন করা দরকার। উইকিতে মিরাকল নাইন্টিন নিবন্ধের পাপ মোচন। চিন্তা পর্যন্তই।

এরপর হঠাত একদিন ক্যাডেট কলেজ ব্লগে মিরাকল নাইন্টিন নিয়ে পোস্ট আসলো। সেখানে বর্ণনা করা হয়েছে কোরানের সব কিছুতে আছে মহান উনিশ। আল্লাহর অস্তিত্বের বাস্তব প্রমাণ একেবারে। আমি গা ঝাড়া দিয়ে বসলাম। মিরাকল নাইন্টিনের ভন্ডামি তুলে ধরে  একটা ব্লগ লিখলাম। এই লেখা যেহেতু আমার পাপ মোচন লেখা ছিল তাই এসব বিষয় নিয়ে পুনরায় আর লেখার আগ্রহ ছিল না। কয়েক মাস পরে, অভিদা আমাকে একটা মেইল দিলেন, মেইলের বিষয়বস্তু উনি নেট খুঁজে আমার মিরাকল নাইন্টিন লেখাটা পড়েছেন, আমি যেন মুক্তমনায় নিবন্ধন করে লেখাটা সেখানেও রাখি।

আরেকবার মুগ্ধ হবার পালা। কারণ তখন অভিদা, বন্যাপাকে মুক্তমনায় যাওয়া আসার সুবাদে চিনেছি ঠিকই কিন্তু এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন আমার কাছে বিশাল উচ্চতার একজন মানুষ। সেই অভিদা আমাকে মেইল করেছেন। তারপর থেকেই মুক্তমনায় নিবন্ধন করে ধীরে ধীরে অতি আঁতেল সম্প্রদায়ের লেখা বিভিন্ন ব্লগে ভয়ে মন্তব্য করা শুরু করি।

২০০৯ এর ডিসেম্বরের দিকে অভিদা আর বন্যাপা ঢাকায় এসেছিলেন। অভিদা আগে থেকেই বলেছিলেন আগমনের খবর। উনারা ঢাকা আসা মাত্রই ছুটে গেলাম বন্ধু শিক্ষানবিস সহ। সুটকেস ভর্তি বই এবং চকলেট নিয়ে এসেছিলেন বন্যাপা আর অভিদা। আমরা নিজেদের বই ভাগাভাগি করে, সে বইয়ের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে আর চকলেট খেতে খেতে বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনে তরুণদের ভূমিকা এবং করণীয় নামক বিষয় নিয়ে বিশাল জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেছিলাম। একেবারে শেষ মুহূর্তে অভিদা ভিক্টর স্টেংগরের “নিউ এইথিজম” বইটা কোন চিপা থেকে বের করে শিক্ষানবিস এর হাতে দিয়ে বললেন, বইটা পড়তে। অনেক কিছু জানা যাবে।

শিক্ষানবিস এর আগে সে বই আমি কব্জা করে পড়া শুরু করলাম। “অনেক কিছু জানার জন্য” না বরঞ্চ বইয়ের শুরুতে INGERSLL’S VOW নামে ইঙ্গারসল সাহেবের একটি বক্তৃতার কিয়দংশ পড়ে মুগ্ধ হবার কারণে। তারপর পুরো বইটা অল্প দিনের কাছে মুখস্ত করে ফেলি। নাস্তিকতা নিয়ে বাজারে অনেক বই পাওয়া যায় কিন্তু নিউ এইথিজমের বিশেষত্ব ছিল মূলতঃ এর রেফারেন্স কালেকশন। বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে বিবর্তন, জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম, ঈশ্বর হাইপোথিসিস সহ বিভিন্ন বিষয়ে বর্তমান সময়ে নাস্তিকতার পুরো বিষয়টাই ফুটে উঠেছিল। সবকিছু ছুঁয়ে যাওয়া বইটা পড়ে এসব বিষয়ে আগ্রহবোধ করলাম, এবং রেফারেন্স উল্লেখ থাকা বইগুলো নামিয়ে পড়া শুরু করলাম। বাংলাদেশ থেকে ফিরে গিয়ে প্রায় এক বছর পর অভিদা চিঠি দিয়ে বললেন – অবিশ্বাসের দর্শন নিয়ে একটা বই আমরা দুইজন মিলে লিখতে পারি কিনা। অভিদার সাথে লেখালিখির সূচনা হল আমার। ২০১১ সালে শুদ্ধস্বর থেকে প্রকাশিত হয় ‘অবিশ্বাসের দর্শন’। বইটি সম্পাদনা কাকে দিয়ে করানো যায় সেটা ঠিক করতে আমার কিংবা অভিদার এক মুহূর্তও চিন্তা করতে হয় নি। ছিলেন অকালে হারিয়ে ফেলা অনন্ত বিজয় দাশ। ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ বইটি সম্পর্কে অনন্ত দা ফ্ল্যাপে লিখেছিলেন, ‘আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বশেষ তত্ত্ব-উপাত্তের উপর ভিত্তি করে লেখা অবিশ্বাসের দর্শন বইটি বাংলাভাষী ঈশ্বরবিশ্বাসী থেকে শুরু করে সংশয়বাদী, অজ্ঞেয়বাদী, নিরীশ্বরবাদী কিংবা মানবতাবাদী এবং সর্বোপরি বিজ্ঞানমনস্ক সবার মনের খোরাক জোগাবে। ধর্মান্ধতা এবং কুসংস্কার মুক্তির আন্দোলনের মাধ্যমে আগামী দিনের জাত-প্রথা-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেনীবৈষম্যমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখা আমরা, এই মহাবিশ্ব তৈরি বা চালানোর, এর শেষই বা কোথায়, এই অনন্ত মহাবিশ্বের সূচনা হল কিভাবে, তিনি কি আমাদের প্রার্থনা শোনেন এ প্রশ্নগুলো শতাব্দী? পেছনে কি আছেন কোনো অপার্থিব সত্ত্বা-প্রাচীন চিরচেনা প্রশ্ন। প্রশ্নগুলো নতুন নয়। নানা ধরণের উত্তর সমৃদ্ধ বইও বাংলা ভাষায় কম লেখা হয়নি। তবে এধরনের অধিকাংশ প্রচলিত বইয়ে যুক্তির চেয়ে স্থান পেয়েছে অন্ধবিশ্বাস, বিজ্ঞানের বদলে স্থান পেয়েছে কূপমুন্ডুকতা। অবিশ্বাসের দর্শন বইটিতে চিরায়ত গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে আমরা বরং প্রশ্ন করেছি, পাঠকদেরও অনুরোধ করেছি ‘ক্ষতবিক্ষত হতে প্রশ্নের পাথরে’। সেই সাথে নির্মোহভাবে উপস্থাপন করেছিলাম এই অন্তিম প্রশ্নগুলোর রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক অর্জনগুলো। এই চিরচেনা প্রশ্নগুলোর উত্তর সন্ধানে বিজ্ঞানের অর্জন স্থান পাওয়ায় তা চুয়াডাঙ্গা থেকে সূদুর আইসল্যান্ড প্রবাসী বাংলাভাষী বহু বিজ্ঞানমনস্ক পাঠকের মনে আলোড়ন জাগিয়েছে। বইটি প্রকাশের পর থেকে অসংখ্য মানুষ ফোন, ইমেইল, ব্লগ, ফেসবুক, টুইটারে তাদের মতামত জানিয়েছেন। বিজ্ঞান, মুক্তচিন্তা, সংশয়বাদ এবং যুক্তিবাদ নিয়ে বাংলায় প্রকাশিত যে সমস্ত বই বাজারে আছে, তার মধ্যেও অগ্রগণ্য বই হিসেবে পাঠকেরা অবিশ্বাসের দর্শনকে স্থান দিয়েছেন। ২০১২ সালে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তারপর দীর্ঘ বিরতি। ২০১৩ সালেই সব কপি শেষ হয়ে গেল দ্বিতীয় সংস্করণের। ২০১৪ সালে অভিদার সাথে মিলে বইটি আবার ঠিকঠাক করে দেওয়া হল জাগৃতিকে তৃতীয় প্রকাশের জন্য, ২০১৫ এর ফেব্রুয়ারী বইমেলায়। জানুয়ারীতে ছাপা হয়ে যাবার খবর পেয়ে অভিজিৎ দা লিখলেন –

নববর্ষের প্রথম দিনেই প্রকাশকের কাছ থেকে একটি আনন্দের সংবাদ পেলাম। অবিশ্বাসের দর্শন বইটির তৃতীয় সংস্করণ আসছে। ছাপা শেষ, প্রচ্ছদও হয়ে গেছে।
বিভিন্ন কারণেই ২০১৪ সালটি ছিল এক বিভীষীকাময় বছর। ২০১৫ সালের শুরুটা অন্ততঃ একটা আনন্দের বার্তা দিয়ে শুরু হল, এটাই বা কম কি!
“মুক্তি আসুক যুক্তির পথ ধরে! জীবন হোক বিশ্বাসের ভাইরাস মুক্ত”।
সবাইকে নববর্ষের শূভেচ্ছা।

( ৪ )

২০০৫ সালে ‘আলো হাতে আঁধারের যাত্রী’ আর ২০০৭ সালে ফরিদ আহমেদ’এর সাথে মিলে লেখা ‘মহাবিশ্বে প্রান ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’ এই দুটো বই পড়ে প্রথম জানতে পেরেছিলাম বিজ্ঞানের বদলে স্থান পেয়েছে অভিজিৎ রায় সম্পর্কে। ২০০৯ সালে অভিজিৎ দা ঢাকায় এসে ‘সমকামিতা’ বইটির জন্য বেশ কিছু সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। পরের বছর শুদ্ধস্বর বইটি প্রকাশ করে। সচলায়তনের কল্যাণে টুটুল ভাইয়ের সাথে আমার আগেই পরিচয় ছিল। অভিদাকেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম তার বইগুলো প্রকাশে টুটুল ভাইয়ের আগ্রহ দেখে। সমকামিতার পরে অবিশ্বাসের দর্শন, বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের আলোকে লেখা অভিদার ‘ভালোবাসা করে কয়’ ২০১২ সালে। সেবার অভিদা ঢাকায় এসেছিলেন লেখক হিসেবে প্রথমবারের মত বইমেলা পালন করতে, একা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করি। অভি’দা যতদিন ছিলেন, প্রতিদিন দেখা হতো, কথা হতো, বইমেলায় ঘোরাঘুরি, আড্ডা, খাওয়াদাওয়া, রাতের বেলা কার্জন হলের পুকুর পাড়ে বিশ্রাম নেওয়া, বাইকে করে অভিদাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া। বইমেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে অভিদা লিখেছিলেন-

বইমেলার সাথে এই আত্মার সম্পর্কটায় ছেদ পড়ল আমি যখন সিঙ্গাপুরে চলে গেলাম। ১৯৯৮ সালের শেষ দিকে। এরপর সিঙ্গাপুরের পাঠ চুকিয়ে আমেরিকায়। বিদেশ বিভূঁইয়ে থাকাকালীন সময়ে বহুবারই আমার দেশে যাওয়া পড়েছে, কিন্তু কখনোই বইমেলার মাসটিতে নয়। ফেব্রুয়ারীর সময়টাতেই কোত্থেকে যেন ঘাড়ের উপর এসে ভর করে যত রাজ্যের ঝুট ঝামেলা। অফিসে কাজ করলেও মন পড়ে থাকে সেই বইমেলায়, সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলা একাডেমীর বইমেলায়। দেখি সারা মাস জুড়ে পোলাপান কত মজা মারে, রায়হান আবীরের মত জনপ্রিয় লেখকরা দাঁত কেলিয়ে অটোগ্রাফ বিলায়, লিটন ম্যাগ চত্বরে আড্ডা মারে, পোজ দিয়ে ছবি তুলে, সেগুলো আবার আপলোড করে ফেসবুক কিংবা বাংলা ব্লগে। আর আমি উদাস নয়নে সেই ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি।

এই বছর হঠাত করেই ঠিক করে ফেললাম মরি বাঁচি – মেলায় যাচ্ছি। গেলাম। প্রায় ২২ ঘণ্টার উড়াল যাত্রার ক্লান্তি নিয়ে দেশে নামলাম ফেব্রুয়ারীর ১২ তারিখ। মহাখালী ফার্মগেটের জ্যাম ট্যাম টপকে বাসায় পৌঁছুতে পৌঁছুতে একেবারে দুপুর। আর বিকেলের মধ্যেই সব ক্লান্তি ফান্তি ভুলে বইমেলায়। তারপর থেকেই প্রতিদিনই বহু মানুষের সাথে দেখা হচ্ছে। অনেক মুক্তমনা বন্ধু যাদের কেবল ইন্টানেটের মাধ্যমেই চিনতাম, তাদের সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্য হল। এই সৌভাগ্যের ব্যাপারটা গত কয়েকদিন ধরেই হচ্ছে। রায়হানের সাথে তো আগে থেকেই চেনা-জানা-পরিচয়-দেখা হয়েছিলো, তাই তারে বেশি পুছি নাই। কিন্তু আমি না পুঁছলেও এই ছেলেটা আমারে তার বাইকে করে প্রতিদিন বাসায় পৌঁছিয়ে দেবার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। বিকেল পাঁচটা বাজলেই রায়হানের ফোনঃ

-‘অভিদা, আপনে কই’?

-‘আমি মেলায়’।

-‘উক্কে আমি আসতেছি’। আবার যাওয়ার হইলেও সেই একই ব্যাপার।

-‘আপনে কই’?

-‘আমি লিটন ম্যাগ চত্বরের সামনে’।

-‘উক্কে আমি আসতেছি বাইক নিয়া। আপনে থাইকেন’।

২০১৫ এ বন্যাপাকে সাথে নিয়ে আসবেন বলে গিয়েছিলেন অভিদা। আসলেন তিনি। এবার বই মেলায় তাঁর নতুন দুইটা বই, ‘শুন্য থেকে মহাবিশ্ব’ আর ‘ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো’ প্রকাশিত হল। এরসাথে যুক্ত হল, ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ এর জাগৃতি সংস্করণ এবং ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’এর দ্বিতীয় সংস্করণ। প্রয়াত গণিতবিদ মিজান রহমানের সাথে লেখা ‘শুন্য থেকে মহাবিশ্ব’ প্রকাশিত হয় শুদ্ধস্বর থেকে, অকাম্পো প্রকাশ করে অবসর। শুন্য থেকে মহাবিশ্ব বইটার সম্পাদনায় জড়িত ছিলাম। বইয়ের সম্পর্কে মন্তব্য জানাতে বলেছিলেন অভিদা। পাঠিয়েছিলাম তাঁকে। আরও কয়েকজনের মতামতের সাথে আমার মন্তব্যটাও বইয়ে যুক্ত করেছিলেন অভিদা – মীজান রহমান এবং অভিজিৎ রায় লিখিত শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ বইটি গণিতের শূন্যের মূর্ছনায় ঘোড়ায় চড়িয়ে পাঠককে নিয়ে যাবে শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে বর্তমানের কালের সেরা বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিকতম ধারণার এক বৈজ্ঞানিক সঙ্গীতানুষ্ঠানে। সৃষ্টির সূচনা, ধর্ম এবং বিজ্ঞান থেকে পাওয়া ফলাফল থেকে আমরা আজ বুঝতে পারছি মহাপ্রাক্রমশামী কোন সত্ত্বার হাতে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়নি। মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটেছে স্রেফ শূন্য থেকে, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভাবে। সভ্যতার এ পর্যায়ে এসে বিজ্ঞান তার সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে। বাংলাভাষী বিজ্ঞান ও দর্শনে কৌতূহলী পাঠকের অবশ্য পাঠ্য তাই এই বইটি।

২০১৪ সালে জাগৃতি প্রকাশনী থেকে ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ বইটি প্রকাশিত হবার পর থেকেই মৌলবাদী অপশক্তিরা অভিজিৎ রায়কে রুটিন করে হত্যা করার হুমকি দিতে থাকে। প্রতিদিন একজন করে মানুষকে ‘নাস্তিক’ প্রমাণ শেষে তাকে হত্যা করার আহ্বান জানিয়ে ফারাবী নামক এক বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের মত দেখতে দু’পেয়ে ততদিনে বাংলাদেশের সামাজিক নেটওয়ার্কে পরিচিত মুখ। নিজেকে কখনো নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘হিজবুত তাহরির’, কখনো ‘শিবিরের’ অনুসারী বলে প্রচার করা ফারাবীর ব্লগে আগমন ঘটেছিল মূলতঃ সহব্লগার মেয়েদের বিরক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে। তার প্রথম পোস্টও ছিল অজানা অচেনা মেয়েদের ‘বিয়ে করার অনুরোধ জানিয়ে’। বিভিন্ন ভুয়া আইডি খুলে ফেসবুক এবং ব্লগে মেয়েদের অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়াই ছিল তার প্রধান কাজ। ফেসবুকে আপনারা যারা নিয়মিত, তারা খেয়াল করে দেখবেন, বাংলাভাষায় ফেসবুকে যেসব নারী বিদ্বেষী, অশ্লীল, যৌন সুরসুড়ির পাতা রয়েছে তাদের মধ্যে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। এরা ইন্টারনেট থেকে নারীদের বিভিন্ন ছবি সংগ্রহ করে তাদের অনুসারীদের সামনে উপস্থাপন করে এবং একই সঙ্গে আরও একটা বিষয়ে তারা সমান কম্পাঙ্কে পোস্ট করে।

কই সেই বিষয়টা? ধর্ম। যেহেতু বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম ইসলাম, তাই এই অশ্লীল পাতাগুলোর কাছেও ধর্ম বলতে কেবল ইসলাম। ফারাবী যেন এই মানুষগুলোরই প্রতিনিধি। যার একমাত্র কাজ ছিল নারীদের উত্যক্ত করা এবং ইসলাম ধর্ম নিয়ে পোস্ট দেওয়া। মৌলবাদীদের চাপাতির আঘাতে নিজ বাসার সামনে খুন হওয়া আমাদের রাজীব হায়দারের জানাজার ইমামকে হত্যা করার হুমকি দিয়ে গ্রেফতার হয় ফারাবী। জামিনে বের হয়ে আসার পর থেকে নিজেকে শোধরানো তো দূরের কথা, উল্টো ব্যাপক উদ্যমে সে ইসলাম ধর্মকে নিজের মতো ব্যাখ্যা করে সন্ত্রাস কায়েমের আহ্বান জানানো শুরু করে। সিলেট থেকে প্রকাশিত ‘যুক্তি’ পত্রিকার সম্পাদক, মান্নান রাহী নামক ফারামীর এক ঘনিষ্ঠ সহচরের হাতে সিলেটে বাসার সামনে নিহত অনন্ত বিজয় দাশ মুক্তমনায় তার ‘ফারাবীর ফাতরামি’ লেখায় এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন –

এরপর ফারাবী আবির্ভূত হয় ইসলামের খেদমতগার হিসেবে। হেফাজতকারী হিসেবে। আমাদের এখানে একটা কথা প্রচলিত আছে, এরশাদ যদি আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির রক্ষক হয় তবে এই রাজনীতিকে ধর্ষণ করার জন্য বাহির থেকে কোন শত্রু আসার প্রয়োজন নেই, তেমন ফারাবীর মত লুইচ্চা যদি হয়ে যায় ইসলামের খেদমতগার, তবে ইসলামের মুখে চুনকালি মাখাতে কোনো ইসলামবিরোধী, ইসলামবিদ্বেষীর প্রয়োজন নাই।

ইমামকে হত্যার হুমকির অভিযোগে ফারাবীকে আটক করা হলেও সে অস্থায়ী জামিনে জেলহাজত থেকে বের হয়ে আরও বেশি উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ফেসবুকের অসংখ্য ভুয়া আইডি নিয়ে। আল্লাহ ও রসূলকে আর ভাষায় – যারা অপমান করে, তাদের হত্যা করা যায়েজ। এই ফতোয়া দিয়ে সে একের পর এক শুভবুদ্ধির লেখক, ব্লগার, অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের হত্যার হুমকি প্রদান শুরু করে।

ফারাবীর ভাষ্যমতে –

ইসলাম অর্থ শান্তি নয়, ইসলাম অর্থ হল আত্মসমর্পণ। ইসলামের ভিতরে জিহাদ, কিতাল সবই আছে। আল্লাহ-রসূলকে যারা ঠান্ডা মাথায় গালিগালাজ করবে আমরা তাদেরকে হত্যা করব এতে লুকোচুরির কিছু নাই।

২০১৪ সালে ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ বইটি প্রকাশিত হবার পর থেকেই মৌলবাদী অপশক্তিরা অভিজিৎ রায়কে রুটিন করে হত্যা করার হুমকি দিতে থাকে। উনি দেশের বাইরে থাকেন বিধায়, ফারাবী নামক বিকৃত মস্তিষ্কের অমানুষ তার বই বিক্রির দায়ে বাংলাদেশের অনলাইন বই কেনার সাইট ‘রকমারি ডটকম’ – এর অফিসের ঠিকানা প্রদান করে পোস্ট দেয়। বাংলাদেশে নাস্তিকতা ছড়ানোর অপরাধে সে তার অনুসারীদের রকমারির অফিস আক্রমণের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে স্বত্বাধিকারীর প্রোফাইল উল্লেখ করে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

এরপর বাংলাদেশের শুভবুদ্ধির সব মানুষকে অবাক করে দিয়ে রকমারির স্বত্বাধিকারী মাহমুদুল হাসান সোহাগ তার স্ট্যাটাসে অভিজিৎ রায়সহ অন্যান্য লেখকদের বিজ্ঞান ও মুক্তচিন্তার বই বিক্রি করার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। কিন্তু তারপরও ফারাবী সন্তুষ্ট না হওয়ায় রকমারি ডটকম তার দেওয়া লিস্ট ধরে নিমেষেই সকল বই তাদের ওয়েবসাইট থেকে প্রত্যাহার করে বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয়।

ব্যক্তিগত সম্পর্ক ধরে এই ঘটনার সময় থেকেই আমি রকমারি ডটকমের সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করি, ফারাবীর ভয়ে ভীত হওয়ার বদলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। আমাদের সবার অনুরোধ উপেক্ষা করে ওরা মৌলবাদী তোষণকেই তাদের নীতি হিসেবে গ্রহণ করে এবং বিজ্ঞান, যুক্তিবাদী এবং প্রগতিশীল’দের লেখা বইগুলোকে ‘নাস্তিক’দের বই আখ্যায়িত করে সেগুলো বিক্রি চিরতরে বন্ধ করে দেয়।

অবশ্য বন্ধ করার আগে নিজেদের মেরুদন্ডহীনতা ঢাকতে তারা জানিয়ে দেয়, ফারাবীর হুমকির আগে থেকেই তারা এ ধরণের বই সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল এবং সে উদ্যোগের কারণেই এখন বইগুলো চিরতরে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অপকর্মের হোতা ফারাবীর বিরুদ্ধে কোনো ধরণের আইনি ব্যবস্থা তারা গ্রহণ করেনি।

মৌলবাদীদের হত্যার পরোয়ানা স্বত্বেও প্রিয় বাংলাদেশে এসেছিলেন অভিজিৎ রায়। এসেছিলেন অসুস্থ মা’কে দেখতে, অসুস্থ বাবাকে দেখতে, বইমেলা প্রকাশিত নতুন নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকতে, বাংলাদেশের বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে। তিনি এসেছিলেন আমাদের অতিথি হয়ে। তিনি জানতেন না তাঁর প্রিয় বাংলাদেশ কতখানি বদলে গেছে। ২৩ তারিখ রাতে অভি’দাকে মনে করিয়ে দিলাম, হুমকিগুলোকে হালকা ভাবে না দেখতে। উনি হেঁসে উড়িয়ে দিলেন। ‘আমি লেখক মানুষ, আমাকে কেন মারবে’?

ফেব্রুয়ারির ছাব্বিশ তারিখ রাত আটটা তেইশ মিনিটে অভিদার কাছ থেকে শেষ এসএমএস’টা আসে আমার ফোনে। ‘রায়হান, তুমি কই’? আমি আর সামিয়া তখন বাসার বাইরে, বইমেলা থেকে অনেক দূরে, পরের দিন বন্যা’পা বলছিলেন, মুক্তমনা ব্লগের যারা দেশে আছে তাদেরকে কোথাও একত্র করতে, তিনি সবাইকে খাওয়াতে চান। আমরা তখন একটা নতুন বাসায় উঠেছি, পাঁচতলার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেই আধখানা ছাদ, আর আধখানা বাসা। ইচ্ছে ছিল আমরা আট-দশ জন মিলে সারাদিন আড্ডাবাজিতে কাটাবো, বন্যা’পার সাথে মিলে অভি’দাকে পচাবো, তারপর অভিদার সাথে মিলে বন্যা’পাকে, ক্ষুধা পেলে পেট সাটিয়ে অভি’দার প্রিয় বিরিয়ানি। ফেব্রুয়ারির ২৪ তারিখে আমি আর সামিয়া প্রথম জানতে পারি আমাদের মাতা-পিতা হবার সম্ভাবনার কথা। খবরটা শুনে আমি সামিয়াকে বুকে চেপে ধরে রেখেছিলাম অনেক্ষন এবং আমরা দুইজনেই একই সাথে ঠিক করি, বাবা-মা-ভাই-বোনদের পর পরবর্তী পরিবারের সদস্য হিসেবে জানাবো বন্যা’পা আর অভি’দাকে, ফেব্রুয়ারির সাতাশ তারিখে। পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও ছাব্বিশ তারিখের পরের সেই দিনটা আমার জীবনে আর আসে নি। না ঘটা সেই দিনটা নিয়ে আমি আজও ভাবি, চোখের সামনে নানা ভাবে চিত্রায়িত হয় দিনটির প্রতিটি ক্ষণ।

দেশ ছাড়ার আগে আমার ‘মানুষিকতা’ বইটার রিভিউ করেছিলেন অভিজিৎ দা। বইটাতে আমি অভি’দার কাছ থেকে পড়া ইঙ্গারসলের সেই অমর প্রতিজ্ঞাটার অনুবাদ করেছিলাম। অভি’দা খুব খুব পছন্দ করেছিলেন অনুবাদটা। আজকের এই লেখার শেষটাও সেই প্রতিজ্ঞা দিয়েই হোক।

যেদিন নিশ্চিতভাবে বুঝে গেলাম আমার চারপাশের সব কিছুই প্রাকৃতিক, সকল দেবতা, অপদেবতা কিংবা ঈশ্বর মানুষের সৃষ্ট পৌরাণিক চরিত্র ব্যতীত কিছুই নন, সেদিন সত্যিকারের স্বাধীনতার তীব্র আনন্দে মাতোয়ারা হয়েছিল আমার মন, শরীরের প্রতিটি কণা, রক্তবিন্দু, ঈন্দ্রিয়। আমাকে সীমাবদ্ধ করে রাখা চার দেয়াল টুকরো টুকরো হয়ে মিশে গেল ধুলোয়, আলোর স্রোতে আলোকিত হয়ে গেল আমার অন্ধকূপের প্রতিটি কোণ। সেদিন থেকে আমি কারও চাকর, সেবক বা বান্দা নই। এই পৃথিবীতে আমার কোন মনিব নেই, আমার কোন মনিব নেই এই সীমাহীন মহাবিশ্বেও। আমি স্বাধীন, মুক্ত – চিন্তা করতে, চিন্তারাজি প্রকাশে, আদর্শ নির্ধারণে, ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গী করে নিজের মতো বাঁচতে।

আমি স্বাধীন আমার মানসিক এবং শারীরিক ক্ষমতা ব্যবহারে, প্রতিটি ইন্দ্রিয় দিয়ে কল্পনার ডানা মেলে উড়ে যেতে, নিজের মতো স্বপ্ন দেখতে, আশা করতে।

আমি স্বাধীন – নিজের মতো ভাবতে।

আমি স্বাধীন – নির্দয়, উগ্র ধর্মকে অস্বীকার করতে।

আমি স্বাধীন – অসভ্য, মূর্খের ‘অলৌকিক’ গ্রন্থসমূহ এবং এগুলোকে পুঁজি করে ঘটা অসংখ্য নিষ্ঠুরতাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে।

আমি স্বাধীন অসংখ্য মহাজাগতিক মিথ্যা থেকে, স্বাধীন সীমাহীন শাস্তির ভয় থেকে, আমি স্বাধীন ডানাওয়ালা ফেরেশতা থেকে, শয়তান থেকে, জিন-ভূত এবং ঈশ্বর থেকে।

জীবনে প্রথমবারের মতো আমি স্বাধীন।

আমার চিন্তার রাজ্যে সেদিন থেকে নেই আর কোন নিষিদ্ধ জায়গা, নেই কোন অশরীরী শৃঙ্খল যা বেঁধে রাখে আমার অবয়বকে, আমাকে রক্তাক্ত করার জন্য নেই কোন অলৌকিক চাবুক, আমার মাংসের জন্য নেই কোন আগুন। আমার মাঝে নেই ভয়, আমার মাঝে নেই অন্যের দেখানো পথে হাঁটার দায়বদ্ধতা, আমার প্রয়োজন নেই কারও সামনে অবনত হওয়া, কাউকে পূজা করা, আমার প্রয়োজন নেই মিথ্যা কথা বলারও।

আমি মুক্ত।

ভয়-ভীতি, মেরুদন্ডহীনতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সেদিন আমি প্রথমবারের মতো উঠে দাঁড়িয়েছিলাম, জগতকে নতুন করে দেখার, ভাবার চেতনা নিয়ে।

আমার অন্তর সেদিন কৃতজ্ঞতায় ভরে গিয়েছিল। আমি কৃতজ্ঞতা বোধ করেছিলাম ইতিহাসের সেই সব নায়কদের প্রতি, মানুষের প্রতি যারা নিজের জীবন বিপন্ন, বিসর্জন করেছিল মানুষের হাত এবং মস্তিষ্কের স্বাধীনতা যুদ্ধে। আমি ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম পৃথিবীর আলোকিত সকল সন্তানদের, যাদের কেউ আত্মাহুতি দিয়েছিল মূর্খের সাথে যুদ্ধে, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিল অন্ধ প্রকোষ্ঠে আ-বদ্ধাবস্থায়, যাদের মাংস পুড়েছিল ধর্মান্ধদের আগুনে।

আলোকিত সেই সব সাহসী মানুষেরা, যারা এসেছিল পৃথিবীর আনাছে-কানাচে, যাদের চিন্তায়-কর্মে স্বাধীনতা পেয়েছে মানুষের সন্তানেরা। অতঃপর আমি নিচু হলাম, যে আলোর মশাল তারা জ্বালিয়েছিলেন সে আলোর মশাল তুলে নিলাম নিজের হাতে, উচু করে তুলে ধরলাম সেটা, এ আলো নিশ্চয়ই একদিন জয় করবে সকল অন্ধকার।

না বাংলাদেশ ইঙ্গারসল জন্ম নেন নি। ফারাবীতে পরিপূর্ণ এই দেশে আমরা পেয়েছিলাম অভিজিৎ রায়কে। তাঁর আলোয় হয়েছিলাম আলোকিত, মুক্ত হয়েছিলাম চিন্তার দাসত্ব থেকে। অভিজিতের আলোকে গ্রাস করতে অন্ধকার হামলা করেছিল পেছন থেকে। অভিজিতের সেই আলোর মশাল লক্ষ অভিজিতের তুলে ধরতে দেরি হয় নি। এক অভিজিতের থেকে বাংলাদেশে জন্ম নিচ্ছে লক্ষ অভিজিৎ।

জন্ম শুভ হয়ে থাক; অভিজিৎ রায়!