জীবনের উদ্ভবের সম্ভাব্য ধারণাগুলো

প্রানের প্রাণ জাগিয়াছে তোমারই প্রানে- ৩

অভিজিৎ রায়

 

চারিদিকে শান্ত বাতি ভিজে গন্ধ-মৃদু কলরব;
খেয়া নৌকাগুলো এসে লেগেছে চরের খুব কাছে;
পৃথিবীর এই সব গল্প বেঁচে রবে চিরকাল;-
এশিরিয়া ধুলো আজ ব্যাবিলন ছাই হ’য়ে আছে।
–জীবনানন্দ দাশ

জীববিদ্যার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হল- ‘কিভাবে, কখন আর কোথায় প্রথম প্রানের উৎপত্তি হল’? এ প্রশ্নগুলো জীববিজ্ঞানের চিরন্তন এবং মৌলিক প্রশ্ন। এ প্রশ্নের সমাধান করতে গিয়ে উদ্ভিদ বিজ্ঞানী, প্রানীবিজ্ঞানী, রসায়ন বিজ্ঞানী, পদার্থ বিজ্ঞানী সবাই বরাবর হিমশিম খেয়েছেন। এমনকি ডারউইন নিজেও এক সময় বলেছিলেনঃ বর্তমানকালে জীবনের উৎপত্তি নিয়ে ভাববার মত বাজে কাজ আর কিছুই নেই, তার চেয়ে বরং বস্তুর উৎপত্তি নিয়ে ভাবা যেতে পারে’ (It is mere rubbish thinking at present of the origin of life; one might as well think about the origin of matter)। এর কারন হল জীবনের উৎপত্তি সূচক প্রশ্নগুলো শুনতে যত সহজ সরল শোনায়, এগুলোর সমাধান কিন্তু এতো সোজা নয়; এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অন্তর্নিহিত নানা জটিলতা। তারপরেও মানুষের অনুসন্ধিৎসু মন বসে থাকে নি। অজানাকে জানবার আগ্রহে উত্তর খুঁজে নিতে চেয়েছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু জীবনের ‘গোলকধাঁধা’র সমাধান তো এত সহজ নয় যে ‘জলবৎ তরলং’ এর সমাধান পেয়ে যাবে। যদিও মানুষ কিন্তু প্রতিনিয়তই আশাবাদী। এ প্রসঙ্গে জেডি বার্নলের উক্তিটি স্মর্তব্যঃ

Life is beginning to cease to be a mystery and becoming practically a cryptogram, a puzzle, a code that can be broken, a working model that sooner or later can be made.

বার্নাল এ উক্তিটি করেছিলেন ১৯৬৭ সালে; এর পর কয়েক দশক পার হয়ে গেছে। তারপরও জীবনের সঠিক সংজ্ঞা আর উৎপত্তির ইতিহাস সঠিক ভাবে পাওয়া যাচ্ছে কি? আসলে জীবনের উৎপত্তিকে বুঝতে হলে জড় জগতে আর জীব জগতে বিবর্তনকে খুব ভালোভাবে বোঝা ছাড়া গতি নেই। জড় জগতে বিবর্তন বলতে আমি মহাবিশ্বের উৎপত্তি এবং তার ধারাবাহিক ক্রমবিকাশকে বুঝাচ্ছি। আজ থেকে মোটামুটি সাড়ে চারশ কোটি বছর আগে আমাদের এই পৃথিবীর জন্ম হয়েছিল। কিভাবে মহাবিস্ফোরণ থেকে শুরু করে প্রাথমিক কনিকার উৎপত্তি, তারপর ধীরে ধীরে এক সময় শক্তির প্রাধান্য অতিক্রম করে শুরু হল পদার্থের প্রাধান্য, সেই থেকে শুরু করে তারামণ্ডল, কোয়েসার, ছায়াপথ, সূর্য, সৌরজগৎ, সবকিছু পার হয়ে কিভাবে অবশেষে আমাদের এ পৃথিবীর জন্ম হল তার একটি পর্যায়ক্রমিক ধারনা প্রথম গ্রন্থকার তার ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ বইটিতে (অঙ্কুর প্রকাশনী; ২০০৫, ২০০৬) দিতে চেষ্টা করেছে। উক্ত বইটিকে জড় জগতে বিবর্তনের একটি সংক্ষিপ্ত প্রকাশ হিসেবেও ধরা যেতে পারে। তবে জড় জগতে বিবর্তনই কিন্তু সবটুকু নয়। প্রানের উৎপত্তি আর জীব জগতে বিবর্তনের ইতিহাসটা না তুলে ধরলে গল্পটি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। বাস্তবে বিবর্তন যে অনুক্রমে ঘটেছে তা হলঃ

জড় জগতে বিবর্তন → প্রানের উৎপত্তি → প্রজাতির উৎপত্তি → মানুষের উৎপত্তি

তবে এ বইটিতে আমাদের আলোচনা মূলতঃ প্রানের উৎপত্তির বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে।

সেই সাড়ে চারশ কোটি বছর আগেকার পৃথিবী কিন্তু কোনদিক দিয়েই আজকের পৃথিবীর মত ছিল না। তখন পৃথিবীতে কোন প্রাণ ছিল না। পৃথিবী ছিল প্রচন্ড উত্তপ্ত, আর আকাশ আর পৃথিবী পরিপূর্ণ ছিল বিষাক্ত গ্যাসে। তারপর এক সময় অনেক কিছুর বদল হল, পৃথিবীও এক সময় বারিধারায় শীতল হল। এমনি এক পরিস্থিতিতে এক কোষী জীবের উদ্ভব ঘটল। তবে ঠিক কন মহেন্দ্রক্ষনে এক কোষী জীবের উৎপত্তি আর তারপর সেই আনন্দধারা ক্রমাগত বহুকোষে ছড়িয়ে দিয়ে সবুজ গাছপালাকে আন্দোলিত করেছে, কিংবা পাখির কূজনে পৃথিবীর আকাশ-বাতাস  ভরিয়ে তুলেছে তা আর আজ হলফ করে বলা যাবে না। এ পৃথিবীতে জীবনের প্রথম আবির্ভাব সম্পর্কে অনেক অনুকল্প আছে। এগুলোকে মোটামুটি পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায় (আখতারুজ্জামান, ১৯৯৮):

১) অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাঃ জীবনের আবির্ভাব হয়েছে অতিপ্রাকৃতিক (supernatural) ও অজ্ঞেয় ঘটনা হিসেবে।

২) সৃষ্টিবাদঃ বিশেষ লক্ষ্যে বা উদ্দেশ্যে, বিরাট কোন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জীবনের সৃষ্টি করা হয়েছিল। এর নাম সৃষ্টিবাদ বা বিশেষ সৃষ্টিতত্ব (Theory of special creation)।

৩) স্বতঃজননবাদঃ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ময়লা-আবর্জনা থেকে প্রানের সৃষ্টি হয়। এ ধারনাকে বলে স্বতঃজনন তত্ত্ব (Theory of spontaneous generation)।

৪) বহির্জগতে উৎপত্তিঃ এ ধারনা অনুযায়ী পৃথিবীর বহিঃস্থ (Extra terrestrial) পরিবেশ থেকে। ধারনা করা হয় পৃথিবীর বহির্জগতে কোথাও না কোথাও প্রাণ চিরকালই ছিল, আর সেখান থেকেই পৃথিবীতে প্রানের বিকাশ ঘটেছে।

৫) জৈব রাসায়নিক তত্ত্বঃ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আদিম পরিবেশে অজৈব (জড়) বস্তু হতে পৃথিবীতেই জীবনের উৎপত্তি হয়েছে। এই তত্ত্বের নাম জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি তত্ত্ব (Chemical theory of origin of life)। এ তত্ত্বের অপর একটি নাম অজীবজনি (Abiogenesis)।

 

প্রথমোক্ত দুটি অনুকল্প বিজ্ঞানের আওতায় পরে না। এই তত্ত্ব দুটি আসলে মনে করে বিশাল পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঈশ্বর পৃথিবীতে এক সময় প্রাণ সৃষ্টি করেন। কিন্তু এই তত্ত্বগুলোর কোন অবরোহ বা অনুসিদ্ধান্ত নেই, কিংবা থাকলেও তা পরীক্ষা, নিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ দ্বারা যাচাই করা যায় না। তবে ৭ দিনের বিশ্ব সৃষ্টির বাইবেলীয় সৃষ্টিবাদের যে ব্যাখ্যা ফাদার সুয়ারেজ দিয়েছেন বা সৃষ্টি মুহূর্তের তারিখ হিসেবে আর্চ বিশপ উশার যা বলেছেন (সকাল ৯-৩০, মঙ্গলবার, ২০০৪ খ্রীঃ পূঃ) তাকে বিজ্ঞান সঠিক মনে করে না। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ফসিলাদি পর্যবেক্ষণ করে এবং অন্যান্য পরীক্ষার সাহায্যে তাদের ধারনার অসারতা প্রমানিত হয়। আর তাছাড়া বিজ্ঞান অজ্ঞেয়বাদী নয়। বিজ্ঞান খুব কঠোর ভাবেই বস্তুবাদী। প্রানের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছে তা প্রাকৃতিক নিয়ম-কানুনের ভিত্তিতেই বিজ্ঞান জানতে চায়। আধুনিক বিজ্ঞান জন্ম নিয়েছে যাদের হাত দিয়ে তারা মধ্যযুগীয় ভাববাদ আর অজ্ঞেয়বাদের তীব্র বিরোধী ছিলেন। বেকন, দেকার্ত, নিউটন, গ্যালিলিও, কেপলার মিলে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের সংস্কৃতি গড়েছেন, যন্ত্রসভ্যতার দার্শনিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। পরে বিকশিত হয়েছে রসায়নবিদ্যা আর তার সাথে সাথে জীববিদ্যা। কিন্তু প্রানের উৎপত্তি নিয়ে কোন সঠিক ধারনা তখনো মানুষের মনে ছিল না। ‘নিম্ন’শ্রেনীর প্রানী যেমন কীট পতঙ্গ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাটি, কাদা ময়লা আবর্জনা থেকে জন্ম নেয়- এই বিশ্বাস প্রাচীন চীন, ভারত আর মিশরে আমরা দেখতে পাই। এর কারনও ছিল। আবর্জনা কাদার মধ্যে কীটের ডিম পারার ফলে তা থেকেই যে কীটের জন্ম হয়, তা জানতে হলে যে শক্তিশালী অনুবীক্ষন যন্ত্রের প্রয়োজন হয়, তা তখনকার দিনে ছিল না। ফলে জীবনের উৎপত্তির এই স্বতঃস্ফূর্ত তত্ত্ব দীর্ঘকাল মানব সমাজে রাজত্ব করেছে। এমনকি শ’চারেক বছর আগেও যখন আধুনিক বিজ্ঞান যাত্রা শুরু করে তখনো এই স্বতঃস্ফূর্ত (Theory of spontaneous generation) বহাল তবিয়তেই রাজত্ব করেছে। শুধু রোগ জীবানু বা আনুবীক্ষনীক জীবের ক্ষেত্রেই নয়, এমনকি বড় বড় প্রানীর ক্ষেত্রেও*। ব্রিটিশ গবেষক আলেকজান্দার নীঢ্যাম (১১৫৭-১২১৭) বিশ্বাস করতেন ফার গাছ সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে ফেলে রাখলে তা থেকে রাজহাঁস জন্ম নেয়। জ্যান ব্যাপটিস্ট হেলমন্ট (১৫৮০-১৬৪৪) ভাবতেন ঘর্মাক্ত নোংড়া অন্তর্বাস ঘরের কোনায় ফেলে রাখলে তা থেকে ইঁদুর আপনা আপনিই জন্ম নেয়! উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়  মূলতঃ লুই পাস্তুরের গবেষনার মধ্য দিয়ে আমরা এই পুরোন ধারনা ছেড়ে দেই (পরবর্তী অধ্যায়ে স্বতঃস্ফূর্ত তত্ত্ব এবং এর মৃত্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে)।

উনবিংশ শতকের শেষার্ধে যখন স্বতঃজননবাদ গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হচ্ছিল না, তখন অন্য একটি অনুকল্প প্রস্তাবিত হয়। তার মূল কথা হল জীবনের প্রথম আবির্ভাব হয়েছিল মহাবিশ্বে। সেখান থেকে পৃথিবীতে জীবন এসেছে। এ অনুকল্পের নাম বহির্বিশ্বে জীবনের উৎপত্তি (Extra terrestrial origin of life)। প্রথম দিকে রিখটার, আরহেনিয়াস (তাঁর অনুকল্পের নাম ছিল ‘প্যানস্পার্মিয়া’, এ বইয়ের সপ্তম অধ্যায়ে এ নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে) এবং পরবর্তীতে ব্রুকস, ক্রিক, হয়েল, বিক্রমসিংহ প্রমুখ এই তত্ত্বের প্রচারক ছিলেন। তাদের মতে পৃথিবীর বাইরে কোন গ্রহে বা অন্য কোথাও জীবনের উৎপত্তি হয়েছিল। সেখান হতে প্রাণ স্পোর বা অনুবীজ হিসেবে পৃথিবীতে এসেছিল।

————————————————-

*জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত বা আপনা আপনি উৎপত্তির ধারনা কিন্তু বহু প্রাচীন। এর প্রমান এরিস্টটলের লেখায়ও রয়েছে। যদিও একথা তাঁর জানাই ছিল যে জীব থেকেই জীবের উৎপত্তি হয়, তবুও এরিস্টটল কোন কোন ছোট প্রানী (যেমন কিছু কিছু মাছ এবং পতঙ্গ) স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদ্ভূত হয় বলে বিশ্বাস করতেন। তার বিখ্যাত এই প্রানী জগতের ইতিহাস (Historia Animalium)- এ এধরনের একটি বিবরণ দিয়েছেনঃ

                     ‘অধিকাংশ মাছের জন্ম ডিম থেকে হয়ে থাকে। তবে এমন কিছু মাছ আছে যেগুলোর জন্ম হয় কাদা ও বালি           থেকে। একবার নিডোসের কাছে একটি পুকুর শুকিয়ে যায়। এর তলদেশের কাদা শুকিয়ে যায়। তারপর বেশ কয়েকদিন পর বৃষ্টিতে পুকুরটি ভরে যায়। এ দেখা গেল পুকুরে জন্মেছে নানা ধরনের ‘মুলেট জাতীয়’ ছোট মাছ। কাজেই এটি পরিষ্কার যে কিছু মাছ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্মায়। তার জন্য ডিমের বা যৌন ক্রিয়ার দরকার হয় না।‘

আজকের দিনের জ্ঞানের প্রেক্ষাপটে এরিস্টটলের এ বর্ণনা হয়ত হাসির খোরাক যোগাবে।

কিন্তু মহাশূন্যের পরিবেশ এই অন্তঃগ্রহ পরিভ্রমণের জন্য এতই প্রতিকুল (নিন্মমাত্রার তাপ, বায়ুর অনুপ্সথিতি, উচ্চশক্তির বিকিরন, অকল্পনীয় দূরত্ব ইত্যাদি) যে এভাবে পৃথিবীতে প্রানের বিকাশ এবং টিকে থাকার সম্ভাবনা প্রায় অসম্ভবই বলা চলে। কার্ল স্যাগান আর শকোভস্কি ১৯৬৬ সালে অনুজীবের আন্তঃনাক্ষত্রিক পরিভ্রমণের মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির ক্ষেত্রে নানা ধরনের সমস্যার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তারা হিসেব করে দেখিয়েছেন, অনুজীবগুলো যদি এক মাইক্রনের কম হয় তবে সসেগুলোর পক্ষে পৃথিবীতে জীবন ধারনের উপযোগী অঙ্গাণু ধারন করা সম্ভব নয়। আবার অনুজীবগুলো যদি এক মাইক্রনের বেশি হয় তবে পৃথিবীর মত অন্য কোন গ্রহ থেকে এই ধরনের প্রাণকণা নির্গত হয়ে পৃথিবীতে চলে আসা খুবই কঠিন। আর বিকিরন জনিত বিভিন্ন কারনে সেগুলোর পুড়ে যাবার সম্ভাবনা তো আছেই। তারপরও তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয় যে, ঠিক ঠিক এক মাইক্রনের অনুজীবেরা কোন না কোন ভাবে পৃথিবীতে আসতে সক্ষম হয়েছিল, স্যাগান আর শকোভস্কি হিসেব দিয়েছেন যে, পৃথিবীকে একশ কোটি বছরে একটি মাত্র এ ধরনের স্পোর পেতে হলে আমাদের গ্যালাক্সির ১০০টি প্রাণধারনক্ষম গ্রহকে একসাথে ১০০০ টন অনুবীজ ছড়াতে হবে। কিন্তু আমাদের গ্যালাক্সিতে এধরনের ১০০টি গ্রহ তো দূরের কথা, পৃথিবী ছাড়া অন্য কোন জীবনবাহী গ্রহের সন্ধানই এখনো মেলেনি। আর তাছাড়া যদি ধরেই নেওয়া হয়, বিশাল দূরত্ব পাড়ি দিয়ে প্রানের বীজ এ পৃথিবীতে এসেছিল, তা হলেও প্রশ্ন থেকে যায় বহির্বিশ্বেই বা কিভাবে প্রানের উৎপত্তি হয়েছিল? তার মানে পৃথিবীর ক্ষেত্রে যে সমস্যাটির সমাধান করা যাচ্ছিল না, বহির্বিশ্বের দিকে ঠেলে দিয়ে সেই সমস্যাটিকে পেছানোর প্রয়াস নেয়া হল মাত্র।

পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত উল্কাপিন্ড আছরে পরছে পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই আমরা এধরনের খবর দেখতে পাই। এগুলোকেই প্রাথমিকভাবে প্রাণ কনার বাহন বলে মনে করেন বহির্বিশ্বে জীবনের উৎপত্তি তত্ত্বের প্রবক্তারা। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে যে সমস্ত এ্যামাইনো এসিড উল্কাপিণ্ডের উপর ভর করে এই পৃথিবীতে এসেছে সেগুলোর সাথে পৃথিবীতে তৈরি এ্যামাইনো এসিডের পার্থক্য রয়েছে বিস্তর। মহাকাশের উল্কাপিণ্ডের সাথে আসা এ্যামাইনো এসিডগুলোর মধ্যে কিছু বামাবর্তী এবং কিছু ডানাবর্তী (left and right-handed); ফলে এগুলোর কোন আলোক ক্রিয়া নেই। কিন্তু পৃথিবীতে প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি এ্যামাইনো এসিড গুলো সবই বামাবর্তী (left-handed)। এছারা এমন কিছু এ্যামাইনো এসিড উল্কাপিন্ডে পাওয়া গেছে যেগুলোর পৃথিবীর কোন জীবে দেখা যায় না। তাই অধিকাংশ বিজ্ঞানী মনে করেন এসব এ্যামাইনো এসিড থেকে পৃথিবীর এ্যামাইনো এসিড তৈরি হতে পারে না।

আসলে এ পৃথিবীতেই আদিম অবস্থায় অজৈব পদার্থ হতে জীবনের উৎপত্তি হয়েছে এবং তা কোন রহস্যজনক কারনে নয়, বরং জানা কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে – জীবনের এই রাসায়নিক উৎপত্তি তত্ত্বকেই (Chemical theory of origin of life) আজ পৃথিবীর অধিকাংশ বিজ্ঞানীরা সঠিক বলে মেনে নিয়েছেন। গত শতকের শেষ ভাগে থমাস হাক্সলি আর জন টিন্ডেলের গবেষনায় জীবনের এই বস্তুগত ভিত্তির কথা সাধারনভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। তারপরও অনেকটাই ধোঁয়াটে ছিল সবকিছু। ধীরে ধীরে কুয়াশা কেটেছে, কাটছে। হাক্সলীর উত্তরসূরীরা যেমন হারডি, উইলসন, বারনাল, হলডেন, ওপারিন, মিলার, ইউরে, ডবঝানোস্কি প্রমুখ বিজ্ঞানীরা মানব মনের কুয়াশা কাটিয়ে জীবনের এই বস্তুবাদী রূপটিকে প্রতিষ্টিত করবার প্রয়াস পেয়েছেন।

আমরা আগামী অধ্যায়ে এ তত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

⇐পূর্বের অধ্যায় পরবর্তী অধ্যায়⇒