কোরআনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস- পর্বঃ ০১

আমরা জানি, ইসলাম ধর্মের মূল ও প্রধান ধর্মগ্রন্থ হল পবিত্র কোরআন যা নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর উপর পর্যায়ক্রমে নাযিল হয়েছে। কিন্তু আমরা বেশির ভাগ মানুষই জানি না উক্ত কোরআন কবে, কখন, কিভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। আমরা বেশির ভাগ মানুষই জানি না কোরআন সংরক্ষণ ও সংকলনের প্রকৃত ইতিহাস। যেটুকু জানি, সেটাও কোন বই-পুস্তক পড়ে নয়, হয়তো অমুক হুজুরের ওয়াজ মাহফিল থেকে, নয়তো বড় হুজুরের মুখ থেকে। আমরা বাঙ্গালী এতোটাই অলস প্রকৃতির যে, বড় হুজুরদের মুখের কথা বিশ্বাস করতে খুব পটু, কিন্তু বড় হুজুরেরা কতটুকু সত্য বলছে আর কতটুকু মিথ্যা বলছে, তা যাচাই করে দেখার কষ্টটুকুও করতে নারাজ। ঠিক এই সুযোগটাই কাজে লাগায় সমাজের এক শ্রেনীর ধর্ম ব্যবসায়ীরা। ব্যাপারটা শুধুমাত্র এখানেই সীমাবদ্ধ থাকলেও হত, একেক হুজুরের একেক রকম বক্তব্যে আজ মুসলিম সমাজ বড়ই বিভ্রান্তিতে পতিত। ফলে একই ধর্মে তৈরি হচ্ছে গ্রুপিং। বড় হুজুরের একদল এক মতবাদে বিশ্বাসী, কাজেই ছোট হুজুরের ভক্তরা অন্য মতবাদে বিশ্বাসী বলেই তারা কাফির-মুরতাদ। অথবা মেঝো হুজুরের ভক্তরা কোন হুজুরের পক্ষপাতিত্ব করে না বলে তারা নাস্তিক। একদল বিশ্বাস করে নবী মুহাম্মদ (সঃ) মাটির তৈরি, কিন্তু অন্য দলের ভক্তরা বিশ্বাস করে নবী নূরের তৈরি। ব্যস শুরু হয়ে গেল দু দলে জিহাদ জিহাদ ইমেজ। আসলে ধর্মের চেয়ে ধর্মজ্ঞানপাপীরা বেশি ভয়ংকর। এরকম দলাদলি থেকে মুক্তি দিতেই সহীহ দলীলের মাধ্যমে কোরআন ও ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করার চেষ্টা করবো।

শুরুটা করবো কোরআন নাযিল, কোরআন সংরক্ষণ ও সংকলনের মাধ্যমে। ইসলাম ধর্মে এমন কোন কিতাব নেই যেখানে কোরআন সংরক্ষণ বা সংকলনের পূর্ণাংজ্ঞ ইতিহাস জানা যায়। কাজেই আমার এই লেখনীর মাধ্যমে পূর্ণাংজ্ঞ ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

আমরা জানি, নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর জন্ম পৌত্তলিক পরিবারে, কাজেই আমরা যেমন জন্মসূত্রে মুসলিম, নবী মুহাম্মদ (সঃ) তেমন ছিলেন জন্মসূত্রে পৌত্তলিক। পৌত্তলিক ধর্মে থাকা অবস্থাতেই ২৫ বছর বয়সে খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী দুই বার বিধবা হওয়া খাদিজা (রাঃ) কে বিবাহ করেন তিনি। এক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে কোন ধর্মের রীতিতে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল তা আমার অজানা। এর কিছু সময় পর হতেই নবী মুহাম্মদ (সঃ) হেরা গুহা পর্বতে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। তৎকালীন সময়ে নবী মুহাম্মদ (সঃ) ই প্রথম বা একমাত্র ব্যক্তি নয় যিনি পাহারের গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। তার অনেক পূর্ব থেকেই বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা নীরবতা এবং একাগ্রতার জন্য বিভিন্ন পাহারে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। ধ্যান করতে নির্দিষ্ট কোন বিষয় প্রয়োজন। কিন্তু নবী মুহাম্মদ (সঃ) ঠিক কোন বিষয়ে একাগ্রতার জন্য ধ্যানমগ্ন থাকতেন, তা একমাত্র উনি ব্যতীত বলা কঠিন, কারন ধ্যানের বিষয় কোন কিতাবে খুঁজে পাওয়া যায় না।

নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর বয়স যখন ৪০ বছর, তখন তিনি নবুয়্যাত প্রাপ্ত হন। তবে শুরুতেই জীব্রাইল ফেরেস্তা ওহী নিয়ে আগমন করে নি। আমরা জানি পবিত্র কোরআন পূর্ণাংজ্ঞরুপে লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত ছিল। সরাসরি জীব্রাইল ফেরেস্তার মাধ্যমে সেখান থেকেই ওহী আনয়ন করে নি। ইহা সর্ব প্রথম লাওহে মাহফুজ থেকে কোন এক কদরের রাত্রে পৃথিবীর আকাশে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু সেই কদরের রাত্রি ঠিক কোন সময়ের কদরের রাত্রি, তা কোথাও স্পষ্ট করে উল্লেখ নেই। এই সময়টা কি নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর জন্মের পূর্বে, নাকি পরে। কিংবা ধ্যানমগ্ন হওয়ার পূর্বে নাকি পরে তা কোথাও স্পষ্ট উল্লেখ নেই। এছাড়া পূর্ণাংজ্ঞ কোরআন কিসে লিপিবদ্ধ ছিল, কাগজে নাকি গাছের বাকলে, নাকি পাথরে খোদাই করা অবস্থায়, নাকি কোন অত্যাধুনিক টেকনোলজির ব্যবহার করা হয়েছে তারও কোন উল্লেখ নাই। এছাড়াও পৃথিবীর আকাশ ঠিক কোথায় অবস্থিত, কিংবা সেই আকাশে কোরআন ভাসমান ছিল, নাকি কোন কিছুর উপরে রাখা হয়েছিল সেসব বিষয়েরও কোন উল্লেখ নাই।

তথ্যসূত্রঃ তাফসির ইবনে কাথির, ১ম খন্ড, অধ্যায়ঃ ওহী অবতরণ পরিক্রমা, পৃষ্ঠাঃ ২৮

নবী মুহাম্মদ (সঃ) সর্ব প্রথম ওহী প্রাপ্ত হতেন ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নরুপে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা দিনের আলোর ন্যায় প্রকাশ পেত। তারপর থেকেই তাঁর নির্জনতা প্রয়োজন হয়ে পরেছিল, এবং তখন থেকেই তিনি হেরা পর্বতের গুহায় নির্জনতা অবলম্বন করেন। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তিনি সেখানে অবস্থান করা শুরু করলেন। তিনি হেরা পর্বতে যাবার সময় খাদ্য সামগ্রী সাথে করে নিয়ে যেতেন, এবং অনেক সময় খাদিজা (রাঃ) নিজেও খাবার নিয়ে যেতেন।

তথ্যসূত্রঃ সহীহ বুখারী- (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), ১ম খন্ড, অধ্যায়ঃ ওহীর সূচনা, হাদিসঃ ০৩, হাদিসের মানঃ সহীহ।

স্বপ্নযোগে ওহী প্রাপ্তির পরে শুরু হয়েছিল ঘণ্টাধ্বনির মাধ্যমে ওহী প্রাপ্তি। নবী যখন থেকে হেরা গুহা পর্বতে নির্জনতা গ্রহণ করলেন, তারপর থেকেই প্রথমে ঘণ্টাধ্বনির মাধ্যমে, এরপর পরই ফেরেস্তা এসে যা বলেন, নবী তা মুখস্ত করে নেন। আবার কখনো কখনো ফেরেস্তা মানুষের আকৃতিতে এসেও নবীর সহিত কথা বলতেন।

কিন্তু ওহী আগমনের ঘণ্টাধ্বনির কি সম্পর্ক, তার স্পষ্ট কোন কারন জানা যায় না। এটা কি আসলে ওহী আগমনের পূর্ব প্রস্তুতি, নাকি অন্য কিছুর সংকেত, তার কোন স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না।

তথ্যসূত্রঃ সহীহ বুখারী- (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), ১ম খন্ড, অধ্যায়ঃ ওহীর সূচনা, হাদিসঃ ০২, হাদিসের মানঃ সহীহ।

নির্জনতা অবলম্বনের পরে আল্লাহর নবীর যখন থেকে ঘণ্টাধ্বনির মাধ্যমে ওহী নাযিল শুরু হয়, ঠিক তার কত পর থেকে স্বপ্নযোগের ওহী আগমন বন্ধ হয়, তার কোন দলিল পাওয়া যায় না। আবার, কতবার ঘণ্টাধ্বনির মাধ্যমে ওহী এসেছিল, তার হিসাবও কোথাও পাওয়া যায় না। এরপর থেকে যখন সরাসরি ফেরেস্তার আগমন ঘটে, তখন থেকেই মনে হয় স্বপ্নযোগে ও ঘণ্টাধ্বনিযোগে ওহী নাযিল বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর হেরা গুহায় অবস্থানকালে প্রথম যখন ফেরেস্তা ওহী নিয়ে নবীর নিকটে আসলেন, তখন বললেন, “পড়ুন”। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “পড়ি না”। এরপর ফেরেস্তা জীব্রাইল নবীকে সজোরে চেপে ধরলেন এবং ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ুন”। রাসূলুল্লাহ আবারো বললেন, “আমি পড়ি না”। পুনরায় ফেরেস্তা জীব্রাইল নবীকে সজোরে চেপে ধরলেন এবং ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ুন”। নবী আবারো বললেন, “আমি তো পড়ি না”। আবারো ফেরেস্তা জীব্রাইল নবীকে চেপে ধরে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, “পড়ুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাকা থেকে। পড়ুন আপনার রব মহিমান্বিত। (৯৬: ১-৩)

ইহাই ছিল ফেরেস্তার সম্মুখে নবীর প্রথম ওহী।

তথ্যসূত্রঃ সহীহ বুখারী- (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), ১ম খন্ড, অধ্যায়ঃ ওহীর সূচনা, হাদিসঃ ০৩, হাদিসের মানঃ সহীহ।

ফেরেস্তা জীব্রাইল যখন নবীকে ওহী পড়তে বললেন, তখন নবী বলেছিলেন আমি পড়ি না। এটাই স্বাভাবিক, কারন আমরা সবাই জানি যে নবী মুহাম্মদ (সঃ) ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নিরক্ষর। বিষয়টি আল্লাহরও নিশ্চয় অজানা ছিল না, তথাপি আল্লাহ জীব্রাইলের মাধ্যমে নবীকে পড়ার নির্দেশই দিলেন কেন, তা সত্যিই রহস্য। সে যাই হোক, ফেরেস্তা পড়তে বলেছিলেন মানে জীব্রাইলের নিসে আসা ওহী ছিল লিখিত ওহী। কিন্তু সেই ওহী কিসে লিখিত ছিল, কাগজে, পশুর চামড়ায়, গাছের বাকলে নাকি পাথরে খোদাই করা অবস্থায়, তার কোন উল্লেখ নেই। এরপর নিরক্ষর নবীকে অক্ষর জ্ঞান দান করতে ফেরেস্তা নবীকে সজোরে চেপে ধরেন, আর পর পর দুই বার ব্যর্থ হলেও তৃতীয় বার সফল হন জীব্রাইল। এরপর থেকেই নবী পড়তে শুরু করে দেন।

ব্যাপারটি শুরুর দিকে আশ্চর্যজনক মনে হলেও, মোটেও তা আশ্চর্যজনক ছিল না। কারন মোবাইল ফোনের শুরু দিকে ফোন যখন ক্রমান্বয়ে ডেভেলপ করা হচ্ছিল, সেই সময় এক ধরনের মোবাইল ফোন দেখেছিলাম, এক মোবাইল থেকে আরেক মোবাইলে ডাটা ট্রান্সফারের জন্য ইনফ্রারেড ব্যবস্থা ছিল, কারন তখনো ফোনে ব্লুটুথ সিস্টেম চালু ছিল না। এই সিস্টেমে দুটি ফোন একদম গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রেখে একটি থেকে অন্যটিকে ডাটা ট্রান্সফার করা যেত। জীব্রাইলের নিকট থেকে নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর মাঝে ওহী ট্রান্সফারের ব্যাপারটি মোটেও তার ব্যতিক্রম নয়।

এরপর হতে ক্রমান্বয়ে সুদীর্ঘ ২০ বছর মতান্তরে ২৩ বছর নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর নিকট ওহী নাযিল হত। ইমাম বুখারী তাঁর হাদিস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ২০ বছর, আবার অন্যান্য বক্তব্যে ২৩ বছর। তবে সাধারনভাবে বিবেচনা করলেই বুঝতে পারবেন যে, নবীর বয়স যখন ৪০ বছর তখন নবুয়াত প্রাপ্ত হন এবং  ৬৩ বছর বয়সে তিনি ইহলোক গমন করেন। অর্থাৎ ২৩ বছর। আর যেহেতু তিনি নবুয়াত পাবার পর হতে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওহী পেয়েছেন, সেহেতু তাঁর ওহীর বয়সকাল ২৩ বছর ধরা যায়। উনার মদীনার অবস্থান কাল ১০ বছর, সেই ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই, কাজেই বাঁকি ১৩ বছর উনার যে মক্কার সময়কাল, ইহাতে কোন সন্দেহ নেই।

নবীর নিকট যখনই কোন ওহী নাযিল হত, তখনই তা লিখে রাখা হত এবং যাদের স্মরণ শক্তি বেশি ছিল, তাঁরা মুখস্ত করে রাখতেন। এভাবেই কোরআনের আয়াতগুলো বিচ্ছিন্ন ভাবে সংরক্ষণ করে রাখা হত। কোরানে যেমন আমরা একটা সূরার পর আরেকটি সূরা পর্যায়ক্রমে সাজানো অবস্থায় রয়েছে এবং একটা আয়াতের পর আরেকটি আয়াত পর্যায়ক্রমে সাজানো অবস্থায় রয়েছে, বাস্তবে সেরকম ভাবে সাজানো গোছানো অবস্থায় কিন্তু ওহী নাযিল হয় নি। একটি সূরার অংশ বিশেষ নাযিল হইবার পরে অন্য আরেকটি সূরার অংশ বিশেষ নাযিল হইতো। তখন নবী মুহাম্মদ নিজেই সাহাবীদের ডেকে নির্ধারন করে দিতেন যে, কোন আয়াত কোন সূরার কোথায় স্থাপন হইবে।

তথ্যসূত্রঃ তাফসীর ইবনে কাথির, ১ম খন্ড, অধ্যায়ঃ কোরআনের গ্রন্থনা, পৃষ্ঠাঃ ৪৭

এসব কিছু হয়েছে নবীর জীবদ্দশায়, নবী কখনো কোথাও নির্দেশ দেন নি যে, কোরআনকে গ্রন্থাকারে রুপদান করতে হবে। কাজেই সমগ্র কোরআন বহু সাহাবাদের নিকটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, যা নবীর ইন্তেকালের অনেক বছর পরে ধীরে ধীরে সংগ্রহ করা শুরু হয় এবং পূর্ণাংজ্ঞ গ্রন্থে রুপদান করা হয়। নবীর ইন্তেকালের পরে কিভাবে কোরআনকে সংকলন ও সংরক্ষণ করা হয়েছিল, তা পরবর্তী পর্বে দলিল সহ আলোচিত হবে।

তথ্যসূত্রঃ তাফসীর ইবনে কাথির, ১ম খন্ড, অধ্যায়ঃ কোরআনের গ্রন্থনা, পৃষ্ঠাঃ ৩৮

Leave a Comment

Your email address will not be published.