আমি যেভাবে বখে গেলাম

নিকসন কান্তি

‘আলোকিত হওয়ার গল্প’ কথাটা বেশ অস্বস্তিতে ফেলে। ‘আলোকিত মানুষ’ এই শব্দমালা যিনি জনপ্রিয় ক্রেছেন্সেই আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ একসময় বলেছিলেন যে আলোকিত মানুষ বলে আসলে কিছু নেই। আলোকিত মানুষ একটা স্বপ্নের নাম। মানুষ জীবন ভর সেই স্বপ্নের কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করতে পারে কেবল। এই এগিয়ে যাওয়াই সেই চিরঅধরা স্বপ্নের সার্থকতা।

সুতরাং, আলোকিত হওয়ার গল্প বাদ। মুক্তমনা কি হতে পেরেছি? কনফিডেন্টলি দাবী তো করতে পারি না। এই ব্লগের একজনের লেখা পড়ি আর নিজেকে স্রেফ অশিক্ষিত মনে হতে থাকে। আচ্ছা, যুক্তিবাদী? ওরে বাবা… থাক থাক। কোনমতে মিন মিন করে নিজেকে কেবল নাস্তিক বলে স্বীকার করতে পারি। আর বর্তমান বাংলাদেশে, হয়তো প্রাচীন বাংলাদেশেও, নাস্তিকতা একরকম বখামি ছাড়া আর কী! তাই – বখে যাওয়ার গল্প।

জন্মেছি বাংলাদেশে। মুসলিম প্রধান একটি মফস্বল শহরের এক হিন্দু পরিবারে। চারদিকে একঘরও হিন্দু প্রতিবেশি না থাকায় এবং বাবা ধর্মের ব্যাপারে উদাসীন ধরণের হওয়ায় আমাদের পরিবারে ধর্মচর্চা প্রায় ছিলো না বললেই চলে। মা একাই ঘরেই এক কোণে শ্রী রামকৃষ্ণের একটা ছবি রেখে নিয়মিত ধুপধুনা দিতেন। তো কয়েকবার বাসা পাল্টানোর পর এক পর্যায়ে আর উপযুক্ত কোণ বের না হওয়ায় বেচারা রামকৃষ্ণও গন। বড় ভাই-বোনদের মুখে শুনেছি বাবা নাকি মাকে একটা অদ্ভুত কথা বলতেন। তিনি বলতেন, ছেলেমেয়েদের ধর্ম পালন করতে বাধ্য করবে না। এরা বড় হোক। পড়াশুনা করুক। নিজে নিজে কোনদিন শুরু করলে করবে। তুমি কখনো জোর করবে না।

বাবা মারা যাবার সময় আমি বেশ ছোট। বড়জোর থ্রীতে পড়ি। কিন্তু আমি নিজেও দেখেছি, মা সারাজীবন বাবার কথাটা মেনে চলেছেন। এই যেমন, মা হয়তো কোন একটা মন্দিরে গেলেন আমাকে সাথে নিয়ে। পুজো দিচ্ছেন। আমি মন্দিরের সামনের মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি। মা পুজো সেরে আমাকে একবার ডাকলেন মন্দিরের ভেতরে ঢুকতে। আমি গাঁইগুই করে সরে গেলাম। মাও দ্বিতীয়বার আর ডাকলেন না।

তো এই তরিকায় বড় হবার কারনে আমার কিংবা আমার বড় ভাই-বোনদের মধ্যে ধর্ম বিষয়ে একটা গা-ছাড়া ভাব বরাবরই ছিল। তরুণ বয়সে ভাইয়া তার বন্ধুবান্ধবদের সাথে মহাসুখে গো-মাংস খেতেন খবর পেতাম। মাকে কখনো এবিষয়ে কোন কথা বলতে শুনিনি। আমিও তথৈবচ। ধর্মবিশ্বাসটা মোটামুটি সুতায় দুলতে থাকার কারনে ছিঁড়ে যেতে সময় লাগেনি; যখন এসএসসি পরীক্ষার পর গ্রামে বেড়াতে গিয়ে মাসতুতো ভাইয়ের বাসায় বসে প্রবীর ঘোষের ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ এর প্রথম খন্ডটা পড়েছিলাম। অনুভূতিতে কোন আঘাত নয়… এমনকি কোন বিস্ময়ও নয়; আমার আগাগোড়া রিএ্যাকশনটা ছিল ‘আরে তাই তো’… ‘ঠিকই তো’…।

বখামির সেই শুরু। কয়েক বছর পরে এক সময় যখন বাসায় আরাম করে শুয়ে বসে ‘আমি কেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না’ বইটা পড়ছিলাম, মাকে দেখলাম প্রথমবারের মতো একটু চমকে উঠতে। কিছু বলেন নি অবশ্য। এদিকে তদ্দিনে আমি পুরোপুরি উচ্ছন্নে গেছি। তবু বিশেষ করে এই বইটা নিয়ে মজার স্মৃতি আছে। তখন মাত্র ভার্সিটিতে উঠেছি। দেখানেপনার লোভটা ষোল আনা আছে। ব্যাগের মধ্যে কোন না কোন গল্পের বই তো থাকতোই। বন্ধুরাও পড়তে নিতো। তো একদিন ইচ্ছা করে ঐ বইটা নিয়ে গেলাম। তারপর ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে সেটা বের করে পড়া বইটায় গভীর মনোযোগ দিয়ে মাঝখান থেকে আবার পড়তে লাগলাম। কিসের আর পড়া। খুঁজে খুঁজে সেনসিটিভ পেজগুলো একটা একটা খুলে রেখে বইয়ে চোখ রেখেই লক্ষ্য রাখছিলাম আশপাশ থেকে কেউ পড়ার চেষ্টা করে কিনা। কাছের বন্ধুরা এসে এসে বই উল্টে নামটা দেখে নিচ্ছিলো। আর প্রত্যেকেই থতমত খেয়ে আবার সোজা করে রাখছিলো। আর আমি এদিকে খুবই-ডিস্টার্ব-ফিল-করলাম, ‘পড়তে নিবি নাকি?’ যে ছেলে এমনিতে আমার আধা-পড়া বই কেড়ে নিয়ে যায়, সেদিন দেখলাম তার মুখ শুকিয়ে গেলো। বলে কিনা, ‘আচ্ছা… নিবো… পরে’। আরেকজন সিরিয়াস ভঙ্গিতে মন্তব্য করলো, ‘আমার ধারণা এই বই পড়লে আমার বিশ্বাসটা আরো বাইড়া যাবে’। লও ঠ্যালা!

সেদিন একটা জিনিস বুঝেছিলাম। ধর্মবিশ্বাস মাথায় একবার মোটামুটি গেঁথে গেলে স্রেফ পড়াশোনা করে বোধহয় সেটা বের হয়না বা কমে যায় না। মনে হয় আমার মতো প্রায় ধর্মচর্চাহীন পরিবেশে শৈশব-কৈশোর কাটালেই কেবল ধর্মবিশ্বাস থেকে পুরোপুরি সরে আসা সম্ভব। এর বাইরে অবিশ্বাসী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা সম্ভবত খুবই কম।

এসব বহুদিন আগের কথা। তখনো ইন্টারনেটের ব্যবহার তেমন জানি না। অভিজিৎ রায়ের নামও শুনিনি। ব্লগ পড়া, ফেসবুকিং করা শুরু করেছি এই সেদিন। দুই হাজার দশ এগারোর দিকে। প্রথম, প্রথম সামু পড়তাম। সেখানকারই একটা পোস্ট থেকে অন্য বাংলা ব্লগগুলোর খোঁজ পেয়ে ঢুঁ মারা শুরু করলাম। সচলায়তন খুব ভালো লাগলো। তারপর মুক্তমনা।

এমন চেটেপুটে আর কোন ব্লগ পড়িনি। খুব ঘন ঘন নতুন পোস্ট না আসায় আমার সুবিধাই হয়েছিল। পেছনের লেখাগুলোও হাভাতের মতো পড়তে লাগলাম। খালি মনে হতো, কোথায় ছিলাম আমি এতদিন! কি ঘণ্টা করছিলাম!

তবুও এসব নিজের মধ্যেই রেখে যাচ্ছিলাম। তেমন কারো সাথে শেয়ার করিনি। বন্ধুদের সাথেও নয়। তখনো আমি বড্ড সুশীল। কারো অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া ঠিক না- এমনই ভাবি। আমি নিজে ‘সবই ব্যাদে আছে’ ধরণের লেখা পড়ে মজা পাচ্ছি – পাই। সবাইকে পড়ানো কি দরকার! মানুষ কষ্ট পাবে না? থাক থাক।

আমাকে প্রথমবারের মতো একটা ভালো ঝাঁকুনি দিলো থাবা বাবার মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ। মাহমুদুর রহমান বীর হয়ে উঠলেন। কতজনের সাথে যে তখন তর্ক করেছি! সমীকরণে এক্স এর মান বের করার মতো করে ধাপে ধাপে দেখিয়েছি- ইস্যুটা ছিল যুদ্ধাপরাধীর বিচার; ধর্ম অধর্ম নয়। সেখানে নাস্তিকতাকে ইস্যু হিসাবে সামনে নিয়ে এসে পুরো বিষয়টাকে গুলিয়ে দেয়া, হাওয়ার দিক বদলে দেয়ার মানে হচ্ছে স্রেফ পেছন থেকে ছুড়ি মেরে জিতে যাওয়া। পেছন থেকে ছুড়ি মেরে যে জেতে তাকে একরকম বিজয়ী বলা যেতে পারে, বীর কিভাবে বলি! কিন্তু না, তবুও বার বার সেই একই কথা শুনতে হচ্ছিল। কাছের কিছু মানুষের নতুন একটা চেহারা দেখেছি তখন। প্রায় মন ভেঙ্গে গিয়েছিলো।

তবু সে ঘটনাও নয়। আমার নিয়তি ঠিক করে দিল ২০১৫। হয়তো গোটা বাংলাদেশেরই।

ঐদিন সকালে-বোধহয় বিডিনিউজেই – অভিজিত’দার একটা লেখা দেখেছিলাম। (এখন একবার কনফার্ম হতে গিয়ে সেটা আর খুঁজে পেলাম না। কি আশ্চর্য!) কিছুদুর পড়েই বুঝলাম এ জিনিস রিডিং পড়ে গেলে হবে না; বানান করে পড়তে হবে। সুতরাং সন্ধ্যায়। তারপর অফিস শেষে বাসায় ফিরে লেখাটার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে কি একটা যেন ছবি দেখতে বসে গেলাম। রাত এগারোটার দিকে ফেসবুক খুলে দেখি… ছোপ ছোপ রক্ত।

ঐ তারিখটা এবং তার পরের কয়েকদিনে মানুষের রেসপন্স বাংগালীর শেষ মুখোশটা খুলে দিয়ে গেলো। অভাবনীয় যুক্তি শুনলাম – ফেসবুক নয় – বন্ধুর কাছ থেকেইঃ তোমার বাক স্বাধীনতা থাকলে আমারও হাতস্বাধীনতা আছে!

ভালোই হল; চিনে নিলাম কিছু মানুষকে। শিখে নিলাম কোথায় লাইন টানতে হয়। বুঝতে পারলাম আমারও সময় এসেছে নিজের মুখোশটা খুলে ফেলার – ভালো ছেলের মুখোশ। আমি তো ভালো ছেলে নই। আমি তো নাস্তিক।

নিজের জন্য কিছু মন্ত্র তৈরি করলাম; নিজেই অষ্টপ্রহর জপ করার জন্য –

১। কাউকে আপগ্রেড করার চেষ্টা করো না; জগতের সকল প্রানী তোমার চেয়ে বেশি জানে এবং বেশি বোঝে। সুতরাং, যে বিষ্ঠা-কুপে সুখে আছে তাকে সেখানেই সুখে থাকতে দাও।
২। সম্মান খুব দামী জিনিস। অপাত্রে ঢেলো না। যে যতটুকুর উপযুক্ত তার একবিন্দু বেশি দিও না। সর্বজীবে দয়া চুড়ান্ত গাধামীর আরেক নাম।
৩। পড়াশোনা কর। লেখালিখি করতে হবে।
৪। যে প্রশ্ন জানার জন্য করা হয়নি বরং কুতর্ক শুরু করার জন্য করা হয়েছে সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ো না। ও… ভালো কথা, ‘মুড়ি খাও’ উত্তরটা দিতে পারো।
৫। লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট – সবার কাছে ভালো থাকার দরকার নেই।

“সেই থেকে শুরু দিন বদলের পালা।“

পুনশ্চঃ

বাংলাদেশের মুক্ত চিন্তার ইতিহাসে অভিজিৎ রায়ের জন্মদিনের তুলনায় তাঁর হত্যাকান্ডের দিনটি অনেক অনেক বেশি গুরুত্ববহ। তবু দ’টোই পালন করা যেতে পারে। জন্মদিনটি পালিত হোক শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, ঠিক এমনই কোন বিষয় ভিত্তিক সম্মিলিত কাজের মধ্য দিয়ে। আর ২৬শে ফেব্রুয়ারি পালিত হোক শুধুই প্রতিবাদে। স্রেফ দাবানলের ভাষায়।