আমার মুক্তি আলোয় আলোয়

মারজিয়া প্রভা

পাতি মেয়ে ছিলাম আমি! একেবারে পাতি মেয়ে! নমঃ নমঃ করে অনেক কিছুই মেনে নিতাম। পাবলিক বাসে বুড়ো লোকটা পাশে বসে গুঁতাগুঁতি করছে, আমি আরও সরে সরে যেতাম, মনে হতো বুড়া লোকের দোষ কি? ভির বাস তাই এমনটা করছে! এতটুকু প্রতিবাদের ভাষা জানা ছিল না আমার। জিন্স কুর্তা পড়ে যাচ্ছি, মোটা বলে মানুষ এসে ধেই ধেই টিজ করে যাচ্ছে, আলুর বস্তা বলে ডাকছে, আমি বাড়ি এসে জিন্স ছিড়লাম! আমি গায়ে বড় ওড়না জরাতাম, রিক্সায় ওড়না লেগে ধপাস ধপাস! কোনদিন মনে হতো না, এই বস্ত্রবন্দিত্বকে ভাঙ্গলে কিছুই যায়ে আসবে না! বুঝেছি আরো পরে।

আমি নাকি নারী হিসাবে যা তা! লেখাপড়া করি, বই পড়ি, মুভি দেখি, তর্ক করি, খিস্তি ছাড়ি, ছেলেদের সাথে হৈ হৈ করে মিশি! আমার প্রেম ভেঙ্গে গেল এইসব বলে টলে! আমি তখন উন্মাতাল, দিশেহারা! প্রথম প্রেমে শারীরিকভাবে অনেক কাছাকাছি এসেছিলাম, নিজেকে প্রতিনিয়ত শাপ দিতাম দুশ্চরিত্র বলে! সুইসাইড এটেম্প নিব বলে কতশত প্ল্যান করেছি! ক্যান জানি মরা আর হইল না!

মা বাবার কথা, আরও ভিতরে বুনে থাকা স্বপ্নের কথা ভেবে ধীরে ধীরে ফিরে আসলাম পুরান জীবনে। কিন্তু কোথায় যানি বদলে গেলাম আমি হুট করেই।

নিজের দুঃখ কষ্টের কথা শেয়ার করে আনন্দ পেতে চাইতাম, তখন শুনতাম আরও দুঃখের কাহিনী! আরও যত নোংড়া নোংড়া ছেলেরা মেয়েদের জীবন বিপর্যস্ত করে দিয়েছে আরও কত নোংড়াভাবে! প্রতিনিয়ত করছে! বস্ত্র, জীবন, যৌনতা, সবকিছু তে নারী-জীবন এক কারাগার। প্রথাগত নিয়মের বাইরে যেতে মানা।

প্রথা ভাঙ্গলাম, যে আমি রা কাড়তাম না ঠিকঠাক প্লেসে, সেই আমি উন্মুক্ত কণ্ঠস্বরের মানুষ হলাম। স্কুলে বাচ্চা মেয়ের রেপের ঘটনায়, ইভেন্টে যোগ দিয়ে রাস্তায় দাঁড়ালাম। ফেসবুকে এক্টিভিটি শুরু করলাম! আশাজাগানিয়ার গল্প শোনালাম মেয়েদের। সেই কবে ছোটবেলা থেকে যৌবন অবধি, পুরুষের দুরাচার থেকে মুক্তি পেতে প্রতিবাদি হবার স্বপ্ন দেখলাম। নিজে সাইবার সেক্সজুয়াল হ্যারাজমেন্টের জন্য আইনের ব্যবস্থা নিলাম।

আমি পারতাম না, এই কাজ! ভাবতেই পারি না আরও বছর দুয়েক আগে, আমি থানার যাব! জিডি করব! ল ইয়ারের সঙ্গে কথা বলবো! একা একা এতো পথ পাড়ি দিব! ভাবতেই গা শিউরে উঠত! এ বড় অচেনা আমি ছিলাম।

“আমি আর নেই সেই আমি”।

“দোস্ত, ছোটবেলায়, এক টিচার আমাকে আবিউজ করেছিল, কোনদিন বলতে পারিনি। আজ সে ফেবু রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে কোন সাহসে কে জানে? কথা শুনাচ্ছি, তার ছ্যাঁচড়ামির কথা সবাইকে জানিয়ে দিব এবার। আমি পারতাম না দোস্ত, তোর কাছেই বলা শিখেছি”।

“আপি, তুমি এতো সাহসী। ইচ্ছা হয় তোমার মত একদিন আমিও সাহসী হব, সব কথা মুখে বলতে পারব”।

“তোমার মত জীবন যাপ্ন করতে ইচ্ছা করে, স্বাধীনচেতা। আমি পারব না আপু, সবাই পারে না, তুমি পেরেছ। তোমাকে স্যালুট”।

কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনছি “আমি ভয় করবো না, ভয় করবো না। দু বেলা মরার আগে মরবো না ভাই, মরবো না”। ধী এর গল্প শুরু হচ্ছে, সমকামীদের নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম কমিক! আমার অনেক বন্ধু সমকামী!

আরও বছর দুয়েক আগে, আমি ভাবতেই পারতাম না সমকামিতা কোন অসুখ নয়, জেনেটিক ভেরিয়েশন। দু বছর আগে, ভাবতে পারতাম না, ধর্ম নিয়ে কোন যুক্তির জায়গা আছে, ঐশী বানীও ডমিন্যান্ট হয়ে যেতে পারে মানুষের জীবনে। ভাবতে পারতাম না, মেয়ে হয়ে কস্মিনকালে এই জন্মে মুক্তির গল্প বানাব নিজেই!

এখনো অনেক দূর যেতে বাকি! ক্যারিয়ার বাকি, স্বপ্ন পূরণ বাকি, প্রতিবাদের আরও গল্প বাকি।

কিন্তু শুরু তো করেছি, তাই মুক্তি আসবে, আলো আসবে। আশা রেখে দেই সে আলোর,

আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে,

আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে,

আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে,

দুঃখ বিপদ-তুচ্ছ-করা কঠিন কাজে।