আইনস্টাইনের বিশ্ব

‘আমি ব্যক্তি-ঈশ্বরের কল্পনা করতে চাই না; আমরা আমাদের অসম্পূর্ণ ইন্দ্রিয়ের সহায়তায় যে মহাবিশ্বের গড়ন এখন পর্যন্ত সম্যক বুঝতে পেরেছি এতেই শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয়ে আমরা আপ্লুত।‘

-আলবার্ট আইনস্টাইন

১৯৩০ সালের অক্টোবর মাসের এক মায়াবী শরৎ-সন্ধ্যা। লন্ডনের বিখ্যাত স্যাভয় হোটেলের বলরুমে চলছে পানাহারের হুল্লোর। ব্যারন রোথসচাইল্ডের আতিথেয়তায় আয়োজিত এ দাতব্য অনুষ্ঠানে স্পটলাইট মূলত দুই জীবন্ত কিংবদন্তির ওপর। এর একজন হচ্ছেন জর্জ বার্নাড শ, ১৯২৫ সালের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক – শেক্সপিয়ারের পরে যাকে ব্রিটেনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাট্যকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শ অবশ্য ‘সম্মানিত অতিথি’র স্পটলাইট নিজের ওপরে নিতে রাজি নন; বললেন, সম্মানিত অতিথি এ সভায় যদি কেউ থেকে থাকেন তো সেটি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী রমসে ম্যাকডোনাল্ড। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল মন্ত্রী সাহেব সে সভায় উপস্থিত থাকতে পারেন নি। যথারীতি কারিশমা দেখানোর ভারটুকু ঘুরেফিরে বার্নাড শ’র ওপরই পড়ল। শ অবশ্য হতাশ করেন নি। তাঁর জীবনের অন্যতম ছোট্ট কিন্তু আকর্ষণীয় বক্তৃতায় শ সেদিন বললেন,

‘টলেমি এমন একখানা বিশ্বজগত আমাদের জন্য তৈরি করেছিলেন যা দুই হাজার বছর টিকে ছিল। তারপর নিউটন আরেকখানা জগত বানালেন যা তিনশ বছর টিকতে পেরেছিল, আর আইনস্টাইন সম্প্রতি একটি বিশ্বজগত বানিয়েছেন, আমার ধারনা, আপনারা চাইছেন আমি বলি এটি কখনোই ফুরোবে না; কিন্তু আমি সত্যি সত্যিই জানি না কতদিন এ আইনস্টাইনীয় জগত টিকবে।

দর্শকের সারিতে আইনস্টাইনও ছিলেন, আর শ’র কথা শুনে দর্শকদের সাথে সাথে তিনিও হো হো করে হেঁসে উঠলেন। শ’র বাকচাতুর্য আর রঙ্গরস এমনিতেই জগদ্বিখ্যাত ছিল। সেদিনকার সভায় যেন ওটি আরো নতুন মাত্রা পেল। পদার্থবিজ্ঞানে আইনস্টাইনের অবদানকে তুলে ধরতে দিয়ে শ আইনস্টাইনের জীবনের নানা মজার মজার কাহিনী টেনে এনে তাঁর বক্তৃতা শেষ করলেন এ বলে, ‘আইনস্টাইন হচ্ছেন আমাদের সমসাময়িকদের মধ্যে নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠতম প্রতিভা’।

আইনস্টাইনও তো এদিক দিয়ে কম যান না। বক্তৃতা দিতে উঠে শ-কে মৃদু তিরস্কার করলেন ‘আইনস্টাইন নামের অতীন্দ্রিয় মিথটির ভূয়সী প্রশংসা করবার জন্য, যার কারনে নাকি তাঁর জীবন ইতিমধ্যেই ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে! তাঁর মতে, মানুষ তাঁর সম্পর্কে যা কল্পনা করে আর বাস্তবে উনি নিজে যা – এর মধ্যে নাকি বিস্তর ফারাক!

তবে আইনস্টাইন নিজে তখন যা-ই বলুন না কেন, এখন কিন্তু প্রমাণিত হয়েই গেছে যে, শ’র কথা মোটেও অত্যুক্তি ছিল না। আইনস্টাইনের যুগান্তকারী আবিষ্কারের প্রায় একশ বছর এর মধ্যে পার হয়ে গেছে – এখনো আমরা সেই আইনস্টাইনীয় বিশ্বেই বাস করছি। ভবিষ্যতের কোন প্রতিভাধর বিজ্ঞানী যে রঙ্গমঞ্চে এসে আইনস্টাইনের এই বিশ্বজগতকে হটিয়ে দিতে পারবেন না, তা দিব্যি দিয়ে বলা যায় না। তবে এটুকু অন্তত বলা যায় যে, আইনস্টাইন স্বীয় প্রতিভায় উদ্ভাসিত হয়ে নিজেকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে গেছেন যে, তাঁকে পৃথিবীর সর্বকালের অত্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা হিসেবে মনে রাখতেই হবে, তা তাঁর তৈরি বিশ্বজগত শেষ পর্যন্ত টিকুক আর না-ই টিকুক।

 

আইনস্টাইনের ছেলেবেলা

তবে ‘জিনিয়াস’ বলতে যা বোঝায় তা কিন্তু ছেলেবেলায় কখনোই ছিলেন না তিনি। ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে, – প্রবাদ বাক্যটি আইনস্টাইনের জীবনে নিদারুনভাবে ব্যর্থই বলতে হবে। ক্লাসের সেরা ছাত্র ছিলেন না আইনস্টাইন। বরং স্কুল-কলেজের রেকর্ড যদি বিবেচনা করা হয়, নিতান্তই মাঝারি গোছের তাঁর সমস্ত রেকর্ড। আইনস্টাইন এমনিতেই ছিলেন একটু ঢিলেঢালা; এমনকি শৈশবে কথা বলাও শিখেছিলেন একটু দেরি করে। দু বছরের বেশি লেগে গিয়েছিল। সাত বছর পর্যন্ত বাড়িতেই পড়াশোনা চলে তাঁর। একসময় স্কুলেও ভর্তি করা হয় তাঁকে – ক্যাথোলিক স্কুলে। তবে ভর্তি করাই সার হল; স্কুলের পড়াশোনায় মোটেও মনোযোগী ছিলেন না আইনস্টাইন। একা একা ঘুরতেন, আপন মনে কি যেন ভাবতেন। স্বাভাবিকভাবেই রেজাল্ট আহামরি গোছের কিছু হচ্ছিল না। রেজাল্টের চেয়েও গুরুতর কিছু সমস্যা নিয়ে বাবা-মা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। শিক্ষকেরা অভিযোগ করতেন, আইনস্টাইন অন্য ছেলেদের সাথে একেবারেই মেশে না, পড়া মুখস্ত বলতে পারে না, আর প্রশ্ন করলে অনেক্ষন লেগে যায় জবাব দিতে। আবার প্রায়ই জবাব দেওয়ার আগে কি যেন বিড়বিড় করে। প্রথম দুটো লক্ষণ না হয় তাও মানা গেল, কিন্তু তৃতীয়টা? ওটির কারণ আর কিছুই নয়, বেতের বাড়ির ভয়। ছোট্ট আইনস্টাইন ভাবতেন, ভুলভাল উত্তর দিয়ে স্যারের হাতে বেতের বাড়ি খাওয়ার চেয়ে বরং সতর্ক থাকাই তো ভালো! কাজেই ক্লাসে সবার সামনে উত্তর দেওয়ার আগে স্বগতোক্তি করে নিজের কাছেই উত্তরটা পরিষ্কার করে নেওয়া, এই আরকি!

ছেলেবেলায় বন্ধুবান্ধবদের সাথে মিশতে না পারলে কি হবে – একটা কিন্তু খুব ভালো গুন ছিল তাঁর। ওই যে চিরন্তন একগুঁয়ে স্বভাব। কোনো একটা ব্যাপার মাথায় ঢুকে গেলে সেটার শেষ না দেখে তিনি ছাড়তেন না। এর নিদর্শন আমরা পাই আইনস্টাইনের ছোট বোন মায়া উইন্টারের লেখা ‘আলবার্ট আইনস্টাইন – আ বায়োগ্রাফিকাল স্কেচ’ গ্রন্থে। মায়া আইনস্টাইন সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন’, কোন কিছুতে একবার আকৃষ্ট হলে যেন রোখ চেপে বসত আইনস্টাইনের মাথায়। একবার মায়ার কিছু খেলার সঙ্গী বাড়িতে এসেছিল। সবাই মিলে তারা মেতে উঠল তাসের ঘর বানানোর খেলায়। চার তলার চেয়ে বেশি আর কেউ বানাতে পারছিল না। ঠিক এ সময় খেলায় যোগ দেন আইনস্টাইন। প্রথম প্রথম চেষ্টা করতে গিয়ে বেশ কয়েকবারই ভেঙ্গে পড়ে তাঁর তাসের ঘর। ব্যস, রোখ চেপে গেল তাঁর। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে করে যে ঘরটি বানালেন আইনস্টাইন – তা ছিল চৌদ্দ তলার!

কিন্তু চৌদ্দ তলা তাসের ঘর বানানো এক কথা, আর পড়াশোনায় ভালো হওয়া আরেক। আইনস্টাইনের রিপোর্ট কার্ডের ছিরি দেখে বাবা বাধ্য হলেন হেড মাস্টারের সাথে দেখা করতে। বাবা হেডমাস্টারকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বুঝলাম না হয় আলবার্ট পড়ালেখায় খারাপ করছে, কিন্তু এর মধ্যেও কি কোনো পছন্দের বিষয় আছে, যা আলবার্টকে আকর্ষণ করে? মানে কোন বিশেষ সাবজেক্টে সে কি আগ্রহটাগ্রহ দেখায়? ভবিষ্যতে তাঁর আগ্রহের বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করলে যদি কোনো ধরনের উন্নতি হয় – চিন্তাক্লিষ্ট বাবার মাথায় তখন হরেক রকম চিন্তা! হেডমাস্টার মশাই আইনস্টাইনের বাবার এ ধরনের আশাবাদে যারপরনাই বিরক্ত হলেন। সরাসরিই বলে দিলেন, ‘দেখুন বাপু, আপনার ছেলে একটু হাবলু টাইপ। ওকে নিয়ে এত আশাবাদী হয়ে লাভ নেই। মনে হয় না জীবনে কোন কিছুতেই সফল হবে আপনার ছেলে’! কালের কি নির্মম পরিহাস, সেই ‘হাবলু টাইপ’ আইনস্টাইনকেই আজ কিন্তু মানুষ মনে রেখেছে, আর কালস্রোতে হারিয়ে গেছে ওই অর্বাচীন ‘জ্ঞানী’ হেডমাস্টার।

দশ বছর বয়সে আলবার্টকে ভর্তি করা হয় মিউনিখ সহরের লুটপোল্ড জিমনেসিয়াম স্কুলে। এখানেও ক্লাসের গৎবাঁধা পড়াশোনা তাঁর জীবনকে নিরানন্দ করে তুলল। বিশেষত গ্রিক ভাষা শেখার ক্লাসটি তো আইনস্টাইনের জন্য এক ‘মূর্তিমান বিভীষিকা’। ভাষার ব্যকরণগুলো কিছুতেই মাথায় ঢুকতে চায় না তাঁর। কাজেই ব্যাকবেঞ্চার হয়ে হাসি হাসি মুখ করে শূন্যদৃষ্টিতে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকাই সার হলো। মাস্টার মশাই হের জোসেফ ডেগেনহার্ট একই ঘটনা প্রতিদিন দেখতে দেখতে একসময় মহা বিরক্ত বোধ করলেন। সরাসরি বলে দিলেন এর পর থেকে আইনস্টাইন যেন আর ক্লাসে না আসে। কিন্তু এভাবে তো কাউকে ক্লাসে আসতে মানা করা যায় না, বিশেষত আইনস্টাইন যখন ক্লাসে কোনো দুষ্টমি করেননি, কারো সাথে গোলমাল বাঁধাননি। তাহলে? বিরক্ত মাস্টার মশাই জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ’ তা ঠিক। কিন্তু ওরকম হাবার মতো হাসি হাসি মুখ করে ক্লাসে বসে থাকলে শিক্ষক মশাই যে সম্মানটুকু শ্রেণীকক্ষে একটি ছাত্রের কাছ থেকে আশা করেন, তা ক্ষুন্ন হয়।‘

বোঝাই যাচ্ছে স্কুল জীবনটা ছিল আইনস্টাইনের জন্য বিভীষিকাময় পীড়ন-কেন্দ্রের মতো। স্কুলের ওই ভয়ার্ত অভিজ্ঞতার ছাপ তাঁর পরবর্তী জীবনে স্থায়ী ভাবে থেকে গিয়েছিল। বুড় বয়সে এক সাক্ষাৎকারে আইনস্টাইন তাই বলেছিলেন, ‘আমার কাছে প্রাথমিক স্কুলের স্যারদের মনে হতো যেন মিলিটারি সার্জেন্ট, আর জিমনেশিয়াম স্কুলের শিক্ষকদের মনে হতো যেন লেফটেন্যান্ট’। এধরনের কথা কিন্তু বলেছিলেন বার্নাড শ-ও। স্কুল জীবন সম্বন্ধে প্রায়ই একই ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয় এই ব্রিটিশ সাহিত্যিকের। শ তাঁর একটি লেখায় বলেন, ‘স্কুল জেলখানার চেয়েও বেশি নিষ্ঠুর জায়গা। জেলখানায় অন্তত কয়েদিদের বাধ্য করা হয় না ওয়ার্ডেনদের লেখা বই পড়তে, অথবা বেত মারা হয় না শুকনো পাঠ্যবই মুখস্ত না বলতে পারলে’। শৈশবের স্কুলজীবনের বিভীষিকাময় পরিবেশের বাইরে সে সময় আইনস্টাইনের জীবনে সম্ভবত একটিমাত্র আনন্দের বিষয় ছিল, তা হলো তাঁর চাচা জ্যাকবের সাহচর্য। তাঁর এই চাচাই শৈশবে আইনস্টাইনকে পরিচয় করিয়ে দেন অঙ্কের প্রধানতম শাখা বীজগণিতের সাথে অনেকটা এভাবে – ‘আলবার্ট, বীজগণিত হচ্ছে মজার এক বিজ্ঞান, বুঝলে? ধরো, একটা পশুকে শিকারের জন্য আমরা খুঁজছি, কিন্তু এখনো ধরতে পারিনি। সাময়িকভাবে আমরা তার নাম দেই X, আর ওটাকে ধরতে না পারা পর্যন্ত আমরা তার খোঁজ চালিয়ে যেতে থাকি।‘

শৈশবে আইনস্টাইনের জীবনে আনন্দের বিষয় ছিল তাঁর চাচা জ্যাকবের সাহচর্য

জ্যাকব চাচা ছাড়া আরো কজনের প্রভাব আইনস্টাইনের ওপর পড়েছিল। এর মধ্যে একজন হলেন ম্যাক্স ট্যালমি নামের এক গরিব মেডিকেলের ছাত্র। এ ছাত্রটি ছিল আইনস্টাইনদের বাসার ডিনারের ‘নিয়মিত অতিথি’। আসলে সে সময় দক্ষিন জার্মানির ইহুদিদের মধ্যে প্রতি বৃহস্পতিবার বাসায় কোনো গরিব ইহুদিকে দাওয়াত করে খাওয়ানোর রীতি প্রচলিত ছিল। সে সূত্রেই ম্যাক্স ট্যালমির আইনস্টাইনদের বাসায় আসা। ফলাফল অবশ্য মন্দ হয়নি, এর কাছ থেকেই কিশোর আইনস্টাইন জ্যামিতি আর ক্যালকুলাস শেখার প্রাথমিক অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।

আর ছিলেন আইনস্টাইনের মা। তিনি অবশ্য জ্যামিতি বা ক্যালকুলাস শেখায় কোনো সাহায্য করেননি, করেছিলেন বেহালা শেখায়। এই বেহালা এবং সর্বপোরি সংগীতপ্রীতি আইনস্টাইনের শেষ দিন পর্যন্ত বহাল ছিল। তাঁর জীবনীকার ডেনিশ ব্রায়ান আইনস্টাইন – আ লাইফ’ (১৯৯৬) গ্রন্থে আইনস্টাইনের সংগীত-প্রিয়তার একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন – ‘একবার আইনস্টাইন তাঁর মধ্যবয়সে যথারীতি হেলতেদুলতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। হাতে ছিল তাঁর প্রিয় বেহালাখানা। হঠাত শুনলেন রাস্তার ওপারের এক বাসা থেকে পিয়ানোর আওয়াজ ভেসে আসছে। আইনস্টাইন দৌড়ে বাসার কাছে চলে আসতে আসতে মহিলাকে বললেন, থেমো না, থেমো না, বাজাতে থাকো! বলতে বলতেই বাক্স থেকে নিজের বেহালাটি বের করে ফেললেন, আর মহিলার সাথে তালে তাল মিলিয়ে বাজাতে লাগলেন। আইনস্টাইনের এ ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল সত্যই বিস্ময়কর।‘ আইনস্টাইনের সংগীতপ্রিয়তার আরেকটি বড় উদাহরণ আমরা পরবর্তীতে পাই রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎকারের সময় (১৯৩০)। রবীন্দ্রনাথ জার্মানিতে আইনস্টাইনের বাসায় বেড়াতে এলে তাঁরা দুজনেই প্রাচ্য আর প্রতীচ্যের সংগীত নিয়ে গভীর আলোচনায় নিমগ্ন হয়েছিলেন। সাক্ষাৎকারটির অনুলিখন পড়লে বোঝা যায় যে, পদার্থবিজ্ঞানের কাঠখোট্টা জগতের বাইরেও তাঁর ছিল সংগীতপ্রিয় সরস এক শিল্পী মন।

আইনস্টাইনের মা আইনস্টাইনকে দিয়েছিলেন বেহালা শেখার প্রেরণা

তবের আসল উপকারটি যিনি করেছিলেন তিনি তাঁর জ্যাকব চাচাও নন, ম্যাক্স ট্যালমিও নন, এমনকি তাঁর মা-ও হয়তো নন, উপকারটি করেছিলেন তাঁর বাবা – সেই ছোট্টবেলায় আইনস্টাইনকে একটি সামান্য কম্পাস কিনে দিয়ে। আইনস্টাইনের বয়স তখন কতই বা হবে – চার/পাঁচ! কম্পাসের কাঁটা যে সব সময় উত্তর-দক্ষিণে মুখ করে থাকে – এ ব্যাপারটা আইনস্টাইনকে যারপরনাই বিস্মিত করেছিল। ছোট্ট আইনস্টাইন ঘুমানোর সময়ও শুয়ে শুয়ে ভাবতেন যে, কম্পাসের কাঁটা কেন শুধু উত্তর-দক্ষিণে মুখ করে থাকবে! নিশয়ই কোনো কারণ আছে এর পেছনে। মাঝরাতে বাবা এসে দেখেন আইনস্টাইন তখনো ঘুমায়নি। বাবাকে দেখেই আইনস্টাইনের প্রশ্ন – ‘আচ্ছা বাবা, কম্পাসের কাঁটা কেন কেবলই এক দিকে মুখ করে থাকে? বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ম্যাগনেটিজম’। তার পরই বলতেন ‘আলবার্ট, অনেক রাত হয়েছে, এখন ঘুমানোর চেষ্টা করো তো।‘ ঘুমিয়ে যেতে যেতেই আইনস্টাইন ভাবতেন, হুমম ম্যাগনেটিজম বড় হয়ে ব্যাপারটা আরো ভালো করে বুঝতে হবে।

 

বিস্ময় বছর

আইনস্টাইন বড় হয়ে ভালোই বুঝেছিলেন সেটা। বুঝেছিলেন বলেই তিনি ‘বড় হয়ে’ আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। আপেক্ষিক তত্ত্ব নির্মাণ করতে তাঁর আবার নিউটন, ফ্যারাডে, কুলম্ব, গ্যালভানি, অ্যাম্পিয়ার, ম্যাক্সয়েল, হেলমোলজেদের ক্রমিক অবদানে গড়ে ওঠা তড়িচ্চুম্বকীয় মূল নীতিগুলোর সংস্কার সাধন করতে হয়েছিল।

সংগত কারনেই ১৯০৫ সালটিকে আইনস্টাইনের জীবনের ‘বিস্ময় বছর’ বলা হয়, কারণ ও বছরটিতেই আইনস্টাইন মৌলিক আবিষ্কারগুলো করেছিলেন। তার আগ পর্যন্ত আইনস্টাইনের পরিচিতি ছিল অনেকটা যেন ‘অ্যামেচার পদার্থবিদ’ হিসেবে। জুরিখের পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ভর্তি পরীক্ষায় তো এক্কেবারে ফেলই করে বসলেন। পরে অবশ্য তাঁর সাধের এই পলিটেকনিকে একটু অন্যভাবে ভর্তি হতে পেরেছিলেন (ভর্তি পরীক্ষায় আর দ্বিতীয়বার না বসেই)। ভর্তি হলে কি হবে, ফলাফল কিন্তু যেই কি সেই।

ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষায় বসেন চারজন ছাত্র ও একজন ছাত্রী। প্রথম হন লুই কলরস (স্কোর ৬০), দ্বিতীয় মার্সেল গ্রসম্যান (স্কোর ৫৭.৫), জ্যাকব এহরাট (৫৬.৫), এর পর আইনস্টাইন (৫৪), শেষ স্থান মিলেভা মারিকের (৪৪, ফেল) যিনি পরবর্তীতে আইনস্টাইনের স্ত্রী হন। তার মানে ফেলের হাত থেকে বাঁচলেও পাশ করা ছাত্রদের মধ্যে আইনস্টাইনের স্থান হয় সবার শেষে। রেজাল্ট খারাপই কেবল একমাত্র বিষয় নয়, এর মধ্যে পদার্থবিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধানকেও দিলেন চটিয়ে। প্রফেসর ওয়েবার নামের অধ্যাপক মশাইটি চাইতেন ছাত্ররা তাকে সব সময় ‘হের প্রফেসর’ বলে ডাকুক (আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অধ্যাপক যেমন সারা দিনই ‘স্যার স্যার’ করা পছন্দ করেন, অনেকটা ওরকম আরকি!)। আইনস্টাইন ব্যাপারটি বুঝলেও তাকে সব সময় নাম ধরে ‘হের ওয়েবার’ নামে সম্বোধন করে যেতেন। এর ফলে প্রফেসর সাহেব এমনই ক্ষ্যাপা খ্যাপেন যে, পরীক্ষার আগে তিনি আইনস্টাইনকে একটি স্টাডি পেপার দু-দুবার লিখতে বাধ্য করেছিলেন।

সে যা-ই হোক, পরীক্ষার লবডঙ্কা ফলাফলের খেসারত ভালোই দিলেন আইনস্টাইন। সহপাঠীদের মধ্যে কেবল চাকরী হল না তাঁরই। নানা কলেজে দরখাস্ত করলেন, কিন্তু কোথা থেকেও কোন উত্তর এলো না। নিজ প্রতিষ্ঠানেও কোন আশার আলো দেখতে পেলেন না আইনস্টাইন।

সেই ওয়েবার মশাই, যিনি এমনিতেই আইনস্টাইনের উপর ‘ক্ষেপচুরিয়াস’ ছিলেন, তিনি ঘোষনা করে দিলেন যে এ বছর তিনি কোন পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রকে তাঁর অধীনে কাজ করার জন্য নেবেন না, নেবেন একজন পুরোদস্তুর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। বোঝাই যায়, পাছে আইনস্টাইন আবেদন করে বসেন এই ভয়েই তড়িঘড়ি করে অমন ঘোষনা দিয়েছিলেন তিনি। যা হোক, বেকার আইনস্টাইনকে শেষ পর্যন্ত সাহায্য করেছিলেন তাঁর পলিটেকনিকের সহপাঠী গ্রসম্যান। গ্রসম্যান তাঁর বাবাকে অনুরোধ করে কোনো রকমে আইনস্টাইনের জন্য একটা চাকরী জুটিয়ে দিলেন সুইস পেটেন্ট অফিসে। পদ – প্রবেশনারি টেকনিক্যাল এক্সপার্ট, থার্ড ক্লাস। হ্যাঁ – ওখানেই চাকরী শুরু করলেন আইনস্টাইন, ধীরে ধীরে সহকর্মীর শ্রদ্ধাভাজনও হতে শুরু করলেন, কিন্তু এর বেশি কিছু আইনস্টাইনকে দেখে তখন বোঝা যায়নি।

কিন্তু মাস খানেকের মধ্যেই পরিস্থিতি গেল বদলে। ওই ‘অজ্ঞাতকুলশীল’ সাধারণ পেটেন্ট ক্লার্কের চিন্তার ঝড়ে আক্ষরিকভাবেই লন্ডভন্ড হয়ে গেল পৃথিবী। এমনই লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে গেল যে, পদার্থবিদদের এত দিনকার চিরচেনা বিশ্বজগতের ছবিটাই গেল আমূল বদলে। পুরো পদার্থবিজ্ঞানের চেনা জগতটাকেই ঢেলে সাজাতে হলো, পাঠ্যপুস্তকগুলোও লিখতে হল এক্কেবারে নতুন করে! তা পেটেন্ট অফিসে বসে কি করলেন আইনস্টাইন? তিনি তাঁর ওই ‘বিস্ময় বছরের’ প্রথমভাগে প্রকাশ করলেন ব্রাউনীয় গতির উপর একটা পেপার- যেটি আমাদের দিয়েছিল পরমাণুর অস্তিত্বের বাস্তব প্রমাণ, তারপর বানালেন আলোর কণিকা বা কোয়ান্টাম তত্ত্ব, আর প্রকাশ করলেন সব চাইতে জনপ্রিয় আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বটি। তাঁর বিখ্যাত সমীকরণ E = mc2 বাজারে এলো একটি অতিরিক্ত (সংযোজনী) তিন পৃষ্ঠার পেপার হিসেবে। একটি পেপারের জন্য আবার পরবর্তীতে পেলেন নোবেল। আইনস্টাইন আর ‘অ্যামেচার পদার্থবিদ’ রইলেন না, থাকলেন না আর পৃথিবীবাসীর কাছে ‘অজ্ঞাত’ ব্যক্তি হিসেবে। ১৯১৯ সালে আইনস্টাইনের তত্ত্বের ব্যবহারিক প্রমাণ মিলল, তখন আইনস্টাইন রীতিমত তারকা। সে বছর নিউইয়র্ক টাইমস ব্যানার হেডলাইন করে ফিচার করল –

‘আইনস্টাইনের তত্ত্বের বিশ্বজয়।‘
‘লন্ডন টাইমস’ লিখল,
‘বিজ্ঞানে বিপ্লব … নিউটনীয় ধারণা গদিচ্যুত।‘

আইনস্টাইনের আসন সেদিন থেকে পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে রীতিমতো স্থায়ী হয়ে গেল। তাঁর জীবনীকার ডেনিশ ব্রায়ান Einstein: A Life গ্রন্থে লিখেছিলেন,

‘He was regarded by many as an almost supernatural being, his name symbolizing then – as it does now – the highest reaches of the human mind’.

সত্যিই তা-ই। ‘আইনস্টাইন’ শব্দটি উচ্চারন করলেই মনে হয় যে হিমালয়সম তুঙ্গস্পর্শী মানবপ্রতিভার অবয়ব চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল সে সময়ই। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের রুজ বল প্রফেসর রজার পেনরোজের মতে,

‘আমাদের পরম সুবিধা এই যে, এই বিংশ শতাব্দীতে আমরা দু-দুটো বিপ্লবের সাক্ষী হয়েছি। প্রথমটিকে আমরা বলি আপেক্ষিকতার, আর দ্বিতীয়টি চিহ্নিত হয়েছে কোয়ান্টাম তত্ত্ব নামে। অবাক ব্যাপার যে, একজন মাত্র বিজ্ঞানী – আলবার্ট আইনস্টাইন – তাঁর অসাধারণ মনন আর অনুসন্ধিৎসা বলে ১৯০৫ সালে মাত্র এক বছরের ভেতর রচনা করেছিলেন ওই দু-দুটো বিপ্লবেরই।‘

 

মানস পরীক্ষা

আপেক্ষিকতার তত্ত্ব উদ্ভাবনের পেছনে রয়েছে আইনস্টাইনের অসাধারণ কিছু মানস পরীক্ষা (Thought Experiment)। ‘অসাধারণ’ শব্দটি লিখলাম বটে, কিন্তু বর্ণনা শুনলে মনে হবে এ তো খুবই অসাধারণ। এতই সাধারণ, যে কারো মাথায়ই হয়তো আসবে না যে, এগুলো কোনো চিন্তার বিষয় হতে পারে।

বিঃদ্রঃ মানস পরীক্ষাগুলো (Thought Experiment) কোনো বাস্তব পরীক্ষা নয়, বরং কল্পিত পরীক্ষা। পরীক্ষাগুলো ঘটে আসলে পদার্থবিদদের মাথার ভেতরে, কোনো ল্যাবরেটরিতে নয়। মূলত যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা এবং অন্যান্য কারণে এ ধরনের পরীক্ষাকে বাস্তবে রুপ না দেওয়া গেলেও পদার্থবিদদের মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া এ পরীক্ষাগুলোর গুরুত্ব কিন্তু অপরিসীম।

আইনস্টাইনের অসাধারণত্ব ওখানেই। সাধারণ আর হালকা বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে করতে অসাধারণ সমস্ত জটিল সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারতেন। সেই সতেরো বছর বয়সে হঠাত করেই একদিন আইনস্টাইনের মাথায় এসেছিল একটি অদ্ভুতুড়ে প্রশ্নঃ ‘আচ্ছা, আমি যদি একটা আয়না নিয়ে আলোর গতিতে শাঁ শাঁ করে ছুটতে থাকি, তবে কি আয়নায় আমার কোনো ছায়া পড়বে?

প্রশ্নটা শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর আবেদন কিন্তু সুদূরপ্রসারী। এই প্রশ্নটি সমাধানের মধ্যেই আসলে লুকিয়ে ছিল আপেক্ষিকতার বিশেষত্ব (Special Theory of Relativity) সমাধানের বীজ। আলোর গতিতে চললে আয়নায় কি ছায়া পড়ার কথা? আমাদের প্রাত্যহিক যে অভিজ্ঞতা, তাঁর নিরিখে বলতে গেলে বলতে হয় ‘পড়বে না’। কেন?

কারণটা সোজা। গ্যালিলিও-নিউটনেরা বস্তুর মধ্যকার আপেক্ষিক গতির যে নিয়মকানুন শিখিয়ে দিয়েছিলেন, সেটা থেকে বোঝা যায়, আলোর সমান সমান বেগে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকলে আইনস্টাইনের সাপেক্ষে আলোকে তো এক্কেবারে গতিহীন মনে হবার কথা। ফলে আলোর তো আইনস্টাইনকে ডিঙ্গিয়ে আয়নায় ঠিকরে পড়ে আবার আইনস্টাইনের চোখে পড়বার কথা নয়। তাহলে ওই পরিস্থিতিতে আইনস্টাইন কিন্তু নিজের ছায়া আয়নায় দেখতে পাবেন না, আরো সোজাসুজি বললে বলা যায়, আয়না মুখের সামনে ধরে আলোর বেগের সমান বেগে দৌড়ুতে থাকলে আইনস্টাইন দেখবেন যে আয়না থেকে আইনস্টাইনের প্রতিবিম্ব রীতিমতো ‘ভ্যানিশ’ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাই যদি হয় এই ব্যাপারটি জন্ম দেবে আরেক সমস্যার। এতোদিন ধরে গ্যালিলিও যে ‘প্রিন্সিপাল অব রিলেটিভিটি’ নামের সার্বজনীন এক নিয়ম আমাদের শিখিয়েছিলেন, সেটা তো আর কাজ করবে না। গ্যালিলিওর এই আপেক্ষিকতার নিয়মটা আগে একটু একটু বোঝার চেষ্টা করা যাক। এই যে আমরা পৃথিবী নামের গ্রহের কাঁধে সওয়ার হয়ে সূর্যের চারদিকে সেকেন্ডে ১৬ মেইল বেগে অবিরাম ঘুরে চলেছি, তা আমরা কখনো টের পাই না কেন? কারণ আমাদের অবস্থান তো পৃথিবীর বাইরে নয়। পৃথিবী আমাদের সাথে নিয়েই প্রতিনিয়ত লাট্টুর মতো ঘুরে চলেছে। কাজেই আমাদের সাপেক্ষে পৃথিবীর আপেক্ষিক গতি তো সব সময়ই স্রেফ শূন্যই থাকে। সেজন্যই আমরা পৃথিবীর গতিকে কখনো উপলব্ধি করি না। ঠিক একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয় আমাদের যখন আমরা স্টিমারে, লঞ্চে কিংবা জাহাজে করে নদী কিংবা সমুদ্র পাড়ি দিই। অনেক সময় আমরা ডেকের ভেতরে থেকে বুঝতেই পারি না লঞ্চ বা জাহাজটা চলছে কি না। কেবল বাইরের দিকে তাকিয়ে যখন দেখি তীরের গাছপালা-বাড়িঘরগুলো সব পেছনের দিকে চলে যাচ্ছে, তখনই কেবল বুঝি যে আমাদের জাহাজটা আসলে সামনের দিকে এগোচ্ছে। পৃথিবীর ঘূর্ণনের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই। কেবল আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা যখন সূয্যি মামাকে পুব থেকে পশ্চিমে চলে যেতে দেখি, তখনই আমরা কেবল বুঝি যে আমাদের পৃথিবীটা হয়তো আমাদের সাথে নিয়ে পশ্চিম থেকে পুবে পাক খেয়ে চলেছে। এই বিভ্রান্তিটাই কিন্তু গ্যালিলিওর ‘প্রিন্সিপাল অব রিলেটিভিটি’র মূল কথা। গ্যালিলিও বলেছিলেন যে, কেউ যদি সমবেগে ভ্রমণ করতে থাকে (ধরুন জাহাজে করে) তবে তার (জাহাজের ডেকের ভেতরে বসে) কোনভাবেই বুঝবার বা বলবার উপায় নাই যে সে এগোচ্ছে, পেছাচ্ছে নাকি স্থীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তা-ই যদি হয়, জাহাজটি যদি আলোর বেগে চলে তবে তো এই সর্বজনীন ব্যাপারটি খাটবে না। জাহাজের ডেকে বসে স্রেফ আয়নার দিকে তাকিয়েই কিন্তু জাহাজযাত্রী বুঝে যাবেন যে তাঁর জাহাজটি চলছে, কারণ তিনি তাঁর প্রতিবিম্বকে আয়না থেকে ভ্যানিশ হয়ে যেতে দেখবেন।

তাহলে? তাহলে আর কিছুই নয় – আইনস্টাইন বুঝলেন, হয় গ্যালিলিওর প্রিন্সিপাল অব রিলেটিভিটি ভুল, নয়তো আইনস্টাইনের মানস পরীক্ষার মধ্যেই কোথাও গলদ রয়ে গেছে। অবশ্যই সতেরো বছর বয়সে এই ধাঁধার কোনো সমাধান পাননি আইনস্টাইন, কিন্তু এ নিয়ে অনবরত চিন্তা করেই গেছেন।

সমাধান পেয়েছেন শেষ পর্যন্ত সুইস পেটেন্ট অফিসে চাকরি শুরু করার মাস খানেকের মধ্যে। আইনস্টাইন বুঝলেন যে, গ্যালিলিওর প্রিন্সিপাল অব রিলেটিভিটির মধ্যে কোনো ভুল নেই। আয়না থেকে ছায়া ভ্যানিশ হওয়া ঠেকাতে হলে আলোর গতির ব্যাপারটিকে একটু ভিন্ন রকমভাবে ভাবতে হবে; আর দশটা সাধারণ বস্তুকণার বেগের মতো করে ভাবলে চলবে না। আইনস্টাইন বললেন, ‘আলোর বেগ তার উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতির উপর কখনোই নির্ভর করে না; এটি সব সময়ই ধ্রুবক।‘ ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত। মন মানতে চায় না; কারণ এই ব্যাপারটি বস্তুর বেগ সংক্রান্ত আমাদের সাধারণ পর্যবেক্ষণের একেবারেই বিরোধী। যেমনঃ ধরা যাক, আপনি একটি রাস্তায় ৪০ কিমি বেগে গাড়ি চালাচ্ছেন।

আপনার বন্ধু ঠিক বিপরীত দিক থেকে আরেকটি গাড়ি নিয়ে ৪০ কিমি বেগে আপনার দিকে ধেয়ে এল। আপনার কাছে কিন্তু মনে হবে আপনার বন্ধু আপনার দিকে ছুটে আসছে দ্বিগুণ (৪০+৪০=৮০ কিমি) বেগে। আলোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্য রকম। ধরা যাক, একজন পর্যবেক্ষক সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৫০ হাজার কিলোমিটার বেগে আলোর উৎসের দিকে ছুটে চলেছে। আর উৎস থেকে আলো ছড়াচ্ছে তার নিজস্ব বেগে – অর্থাৎ সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটারে। এখন কথা হচ্ছে পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর বেগ কত বলে মনে হওয়া উচিত? আগের উদাহরণ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা বলে- সেকেন্ডে (১ লক্ষ ৫০ হাজার + ৩ লক্ষ =) ৪ লক্ষ ৫০ হাজার কিলোমিটার। আসলে কিন্তু তা হবে না। পর্যবেক্ষক আলোকে সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার বেগেই তাঁর দিকে আসতে দেখবে। ব্যাপারটা ব্যতিক্রমী সন্দেহ নেই, কিন্তু এ ব্যাপারটা না মানলে গ্যালিলিওর ‘প্রিন্সিপাল অব রিলেটিভিটি’র কোনো অর্থ থাকে না। আইনস্টাইন তাঁর তত্ত্বের সাহায্যে আরো দেখালেন, যদি কোনো বস্তুকণার বেগ বাড়তে বাড়তে আলোর গতিবেগের কাছাকাছি চলে আসে, বস্তুটির ‘আপেক্ষিক ভর’ বেড়ে যাবে (mass increase) নাটকীয়ভাবে, দৈর্ঘ্য সংকুচিত হয়ে যাবে (length contraction) এবং সময় ধীরে চলবে (time dialation)। সময়ের ব্যাপারটা সত্যই অদ্ভুত।

একটা বিষয় একটু পরিষ্কার করা দরকার। যদিও বেইজারসহ আগেকার কিছু বইপত্রে আলোর গতির সাথে সাথে বস্তুর ভর বেড়ে যাওয়ার কথা বলা থাকে, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীরা ব্যাপারটিকে আর সেরকমভাবে ব্যাখ্যা করেন না। আসলে ‘রিলেটিভিস্টিক ম্যাস’ বা আপেক্ষিক ভর একটি পুরনো ধারণা। ১৯৩০ সালের আগে পদার্থবিজ্ঞানীরা এটা ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন অধিকাংশ পদার্থবিদেরাই যেটা ব্যবহার করেন তা হলো ‘ইনভ্যারিয়েন্ট ম্যাস’ বা অপরিবর্তিত ভর। পরিবর্ত ভর আলোর বেগের উপর নির্ভর করে না, এটি মূলত একটি অপরিবর্তিত স্কেলার রাশি। কেন আলোর গতিবেগের সাথে সাথে বস্তুর দৈর্ঘ্য কমলেও (length contraction) কিংবা সময় শ্লথ হয়ে গেলেও (time diliation) বস্তুর ভর অপরিবর্তিত থাকে। তাহলে কেন কোন বস্তুকণা আলোর সমান গতিতে ধাবমান হতে পারবে না? সেটাকে ব্যাখ্যা করা উচিত আসলে ভরের মাধ্যমে নয়, বরং শক্তির মাধ্যমে। যত বস্তুর বেগ বাড়তে থাকে তার জড়তা বা ইনারশিয়া বাড়তে থাকে। এক্ষেত্রে বস্তুকণা আলোর বেগের সমান হতে পারবে না, কারণ এর জন্য অসীম শক্তির দরকার হবে।

বিজ্ঞানী-অবিজ্ঞানী-নির্বিশেষে সবাই সময় ব্যাপারটিকে এতোদিন একটা ‘পরম’ (absolute) কোনো ধারণা হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম; সময় ব্যাপারটা রাম-শ্যাম-যদু-মধু সবার জন্যই ছিল সমান, যেন মহাবিশ্বের কোথাও লুকিয়ে থাকা একটি পরম ঘড়ি অবিরাম মহাজাগতিক হৃৎস্পন্দনের তালে তালে স্পন্দিত হয়ে চলছে, টিক, টিক, টিক, টিক – যার সাথে তুলনা করে পার্থিব ঘড়িগুলোর সময় নির্ধারণ করা হয়। কাজেই সময়ের ব্যাপারটা আক্ষরিক অর্থেই ছিল পরম, কোনো ব্যক্তি বিশেষের উপর কোনোভাবেই নির্ভরশীল নয়। কিন্তু আইনস্টাইন রঙ্গমঞ্চে হাজির হয়ে বললেন, সময় ব্যাপারটা কোনোভাবেই ‘পরম’  নয়, বরং আপেক্ষিক। আর সময়ের দৈর্ঘ্য মাপার আইনস্টাইনীয় স্কেলটা লোহার নয়, যেন রাবারের – ইচ্ছে করলেই টেনে লম্বা কিংবা খাটো করে ফেলা যায়! রামের কাছে সময়ের যে দৈর্ঘ্য তা রহিমের কাছে সমান মনে নাও হতে পারে। বিশেষত রাম যদি দ্রুতগতিতে চলতে থাকে, রহিমের তুলনায় রামের ঘড়ি কিন্তু আস্তে চলবে! আরেকটা জিনিস বেড়িয়ে এলো আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে। শূন্য পথে আলোর যা গতিবেগ, কোনো বস্তুর গতিবেগ যদি তার সমান বা বেশি হয়, তবে সমীকরণগুলো নিরর্থক হয়ে পড়ে। এ থেকে একটা সিদ্ধান্ত করা হয় – কোনো পদার্থই আলোর সমান গতিবেগ অর্জন করতে পারবে না। সেই থেকে মহাবিশ্বের গতির সীমা নির্ধারিত হয় আলোর বেগ দিয়ে।

আইনস্টাইন আপেক্ষিকতার এই বিশেষ তত্ত্ব দিয়েই কিন্তু ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারতেন। ১৯০৫ সালে তাঁর গবেষনাপত্রটি জার্নালে প্রকাশের পর থেকেই পদার্থবিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, সুইস পেটেন্ট অফিসের এক অখ্যাত কেরানি অচিরেই পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছেন। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জনক ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক তখনই উচ্চকিত হয়ে উঠেছিলেন এই বলেঃ ‘যদি (আপেক্ষিক তত্ত্ব) সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তবে আইনস্টাইন বিংশ শতাব্দীর কোপার্নিকাস হিসেবে বিবেচিত হবেন।‘

কিন্তু আইনস্টাইন কেবল বিশেষ তত্ত্ব নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকার মানুষ নন। আবিষ্কারের নেশা তখন যেন তাঁকে পেয়ে বসেছে। তিনি মন দিলেন আরো উচ্ছাভিলাষী গবেষণায়। এর ফলাফল হিসেবেই ক’বছরের মধ্যে উঠে এল সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity)। এই গবেষনা মানে ও গুনে এমনই অনন্য যে, আইনস্টাইন নিজেই এক সময় উপলব্ধি করেছিলেন যে, এই গবেষণার কাছে তাঁর আগের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব তো স্রেফ ‘ছেলেখেলা’। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আইনস্টাইনের এই সার্বিক আপেক্ষিকতার পেছনেও কিন্তু রয়েছে আরেকটি সার্থক মানস পরীক্ষা। হঠাত একদিন আইনস্টাইনের মাথায় এল একটা লোক উঁচু একটা বাড়ির ছাদের উপর থেকে পড়ে গেলে কি হবে? কি আবার হবে! ধপ্পাস করে মাটিতে, তারপর দুম ফট! আমাদের মত ছা-পোষা মানুষেরা তো বটেই, অধিকাংশ বিজ্ঞানীরাই ওভাবে চিন্তা করতেন। কিন্তু আইনস্টাইন ওভাবে ভাবলেন না। সাধারণ একটা ঘটনার মধ্যেও অসাধারণত্বের ছোঁয়া খুঁজে পেলেন। তিনি দুর্ভাগ্যবান মানুষটির মাটিতে ভূপাতিত হবার ঠিক আগের মুহূর্তটির ‘সৌভাগ্যের’ কথা ভাবলেন, যেটিকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন ‘হ্যাপিয়েস্ট থট অব মাই লাইফ’।

কি পেলেন আইনস্টাইন ওই পতনশীল মানুষটির মাটিতে আঘাত করার আগ মুহূর্তের মধ্যে? পেলেন ওই যে, ওই পতনশীল মানুষটি নিজের ওজন অনুভব করবে না। আইনস্টাইনের কাছে এ ব্যাপারটির মানে দাঁড়াল, মহাকর্ষ ক্ষেত্রের মধ্যে মুক্তপতনশীলতার অভিজ্ঞতা আর মহাকর্ষ-বিহীন শূন্যাবস্থায় ভেসে থাকার মধ্যে আসলে কোনো পার্থক্য নেই। সেখান থেকেই তিনি বের করে আনলেন ‘ইকুইভ্যালেন্ট প্রিন্সিপাল’ – যা হয়ে দাঁড়াল সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের মূল ভিত্তি।

 

আইনস্টাইন পরবর্তীতে তাঁর এই ঐতিহাসিক তত্ত্বের সাহায্যে মহাকর্ষের সাথে আপেক্ষিকতাকে সন্নিবদ্ধ করে দেখালেন যে, মহাকর্ষকে শুধু শূন্যস্থানে দুটি বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ বল (নিউটন যেভাবে চিন্তা করেছিলেন) হিসেবে ভাবলে চলবে না, ভাবতে হবে আপাত বল (apparent force) হিসেবে, যার উদ্ভব হয় আসলে মহাশূন্যের (space) নিজস্ব বক্রতার কারণে। তাঁর এ তত্ত্ব থেকেই আমরা বুঝতে পেরেছি, কোন আকর্ষণ বল-টল নয়, বরং বিশাল ভরের কারণে মহাশূন্যে সৃষ্টি হয় বক্রতা যা বস্তুকণাদের তো বটেই – এমনকি আলোর গতিপথকেও বাঁকিয়ে দেয়। আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রে সূর্য থাকার কারণেও কিন্তু সৃষ্টি হয়েছে বক্রতা, যার কারণে পৃথিবীসহ অন্য গ্রহগুলোকে একটি বক্রতলে সূর্যের চারদিকে ঘুরতে দেখা যায়। প্রফেসর আর্চিবালড হুইলারের ভাষায় – ‘পদার্থ স্পেসকে বলছে কিভাবে বাঁকতে হবে, আর স্পেস পদার্থকে বলছে কিভাবে চলতে হবে’! এটাই আসলে নিউটনের মহাকর্ষকে আইনস্টাইনের চোখ দিয়ে দেখা।

 

কোয়ান্টাম বলবিদ্যা নিয়ে সংশয়

কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা নিয়েও আইনস্টাইন বিভিন্ন ধরনের মানস পরীক্ষা করেছিলেন তাঁর জীবনের শেষ তিন দশকে। এর অনেকগুলোই তৈরি করেছিলেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বিষয়ে বিখ্যাত ডেনিশ বিজ্ঞানী নীলস বোরের সাথে তর্কে লিপ্ত হয়ে। যদিও আইনস্টাইন ১৯৫ সালে নোবেল পুরস্কারটি পেয়েছিলেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ওপরেই; কিন্তু এই আইনস্টাইনই আবার পরবর্তীতে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সম্ভাবনার জগতের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করতে পারেন নি। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অনিশ্চয়তাকে খন্ডন করতে গিয়ে তাঁর ‘ঈশ্বর পাশা খেলেন না’ উক্তিটি তো সর্বজনবিদিত।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে অসম্পূর্ণ প্রমাণ করতে তিনি অনেকগুলো মানস পরীক্ষার ক্ষেত্র তৈরি করেন; এর মধ্যে বিখ্যাতটি হল ‘ই.পি.আর’ পরীক্ষণ, যেটি তিনি তৈরি করে ন্যাথান রোজেন আর বরিস পোডলস্কির সাথে মিলে। ১৯৩৫ সালে তাঁর সেই মানস পরীক্ষার গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় ফিজিক্যাল রিভিউ জার্নালে Can Quantum Mechanical Description of Physical Reality Be considered Complete? শিরোনামে।

আইনস্টাইনের সবগুলো মানস পরীক্ষাই ছিল খুবই সহজ সরল, যা পদার্থবিজ্ঞানের একেবারে প্রাথমিক জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত। আইনস্টাইনের কৃতিত্ব এখানেই যে তিনি ওইসব সহজ-সরল সাধারণ বিষয়গুলোকে নিয়ে চিন্তা করতে করতে ধীরে ধীরে জটিল তত্ত্বে উপনীত হতেন। আবার অনেক সময় জটিল জিনিসকে নিয়ে আসতেন জনমানুষের সাধারণ বোধগম্যতার স্তরে। একবার বিজ্ঞানের এক ‘ক অক্ষর গোমাংস’ সাংবাদিক ‘আপেক্ষিকতার মূল বিষয়টি কি’ জিজ্ঞাসা করলে, আইনস্টাইন উত্তরে বললেন,

‘আপনি চুলার আগুনে আপনার হাতটি এক মিনিটের জন্য ধরে রাখুন, সেই এক মিনিটকে মনে হবে এক ঘণ্টা। কিন্তু এক সুন্দরী তরুণীর সাথে এক ঘণ্টা ধরে কথা বলুন, সেই এক ঘণ্টাকে মনে হবে এক মিনিট। এটাই আপেক্ষিকতা।‘

আইনস্টাইনের আস্থা ছিল পর্যবেক্ষণ অনপেক্ষ ভৌত বাস্তবতায়। তিনি বিশ্বাস করতেন না মানুষের পর্যবেক্ষণের উপর কখনো ভৌত বাস্তবতার সত্যতা নির্ভরশীল হতে পারে। বোর প্রদত্ত কোয়ান্টাম বলবিদ্যার কোপেনহেগেনীয় ব্যাখ্যার সাথে তার বিরোধ ছিল মূলত এখানেই। বোর বলতেন, ‘পদার্থবিজ্ঞানের কাজ প্রকৃতি কেমন তা আবিষ্কার করা নয়, প্রকৃতি সম্পর্কে আমরা কি বলতে পারি আর কিভাবে বলতে পারি, এটা বের করাই বিজ্ঞানের কাজ।‘ এই ধারনাকে পাকাপোক্ত করতে গিয়ে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার আরেক দিকপাল হাইজেনবার্গ দেখিয়েছিলেন যে, একটি কণার অবস্থান এবং বেগ যুগপৎ নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা অসম্ভব। অবস্থান সুচারুভাবে মাপতে গেলে অবস্থান নির্ণয়ে গণ্ডগোল দেখা দেবে। নীলস বোরের মতে, যতক্ষন পর্যন্ত না একটি কণাকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কণাটি কোথায় রয়েছে – এটা বলার কোনো অর্থ হয় না। কারণ এটি বিরাজ করে সম্ভাবনার এক অস্পষ্ট বলয়ে। অর্থাৎ এই মত অনুযায়ী ভৌত-বাস্তবতা মানব-পর্যবেক্ষণ নিরপেক্ষ নয় (১৯৮২ সালে অ্যালেইন অ্যাস্পেক্ট আইনস্টাইনের ই.পি.আর মানস পরীক্ষাকে পূর্ণতা দান করেন একটি ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমে, যা বোরের যুক্তিকেই সমর্থন করে)। বলা বাহুল্য, আইনস্টাইন এ ধরনের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। একবার বোরের যুক্তিতে অনুপ্রাণিত হয়ে এক বন্ধু তাঁকে রাস্তায় মানব-পর্যবেক্ষণের সাথে কোয়ান্টামীয় ভৌত-বাস্তবতার সম্পর্ক বোঝাতে চাইছিলেন। বিরক্ত আইনস্টাইন আকাশের দিকে আঙ্গুল তুলে বলে উঠলেন-

‘তুমি বলতে চাইছ, ওই যে চাঁদটা ওখানে আছে, আমরা না দেখলে চাঁদটার অস্তিত্ব থাকবে না?’

এই হচ্ছেন আইনস্টাইন। দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কিছু উপমা আর সূদুরপ্রসারী চিন্তাভাবনার মাধ্যমে বিশ্বজগতের জটিল রহস্যের সমাধান করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। প্যাভিয়ার রাস্তআয় হেঁটে বেড়ানো এক সময়কার ‘ভাবুক’ বালক বড় হয়ে স্রেফ কতকগুলো মানস পরীক্ষার মাধ্যমে চিরচেনা জগতের ছবিটাই আমূল পাল্টে দিয়েছিলেন, আর জীবনের শেষ বছরগুলো নিষ্ফলভাবে কাটিয়েছিলেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ‘আজগুবি’ সিদ্ধান্তগুলোকে হটাতে; মানবিকতার সাধনায় আর প্রকৃতির মৌলিক বলগুলোকে একিভূত করবার উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন নিয়ে হেঁটে গিয়েছিলেন অনেক দূরে- একাকী, নিঃসঙ্গভাবে!