অন্তিম প্রশ্নের মুখোমুখিঃ কেন কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে?

‘বিশ্বাস কোনো কিছুরই উত্তর দেয় না, কেবল প্রশ্ন করা থেকে বিরত রাখে’।

–ফ্রেটার রেভাস

 

কেন কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে? –প্রথম কবে প্রশ্নটির মুখোমুখি হয়েছিলাম তা আজ মনে নেই। সম্ভবত পল সাত্রের (১৯০৫১৯৮০) অস্তিত্ববাদী দর্শনবিয়িং এ্যান্ড নাথিংনেসকিংবা মারটিন হাইডেগারের (১৯৮৯১৯৭৬) অধিপদার্থবিদ্যাবিষয়ক বইইন্ট্রোডাকশন টু মেটাফিজিক্সপড়তে গিয়ে। শেষোক্ত বইটির প্রথম লাইনটিই বোধ করি ছিল – ‘হোয়াই দেয়ার ইজ সামথিং রাদার দেন নাথিং?’ তার পর থেকে বহু বইয়ে, অসংখ্য জায়গাতেই এর উপস্থিতি টের পেয়েছি। দার্শনিক উইলিয়াম জেমস (১৮৪২১৯১০) তাঁরসাম প্রব্লেমস অব ফিলসফিগ্রন্থে প্রশ্নটিকে চিহ্নিত করেছিলেনঅন্ধকারতম দর্শনহিসেবে। জ্যোতিঃপদার্থবিদ স্যার আর্থার বার্নাড লোভেল (১৯১৩২০১২) একে দেখেছেনব্যক্তির মনকে ছিন্নভিন্ন করাপ্রশ্ন হিসেবে। বিষয়ে আমার পড়া এখন পর্যন্ত সর্বশেষ বই জিম জোল্টেরহোয়াই ডাস দ্য ওয়ার্ল্ড এক্সিস্ট’ (২০১২) বাংলা করলে দাঁড়ায় – ‘কেন বিশ্ব অস্তিত্বমান?’ বইয়ের এক জায়গায় লেখক রসিকতা করে বলেছেন, ‘সাইকিয়াট্রিক রোগীরা বরাবরই এই প্রশ্ন দিয়ে আচ্ছন্ন থাকে’!

মানসিক রোগীরা সত্যই এই ধরনের প্রশ্ন দিয়ে আচ্ছন্ন থাকে কিনা জানি না, তবে জিম জোল্ট বইয়ের শুরুতেই রসিকতা করেঅস্তিত্বের সহজ প্রমাণহিসেবে যা লেখা আছে, তা মানসিক রোগীর মতোই শোনায় বটে

ধরুন, দেয়ার ওয়্যারনাথিং নাথিং মানে কিছু না, এমনকি কোনো নিয়মনীতি কিছুই নাই। কারণ, নিয়ম থাকা মানেই কিছু একটা থাকা।

কোনো নিয়ম না থাকার মানে, যেকোনো কিছুই সেখানেপারমিটেড

যদি সবকিছুই পারমিটেড হয়, তাইলেনাথিং উইল বই ফরবিডেন’!

তাই,, ‘নাথিংবলে কিছু থাকলেনাথিং উইল বই ফরবিডেন

অর্থাৎ, নাথিং ব্যাপারটাসেলফ ফরবিডিং

সো, দেয়ার মাস্ট বইসামথিং

দার্শনিকদের পাশাপাশি আছেন ধার্মিকরাও। কিছুদিন আগ পর্যন্ত প্রশ্নটি ধর্মবেত্তার প্রিয় একটি প্রশ্ন হিসেবে বিরাজ করেছিল। বিজ্ঞানীদের মুখে কুলুপ আঁটাতে প্রশ্নটি উচ্ছ্বাসভরে ব্যবহার করা হতো। হ্যাঁ, ‘হোয়াই দেয়ার ইস সামথিং রাদার দ্যান নাথিং’- প্রশ্নটি সত্যই ছিল বিজ্ঞানীদের প্রতি বড়সড় চ্যালেঞ্জ; প্যালের ঘড়ি, হয়েলের বোয়িং, কিংবা হাল আমলের হুমায়ুনের নাইকন ক্যামেরা যেমন ধার্মিকদের তৃপ্তির ঢেকুর উৎপাদন করত, এই প্রশ্নটিও অনেকটা বিজ্ঞানধর্মের বিতর্কে বিজ্ঞানের কফিনে শেষ পেরেক পোঁতার মতোই হয়ে উঠেছিল যেন অনেকের কাছে মূল ধারার বিজ্ঞানীরা এত দিন ধরে এর উত্তর প্রদানে অনীহ এবং নিশ্চুপই ছিলেন বলা যায়। অনেকে আবার ধরনের প্রশ্নবিজ্ঞানের বিষয় নয়বলে পাশ কাটিয়ে যেতেন। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। এখন অনেক বিজ্ঞানীই আস্থার সাথে অভিমত দিচ্ছেন যে তাঁরা এর উত্তর জানেন। উত্তরের নিশ্চয়তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ধর্ম দর্শনের বলয়ে পড়ে থাকা প্রশ্নটিকে পদার্থবিজ্ঞানীরা যে নাক গলাতে শুরু করেছেন, এবং নিয়ে একটা অবস্থানে পৌঁছুতে চাইছেন সেটি এখন মোটামুটি নিশ্চিত। সেজন্য বেশ বছর ধরেই দেখছি পদার্থবিজ্ঞানীদের লেখা বইগুলোতে বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসতে। আমরা পদার্থবিদ ভিক্টর স্টেঙ্গরেরগড দ্য ফেইল্ড হাইপোথিসিসশীর্ষক গ্রন্থে এর উল্লেখ ব্যাখ্যা দেখেছি, দেখেছি বিজ্ঞানী হকিংম্লোডিনোরগ্র্যান্ড ডিজাইনবইয়েও। আর ক্ষেত্রে সর্বশেষ সংযোজন বিখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিদ লরেন্স ক্রাউসের ‘A Universe from Nothing: Why There Is Something Rather than Nothing’ বাংলা করলে বলতে পারি – ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্বকেন কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে?’ বইটিতে পদার্থবিদ ক্রাউস পদার্থবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন কিভাবে শূন্য থেকে আমাদের চিরচেনা বিপুল মহাবিশ্ব উদ্ভূত হতে পারে একেবারেই প্রাকৃতিক উপায়ে। যারা লরেন্স ক্রাউসের ব্যাপারে জানেন না, তাঁদের জন্য দু লাইন বলি। অধ্যাপক লরেন্স ক্রাউস বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সুপরিচিত জ্যোতিঃপদার্থবিদ, পিএইচডি করেছিলেন এমআইটি থেকে ১৯৮২ সালে এবং বর্তমানে অ্যারিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়েরঅরিজিননামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের কর্ণধার। এই প্রজেক্টে মহাবিশ্বের উৎপত্তি, পদার্থের উৎপত্তি থেকে প্রাণের উৎপত্তিসহ নানা ধরনের প্রান্তিক বিষয়আশয় নিয়ে তাঁর তত্ত্বাবধানে গবেষণা করা হয়।

ক্রাউসের বইটিতে শূন্য থেকে মহাবিশ্বের উদ্ভবের পাশাপাশি আলোচিত হয়েছে দর্শনের সবচেয়ে প্রগাঢ় সমস্যাটিআমাদের অস্তিত্বের একদম গোড়ার সমস্যাকেনইবা একেবারে কিছু না থাকার বদলে গ্যালাক্সি, তারকাপুঞ্জ, সৌরজগত, পৃথিবী, জীবজগতসহ এত কিছুর অস্তিত্ব রয়েছে আমাদের চারপাশজুড়ে। এতে কিছু থাকার বদলে নিঃসীম আঁধার থাকলেই বা কি ক্ষতি ছিল?

ক্রাউসের বইটির মুখবন্ধে বিজ্ঞানী রিচারড ডকিন্স বলেছেন, ‘জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ডারউইনের অরিজিন অব স্পিশিজ যেমনি, জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ক্রাউসের শূন্য থেকে মহাবিশ্বও তেমনি ডারউইনের বইয়ে বর্ণিত বিবর্তন তত্ত্ব যেমন জীবজগতের ক্ষেত্রে কোন অপ্রাকৃত সত্ত্বা থাকার অনুকল্পকে বাতিল করে দিয়েছে, ক্রাউসের বইও জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অর্থাৎ, মহাবিশ্বের অস্তিত্বের পেছনে কোনো অপ্রাকৃত বা অপার্থিব সত্ত্বার অস্তিত্ব থাকার সকল দাবিকে বাতিল করে দিয়েছে। ক্রাউসের বইটির শিরোনামটিই কেন্দ্রীভূত হয়েছে ধার্মিকদের ছুঁড়ে দেওয়া প্রিয় প্রশ্নকে উপজীব্য করে। বলা বাহুল্য যে সমস্ত মূলধারার পদার্থবিদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে লেখায়, তাঁরা সবাই বিজ্ঞানের চোখ দিয়েই সমস্যাটি মোকাবিলা করেছেন এবং সামধানে পৌঁছাতে চেষ্টা করেছেন, ধর্মবেত্তা কিংবা দার্শনিকদের মতো জল ঘোলা না করে। যেমন, ক্রাউস তাঁর বইয়ে বলেছেন (শুন্য থেকে মহাবিশ্ব’, পৃষ্ঠা ১৪৩) –

আমাদের মহাবিশ্বের আধুনিক বিজ্ঞানের ছবি, এর ইতিহাস, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ, সর্বোপরি শূন্য বলতে আসলে কি বোঝায় তা অনুধাবন এবং পর্যালোচনা করে আমরা এটুকু বলতে পারি যে, এখন প্রশ্নটিকে মোকাবিলা করার জন্য সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছি।

লরেন্স ক্রাউস কোনো অতিশয়োক্তি করেননি। একটা সময় ভাবা হতো ‘নাথিং’ ব্যাপারটা হচ্ছে বস্তুর কিংবা জগতের জন্য স্বাভাবিক অবস্থা, আর ‘সামথিং’ ব্যাপারটা আরোপিত। যেমন জার্মান গণিতবিদ লিবনিজ তাঁর ১৬৯৭ সালে লেখা ‘অন আল্টিমেট অরিজিন অব থিংস’ নামক একটি প্রবন্ধে এ বিষয়ে অভিমত দেন এই বলে যে, ‘নাথিং’ ব্যাপারটা স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু অন্যদিকে ‘সামথিং’ ব্যাপারটা অর্জন করতে কাজ করতে হয়…। আর বাইরের কোনো কিছুর হস্তক্ষেপ ছাড়া এমনি এমনি নাথিং থেকে সাম্থিং-এ উত্তরণ ঘটে না। লিবনিজের কাছে এর সমাধান ছিল যথারীতি ‘ঈশ্বর’।

তার পর থেকে এভাবেই আমাদের দিন গেছে। ‘কেন কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে?’ উত্তর খুব সোজা কারণ হলেন ঈশ্বর। আসলে স্টিফেন হকিং এবং তাঁর সমসাময়িক অন্যান্য ‘ট্যাটনা’ বিজ্ঞানীদের হাতে সত্তরের দশকে ‘কোয়ান্টাম কসমোলজির’ জন্ম হবার আগ পর্যন্ত বিজ্ঞান এর বিপরীতে সফল উত্তর দিতে পারেনি, ঠিক যেমনি ডারউইন আসার আগ পর্যন্ত আমরা প্যালের ডিজাইন আর্গুমেন্টকে ঠিকমতো দলাইমলাই করার উপকরণ খুঁজে পেতাম না। তারপরেও কিছু ঘাড়ত্যাড়া দার্শনিক যে ছিলেন না তা নয়। তাঁরা এ ধরনের ‘হোয়াই দেয়ার ইজ সামথিং রাদার দ্যান নাথিং’ মার্কা প্রশ্ন মুচকি হেসে বলতেন, তা যদি ‘নাথিং’ ব্যাপারটা এতো স্বাভাবিক আর স্বতঃস্ফূর্ত হয় তাহলে ঈশ্বরেরই বা থাকার দরকার কি ছিল? Why there is God rather than nothing?… ‘নাথিং’ বাবাজিকে প্রতিহত করতে অদৃশ্য অপ্রমাণিত ঈশ্বরকে সাক্ষীগোপাল হিসেবে দেখানো যাবে, কিন্তু বাস্তব যে মহাবিশ্বটা আমরা চোখের সামনে হরহামেশা দেখছি সেটাকে ‘কুত্রাপি নয়’, এ ব্যাপারটা একটু হাস্যকর হয়ে যাচ্ছে না? এমনকি অন্তিম প্রশ্নগুলোর উত্তর হিসেবে ঈশ্বরকে সাক্ষীগোপাল করে হাজির করার ব্যাপারটা যে আসলে কোনো উত্তর নয়, তা কৃষক-দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের মাথায়ও এসেছিল। এ জন্যই ‘সত্যের সন্ধানে’ বইয়ে তিনি প্রশ্ন করেছেন – ‘ঈশ্বর সময়কে সৃষ্টি করেছেন কোন সময়ে?’ অথবা ‘স্থানকে সৃষ্টি করা হল কোন স্থান থেকে?’ কিংবা ‘শক্তি সৃষ্টি করা হল কোন শক্তি দ্বারা?’ ধার্মিকেরা এই ধরনের প্রত্যুত্তরে খুব একটা ভালো উত্তর কখনোই দিতে পারেননি। বরং গোস্বা করেছেন। এক দুর্মুখ নাস্তিক একবার খৃষ্টীয় ধর্মবেত্তা সেন্ট অগাস্টিনকে জিজ্ঞেসা করেছিল – ‘ফাদার, এই মহাবিশ্ব বানানোর আগে ঈশ্বর বাবাজি কি করছিলেন বলুন তো?’ অগাস্টিন রাগে ক্ষেপচুরিয়াস হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তোদের মতো লোক, যারা এ ধরনের প্রশ্ন করে, তাদের জন্য জাহান্নাম তৈরি করছিলেন ঈশ্বর’!

তবে ধার্মিকেরা গোস্বা করলেও সংশয়বাদী দার্শনিকেরা সবসময়ই লিবনিজের উপসংহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে গেছেন নানা দৃষ্টিকোণ থেকে। আগেও করেছেন, এখনো করছেন। যেমন, জার্মান দার্শনিক এডলফ গ্রুনবোম তাঁর ‘দ্য পভার্টি অব থিইস্টিক কসমোলজি’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্রে পদ্ধতিগতভাবে লিবনিজের উপসংহারের সমালোচনা হাজির করেছেন, এই সময়ের প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী শন ক্যারল সেটা তাঁর একটি ব্লগে উল্লেখ করেছেন…।

তবে দার্শনিকেরা তাঁদের দার্শনিক প্যাঁচঘোচ থেকে উত্তর বের করতে পারলেও আমার মতে সেগুলো ছিল মোটা দাগে স্রেফ ‘পিছলামি কথার খেলা’, বৈজ্ঞানিক কোন সমাধান নয়। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হল লিবনিজের সময়কালে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এবং এ-সংক্রান্ত অগ্রগতি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের কোন ধারণাই ছিল না। চোখের সামনে দেখা বিশ্বজগতের জন্য যে নিয়ম প্রযোজ্য, সেটার ভিত্তিতেই তাঁরা এবং তাঁদের মতো দার্শনিকেরা সিদ্ধান্ত নিতেন। তাঁরা জানতেন না যে, তাঁদের দৃশ্যমান জগতের বাইরে বিশাল একটা জগত আছে; এই সেই আন্তপারমানিক জগত, যে জগতের নিয়মগুলো অনেকটা হ্যারি পটারের গল্পের ‘হগওয়ার্টস স্কুল’-এর নিয়মকানুনের মতোই অদ্ভুত। আমাদের দৃশ্যমান জগতে আমরা শূন্য থেকে কিছু তৈরি হতে দেখি না, কিংবা আমরা আমাদের বাড়ির ইটের দেয়াল ভেদ করে হেঁটে ওপারে চলে যেতে পারি না। কিন্তু কোয়ান্টাম জগত যেন ভিন্ন, এখানে কণা আর প্রতিকণারা রীতিমতো শূন্য থেকে উদ্ভুত হয়, নিশ্চিত অবস্থান নেওয়ার বদলে সম্ভাবনার বলয়ে থাকতে পছন্দ করে, আর মাঝে মধ্যেই তাঁরা ‘কোয়ান্টাম টানেলিং’-এর মাধ্যমে দুর্লঙ্ঘ বাধার প্রাচীর গলে চলে যায় অশরীরী সত্ত্বার মতোই। কোয়ান্টাম জগতের নিয়মকানুনগুলোকে অবাস্তব ভাবলে কিন্তু ভুল হবে। এটা আমার এই প্রবন্ধের মতোই নিখাদ বাস্তব। যারা ইলেক্ট্রনিক্সের যন্ত্রপাতি নিয়ে নাড়াচাড়া করেন তাঁরা সবাই টানেল ডায়োড ও জোসেফসন জংশনের কথা জানেন, এগুলো কিন্তু কোয়ান্টাম রাজ্যের হ্যারি পটারের সেই ‘হগওয়ার্টস স্কুল’-এর মতো নিয়মকানুনের উপর ভর করেই চলে। এমনকি আমাদের পরিচিত সূর্যি মামার ভেতরে অনবরত যে হাইদ্রোজেনের ফিউশন ঘটে চলছে বলে আমরা জানি, সেটাও কিন্তু কোয়ান্টাম জগতের নীতি মেনেই হচ্ছে।

বিগত সত্তর ও আশির দশকে বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখলেন, কোয়ান্টাম জগতে ‘নাথিং’ ব্যাপারটি ডিফল্ট কিছু নয়, বরং ‘সামথিং’ ব্যাপারাটাই বরং সেখানে ‘ডিফল্ট’। নাথিং ব্যাপারটা সেখানে মোটা দাগে ‘আনস্টেবল’ বা অস্থিতিশীল। শূন্যতা অস্থিতিশীল বলেই ওটা কখনো শান্ত-সমাহিতভাবে পড়ে থাকতে পারে না, সেখানে অনবরতভাবে তৈরি হতে থাকে অসদ কণিকা, অহর্নিশি চলতে থাকে ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশনের রহস্যময় খেলা। আমরা আমাদের বইয়ে আগে আলোচনা করেছি – অ্যারিস্টটল একসময় প্রকৃতিজগত দেখে মন্তব্য করেছিলেন, ‘প্রকৃতি শূন্যতাকে একদম পছন্দ করে না’ (Nature abhors a vacuum)। এমনকি শূন্যতাকে দেখা হতো ‘ব্লাসফেমি হিসেবে। কিন্তু পরে বিজ্ঞানী টরিসেলি পারদ নিয়ে ঐতিহাসিক পরীক্ষার সাহায্যে দেখিয়ে দেন যে, শূন্যতা ইচ্ছে করলেই তৈরি করা যায়, এতে ব্লাসফেমিও হয় না, কারো মাথায় আকাশও ভেঙ্গে পড়ে না। অবাক ব্যাপার হচ্ছে ‘প্রকৃতি শূন্যতাকে একদম পছন্দ করে না’ – অ্যারিস্টটলের করা প্রাচীন এ উক্তিটি যেন কোয়ান্টাম জগতের জন্য সত্য হয়ে ফিরে এসেছে। বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক ক্লোস তাঁর ‘নাথিং’ বইয়ে এ জন্যই বলেছেন, ‘অ্যারিস্টটল কোয়ান্টাম জগতকে দেখে যাওয়ার সুযোগ পাননি, কিন্তু তাঁর এই উচ্চারন জগতের জন্য যেন হাড়ে হারে সত্য হয়ে গেছে।

‘নাথিং’ ব্যাপারটা যে অস্থিত ও নড়বড়ে টাইপের কিছু, তা আশির দশকে উল্লেখ করেছিলেন নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী ফ্যাংক উইলজেক সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে…। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘The Cosmic Asymmetry Between Matter and Antimatter’। মহাবিশ্বের উৎপত্তির উষালগ্নে পদার্থ এবং প্রতিপদার্থ যখন উদ্ভুত হয়েছিল এক রহস্যময় কারনে প্রকৃতি প্রতি-পদার্থের তুলনায় পদার্থের প্রতি খুব সামান্য হলেও পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছিল। এই পক্ষ পাতিতেত্বের ব্যাপারটা যদি না ঘটত, তাহলে আজ আমরা এখানে বসে বসে নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে এই আঁতেলেকচুয়াল প্রশ্ন করার সুযোগ পেতাম না, ম্যাটার ও এন্টিম্যাটার একে অপরকে আলিঙ্গন করে ধ্বংস করে দিত, আর আমাদের সামনে তখন চেনাজানা পদার্থ, জীবজগত ও নক্ষত্ররাজির বদলে থাকত কেবল তেজস্ক্রিয়তায় পরিপূর্ণ অবারিত এক শূন্যতা। আমাদের এই পার্থিব প্রানচাঞ্চল্যের বদলে বিরাজ করত একেবাতে কবরের নিস্তব্ধতা। তবে একটি বিষয় এখানে উল্লেখ্য। ‘অলৌকিক’ কোনো কারনে এই পক্ষপাতিত্ব ঘটেনি। আর এমনও নয় যে প্রকৃতিতে বিশাল কোনো পক্ষপাতিত্ব দেখাতে হয়েছিল এর জন্য। বরং বিজ্ঞানীরা গণনা করে দেখেছেন সূচনালগ্নে পদার্থ-প্রতিপদার্থের মধ্যে এক বিলিয়নের এক ভাগ মাত্র অসমতাই খুলে দিতে পারত আমাদের এই চেনাজানা মহাবিশ্ব তৈরি হবার দুয়ার। আর সত্য বলতে কি – ঠিক তাই সম্ভবত হয়েছে…। আজকের মহাজাগতিক পশ্চাৎপট বিকিরণ বিশ্লেষন করেও বিজ্ঞানীরা ঠিক তেমনটিই দেখছেন…। ফ্রাঙ্ক উইলজেক তাঁর সেই প্রবন্ধে ব্যাখ্যা করেছিলেন কিভাবে অলৌকিক নয়, বরং নিতান্ত প্রাকৃতিক উপায়ে প্রতিসমতার ভাঙ্গনের মাধ্যমে শুরুতে পদার্থ ও প্রতিপদার্থের মধ্যকার অসমতা তৈরি হয়েছিল, এবং তার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, ‘শূন্য ব্যাপারটার অস্থিতিশীলতা’। উইলজেক তাঁর পেপারে লিখেছিলেন এভাবে –

ধারণা করা যায় যে, মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল যতদূর সম্ভব সর্বোচ্চ প্রতিসম দশার (symmetrical state) মধ্য দিয়ে, এবং দশায় কোন পদার্থের অস্তিত্ব ছিল না, মহাবিশ্ব ছিল এক ভ্যাকুয়াম। দ্বিতীয় দশায় পদার্থ এল। এই দশায় প্রতিসাম্যতা ছিল কিছুটা কম। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত কম প্রতিসম দশা এসে সেটি বেড়ে গেল খুব দ্রুত। এই অবস্থান্তরের ফলে যে শক্তি নির্গত হল সেটা কণা তৈরি করল। এই ঘটনা মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং হিসেবে চিহ্নিত করা যায়… কাজেই ‘কেন কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে?’ – প্রাচীন প্রশ্নটির যথার্থ উত্তর হল – ‘নাথিং’ ব্যাপারটা অস্থিতিশীল।

জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানীদের দেওয়া সর্বাধুনিক তত্ত্ব থেকে আমরা এখন জানি যে, আমাদের এই মহাবিশ্ব একটি ‘কোয়ান্টাম ঘটনা’ হিসেবেই এক সময় আত্মপ্রকাশ করেছিল। কাজেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মূল সূত্রগুলো মহাবিশ্বের উৎপত্তির সময়ও একইভাবে প্রযোজ্য হবে, সে আর নতুন কি! সেটা করতে গিয়েই বিজ্ঞানীরা দেখলেন শূন্য থেকে মহাবিশ্বের আবির্ভাব সম্ভব কেবল তা-ই নয়, রীতিমতো অবশ্যম্ভাবী। সেজন্যই ‘গ্র্যান্ড ডিজাইন’ বইয়ে স্টিফেন হকিং ও ম্লোডিনো বলেছেন বহুল পঠিত এই উক্তিতে –

মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সূত্রের মতো পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন সূত্র কার্যকর রয়েছে, তাই একদম শূন্যতা থেকেও মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্ভব এবং সেটি অবশ্যম্ভাবী। ‘স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে উৎপত্তি’ হওয়ার কারনেই ‘দেয়ার ইজ সামথিং, রাদার দ্যান নাথিং’, সে কারনেই মহাবিশ্বের উৎপত্তি রয়েছে, অস্তিত্ব রয়েছে আমাদের। মহাবিশ্বের উৎপত্তির সময় বাতি জ্বালানোর জন্য ঈশ্বরের কোন প্রয়োজন নেই।

আসলে কোয়ান্টাম শূন্যতা অস্থিতিশীল বলেই সেখানে ‘স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎপত্তি’র মাধ্যমে বস্তুকণার উদ্ভব অবশ্যম্ভাবী। ব্যাপারটি খোলাসা করেছেন লরেন্স ক্রাউসও তাঁর সাম্প্রতিক ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ বইয়ে (ইউনিভার্স ফ্রম নাথিং’, পৃষ্ঠা ১৬৯):

কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি থেকে মহাবিশ্ব শূন্য থেকে উদ্ভুত হতে পারে, এবং হবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। সে সমস্ত মহাবিশ্ব ফাঁকা হবার দরকার নেই, তাতে পদার্থ শক্তি থাকতে পারে যতক্ষন পর্যন্ত না এর মাধ্যাকর্ষণের সাথে যুক্ত ঋণাত্মক শক্তিসহ এর সর্বমোট শক্তি শুন্য হবে।

এবং ক্রাউসের সুচিন্তিত উপসংহার (‘ইউনিভার্স ফ্রম নাথিং’, প্রিষ্ঠা ১৭০) –

ব্যাপারটা খুব পরিষ্কার। কোয়ান্টাম মাধ্যাকর্ষণ কেবল মহাবিশ্বকে শুন্য থেকে উদ্ভুত হতে অনুমতি দিয়েই ক্ষান্ত হয় না, একেবারে অবশ্যম্ভাবী করে তুলে। কারণ, স্থানকালের অবর্তমানে যে শূন্যবস্থার কথা আমরা বলছি সেটা একেবারেই আনস্টেবল বা অস্থিতিশীল।

একই ধারণার প্রতিফলন আমরা দেখি পদার্থবিদ ভিক্টর স্টেঙ্গরের বিভিন্ন বইয়ে এবং প্রবন্ধে। তিনি তাঁর ‘কমপ্রিহেনসিবল কসমস’ বইয়ে দেখিয়েছেন যে, কোনো কিছু থাকা এবং না থাকার সম্ভাবনার ব্যাপারটি আসলে গণনা করা সম্ভব, এবং থাকার সম্ভাবনাটা ষাট শতাংশেরও বেশি পাওয়া যায়-। অধ্যাপক স্টেঙ্গার তাঁর প্রবন্ধটি শেষ করেছেন নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী ফ্র্যাংক উইলজেকের পেপার থেকে উদ্ধৃতিটি হাজির করে, যেখানে তিনি অভিমত দিয়েছেন ‘নাথিং ব্যাপারটা অস্থিতিশীল’।

সংশয়বাদী দার্শনিক মাইকেল শারমার সম্প্রতি ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান এবং তাঁর সম্পাদিত ‘স্কেপ্টিক’ পত্রিকায় এ নিয়ে দুটি প্রবন্ধ লিখেছেন। স্কেপ্টিক পত্রিকায় প্রকাশিত দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে কেন কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে এই রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে অন্তত বারোটি সমাধান হাজির করেছেন। তার মধ্যে ধার্মিকদের ‘ঈশ্বর অনুকল্প’টি বাদ দিলে শারমার আরো যে এগারোটি সমাধান হাজির করেছেন তার সবগুলোই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীদের দেওয়া বৈজ্ঞানিক সমাধান, যেগুলোতে অপার্থিব ও অলৌকিক কোনো সত্ত্বা আমদানি না করেই ব্যাপারটিকে মোকাবেলা করা যায়। এর মধ্যে যে সমাধানটিকে সবচেয়ে শেষে রেখেছেন, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সমাধান বলে মত দিয়েছেন শারমার – ‘শূন্যতা অস্থিতিশীল’।

আমরা আমাদের এই বইয়ে গণিতবিদ ও জ্যোতিঃপদার্থবিদদের আধুনিক ধারণাগুলোর সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছি। সেজন্যই এ বইটিতে আমরা গণিতের শূন্যতা এবং পদার্থবিজ্ঞানের শূন্যতা নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করেছি। আলোচনা করেছি মহাবিশ্বের উৎপত্তির সাম্প্রতিক ধারণাগুলো নিয়ে; বিশেষত দীর্ঘ পরিসরে সাম্প্রতিক স্ফীতি তত্ত্ব (inflation theory) নিয়ে। স্ফীতি তত্ত্বকে অধিকাংশ মূল ধারার জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানীরাই মহাবিশ্বের উৎপত্তির রহস্য সমাধানের সবচেয়ে জোরালো তত্ত্ব বলে আজ মেনে নিয়েছেন। সুগ্রন্থিত এ তথ্যের আলোকে দেখানো যায়, শুরুতে শুন্যতা থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে মহাবিশ্বের যাত্রা শুরু হয়ে স্বতঃস্ফূত দশা পরিবর্তনের (phase transition) মাধ্যমে পদার্থের উদ্ভব ঘটা সম্ভব, এবং বাস্তবে হয়তো সেভাবেই মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটেছে। ব্যাপারটি অস্বাভাবিকও নয়, অবৈজ্ঞানিকও নয়। মহাবিশ্বকে যেহেতু কোয়ান্টাম শূন্যতার মধ্য দিয়ে আবির্ভূত হতে হয়েছে, তাই তার উদ্ভব ঘটেছে কোয়ান্টাম স্তরের ‘অস্তিতিশীলতা’ সামলিয়েই। আমরা আমাদের বইয়ে দেখিয়েছি যে, ‘কেন কোন কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে?’ – এটা কোন ধর্মীয় কিংবা দার্শনিক প্রশ্ন নয়, এটা একান্তভাবেই একটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন। বিগত কয়েক শতকে বিজ্ঞানের যে অগ্রগতি ঘটেছে, তার নিরিখে আমরা বলতে পারি, আমরা এ প্রশ্নকে মোকাবিলা করতে সক্ষম, এবং তা বৈজ্ঞানিকভাবেই। আসলে এ ধরনের প্রশ্ন মোকাবিলায় এতোদিন যে সনাতন ছবিটা আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হতো, সেটা এরকমের –

 

আমাদের বইয়ের মাধ্যমে অস্তিত্বের ব্যাখ্যা হিসেবে যে নতুন বৈজ্ঞানিক ছবিটি আমরা পাঠকদের কাছে নিবেদন করেছি সেটার সারমর্ম হল এরকমের –

কোয়ান্টাম জগতের নিয়মকানুনের কথা মাথায় রাখলে কিছু ‘না থাকার’ অবস্থা থেকে ‘কিছু থাকার’ পরিস্থিতিতে পৌঁছানো যায় সহজেই। আর এটা তদারকির জন্য আমাদের ঈশ্বর নামে কোন মধ্যস্বত্বভোগী ওপরওয়ালার দরকার নেই; প্রাকৃতিকভাবেই এটা সম্ভব। কারণ আধুনিক বিজ্ঞানের চোখে শূন্যতা ব্যাপারটি মোটাদাগে অস্থিতিশীল।

বরং এটাই ‘বিজ্ঞানের চোখে’ আমাদের অস্তিত্বের মূল কারণ। এই জন্যই কিছু একদম না থাকার বদলে কিছু আছে বলে আমরা জানি। অন্তত আধুনিক বিজ্ঞানের চোখ দিয়ে দেখলে সেটাই ‘আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্নে’ এখন পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ উত্তর।

 

শেষ কথা

আমাদের বইটি শূন্য নিয়ে। শূন্য নিয়ে আমাদের এই আলোচনা আবর্তিত হয়েছে মূলত দুটি এলাকা ঘিরে – একটি হল গণিতের শূন্যতা,আর অন্যটি পদার্থবিজ্ঞানের। গণিতের শূন্যতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই এসেছে শূন্য সংখ্যাটির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা। শূন্য সংখ্যাটা আমাদের কাছে এখন এতই স্বাভাবিক যে প্রাইমারি স্কুলের ছেলেপুলেদের শূন্য সম্বন্ধে জিজ্ঞেসা করলে হেসে গড়িয়ে পড়বে। একদিন কিন্তু তা এরকম ‘জলবৎ তরলং’ ছিল না। আসলে শূন্য বলে কোন কিছু আমাদের সংখ্যার সম্রাজ্যে ছিলই না। ব্যাপারটা যে অস্বাভাবিক তাও বলা যাবে না অবশ্য। এমন তো নয় যে প্রাত্যহিক জীবনে এর বিশাল কোন ব্যবহার আছে। জমিজমা কিংবা সন্তানসন্ততির হিসাব রাখতেই হোক, কিংবা হোক না বিয়ারের ক্যান খালি করতে, কিংবা বাজার থেকে কলা কিনতে – কেউ শূন্যের ঝামেলায় যায় না; যেতে হয় না। এ নিয়ে বইয়ের প্রথমদিকে আমরা বলেছিলাম খেতের চাষীকে কখনো ‘শূন্য’ সংখ্যক বীজ বপন করতে হয় না, ‘শূন্য’ গরুর দুধ দোয়াতে হয় না, কিংবা হতে হয় না ‘শূন্য’ সন্তানের মৃত্যুতে কাতর। কাজেই শুন্য সংখ্যার উপকারিতে বুঝতে আমাদের সময় লেগেছে।

সময় লাগার আরো একটা বড় কারণ শূন্য সংখ্যাটির প্রকৃতি। আমরা দেখেছি, শূন্য সংখ্যাটা অন্য সব সংখ্যার মতো নয়। যেকোনো সংখ্যাকে নিজের সাথে যোগ করলে সংখ্যার মান বাড়ে। যেমন ১ কে ১-এর সাথে যোগ দিলে আমরা পাই ২। ২-এর সাথে ২ যোগ করলে আমরা পাই ৪। কিন্তু শূন্যকে শুন্যের সাথে যোগ দিলে কেবল শূন্যই পাওয়া যায়। ব্যাপারটা সংখ্যার সর্বজনীন ধর্মের বিরোধী যেন। সে নিজে বাড়তে চায় না, এমনকি অন্য সংখ্যাকেও বাড়তে দেয় না। ২-এর সাথে ০ যোগ করুন। আপনি পাবেন ২। অথচ শূন্যের ক্ষেত্রে ফলাফল দেখে মনে হবে, কেউ কখনো কোন কিছু যোগ করার চেষ্টাই করেনি যেন। আর পূরন ভাগের ক্ষেত্রে এই রহস্য যেন আরও ব্যাপক। শুন্য আমাদের তাড়া করে ফেরে অশরীরী সত্ত্বার মতোই। যেকোনো সংখ্যাকে শুন্য দিয়ে গুন করলে কেবল শূন্যই পাওয়া যায়, সেটা যত বড় কিংবা ছোট সংখ্যা যা-ই হোক না কেন। আর শুন্য দিয়ে ভাগ করতে গেলে যেন অঙ্কের জানা সব কাঠামোই ভেঙ্গে পড়তে চায়।

শূন্যর এই রহস্যময় ব্যাপারস্যাপারগুলো প্রাচীনকালের দার্শনিকদের ভীতবিহ্বল করে তুলেছিল। তাই আমরা ইতিহাসের একটা বড় সময় জুড়ে শূন্যকে ঠেকানোর প্রচেষ্টা লক্ষ্য করি, অন্তত পশ্চিমে তো বটেই। গণিতবিদ পিথাগোরাস আর তাঁর অনুরক্ত বাহিনী মুইলে একধরনের ‘কাল্ট’ই গড়ে তুলেছিলেন তথাকথিত শূন্য আর অমূলদ সংখ্যা ঠেকাতে। তাঁদের ধারণা ছিল, প্রকৃতির পবিত্র সুসামঞ্জস্য বজায় রাখতে হলে এইটাই করণীয়। কিন্তু প্রকৃতি তো এতো সুসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার বহু বৈশিষ্ট্যেই, বহু কাঠামোতেই খুঁজলে অমূলদ সংখ্যা বেরিয়ে আসে। বেচারা হিপসাসকে প্রাণ দিতে হয়েছিল এই গুমোর ফাঁস করে দেওয়ার জন্য। তাই আমরা দেখি, খৃষ্টের জন্মেরও বহু আগে ব্যবিলনে শূন্যের ধারণার উদ্ভব ঘটলেও কিংবা মায়া সভ্যতায় এবং তাঁদের বিখ্যাত ক্যালেন্ডারে এর নিদর্শন থাকলেও পশ্চিম শূন্যকে গ্রহন করেনি। শূন্যকে পশ্চিমে প্রতিষ্ঠিত করতে আসলে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। পিথাগোরাসের জ্যামিতি থেকে শুরু করে, ভারতীয়-আরবীয় সংখ্যা পদ্ধতি, জেনোর ধাঁধা, সুবর্ণ অনুপাত, ফিবোনাচির রাশিমালা, লিমিট, লোপিতালের সূত্রসহ বহু সিঁড়ি পার হয়ে, বহু কাঠখড় পুড়িয়ে আমরা শূন্যের সঠিক ব্যবহার করায়ত্ব করেছি।

পিথাগোরাসের মতো অ্যারিস্টটলের কাছেও শূন্যতার ব্যাপারটি ছিল অগ্রহণীয়। তিনি মনে করতেন, প্রকৃতিতে শূন্যতা থাকতে পারে না (‘Nature abhors a vacuum’)। একটা সময় অ্যারিস্টটলের এ সমস্ত বাণীকে দেখা হতো যেন সাক্ষাত দৈববাণী হিসেবে। তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ছিল বিশাল। সেজন্য পদার্থবিজ্ঞানের জগতেও শূন্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ঢের ঘাম ঝরাতে হয়েছে। পিথাগোরাসের মতো অ্যারিস্টটলের বাহিনীও প্রায় দুই হাজার বছর ধরে শূন্যকে ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল। শূন্যতাকে সে সময় দেখা হতো ‘ব্লাসফেমি’ হিসেবে। কিন্তু পরবর্তীতে বিজ্ঞানী টরিসেলি পরীক্ষার সাহায্যে প্রমাণ করেন যে, শূন্যতা ইচ্ছা করলেই তৈরি করা যায়। এখনকার স্কুল কলেজের বিজ্ঞানের বইগুলোতেও টরিসেলির সেই ভ্যাকুয়াম ছবি দেখি হরহামেশাই। বিজ্ঞানী প্যাস্কেলও পানি আর পারদ নিয়ে টরিসেলির মতো পরীক্ষা করেছিলেন। টরিসেলির শিক্ষক বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি সাকশন পাম্প নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে অনেক আগেই দেখেছিলেন, পাম্প দিয়ে ১০ মিটারের বেশি উচ্চতায় পানি তোলা সম্ভব হচ্ছে না। এর বেশি উচ্চতায় পানি তুলতে গেলে সাকশন টিউবে তৈরি হবে ভ্যাকুয়াম। তিনিই পরে টরিসেলিকে তাঁর পরীক্ষাটি পারদ নিয়ে করার বুদ্ধি দিয়েছিলেন। শিক্ষকের প্রস্তাবমতো সুযোগ্য ছাত্র টরিসেলি ১ মিটার লম্বা একটি টিউবে পারদ পূর্ণ করে একটি পারদপূর্ণ বাটিতে টিউবটি খাড়া করে দেখেছিলেন পারদ টিউবের মধ্যে এভাবে খাড়া হয়ে থাকতে পারে ৭৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত। তার ওপরে ২৪ সেন্টিমিটার উচ্চতার ‘খালি জায়গা’ জুড়ে তৈরি হয়েছে ভ্যাকুয়াম। আরেক বিজ্ঞানী এবং জার্মান শহরের মেয়র অটো ভন গুয়েরিক শূন্যতা তৈরি করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি দেখিয়েছিলেন শুধু দুটি ব্রোঞ্জের গোলকের ভেতরের বাতাস বের করে দিলে তা এমন শক্তভাবে আটকে থাকে যে বিপরীত দিক থেকে আটিটি করে ঘোড়া জোরা দিয়ে টানাটানি করলেও তা খোলা যায় না। আজ আমরা জানি অটো ভন গুয়েরিকের বানানো সেই শূন্যস্থানের ওপর আসলে ক্রিয়া করছিল প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ১০ টন ওজনের অমানুষিক চাপ। আর এই চাপ আসছিল আসলে আমাদের চারপাশের বায়ুমণ্ডল থেকে। এই পরীক্ষাগুলোর কথা আমরা স্কুলেই পড়েছি।

কিন্তু স্কুল-কলেজের বইগুলোতে আমরা যা পাইনি তা হল শূন্যতার আধুনিক ধারণার সাথে পরিচিত হতে। আধুনিক কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এসে যেন নতুন করে শূন্যতাকে সংজ্ঞায়িত করেছে। স্কুল-কলেজের বইপত্রে টরিসেলি বা অটো ভন গুয়েরিককের শুন্যতার যে বর্ণনা আমরা পেয়েছিলাম, তা আসলে প্রকৃত শূন্যতা ছিল না। আমরা আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব এবং পরে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা থেকে দেখেছি, আমাদের মহাবিশ্বের সকল পদার্থ বিলীন করে দিলেও আমরা ‘প্রকৃত শুন্যতা’র হদিস পাই না, পাব না। মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থকে রাতারাতি উধাও করে দেয়া ব্যবহারিকভাবে সম্ভব ও হয়তো নয়; কিন্তু আমরা সেটা আমাদের মানস পরীক্ষার সাহায্যে করতে পারি। মনের আঙ্গিনা থেকে মহাবিশ্বের প্রতিটি নক্ষত্র, প্রতিটি গ্রহ, গাছপালা, পাহাড়পর্বত, মানুষজন, পশু-পাখি থেকে শুরু করে প্রতিটি পদার্থ, প্রতিটি কণা, প্রতিটি প্রতি কণা একে একে বিলীন করে দিতে পারি আমরা। কিন্তু কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব অনুযায়ী এভাবে মই বেয়ে একদম নিচে নেমে আসলেও শূন্য শক্তির দেখা আমরা পাব না। মইয়ের একদম তলায় শুন্যস্থান বলে কথিত যে জায়গার হদিস আমরা পাই, সেখানে নেমেও আমরা দেখি তার মধ্যে কিছু শক্তি লুকিয়ে আছে। এতাই সেই ‘জিরো পয়েন্ট এনার্জি’। এই ‘জিরো পয়েন্ট এনার্জি’ আছে বলেই শূন্যস্থানকে আমরা শান্তভাবে পড়ে থাকতে দেখি না, বরং দেখি অনবরত ‘ফ্লাকচুয়েট’ করতে।

অর্থাৎ, কোয়ান্টাম বলবিদ্যা আনুযায়ী, শূন্যতা মানে আক্ষরিক অর্থে শূন্য নয়। শূন্যস্থানে প্রতি নিয়ত চলছে কণা প্রতিকণার সৃষ্টি ও ধ্বংসের নিরন্তর খেলা। যে শুন্যদেশকে আমরা আপাত দৃষ্টিতে শান্ত, সমাহিত বলে মনে করেছিলেম, তার মধ্যে নিহিত শক্তি থেকে ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশনের মাধ্যমে পদার্থকণা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হচ্ছে, আবার তারা নিজেকে সেই শক্তিতে বিলীন করে দিচ্ছে। ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশনের বাস্তব প্রমাণ আমরা পেয়েছি কয়েক দশক আগেই বিজ্ঞানীদের করা ‘ল্যাম্ব শিফট’ কিংবা ‘কাসিমিরের পরীক্ষা’ থেকে খুব জোরালো-ভাবে।

আধুনিক ‘কোয়ান্টাম জ্যোতির্বিদ্যা’ যেটাকে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী জন গ্রিবিন অভিহিত করেছেন ‘নিউটনের পর বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন’ হিসেবে – সে শাখার গবেষকদের পাওয়া ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, এই ধরনের ‘ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশন’ থেকেই আমাদের এই মহাবিশ্ব আত্মপ্রকাশ করেছিল প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে। অর্থাৎ, এই বিপুলা মহাবিশ্বের আবির্ভাব স্রেফ শূন্য থেকে – কোয়ান্টাম ঝলকানির মাধ্যমে। এ তত্ত্ব থেকে আমরা আরো জানতে পেরেছি, মহাবিশ্বের উদ্ভবের পর ১০-সেকেন্ড পরে এর তাপমাত্রা ছিল ১০.. ডিগ্রির মতো। এ ধরনের ভ্যাকুয়ামকে বিভিন্ন ধরনের ‘ফেজ ট্রাঞ্জিশন’-এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, ত্বরান্বিত হয়েছিল প্রতিসাম্যের ভাঙ্গন। প্রকৃতির মৌলিক বলগুলো পৃথক হয়ে গিয়েছিল এভাবেই। যেমন, যখন তাপমাত্রা ১০-ডিগ্রির কাছাকাছি চলে আসল, তখন তাড়ির চুম্বক এবং দুর্বল নিউক্লিয় বল আলাদা সত্ত্বা হিসেবে পৃথক হয়ে গিয়েছিল। এগুলোর পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ বিজ্ঞানীরা এর মধ্যেই পেয়েছেন। বিজ্ঞানীরা জেনেছেন, ১০- সেকেন্ড সময়ের মধ্যে ভ্যাকুয়াম আরো শীতল হলে হিগস ক্ষেত্র ‘ঠান্ডায় জমাটবদ্ধ’ হয়ে প্রসারিত করেছিল উপপারমানিক কণাদের ভর প্রাপ্ত হবার সুযোগ (সম্প্রতি সারনের বিজ্ঞানীদের হিগস কণার সন্ধান লাভ এই তত্ত্বকে আরো জোরালো করেছে)।

একটা সময় মহাবিশ্ব ধীরে ধীরে আরো শীতল হয়েছে, মহাজাগতিক বিবর্তনের ক্রমধারায় তৈরি হয়েছে ছায়াপথ, নীহারিকা, নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ। বিগ ব্যাং নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা দেখেছিলাম, হাইড্রোজেন, হিলিয়াম কিংবা লিথিয়ামের মত মৌল মহাবিশ্বের উদ্ভবের ঊষালগ্নে তৈরি হলেও আমাদের জীবনের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যে মৌলগুলো – কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন কিংবা লৌহ – এরা কিন্তু সে সময় তৈরি হয়নি। এগুলো তৈরি হয়েছে অনেক অনেক পরে কোনো-না-কোনো নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণ থেকে। বলেছিলাম, ‘আমরা সবাই নক্ষত্রের সন্তান, আমাদের সবার দেহ তৈরি হয়েছে কেবল নাক্ষত্রিক ধূলিকণা দিয়ে’। এখন  কোয়ান্টাম জ্যোতির্বিদ্যা ও স্ফীতি তত্ত্ব থেকে পাওয়া ফলাফলগুলো সত্য হলে এ-ও আমরা বলতে পারি, আমাদের অস্তিত্ব সম্ভবপর হয়েছে শূন্যতার মাঝে কোয়ান্টাম ঝলকানির কারনেই। সে হিসেবে নিঃসীম শূন্যতার মাঝে হঠাত ঘটা নান্দনিক কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনই যেন আমাদের হারানো প্রপিতামত।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এ ধরনের মহাবিশ্বকে দীর্ঘকাল টিকে থাকতে হলে এর মোট ‘ভার্চুয়াল শক্রি’ হতে হবে শূন্যের কাছাকাছি। আমাদের মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে ঠিক সেতাই হয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। আমাদের মহাবিশ্বে ধনাত্মক শক্তি ও ঋণাত্মক শক্তির যোগফল সর্বদা শূন্যই পাওয়া যায়। একইভাবে মহাবিশ্বের ঘূর্ণন কিংবা নেট চার্জ পরিমাপ করেও দেখা গেছে এদের মান থাকে শুন্য। অর্থাৎ পুরো মহাবিশ্বটাই যেন শুন্য থেকে পাওয়া, যাকে বিজ্ঞানী এ্যালেন গুথ অভিহিত করেন ‘আল্টিমেট ফ্রি লাঞ্চ’ অভিধায়।

এখন কথা হচ্ছে শূন্য থেকে মহাবিশ্বের মতো অতিকায় কিছুর উদ্ভব যদি এতোই স্বাভাবিক হতো, তাহলে আমরা সচরাচর শুন্য থেকে কোনো কিছুর আবির্ভাব ঘটতে দেখি না কেন? মুক্তমনায় মহাবিশ্বের উদ্ভব নিয়ে লেখাটির শেষ পর্ব প্রকাশের পর এ ধরনের প্রশ্ন অনেক পাঠকের কাছ থেকে এসেছে। এ ধরনের প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিকই। এক্ষেত্রে আমাদের উত্তর হচ্ছে, ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশনের ব্যাপারটা কেবল ‘এমপ্টি স্পেসে’ হয়। আমাদের বিশ্বজগত এখন আর শূন্য নেই – পদার্থ এবং তার তেজস্ক্রিয়তা প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করছে। তবে আমাদের মহাবিশ্বের বাইরে শূন্যস্থানে হয়তো এভাবে ফ্লাকচুয়েশনের মাধ্যমে অনবরত মহাবিশ্ব তৈরি হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, স্ফীতি তত্ত্বের সর্বাধুনিক ভাষ্য ‘চিরন্তন স্ফীতি’ আর স্ট্রিং তত্ত্বের গণনাগুলো যদি সঠিক হয়ে থাকে, তবে উদ্ভুত মহাবিশ্বের সংখ্যা একটি-দুটি নয়, অসীম-সংখ্যক।

কেন শূন্যতা থেকে মহাবিশ্ব উদ্ভুত হতে পারে? আমরা যে শূন্যতার কথা বলছি সেখানে ভর নেই, শক্তি নেই, স্থান নেই, সময় নেই, ঘূর্ণন নেই, ইলেক্ট্রন নেই, প্রোটন নেই, বোসন নেই, ফারমিয়ন নেই – একেবারে যাকে বলে অবারিত নিঃসীম শূন্যতা। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এ ধরনের শূন্যতা ‘অস্থিতিশীল’। তাঁরা মনে করেন, এ ধরনের শূন্যতা থেকে প্রতিসমতার ভাঙ্গনের মাধ্যমে মহাবিশ্বের উদ্ভব ‘অবশ্যম্ভাবী’। বহুদিন আগে অ্যারিস্টটল যে উক্তি করেছিলেন, ‘প্রকৃতি শূন্যতাকে পছন্দ করে না’ তা মাঝে ভুল প্রমানিত হলেও, সেটা কোয়ান্টাম জগতের জন্য আবার যেন বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে।

আসলে শূন্যতা আমাদের অস্তিত্বের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শূন্যতার মাধ্যমেই আমাদের অস্তিত্ব প্রকাশমান, হয়তো শূন্যতার মাঝেই আমরা সবাই হব বিলীন একদিন। আমাদের অস্তিত্বকে ঠিকমতো বুঝতে হলে শূন্যতাকে বোঝা ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। জীবনানন্দ দাশকে উদ্ধৃত করেই শেষ করি বইটি –

‘আমি তারে পারি না এড়াতে

 সে আমার হাত হাত রাখে হাতে;

সব কাজ তুচ্ছ হয়, পণ্ড মনে হয়,

সব চিন্তা – প্রার্থনার সকল সময়

শূন্য মনে হয়,

শূন্য মনে হয়’!